একতরফা নির্বাচনের পর দেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যত কী? সরকার কোন পরিকল্পনা
নিয়ে এগুচ্ছে আর বিরোধীদলেরই বা কী কর্মসূচি? সব কিছু ছাপিয়ে বিশ্লেষকদের
মত, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে রাজপথে না নামলে আস্থা হারাবে রাজনৈতিক দলগুলো।
অবশ্য, নির্দলীয় সরকারের অধীনে দ্রুত নির্বাচনের দাবিতে হাল্কা কর্মসূচি
নিয়ে শিগগিরই আন্দোলনের মাঠে নামবে বিএনপি। তবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বলছে,
আন্দোলনের হুমকি দিয়ে লাভ হবে না, পুরো মেয়াদেই ক্ষমতায় থাকবে বর্তমান
সরকার।
গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, বর্তমান অবস্থা থেকে উত্তরণ না ঘটলে
জনগণের আস্থা হারাবে রাজনৈতিক দলগুলো। আর জেঁকে বসবে স্বৈরতন্ত্র। আর এর
থেকে বাঁচতে সবার অংশগ্রহণে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের তাগিদ দিয়েছেন তারা।
দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলসহ বেশিরভাগ রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ ছাড়াই
অনুষ্ঠিত হয়েছে ৫ জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচন। বহু বিতর্কিত এ নির্বাচনে
রয়েছে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার রেকর্ড। রয়েছে
বহু সংখ্যক ভোটকেন্দ্রে একটিও ভোট না পড়ার বিশ্বরেকর্ডসহ বহু নেতিবাচক দিক।
তা সত্ত্বেও এর ভেতর দিয়ে সরকার গঠন, দশম জাতীয় সংসদের কার্যক্রম শুরু
হওয়া এবং পরবর্তীতে অনেকটা সহিংস পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে পাঁচ দফায় অনুষ্ঠিত
হওয়া উপজেলা নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ দেশে-বিদেশে সর্বত্র।
প্রশ্নবিদ্ধ, বিতর্কিত কিংবা অগ্রহণযোগ্য যে কোনো অভিধায়ই একে অভিহিত করা
হোক না কেন, দেশ-বিদেশে যতো আলোচনা সমালোচনাই হোক না কেন, এর মাধ্যমে যে
সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তার সেসব শোনার যেন ফুরসত নেই?
সব মিলিয়ে দেশের রাজনীতির গতিপথ আজ কোন দিকে—এ প্রশ্নই ঘুরে ফিরে উঠছে সবার
মনে। আওয়ামী লীগ বলছে, পুরো পাঁচ বছরই ক্ষমতায় থাকবে তাদের সরকার।
সরকারি দলের অনড় অবস্থান প্রসঙ্গে বিএনপি নেতা লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর
রহমান বলেন, ‘সরকার বলেছিল, সাংবিধানিক অনিবার্যতার জন্য এই দশম সংসদ
প্রয়োজন হচ্ছে। আমরা সে কথা মেনে নিয়েছি।’
‘গত ৫ জানুয়ারি তো দশম সংসদ হয়ে গেছে। তার পর এক মাস ধরে কাজ করার পরই সে
সংসদ ভেঙে দেয়ার কথা। এবং সেই সংসদ বাতিল করে একাদশ সংসদের কর্মকাণ্ড শুরু
হওয়ার কথা’—যোগ করেন তিনি।
আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেছেন,
‘আমাদের মেয়াদকাল পর্যন্ত আমরা ক্ষমতায় থাকবো ইনশাল্লাহ। আমরা কাজ করবো,
জনগণের আলোচনা সমালোচনার মধ্য দিয়েই আমরা কাজ করে যাবো।’ তিনি বলেন, ‘তিন
মাস আগে নির্বাচন হয়েছে। ভবিষ্যতে সংবিধান অনুযায়ী তো বর্তমান
প্রধানমন্ত্রীর অধীনেই নির্বাচন হবে। নির্ধারিত সময়ে যখন নির্বাচন হবে,
তারা আসুক, নির্বাচনে অংশগ্রহণ করুক। জনগণের রায় পেলে তারাই ক্ষমতায় যাবে।’
তবে অচিরেই সরকারকে চাপ দিতে বিএনপির রয়েছে আন্দোলনের চিন্তাভাবনা। হাল্কা
কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামার পরিকল্পনা আছে দলটির। তৃণমূল নেতাকর্মীদের
আন্দোলনের প্রস্তুতি নেয়ার নির্দেশনাও দিয়েছেন দলের চেয়ারপারসন খালেদা
জিয়া।
জেনারেল মাহবুব বলেন, ‘আমাদের কর্মসূচি হবে অহিংস ও শান্তিপূর্ণ এবং
গণমানুষকে সম্পৃক্ত করে সরকারকে বাধ্য করা, বুঝিয়ে দেয়া যে সরকার ভুল পথে
হাঁটছে।’
জবাবে নাসিম বলেন, ‘আমাদের যদি কোনো ব্যর্থতা থাকে, ভুলত্রুটি থাকে- যে
কোনো দলের অধিকার আছে সে ভুলত্রুটি ধরিয়ে দেয়া। বিএনপির নেতৃবৃন্দেরও সে
অধিকার আছে। তারা ধরিয়ে দিক। কিন্তু আন্দোলনের হুমকি দিয়ে কোনো লাভ হবে
না।’
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেন,
‘অপজিশন যতো দুর্বল হয়ে পড়বে ততোই স্বৈরতান্ত্রিক সরকার আরো শক্তিশালী হবে,
ততোই তারা জেঁকে বসবে। কারণ, যে দুয়েকজন তখন সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলতে
চাইবে তাদেরকে স্তব্ধ করার জন্য যা কিছু দরকার তাই তারা করবে।’
পরিস্থিতি উত্তরণের পথ কী? বরং একটি আশঙ্কার কথাই শোনালেন কলামিস্ট আবুল
মকসুদ। তিনি বলেন, ‘এ পরিস্থিতিতে দু’দলই যদি গণতান্ত্রিক চেতনার প্রকাশ না
ঘটায় তাহলে উগ্র রাজনীতি মাথাচারা দিয়ে উঠবে। উগ্র রাজনীতি বলতে শুধু
ইসলামিক মৌলবাদী রাজনীতি তা নয়, বাম উগ্র রাজনীতিরও একটা আবির্ভাব এখানে
ঘটতে পারে।’
তার মতে, আন্দোলনের মাধ্যমেই সরকারকে জনগণের দাবি মানতে বাধ্য করার বিকল্প
নেই। সেজন্য চাই ঐক্যবদ্ধ কিংবা যুগপত্ আন্দোলন— ছোট-বড়, মাঝারি সব দলের।
অন্যথায় তারা জনগণের আস্থা হারাবে।
সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, ‘মাঝারি এবং ছোট দলগুলো ঐক্যবদ্ধভাবে হোক বা
বিচ্ছিন্নভাবে হোক যদি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য তারা বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন
করে, তাহলে কিন্তু সরকার বাধ্য হবে আরেকটি নতুন নির্বাচন দিয়ে একটি
প্রতিনিধিত্বশীল সরকার প্রতিষ্ঠিত করতে।’
মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অসাম্প্রদায়িক দেশ গড়তে রাজনৈতিক দলগুলোকে বিশেষ করে
ক্ষমতাসীন দলকে সমঝোতার রূপরেখা নিরূপণ এবং বিরোধী মতের ওপর গুরুত্ব দেয়ার
পরামর্শ দিয়েছেন এই বিশ্লেষকরা।
List of Bangladeshi newspapers, bangla news sites, All other regional newspapers in Bangladesh.All Bangladeshi Letest news.article 2014
HSC পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস 2014
দেশজুড়ে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা (এইচএসসি) শুরু হয়েছে। বৃহস্পতিবার ছিল ঢাকা
বোর্ডের ইংরেজি দ্বিতীয় পত্রের পরীক্ষা। কিন্তু পরীক্ষা শুরুর আগেই
প্রশ্নপত্রের সব সেটই ফাঁস হয়ে যায়। ফলে পরীক্ষা স্থগিত করতে বাধ্য হয়
কর্তৃপক্ষ।
এভাবে গত দুই বছরে হওয়া বেশিরভাগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্রই ফাঁস হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। প্রাথমিক সমাপনী থেকে শুরু করে জেএসসি, জেডিসি, এসএসসি, দাখিল, এইচএসসি, আলিম, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা এমনকি বিসিএসসহ সরকারি চাকরির পরীক্ষার প্রশ্নপত্রও ফাঁস হয়েছে। এভাবে একের পর এক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের মহোত্সব আগে কখনও শোনা যায়নি। মজার বিষয় হচ্ছে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বিষয়টি স্বীকার না করে পরীক্ষা নেয়া শেষ করা হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্বীকার করলেও কোনো ব্যবস্থা নেয়ার কথা শোনা যায়নি। তবে প্রাথমিক স্কুলের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের পর কয়েকটি জেলার পরীক্ষা বাতিল করা হয়। কিন্তু প্রশ্নপত্র ফাঁসে জড়িত কারা সেটা অন্ধকারেই থেকে গেছে। তাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে রাখার কারণ অনুমান করা কঠিন নয়। ক্ষেত্রবিশেষে লোকদেখানো ব্যবস্থা হিসেবে তদন্ত কমিটি গঠনের কথা শোনা গেলেও তার ফলাফল আর জানা যায়নি।
শেখ হাসিনার দুই মেয়াদের সরকারের শিক্ষামন্ত্রী নিজে ও অন্যরাও সফলতা নিয়ে গলা ফাটাতে পিছিয়ে থাকে না। তার আমলে পরীক্ষার ফলাফল, শিক্ষার মান, শিক্ষা প্রসারের উন্নতি নিয়ে কত কথাই না বলা হয়। অথচ, প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়ে কেউই রা কাটেন না। সাফল্যের মুকুটে আর একটি পালকের জন্য কি নকলমুক্ত পরীক্ষা নিশ্চিত করতে আগেই প্রশ্নপত্র ফাঁস করা হচ্ছে? এর সঙ্গে জড়িতরা কি ক্ষমতাসীনদের কাছের লোক? এসব প্রশ্ন শিক্ষার্থী-অভিভাবক ও সংশ্লিষ্ট সবার মুখে মুখে ফিরছে।
ফলে আইনের যথাযথ প্রয়োগ দেখা যাচ্ছে না। পাবলিক পরীক্ষা (অপরাধ) আইন, ১৯৮০ এবং সংশোধনী ১৯৯২-এর চার নম্বর ধারায় প্রশ্নপত্র ফাঁস, প্রকাশ বা বিতরণের সঙ্গে জড়িত থাকার শাস্তি হিসেবে ন্যূনতম ৩ বছর, সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ডসহ জরিমানার বিধান থাকলেও তার প্রয়োগ নেই। এই হলো আওয়ামী লীগ সরকারের আইনের শাসনের নমুনা। শিক্ষার মেরুদণ্ড গুঁড়িয়ে দেয়ার মতো এমন গুরুতর অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়ায় প্রশ্নপত্র ফাঁসে উত্সাহিত হয়ে ওঠাই স্বাভাবিক। তরা এখন সিন্ডিকেট করে মাঠে নেমেছে। আওয়ামী সিন্ডিকেট বলেই কি কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না?
এভাবে গত দুই বছরে হওয়া বেশিরভাগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্রই ফাঁস হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। প্রাথমিক সমাপনী থেকে শুরু করে জেএসসি, জেডিসি, এসএসসি, দাখিল, এইচএসসি, আলিম, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা এমনকি বিসিএসসহ সরকারি চাকরির পরীক্ষার প্রশ্নপত্রও ফাঁস হয়েছে। এভাবে একের পর এক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের মহোত্সব আগে কখনও শোনা যায়নি। মজার বিষয় হচ্ছে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বিষয়টি স্বীকার না করে পরীক্ষা নেয়া শেষ করা হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্বীকার করলেও কোনো ব্যবস্থা নেয়ার কথা শোনা যায়নি। তবে প্রাথমিক স্কুলের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের পর কয়েকটি জেলার পরীক্ষা বাতিল করা হয়। কিন্তু প্রশ্নপত্র ফাঁসে জড়িত কারা সেটা অন্ধকারেই থেকে গেছে। তাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে রাখার কারণ অনুমান করা কঠিন নয়। ক্ষেত্রবিশেষে লোকদেখানো ব্যবস্থা হিসেবে তদন্ত কমিটি গঠনের কথা শোনা গেলেও তার ফলাফল আর জানা যায়নি।
শেখ হাসিনার দুই মেয়াদের সরকারের শিক্ষামন্ত্রী নিজে ও অন্যরাও সফলতা নিয়ে গলা ফাটাতে পিছিয়ে থাকে না। তার আমলে পরীক্ষার ফলাফল, শিক্ষার মান, শিক্ষা প্রসারের উন্নতি নিয়ে কত কথাই না বলা হয়। অথচ, প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়ে কেউই রা কাটেন না। সাফল্যের মুকুটে আর একটি পালকের জন্য কি নকলমুক্ত পরীক্ষা নিশ্চিত করতে আগেই প্রশ্নপত্র ফাঁস করা হচ্ছে? এর সঙ্গে জড়িতরা কি ক্ষমতাসীনদের কাছের লোক? এসব প্রশ্ন শিক্ষার্থী-অভিভাবক ও সংশ্লিষ্ট সবার মুখে মুখে ফিরছে।
ফলে আইনের যথাযথ প্রয়োগ দেখা যাচ্ছে না। পাবলিক পরীক্ষা (অপরাধ) আইন, ১৯৮০ এবং সংশোধনী ১৯৯২-এর চার নম্বর ধারায় প্রশ্নপত্র ফাঁস, প্রকাশ বা বিতরণের সঙ্গে জড়িত থাকার শাস্তি হিসেবে ন্যূনতম ৩ বছর, সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ডসহ জরিমানার বিধান থাকলেও তার প্রয়োগ নেই। এই হলো আওয়ামী লীগ সরকারের আইনের শাসনের নমুনা। শিক্ষার মেরুদণ্ড গুঁড়িয়ে দেয়ার মতো এমন গুরুতর অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়ায় প্রশ্নপত্র ফাঁসে উত্সাহিত হয়ে ওঠাই স্বাভাবিক। তরা এখন সিন্ডিকেট করে মাঠে নেমেছে। আওয়ামী সিন্ডিকেট বলেই কি কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না?
দোহাই মিডিয়া, থামলে ভাল লাগে
দেশে একসময় সবেধন নীলমণি ছিল সাহেব বিবির বাক্স বিটিভি। সে সময় সেটি
মূলত: সরকারের কথা বললেও টিভি নাটক, ইংরেজী সিরিয়াল, ডকুমেন্টারি, কার্টুন
ইত্যাদি কিছু বিষয়ে ছিল অপ্রতিদ্বন্দ্বী। এই উপমহাদেশে রাষ্ট্রীয় টিভি
চ্যানেলের মনোপলি ঘুচায় স্যাটেলাইট টিভি। ৯০ এর দশকের প্রথম দিকে এমটিভিতে
বাবা সায়গলের মিউজিক ভিডিও (ঠান্ডা ঠান্ডা পানি) এবং জি নিউজের অনুসন্ধিৎসু
খবরের আয়োজন উপমহাদেশের দর্শকদের নতুন যুগের আস্বাদ দেয়। বাংলাদেশ যোগ দেয়
একটু পরে। ১৯৯৭ সালে চ্যানেল আই ও এটিএন বাংলার পরীক্ষামূলক সম্প্রচার
শুরু হয়। এর পরের ঘটনা তো ইতিহাস। বাংলাদেশে মনে হয় এখন গোটা বিশেক স্যাটেলাইট টিভির সম্প্রচার হয়।
দেশের স্যাটেলাইট টিভিগুলো একদিকে রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যমগুলোর একঘেয়ে ও একপেশে অনুষ্ঠান এর বদলে দর্শকদের নিজেদের পছন্দের কিছু দেখার সুযোগ দিয়েছে। কিন্তু এইসব চ্যানেলের অধিকাংশ নিয়ন্ত্রণ করে কিছু কর্পোরেট হাউজ এবং তাদের পেছনের কিছু রাজনৈতিক দর্শন ও মুনাফালোভী ব্যবসায়ী। বেশীরভাগ চ্যানেলেরই নিজস্ব কোন উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য নেই। এসব অনেক সময় চালানো হয় নিজের ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি দেখানোর জন্যে, আর ব্যবসায়ীক প্রতিদ্বন্দ্বীদের টেক্কা দেবার জন্যে বা তাদের প্রতি কুৎসা রটনার জন্যে। আক্ষেপ হয় দেশে এখনও পৃথক কার্টুন, এডুকেশন বা স্পোর্টস চ্যানেল হল না।
বিটিভির অনুষ্ঠান নিয়ে অনেকের অভিযোগ থাকলেও শাইখ সিরাজের 'মাটি ও মানুষ' কিংবা ফেরদৌসী রহমানের 'এসো গান শিখি' ছিল আপামর জনসাধারণের অনুষ্ঠান এবং খুবই জনপ্রিয়। স্যাটেলাইটের যুগে হাজারো অনুষ্ঠানের ভীড়ে সেরকম উল্লেখ করার মত অনুষ্ঠান খুবই কম। এখনকার অনুষ্ঠানের মধ্যে বেশীরভাগই মধ্যবিত্তদের উপদেশ দেয়ায় ব্যস্ত - কিভাবে গ্ল্যামারযুক্ত জীবন যাপন করবেন, কোথায় যাবেন, কি পড়বেন, কি শুনবেন, কি দেখবেন, ইত্যাদি। আর রয়েছে গান, মডেলিং ইত্যাদি বিভিন্ন প্রতিযোগিতা নিয়ে রমরমা বাণিজ্য। আমার এক আভিজ্ঞতা বলি - খাগড়াছড়িতে গিয়েছিলাম - সেখানে কোন এক টিভি চ্যানেলের গানের প্রতিযোগীতায় এক আদিবাসী বালিকার জন্যে এসএমএস ভোটের জন্যে যে পরিমাণ তদবির, ক্যাম্পেইন, মিছিল ইত্যাদির কথা শুনলাম তাতে মনে হল ব্যাপারটি অসুস্থতার পর্যায়ে গিয়েছে। সেই মেয়েটি জিতেছিল কিনা জানিনা - তবে মানুষের এই আবেগকে পুঁজি করে সেই চ্যানেল আর মোবাইল কোম্পানিগুলো কোটি কোটি টাকা কামিয়ে নিয়েছে নিশ্চয়ই - এই ব্যাপারগুলো কিন্তু সংবাদ হয় না।
আপনি খবরের কাগজ খুলে দেখুন, নানা চটকদার খবরের ভীড়ে গণ্ডগ্রামের সেই ক্ষুদ্রঋণের ভার সইতে না পারা কৃষকের আত্মহত্যার খবর আসে না। মিডিয়া এখন শ্রেণীতোষণে ব্যস্ত। তাদের বিজ্ঞাপনী আয়ের মোটা অংশ আসে মোবাইল কোম্পানী থেকে - কাজেই সেসব কোম্পানী নিয়ে সমালোচনামূলক লেখা কম। অমুক তারকা, তমুক বুদ্ধিজীবী কি বলেছেন, তারা ঈদের দিনে কি করবেন বা খাবেন সেটি নিয়ে ফিচার হয়।
আমরা দেখছি এখন মিডিয়াতে তুচ্ছ সব বিষয়ের গ্ল্যামারাইজেশন, খবর সংগ্রহে অসুস্থ প্রতিযোগিতা। আসামের গৌহাটিতে একটি আদিবাসী মেয়ের উপর চড়াও হল গোটা বিশেক উশৃঙ্খল যুবক। এক টিভি ক্যামেরাম্যান ৩০ মিনিট ধরে ভিডিও ধারণ করল মেয়েটিকে সাহায্য না করে। বিডিআর বিদ্রোহের সময় দেখেছি মিডিয়া কি করে ভুল কবরের পেছনে ছুটেছে। সাগর রুনির হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশের আগে গিয়ে আলামত নষ্ট করেছে কারা?
বর্তমানে মিডিয়ার পুঁজি হচ্ছে হুমায়ূন আহমেদের প্রয়াণ। মানুষের আবেগের যায়গাগুলো ধরতে পারে তারা ঠিকই। মৃত্যুর সংবাদ পাবার আধাঘন্টার মধ্যেই কিছু লোক পৌঁছে যায় টিভি চ্যানেলে - টকশোতে নিজেদের তুলে ধরতে। প্রতিটি চ্যানেলে হুমায়ূনকে ভেজে খাওয়া হচ্ছে নানা ভাবে। কফিনের ভেতরের লাশের ছবি দেখাচ্ছে অনেকে। আমরা নাদান দর্শক সেগুলো গোগ্রাসে গিলছি আর হাপুস নয়নে কাঁদছি। হ্যা, আমাদের চোখের জলই, আমাদের আবেগই তাদের উপজীব্য। আমরা প্রশ্ন করছি না কেন এত বাড়াবাড়ি।
এই শেনসেশনালিজমের মূলে রয়েছে যে কোন মূল্যে খবর বেঁচা - মানুষকে আচ্ছন্ন করে রাখা। এ রিপোর্টিংয়ে খবরের বিষয়বস্তু সম্পর্কে কোন গভীর ধারনা থাকে না, এতে থাকে পক্ষপাতিত্ব, দুর্নীতি। এই রিপোর্টিংয়ে জরুরী খবর চাপা পড়ে - তুচ্ছ খবর লাইম লাইটে আসে। এ ধরনের রিপোর্টিংয়ে মানুষের প্রাইভেসি বা শোককে পুঁজি করে।
এ অবস্থা থেকে উন্নতির উপায় কি আমি জানি না। অনিন্দ্যের পোস্টে আকুতি ছিল - "দয়া করে হুমায়ূন আহমেদকে শান্তিতে মরতে দেন"। আমি বলছি মিডিয়াকে "থামলে ভাল লাগে"। অচিরেই না থামলে ভবিষ্যৎে দর্শকরা অন্য কোন বিকল্প খুঁজে নেবে।
দেশের স্যাটেলাইট টিভিগুলো একদিকে রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যমগুলোর একঘেয়ে ও একপেশে অনুষ্ঠান এর বদলে দর্শকদের নিজেদের পছন্দের কিছু দেখার সুযোগ দিয়েছে। কিন্তু এইসব চ্যানেলের অধিকাংশ নিয়ন্ত্রণ করে কিছু কর্পোরেট হাউজ এবং তাদের পেছনের কিছু রাজনৈতিক দর্শন ও মুনাফালোভী ব্যবসায়ী। বেশীরভাগ চ্যানেলেরই নিজস্ব কোন উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য নেই। এসব অনেক সময় চালানো হয় নিজের ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি দেখানোর জন্যে, আর ব্যবসায়ীক প্রতিদ্বন্দ্বীদের টেক্কা দেবার জন্যে বা তাদের প্রতি কুৎসা রটনার জন্যে। আক্ষেপ হয় দেশে এখনও পৃথক কার্টুন, এডুকেশন বা স্পোর্টস চ্যানেল হল না।
বিটিভির অনুষ্ঠান নিয়ে অনেকের অভিযোগ থাকলেও শাইখ সিরাজের 'মাটি ও মানুষ' কিংবা ফেরদৌসী রহমানের 'এসো গান শিখি' ছিল আপামর জনসাধারণের অনুষ্ঠান এবং খুবই জনপ্রিয়। স্যাটেলাইটের যুগে হাজারো অনুষ্ঠানের ভীড়ে সেরকম উল্লেখ করার মত অনুষ্ঠান খুবই কম। এখনকার অনুষ্ঠানের মধ্যে বেশীরভাগই মধ্যবিত্তদের উপদেশ দেয়ায় ব্যস্ত - কিভাবে গ্ল্যামারযুক্ত জীবন যাপন করবেন, কোথায় যাবেন, কি পড়বেন, কি শুনবেন, কি দেখবেন, ইত্যাদি। আর রয়েছে গান, মডেলিং ইত্যাদি বিভিন্ন প্রতিযোগিতা নিয়ে রমরমা বাণিজ্য। আমার এক আভিজ্ঞতা বলি - খাগড়াছড়িতে গিয়েছিলাম - সেখানে কোন এক টিভি চ্যানেলের গানের প্রতিযোগীতায় এক আদিবাসী বালিকার জন্যে এসএমএস ভোটের জন্যে যে পরিমাণ তদবির, ক্যাম্পেইন, মিছিল ইত্যাদির কথা শুনলাম তাতে মনে হল ব্যাপারটি অসুস্থতার পর্যায়ে গিয়েছে। সেই মেয়েটি জিতেছিল কিনা জানিনা - তবে মানুষের এই আবেগকে পুঁজি করে সেই চ্যানেল আর মোবাইল কোম্পানিগুলো কোটি কোটি টাকা কামিয়ে নিয়েছে নিশ্চয়ই - এই ব্যাপারগুলো কিন্তু সংবাদ হয় না।
আপনি খবরের কাগজ খুলে দেখুন, নানা চটকদার খবরের ভীড়ে গণ্ডগ্রামের সেই ক্ষুদ্রঋণের ভার সইতে না পারা কৃষকের আত্মহত্যার খবর আসে না। মিডিয়া এখন শ্রেণীতোষণে ব্যস্ত। তাদের বিজ্ঞাপনী আয়ের মোটা অংশ আসে মোবাইল কোম্পানী থেকে - কাজেই সেসব কোম্পানী নিয়ে সমালোচনামূলক লেখা কম। অমুক তারকা, তমুক বুদ্ধিজীবী কি বলেছেন, তারা ঈদের দিনে কি করবেন বা খাবেন সেটি নিয়ে ফিচার হয়।
আমরা দেখছি এখন মিডিয়াতে তুচ্ছ সব বিষয়ের গ্ল্যামারাইজেশন, খবর সংগ্রহে অসুস্থ প্রতিযোগিতা। আসামের গৌহাটিতে একটি আদিবাসী মেয়ের উপর চড়াও হল গোটা বিশেক উশৃঙ্খল যুবক। এক টিভি ক্যামেরাম্যান ৩০ মিনিট ধরে ভিডিও ধারণ করল মেয়েটিকে সাহায্য না করে। বিডিআর বিদ্রোহের সময় দেখেছি মিডিয়া কি করে ভুল কবরের পেছনে ছুটেছে। সাগর রুনির হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশের আগে গিয়ে আলামত নষ্ট করেছে কারা?
বর্তমানে মিডিয়ার পুঁজি হচ্ছে হুমায়ূন আহমেদের প্রয়াণ। মানুষের আবেগের যায়গাগুলো ধরতে পারে তারা ঠিকই। মৃত্যুর সংবাদ পাবার আধাঘন্টার মধ্যেই কিছু লোক পৌঁছে যায় টিভি চ্যানেলে - টকশোতে নিজেদের তুলে ধরতে। প্রতিটি চ্যানেলে হুমায়ূনকে ভেজে খাওয়া হচ্ছে নানা ভাবে। কফিনের ভেতরের লাশের ছবি দেখাচ্ছে অনেকে। আমরা নাদান দর্শক সেগুলো গোগ্রাসে গিলছি আর হাপুস নয়নে কাঁদছি। হ্যা, আমাদের চোখের জলই, আমাদের আবেগই তাদের উপজীব্য। আমরা প্রশ্ন করছি না কেন এত বাড়াবাড়ি।
এই শেনসেশনালিজমের মূলে রয়েছে যে কোন মূল্যে খবর বেঁচা - মানুষকে আচ্ছন্ন করে রাখা। এ রিপোর্টিংয়ে খবরের বিষয়বস্তু সম্পর্কে কোন গভীর ধারনা থাকে না, এতে থাকে পক্ষপাতিত্ব, দুর্নীতি। এই রিপোর্টিংয়ে জরুরী খবর চাপা পড়ে - তুচ্ছ খবর লাইম লাইটে আসে। এ ধরনের রিপোর্টিংয়ে মানুষের প্রাইভেসি বা শোককে পুঁজি করে।
এ অবস্থা থেকে উন্নতির উপায় কি আমি জানি না। অনিন্দ্যের পোস্টে আকুতি ছিল - "দয়া করে হুমায়ূন আহমেদকে শান্তিতে মরতে দেন"। আমি বলছি মিডিয়াকে "থামলে ভাল লাগে"। অচিরেই না থামলে ভবিষ্যৎে দর্শকরা অন্য কোন বিকল্প খুঁজে নেবে।
বিবেকহীন বস্তি উচ্ছেদ ও নীরব দর্শক
গতকাল বুধবার সকালে বেদখলকৃত সরকারী জমি উদ্ধারে বনানী এলাকার করাইল বস্তি
উচ্ছেদ অভিযান চালায় ঢাকা জেলার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। অপ্রীতিকর ঘটনা
এড়াতে মেটোপলিটন পুলিশের ৪ প্লাটুন মোতায়েন করা হয়। সরকারী ভাষ্যমতে বেদখলকৃত ১৭০ শতাংশ জমির মধ্যে ৮০ শতাংশ বিটিসিএলের মালিকানাধীন ও ৪৩ শতাংশ পিডব্লিইডি’র এবং বাকি জমি আইসিটির।
এক অসমর্থিত খবরে জানা গেছে যে বুলডোজারের নীচে শত শত বস্তি ধ্বংস হবার সময় ঘুমন্ত দুই শিশু মারা যায়। হ্যা তাদের জানানো হয়েছিল উচ্ছেদের কথা গত মঙ্গলবার বিকেলে - স্থানীয় ভাবে মাইকিং করে। কিন্তু এই দুই শিশুর পিতামাতা হয়ত আমলে নেয়নি। গত বছর ২০শে সেপ্টেম্বর রাজউক এরকম স্বল্প নোটিসে আরেকটি উচ্ছেদ অভিযান চালায় সেখানে। পুলিশ আর পাড়ার মাস্তানদের দ্বারা ১২০টিরও বেশী পরিবার উচ্ছেদ করা হলেও পরে তারা আবার এসে বাসা করে। গত ২০০৮ সালে প্রথম পিডাব্লিউডি উচ্ছেদের নোটিশ পাঠালে আইন ও শালিস কেন্দ্র পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ মানবাধিকার লঙ্ঘন এই বলে হাইকোর্টে একটি স্টে অর্ডার নেয়। সেই মামলার বিভিন্ন শুনানীতে পুনর্বাসনের কথা বলা হয় তবে গত জানুয়ারীতে হাইকোর্ট সরকারকে আদেশ দেয় দুই মাসের মধ্যে এই বেদখলকৃত জমি উদ্ধার করতে - তবে সেখানে পুনর্বাসনের কোন কথা বলা হয় নি।
করাইল এলাকার এইসব ভূমিহীন বস্তিবাসীর ৩০ ভাগ দিনমুজুর, ২০% রিক্সা-ভ্যান চালায়, ১৮% গার্মেন্টস কর্মী ও ১২% ছোট ব্যবসা করে। তাদের মাসিক আয় ২৫০০-৪৫০০ টাকা এবং স্থানীয় মান্তানদের ৮০ স্কয়ার ফিটের ঘর ভাড়া দিতে হয় ৮০০-১২০০ টাকা।
এই টাকায় তাদের কিভাবে চলে সে খেয়াল কি রাখে কেউ? জ্যাম এড়াতে আমি অনেক সময় রিক্সায় তেজগাঁয়ের রেললাইনের পাশের বস্তি ও ৪র্থ শ্রেণী কর্মচারীদের বাসস্থান এর পাশের রাস্তাটি দিয়ে আসি। বিজয় স্বরণী ও তেজগাওঁ এর ওভারব্রিজের নীচে এক অদ্ভুত বাজার বসে। কাছাকাছি কাওরান বাজারে যেসব শাক-সব্জি আসে সেসব ট্রাক থেকে নামানোর সময়টা কখনও দেখেছেন কি? কিছু বস্তির ছেলে চাপ খাওয়া, নষ্ট হওয়া শাক সব্জি সংগ্রহ করে সেখান থেকে, এবং অনেকসময় ভালগুলো চুরি করে - অবশ্যই শারীরিক প্রহার এবং গালাগালির ঝুঁকি মাথায় নিয়ে। সেইসব শাকসব্জি এবং হয়ত সরাসরি আড়ত থেকে পঁচে যাওয়া শাক-সব্জি দিয়েই উল্লেখিত বাজারটি সাজানো। সারি করে বিছিয়ে রাখা পাকা করলা, থেৎলানো পটল, পঁচা শসা, কাল হয়ে যাওয়া আলু - এগুরো নিত্য নৈমিত্তিক চিত্র। এখানে বাজার করতে আসে বস্তির নিম্নবিত্তরা। হ্যা, আমাদের মত বেশী দামের ফ্রেস সব্জি কেনার সামর্থ না থাকতে পারে, কিন্তু তাদেরও তো বাঁচতে হয়। বাজারের একটি মাত্র মাংসের দোকানে ঘন্টার পর ঘন্টা একটি মাংসের পিস ঝুলে প্রমান করে তারা - না তাদের জীবনেও বিশেষ অনুষ্ঠান থাকে যখন তারা মাংস খেতে পারে।
কিন্তু এই বস্তিবাসীদের আবাসহীন করা ঠেকাতে তেমন কেউ নেই তাদের পক্ষে লড়ার। কিছু এনজিও প্রেসক্লাবে মানববন্ধন করেছে এবং অনেকে পত্রপত্রিকায় লিখছে। কিন্তু আমাদের কার সময় আছে সেগুলোর প্রতি দৃষ্টি দেবার?
তত্বাবধায়ক সরকারের সময় মিরপুরে বস্তিবাসীদের জন্যে বাসস্থান করার কথা উঠল। সেটা আর এগোয় নি। কে করবে বলেন। তাদের জন্যে করে কার কি লাভ হবে?
আজকে বস্তিবাসীরা মহাখালীতে মানববন্ধন করছে। বনানী গুলশান এলাকায় ট্রাফিক ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়েছে। সেখানে কোন রিক্সা চলছে না - ধর্মঘটে গেছে তারা। আমাদের সাধারণ প্রতিক্রিয়া কি হবে ভাবছি। অসহ্য গরমে ঘন্টার পর ঘন্টা ট্রাফিক জ্যামে থেকে সরকারের গুষ্টি উদ্ধার করব। তাতে পরিস্থিতির কোন পরিবর্তন হবে না। এসব ভূমিহীন মানুষ আবার বসতি গড়বে নতুন কোন করাইলে। আমরা আমাদের সমস্যাকে শুধু এড়ানোর চেষ্টা করব - ঢাকাকে তিলত্তোমা করার কথা বলব কিন্তু সমস্যা মিটবে না। এ জন্যে আমরা নীরব দর্শকরাও অনেকটা দায়ী।
ছুটি এলেই মনটা পালাই পালাই করে কিন্তু আলস্যের কারনে কোথাও যাওয়া হয়না। এবার পুজোর ছুটিতে আড়মোড়া ভেঙ্গে সপরিবারে খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটি বেরিয়ে এলাম। আমার জন্যে ব্যাপারটি ছিল উত্তেজনাকর, কারন হিল্লি দিল্লি করার সুযোগ হলেও দেখা হয়নি চক্ষু মেলিয়া দেশের ভেতরের এই সবুজ ও নীলের পাহাড়-হ্রদের মেলা।
এ অঞ্চলের সৌন্দর্য নিয়ে নতুন কিছু বলার নেই (ছবি দ্রষ্টব্য: রাঙ্গামাটি , খাগড়াছড়ি, বান্দরবান )। আমাদের সফরসঙ্গী পরিবারের কর্তাটি বললেন দেখুন এইরকম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখতে মানুষ অনেক পয়সা খরচ করে বিদেশে যায়। তবে বাস্তব হচ্ছে যে পার্বত্য চট্টগ্রাম দিনে দিনে তার রুপ হারাচ্ছে। পর্যটন ও বসতি বাড়ার সাথে পাহাড় কেটে বানানো হচ্ছে বাড়িঘর, হোটেল-রিসোর্ট। বাশ ও সেগুন গাছের গুড়ি ভর্তি সারি সারি ট্রাক তো নিজ চোখেই দেখলাম রাস্তায়। পাহাড় থেকে খাদ্যাভাবে জনপদে নেমে আসে হাতির পাল এমন শুনেছি, কাপ্তাই লেকে আর আগের মত মাছ পাওয়া যায় না। হায় কে কার খবর রাখে।
সত্যিই এগুলো খবর হয় না। খবর হয় না যখন সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদীরা পাহাড়ি-বাঙ্গালী নির্বিশেষে চাঁদা তোলে বা অপহরণ করে, পাহাড়ি-বাঙ্গালী উভয়ের উপর হামলা করে। খবর হয়না যখন পাহাড়িদের জীবন, বসতি নিয়ে রাজনীতি করে জ্ঞানপাপী মানুষ আর তাদের এতটুকু মাথা গোঁজার ঠাই কেড়ে নেয়। খবর হয় না যখন আইন শৃঙ্খলা বাহিনী (বিশেষ করে পুলিশ) টাকার জন্যে নিপীড়িতের পাশে না এসে নির্যাতনকারীর পাশে এসে দাড়ায়। খবর হয় না যখন কল্পনা চাকমারা হারিয়ে যায়। খবর হয়না যখন খাগড়াছড়ির ১৯২টি কাজের বিনিময়ে খাদ্য প্রকল্পের শতভাগ টাকা মেরে দেয় রাজনৈতিক নেতারা যার মধ্যে অধিকাংশই পাহাড়ি। নিজেদের রক্ত নিজেরাই খেয়ে কুমীর বনে যায় (উদাহরণ: ইউনিপের নামে ৩০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে উদ্দীপন চাকমা )।
খবর হয় যখন দেয়ালে পিঠ ঠেকা মানুষ রুখে দাড়ায় এবং নিজের হাতে আইন তুলে নেয়। খবর হয় যখন শান্তিরক্ষার দায়িত্বপ্রাপ্ত বাহিনী দুপক্ষের মধ্যে এসে দাড়ায় এবং লোক মারা যায়। খবর হয় যখন পাহাড়ি দুইপক্ষ নিজেদের রক্তে গা ভাসায় আর নিরীহ জনগনকে ত্রাসের রাজ্যে রাখে। খবর হয় যখন আদিবাসী নামকরণ নিয়ে সরকারের মনোভাব প্রতিষ্ঠায় অদ্ভুত সব যুক্তি দেখানো হয়।
এসবের মাঝে একটি জিনিষ আমরা ভুলে যাচ্ছি - তিন পার্বত্য জেলার ১৪টি উপজাতির মনে কি খেলা করছে। এই মূহুর্তে তারা আর বাঙ্গালী দের বিশ্বাস করছে না, এই মূহুর্তে তারা নিজেদের দেশের ভেতরে অবাঞ্ছিত ভাবছে। সংবিধানে আদিবাসীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যে ডাকা বিক্ষোভে দুর্গম অঞ্চল থেকে চার ঘন্টা হেটে বর্ষীয়ান পাহাড়ি যোগ দিয়েছেন। তাদের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। এরপর হয়ত শান্তিচুক্তি রদ হয়ে আবার সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু হবে। কিন্তু এমন তো কথা ছিল না।
১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু পার্বত্য চট্টগ্রামে গিয়েছিলেন এবং মানবেন্দ্র লারমা স্বায়ত্তশাসন সহ বিভিন্ন উপজাতির দাবী তুলে ধরলে তিনি বলেন "তোরা সব বাঙ্গালী হইয়া যা"। ১৯৭৩ সালে সংসদের কাছে তার আহ্বানেও সাড়া দেওয়া হয় না। ফলশ্রুতিতে ১৯৭৪ সালে এম এন লারমা জনসংহতি সমিতির একটি সশস্ত্র গ্রুপ গঠন করেন, যা পরে শান্তিবাহিনী নামে পরিচিতি লাভ করে এবং পরে তারা অত্র অঞ্চলে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। ১৯৮১ সালে শান্তিবাহিনী দ্বিধাবিভক্ত হয় এবং ১৯৮৩ সালে বিপক্ষ দলের হাতে মানবেন্দ্র মারা যান। তবে তার অনুজ সন্তু লারমার নেতৃত্বে শান্তিবাহিনী গেরিলা যুদ্ধ অব্যহত রাখে। জিয়া এবং এরশাদ সরকারের আমলে শান্তিবাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযান চালায় সেনাবাহিনী এবং আশির দশকে উপজাতিদের উপর নির্লজ্জ্ব হত্যাকান্ড চালানো হয়। কোন সরকারের আমলেই এইসব হত্যাকান্ডের বিচার হয়নি। এছাড়া গ্রেপ্তার, নির্যাতন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, মানবাধিকার কর্মীদের হেনস্থা করা, যৌন নিপীড়ন প্রভৃতি মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়েছে নিয়মিতই। সাথে সাথে শান্তিবাহিনীরও অনুরূপ মানবাধিকার লংঘনের মূল্য দিতে হয়েছে পাহাড়ি-বাঙ্গালি উভয়কেই।
এরশাদের আমলে ১৯৮২-৮৩ সালে ২৬ হাজারের ও বেশী ছিন্নমূল ও ভাঙ্গনের ফলে উদ্বাস্তু পরিবারকে চট্টগ্রামের তিন পার্বত্য জেলায় পুনর্বাসনের জন্যে নিয়ে আসা হয়। তাদের মধ্যে প্রায় ২০ হাজারেরও বেশি পরিবারের স্থান হয় খাগড়াছড়িতে। আশির দশকের শেষের দিকে তাদের উপর ‘শান্তিবাহিনী’র হামলার ঘটনা বাড়তে থাকলে সেখান থেকে লোকজনকে সেনাক্যাম্প সংলগ্ন ৮১টি গুচ্ছগ্রামে স্থানান্তর করা হয়।
১৯৯৭ সালের ২রা ডিসেম্বর সম্পাদিত আওয়ামী লীগের শান্তিচুক্তি নিশ্চয়ই এই অবস্থা থেকে উত্তরণের একটি বলিষ্ঠ পদক্ষেপ। এ অবস্থায় আনতে কি পরিমান রাজনৈতিক গণসংযোগ করতে হয়েছে তা অনুমেয়। শান্তিচুক্তির পর তিন পর্বে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে সেনা প্রত্যাহার করা হয়েছে। আশির দশকের তুলনায় বর্তমানে অর্ধেকের কম সেনাক্যাম্প পার্বত্য চট্টগ্রামে রয়েছে। বর্তমানে যা হচ্ছে তাতে উল্টোস্রোত দেখা যাচ্ছে আর সরকারেরও মাথা ব্যাথা নেই।
শান্তিচুক্তি অনুযায়ী ১৯৯৮ সালের ফেব্রুয়ারীতে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) এর প্রায় দুই হাজার সশস্ত্র সদস্য স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে। তবে প্রসিত বিকাশ খীসার নেতৃত্বে একটি দল চুক্তি মানতে অপারগতা প্রকাশ করে এবং পূর্ণ স্বায়ত্বশাসনের দাবীতে ১৯৯৮ সালে গঠন করে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)। এই বিভাজন অবশ্য জেএসএসকে দমাতে পারেনি এবং তারা দাপটেই কার্যক্রম চালিয়েছে খাগড়াছড়ি অঞ্চল ছাড়া যেখানে বেশীরভাগ অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ ছিল ইউপিডিএফ এর। কিন্তু ২০০৬ সালের জরুরী সরকারের সময় সন্তু লারমার একক নেতৃত্ব থেকে দল বাঁচাতে সংস্কারের দাবীতে জনসংহতি থেকে বেরিয়ে গিয়ে নতুন আরেকটি রাজনৈতিক দল গঠন করে বেশ কিছু প্রতিবাদী নেতারা। এদের মধ্যে আছেন সন্তু লারমার ঘনিষ্ট সহকর্মী রূপায়ন দেওয়ান, তাতিন্দ্র লাল চাকমা পেলে, সুধাসিন্ধু খীসা, চন্দ্রশেখর চাকমা,শক্তিমান চাকমা প্রমূখ এবং তারা দলের নাম দেন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (এমএনলারমা)। এই বিভাজনে লাভ হয় ইউপিডিএফ এর যার নমুনা দেখা যাচ্ছে এবারকার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে - অনেক অঞ্চলে ইউপিডিএফ সমর্থিত প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছে।
বর্তমানে গতানুগতিক রাজনৈতিক দলগুলোর জনপ্রিয়তা একেবারে তলানীতে এসে ঠেকেছে। বিএনপি বরাবরই সেটেলার ভোটব্যাংক ভিত্তিক একটি দল, কাজেই ভবিষ্যতে তাদের ভোট পাবার চান্স কম। ভাড়াটে পাহাড়ী নেতা দিয়ে তারা এতদিন পার পেলেও যেহেতু তারা শান্তিচুক্তি ও সেনা প্রত্যাহারের বিরোধীতা (আওয়ামী লীগ একটি ব্রিগেড এবং ৩৫টি অস্থায়ী ক্যাম্প প্রত্যাহার করে ২০০৯ সালে এবং এর বিরুদ্ধে হাইকোর্টে পিটিশন করে তারা) করেছে সব সময়, তাদের আর গ্রহণযোগ্যতা নেই।
আওয়ামী লীগের গ্রহণযোগ্যতা এখন বিশ্বাস ঘাতকের পর্যায়ে। ২০০৮ ও ২০০৯ সালে পররাষ্ট্র মন্ত্রী দীপুমনি আদিবাসী দিবসে আদিবাসীদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে সংহতি প্রকাশ করেন। আর সেই তিনিই এবছর থেকে তিন পার্বত্য জেলার অধিবাসীদের আদিবাসী সম্বোধন করতে বারণ করেছেন এবং বলেছেন বাংলাদেশে কোন আদিবাসী নেই; বিভিন্ন উপজাতি আছে। তার এই অবস্থান পরিবর্তন বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনের ফলশ্রুতিতে হয়েছে বলে রিপোর্টে বলা হয়েছে। আদিবাসী নিয়ে দেশী-বিদেশী যে বৃহত্তর রাজনীতি চলছে তা সামাল দিতেই যদি সরকারের এই পদক্ষেপ হয় তাহলে বলতে হয় এই পদক্ষেপটি চতুরতার সাথে নেয়া হয়নি। এই একটি ইস্যুকে পুজি করে পাহাড়ি বিচ্ছিন্নতাবাদীরা অনেককে তাদের চেতনায় সম্পৃক্ত করতে পেরেছে। পার্বত্য অঞ্চলে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ব্যর্থতা সম্পর্কে নতুন করে বলার নেই। জেলা-উপজেলা পর্যায়ের সকল নেতারাই ঠিকাদারিতে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। আগে উন্নয়ন কার্যক্রমের ৭০ ভাগ লোক পেত এখন পুরোটাই যায় তাদের পেটে। পাহাড়িরা তাদের কেন বিশ্বাস করবে?
পার্বত্য উপজেলাগুলোতে প্রাথমিক শিক্ষার হার ভাল। সরকারী স্কুল ছাড়াও ব্র্যাক ও অন্যান্য বেসরকারী স্কুল রয়েছে। আমি প্রচুর ছেলেমেয়েকে দেখেছি স্কুল ড্রেস পড়ে রাস্তায় হাটতে। কিন্তু উচ্চশিক্ষার হার কম - হাতে গোনা গুটিকয়েক কলেজ এবং কোন বিশ্ববিদ্যালয় নেই। এই অঞ্চলে নেই কোন বিশ্ববিদ্যালয় - প্রধানমন্ত্রী হাসিনা একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘোষণা দিলেও পাহাড়িদের একপক্ষ এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। ফলে সেটি এখনও পরিকল্পনা পর্যায়েই আছে। পাহাড়িদের উচ্চশিক্ষার জন্যে তাই বাইরে যেতে হয়। আর উচ্চ শিক্ষিতদের চাকুরির উপায় কি? নেই কোন কলকারখানা, উল্লেখযোগ্য বেসরকারী বাণিজ্য। তাই একমাত্র কাজ মিলে এনজিও বা সাহায্য সংস্থার অফিসে।
এরপর রয়েছে সাহায্য সংস্থা/এনজিওর দৌরাত্ম্য। এই সব সংস্থায় উচ্চশিক্ষিত ইউপিডিএফ এর কর্মীরা অনায়াসে কাজ পাচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে ইএনডিপির ২০১৩ পর্যন্ত প্রকল্প রয়েছে হাজার কোটি টাকার। তাদের স্বাস্থ্য কর্মসূচি গুলো খুবই উপযোগী (এবং অকার্যকর সরকারী স্বাস্থ্য সেবার বিকল্প) কিন্তু উন্নয়ন কার্যক্রমের আওতায় বিভিন্ন কমিউনিটিকে তারা ৪ লাখ করে অনুদান দিচ্ছে যা রিপোর্ট মোতাবেক ইউপিডিএফ এর কর্মীরা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কাজে লাগাচ্ছে। ২০০৭ সাল থেকে ইউপিডিএফ সকল মাইক্রোক্রেডিট কার্যক্রম বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছে ফলে কিছু পাহাড়ি কাজ কর্ম বাদ দিয়ে দানে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছে এবং তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে লাগানো যাচ্ছে।
অনেক এনজিওদের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ। মানবাধিকারের ইস্যুকে পুঁজি করে সব দোষ সরকারের ঘাড়ে, শান্তিচুক্তির উপর অথবা সুযোগ বুঝে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দিকে চাপিয়ে দিলেই কি সমস্যার সমাধান হয়ে যায়? পাহাড়ের সমস্যার শতভাগ বহিরাগত বা সেনাদের দ্বারা উদ্ভুত নয় আর পাহাড়ের রাজনীতিতেও বহিরাগতদের নিয়ন্ত্রণে নেই। সমীকরণটা ভিন্ন- দুর্নীতিতে পাহাড়ি নেতারাও পিছিয়ে নেই আর ইউপিডিএফ-জেএসএস এর সংঘাত অনেক ক্ষেত্রে পরিস্থিতির অবনতি ঘটাচ্ছে। যেখানে ভূমি, রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও শিক্ষার দিক থেকে বহিরাগতরা পিছিয়ে, সেখানে কিছুসংখ্যক ভূমি সন্ত্রাসীদের জন্যে এসব দরিদ্র মানুষকে ঢালাওভাবে রাজনৈতিক গিনিপিগ বানানো হচ্ছে। এটি হচ্ছে বিভাজনের রাজনীতি যা খেলছে সব পক্ষই।
এদেশ পাহাড়ি-বাঙ্গালি সবার। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিচ্ছিন্ন কোনো জনপদ নয় - একে গড়ে তুলতে হবে পাহাড়ি-বাঙ্গালি মিলেই। পাহাড়ি-বাঙ্গালি বা জাতি-উপজাতি কেন্দ্রিক বৈষম্য থাকা চলবে না। ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি করতে হবে, উচ্চশিক্ষা, কর্মসংস্থান, উন্নয়ন ইত্যাদি চালিয়ে যেতে হবে। পাহাড়িদের ন্যায়সঙ্গত দাবির প্রতি শ্রদ্ধা শান্তির নিশ্চয়তা দিতে পারে। অথচ সেটা করার জন্যে একসাথে কাজ করার পূর্বশর্ত - পরস্পর বিশ্বাসটুকু হারিয়ে যাচ্ছে।
বর্তমান পরিস্থিতি খুবই নাজুক পরিস্থিতি। পাহাড়িরা শান্তি চুক্তিতে একটি ভুয়া প্রতিশ্রুতি ভাবছে। প্রতিনিয়তই নানা গুজব মানুষকে বিচলিত ও আতঙ্কিত করে। স্থানীয় সূত্রমতে আগামী যে কোন নির্বাচনে এলাকায় একচ্ছত্রভাবে পাহাড়িদের জয় হবে, ইতোমধ্যেই যার আলামত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে পাওয়া গিয়েছে। এখানে পুরো ১৯৭১ এর ফর্মুলার সাথে মিল পাওয়া যাচ্ছে। বহিরাগতদের অত্যাচার, মানবাধিকার লঙ্ঘন, পাহাড়িদের অধিকার আদায়ের লড়াই, আর নিজভূমে মেজরিটি (যেমন ১৯৭০ এর নির্বাচনে পশ্চিম পাকিস্তানী কোন দল জিততে পারেনি এ বঙ্গে) এই স্ক্রিপ্টটি মিলে যাচ্ছে। এর সমাধান বা তাদের আপন করার কোন পরিকল্পনা নেই সরকারের বা অন্যান্য রাজনৈতিক দলের। তারা আদিবাসী নামকরণ ইস্যুতে তাদের দুরে ঠেলে দিচ্ছে। তাদের ধারনা সেনাবাহিনীর বুলেটের নীচেই সব ঠিক থাকবে - এভাবে সেনাবাহিনীকেও সংঘর্ষের দিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। এর পরিণতি কি হবে তা আমরা জানি।
ফলে পাহাড়িরা এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের সাথে আমাদের দূরত্ব তৈরি হচ্ছে। এই দূরত্ব ঘুচাতে এবং পাহাড়িদের অধিকার নিশ্চিত করতে আমরা সাধারণ মানুষেরা কি করতে পারি?
এক অসমর্থিত খবরে জানা গেছে যে বুলডোজারের নীচে শত শত বস্তি ধ্বংস হবার সময় ঘুমন্ত দুই শিশু মারা যায়। হ্যা তাদের জানানো হয়েছিল উচ্ছেদের কথা গত মঙ্গলবার বিকেলে - স্থানীয় ভাবে মাইকিং করে। কিন্তু এই দুই শিশুর পিতামাতা হয়ত আমলে নেয়নি। গত বছর ২০শে সেপ্টেম্বর রাজউক এরকম স্বল্প নোটিসে আরেকটি উচ্ছেদ অভিযান চালায় সেখানে। পুলিশ আর পাড়ার মাস্তানদের দ্বারা ১২০টিরও বেশী পরিবার উচ্ছেদ করা হলেও পরে তারা আবার এসে বাসা করে। গত ২০০৮ সালে প্রথম পিডাব্লিউডি উচ্ছেদের নোটিশ পাঠালে আইন ও শালিস কেন্দ্র পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ মানবাধিকার লঙ্ঘন এই বলে হাইকোর্টে একটি স্টে অর্ডার নেয়। সেই মামলার বিভিন্ন শুনানীতে পুনর্বাসনের কথা বলা হয় তবে গত জানুয়ারীতে হাইকোর্ট সরকারকে আদেশ দেয় দুই মাসের মধ্যে এই বেদখলকৃত জমি উদ্ধার করতে - তবে সেখানে পুনর্বাসনের কোন কথা বলা হয় নি।
করাইল এলাকার এইসব ভূমিহীন বস্তিবাসীর ৩০ ভাগ দিনমুজুর, ২০% রিক্সা-ভ্যান চালায়, ১৮% গার্মেন্টস কর্মী ও ১২% ছোট ব্যবসা করে। তাদের মাসিক আয় ২৫০০-৪৫০০ টাকা এবং স্থানীয় মান্তানদের ৮০ স্কয়ার ফিটের ঘর ভাড়া দিতে হয় ৮০০-১২০০ টাকা।
এই টাকায় তাদের কিভাবে চলে সে খেয়াল কি রাখে কেউ? জ্যাম এড়াতে আমি অনেক সময় রিক্সায় তেজগাঁয়ের রেললাইনের পাশের বস্তি ও ৪র্থ শ্রেণী কর্মচারীদের বাসস্থান এর পাশের রাস্তাটি দিয়ে আসি। বিজয় স্বরণী ও তেজগাওঁ এর ওভারব্রিজের নীচে এক অদ্ভুত বাজার বসে। কাছাকাছি কাওরান বাজারে যেসব শাক-সব্জি আসে সেসব ট্রাক থেকে নামানোর সময়টা কখনও দেখেছেন কি? কিছু বস্তির ছেলে চাপ খাওয়া, নষ্ট হওয়া শাক সব্জি সংগ্রহ করে সেখান থেকে, এবং অনেকসময় ভালগুলো চুরি করে - অবশ্যই শারীরিক প্রহার এবং গালাগালির ঝুঁকি মাথায় নিয়ে। সেইসব শাকসব্জি এবং হয়ত সরাসরি আড়ত থেকে পঁচে যাওয়া শাক-সব্জি দিয়েই উল্লেখিত বাজারটি সাজানো। সারি করে বিছিয়ে রাখা পাকা করলা, থেৎলানো পটল, পঁচা শসা, কাল হয়ে যাওয়া আলু - এগুরো নিত্য নৈমিত্তিক চিত্র। এখানে বাজার করতে আসে বস্তির নিম্নবিত্তরা। হ্যা, আমাদের মত বেশী দামের ফ্রেস সব্জি কেনার সামর্থ না থাকতে পারে, কিন্তু তাদেরও তো বাঁচতে হয়। বাজারের একটি মাত্র মাংসের দোকানে ঘন্টার পর ঘন্টা একটি মাংসের পিস ঝুলে প্রমান করে তারা - না তাদের জীবনেও বিশেষ অনুষ্ঠান থাকে যখন তারা মাংস খেতে পারে।
কিন্তু এই বস্তিবাসীদের আবাসহীন করা ঠেকাতে তেমন কেউ নেই তাদের পক্ষে লড়ার। কিছু এনজিও প্রেসক্লাবে মানববন্ধন করেছে এবং অনেকে পত্রপত্রিকায় লিখছে। কিন্তু আমাদের কার সময় আছে সেগুলোর প্রতি দৃষ্টি দেবার?
তত্বাবধায়ক সরকারের সময় মিরপুরে বস্তিবাসীদের জন্যে বাসস্থান করার কথা উঠল। সেটা আর এগোয় নি। কে করবে বলেন। তাদের জন্যে করে কার কি লাভ হবে?
আজকে বস্তিবাসীরা মহাখালীতে মানববন্ধন করছে। বনানী গুলশান এলাকায় ট্রাফিক ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়েছে। সেখানে কোন রিক্সা চলছে না - ধর্মঘটে গেছে তারা। আমাদের সাধারণ প্রতিক্রিয়া কি হবে ভাবছি। অসহ্য গরমে ঘন্টার পর ঘন্টা ট্রাফিক জ্যামে থেকে সরকারের গুষ্টি উদ্ধার করব। তাতে পরিস্থিতির কোন পরিবর্তন হবে না। এসব ভূমিহীন মানুষ আবার বসতি গড়বে নতুন কোন করাইলে। আমরা আমাদের সমস্যাকে শুধু এড়ানোর চেষ্টা করব - ঢাকাকে তিলত্তোমা করার কথা বলব কিন্তু সমস্যা মিটবে না। এ জন্যে আমরা নীরব দর্শকরাও অনেকটা দায়ী।
এ-কেমন মৃত্যু ?
আজ সকালে মেইল চেক করার সময় বন্ধু চ্যাটে এল ও জানালো আজকের দিনের বিভীষিকাময় খবরটি - সাংবাদিক সাগর সরোয়ার ও টিভি রিপোর্টার মেহেরুন রুনীর নৃশংস হত্যাকান্ড। সে বলছিল "গতকাল রাতেই সাগরকে একটি প্রেস রিলিজ পাঠিয়েছিলাম - আজকে সেটাই হাতে নিয়ে স্তব্ধ হয়ে বসে আছি।"
এইতো একদিন আগেও যারা ছিলেন সুখী দম্পতি, আজ শুধুই স্মৃতি আর ছবি। সারাদিন ফেসবুকে সাংবাদিক বন্ধুদের কাছ থেকে সাগর-রুনী নিয়ে শোকগাথা ও স্মৃতিচারণ, তাদের ছেলে মেঘকে নিয়ে নানা কথা পড়তে পড়তে ও ছবি দেখে আমরাও শোকাচ্ছন্ন ও ভারাক্রান্ত হই বইকি।
সাগরের ডয়েশে ভেলেতে চাকুরির সুবাদে দম্পতিটি জার্মানিতে প্রবাস জীবন কাটিয়ে গত বছর ফিরে এসেছেন। অন্য অনেকের মত বিদেশে থেকে জাননি। হয়ত দেশকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল। কিন্তু ভাগ্যে রইল বিভীষিকাময় মৃত্যু।
অনেকের মনেই নানা প্রশ্ন - এটা কি ডাকাতি না প্রতিহিংসামূলক খুন। তারা দুজন কি তাদের রিপোর্টিং এর জন্যেই কোন শক্র তৈরি করেছিলেন? নাকি এটি কোন পারিবারিক বিরোধ? সেসব হয়ত জানা যাবে অথবা যাবে না। তবে আমাদের সমাজ যে অমানবিক ও কলুষিত হয়ে গেছে তা বোঝা যায় ঘাতকদের আচরণে। পত্রিকার রিপোর্ট অনুযায়ীঃ "সাগরের দেহে ১৯টি বড় ধরনের আঘাতের চিহ্ন ছিল। এছাড়া ছোটখাটো আরো ২০-২৫টি কাটা দাগ পাওয়া গেছে। বুকের বাম পাশে একটা ছুরির ৮০ ভাগ গেঁথে ছিল।" হায়, এ পোড়ার দেশে খুনেও রহম নেই।
এ মৃত্যু আমাদের অনেককেই নাড়িয়ে দিয়েছে। এসব জেনে নির্লজ্জ স্বাভাবিক থাকা যায় না। তবে বাস্তবতা এই যে দেশে নানান নৃশংসতা অব্যহত রয়েছে ও থাকবে। কারন আমরা কখনও মূল নিয়ে ভাবি না। সমাজে বৈষম্য বাড়ছে। পাওয়া আর না পাওয়ার দলের মধ্যে একধরণের অবিশ্বাসের ব্যবধান তৈরি হচ্ছে। ফলে দেখা যায় খুব অল্প খরচ করেই মানুষ খুন করা যায়। আর নৃশংসতার ব্যাপারটিও সমাজসৃষ্ট। কোরবানীর সময় অভিভাবকরা অতি উৎসাহে সন্তানদের পশু জবাই করা দেখাব। পাকিস্তান ও গুটি কয়েক দেশ ব্যতিত পৃথিবীর কোথাও প্রকাশ্যে পশু জবাইয়ের চল নেই। ফলে লক্ষ্য করবেন এসব দেখে দেখে শেখার ফলে দেশে জবাই ও ছুরিকাঘাতে মৃত্যুর হার বেশী। কিন্তু এ নিয়ে রাষ্ট্র বা বুদ্ধিজীবীরা ভেবেছে কখনও?
আজ আরেক প্রবাসী বান্ধবীর সাথে কথা হচ্ছিল। সে দেশে ফেরার জন্যে চাকুরি খুঁজছে কিছুদিন ধরে। আজকের সংবাদে মুহ্যমান সে বলল এখন আমি ফেরার ব্যপারে নতুন করে ভাবব। এতদিন ফিরে আসার জন্যে উদ্বুদ্ধ করলেও আজ তাকে কোন কিছু বলতে পারিনি। এই মৃত্যু উপত্যকা থেকে আমার দেশকে ফিরে কেড়ে না আনলে আমি তার নিরাপদ ভবিষ্যৎের প্রতিশ্রুতি দেই কিভাবে?
এইতো একদিন আগেও যারা ছিলেন সুখী দম্পতি, আজ শুধুই স্মৃতি আর ছবি। সারাদিন ফেসবুকে সাংবাদিক বন্ধুদের কাছ থেকে সাগর-রুনী নিয়ে শোকগাথা ও স্মৃতিচারণ, তাদের ছেলে মেঘকে নিয়ে নানা কথা পড়তে পড়তে ও ছবি দেখে আমরাও শোকাচ্ছন্ন ও ভারাক্রান্ত হই বইকি।
সাগরের ডয়েশে ভেলেতে চাকুরির সুবাদে দম্পতিটি জার্মানিতে প্রবাস জীবন কাটিয়ে গত বছর ফিরে এসেছেন। অন্য অনেকের মত বিদেশে থেকে জাননি। হয়ত দেশকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল। কিন্তু ভাগ্যে রইল বিভীষিকাময় মৃত্যু।
অনেকের মনেই নানা প্রশ্ন - এটা কি ডাকাতি না প্রতিহিংসামূলক খুন। তারা দুজন কি তাদের রিপোর্টিং এর জন্যেই কোন শক্র তৈরি করেছিলেন? নাকি এটি কোন পারিবারিক বিরোধ? সেসব হয়ত জানা যাবে অথবা যাবে না। তবে আমাদের সমাজ যে অমানবিক ও কলুষিত হয়ে গেছে তা বোঝা যায় ঘাতকদের আচরণে। পত্রিকার রিপোর্ট অনুযায়ীঃ "সাগরের দেহে ১৯টি বড় ধরনের আঘাতের চিহ্ন ছিল। এছাড়া ছোটখাটো আরো ২০-২৫টি কাটা দাগ পাওয়া গেছে। বুকের বাম পাশে একটা ছুরির ৮০ ভাগ গেঁথে ছিল।" হায়, এ পোড়ার দেশে খুনেও রহম নেই।
এ মৃত্যু আমাদের অনেককেই নাড়িয়ে দিয়েছে। এসব জেনে নির্লজ্জ স্বাভাবিক থাকা যায় না। তবে বাস্তবতা এই যে দেশে নানান নৃশংসতা অব্যহত রয়েছে ও থাকবে। কারন আমরা কখনও মূল নিয়ে ভাবি না। সমাজে বৈষম্য বাড়ছে। পাওয়া আর না পাওয়ার দলের মধ্যে একধরণের অবিশ্বাসের ব্যবধান তৈরি হচ্ছে। ফলে দেখা যায় খুব অল্প খরচ করেই মানুষ খুন করা যায়। আর নৃশংসতার ব্যাপারটিও সমাজসৃষ্ট। কোরবানীর সময় অভিভাবকরা অতি উৎসাহে সন্তানদের পশু জবাই করা দেখাব। পাকিস্তান ও গুটি কয়েক দেশ ব্যতিত পৃথিবীর কোথাও প্রকাশ্যে পশু জবাইয়ের চল নেই। ফলে লক্ষ্য করবেন এসব দেখে দেখে শেখার ফলে দেশে জবাই ও ছুরিকাঘাতে মৃত্যুর হার বেশী। কিন্তু এ নিয়ে রাষ্ট্র বা বুদ্ধিজীবীরা ভেবেছে কখনও?
আজ আরেক প্রবাসী বান্ধবীর সাথে কথা হচ্ছিল। সে দেশে ফেরার জন্যে চাকুরি খুঁজছে কিছুদিন ধরে। আজকের সংবাদে মুহ্যমান সে বলল এখন আমি ফেরার ব্যপারে নতুন করে ভাবব। এতদিন ফিরে আসার জন্যে উদ্বুদ্ধ করলেও আজ তাকে কোন কিছু বলতে পারিনি। এই মৃত্যু উপত্যকা থেকে আমার দেশকে ফিরে কেড়ে না আনলে আমি তার নিরাপদ ভবিষ্যৎের প্রতিশ্রুতি দেই কিভাবে?
ভিআইপিতন্ত্র
ক্লাস টুতে স্কুলের বাংলা টিচার আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন যে বড় হলে কি হব।
আমি উত্তর দিয়েছিলাম 'পুলিশ'। কারন পুলিশরা তখন আমার চোখে ছিল
বীরত্ব-ক্ষমতার প্রতীক। এখন যদি আমাকে একই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করা হয়, তাহলে
চোখ বুঁজে অবশ্যই বলব ভিআইপি।
ভিআইপির সঠিক কোন সংজ্ঞা নেই, স্বার্থ আর ক্ষমতাই তাদের নিয়ন্ত্রক। ভিআইপি হতে লাগে না কোন যোগ্যতা, ন্যুনতম মনুষ্যত্ব বা পড়াশোনা। 'লেখাপড়া করে যে গাড়ি-ঘোড়া চড়ে সে' ধরণের তত্ব এক্ষেত্রে অচল। বাংলাদেশের শতাধিক এমপির শিক্ষাগত যোগ্যতা "স্বশিক্ষিত"। সেই স্বশিক্ষিতদের হাতে আমার শৈশবের হিরো পুলিশকে অনায়াসেই চড় খেয়েও তা হজম করতে হয়। বহু বিচারকের একটি করে অন্তত থার্ড ডিভিশন রয়েছে। তারপরও আপনি যদি ভুলে যান যে তারা সাধারণ মানুষ নয়, বিচারপতি, তাহলে হয়ত আপনাকে হাইকোর্টে হাজির হয়ে হাত জোড় করে ক্ষমা চাইতে হবে।
এই ভিআইপি সংস্কৃতি কি করে বাঙ্গালীদের গ্রাস করল? মুগল সম্রাটেরা তাদের আর্থ-রাজনৈতিক স্বার্থ পূরণের জন্য বংশানুক্রমিক উত্তরাধিকারসূত্রে জমির মালিক ভূঁইয়া বা ভূপতিদের নিয়ে জমিদারতন্ত্র চালু করেন। মুগল আমলে জমি ছিল মর্যাদার প্রতীক এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব-প্রতিপত্তির একটি উৎস - কারন জমিদারকে পুলিশ, বিচার বিভাগ ও সামরিক বাহিনীর কিছু দায়িত্ব পালন করতে হতো। উচ্চাভিলাসী জমিদাররা শাসকশ্রেণীকে তুষ্ট করার বিনিময়ে সার্বভৌম ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসেবে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করতেন। ঔপনিবেশিক আমলেও জমিদাররা ছিলেন বহাল তবিয়তেই তবে তাদের খাজনা আদায় ছাড়া অন্যান্য ক্ষমতা হ্রাস পায়। ১৯৫১ সালে জমিদারি ব্যবস্থার আনুষ্ঠানিক বিলোপ হলেও জমিদার বাহাদুররা ঠিকই রয়ে গেছেন অন্য চেহারায়। আমাদের দেশের মানুষের মধ্যে জমিদারতন্ত্রের মীথ প্রথিত। ফলে অর্থের প্রাচুর্য বা ক্ষমতাধর হলে সেই জমিদারী মানসিকতা জেগে ওঠে। তারা এবং তাদের আশেপাশের লোকেরা ভিআইপি স্ট্যাটাসের সুবিধা ভোগে তৎপর হয়ে ওঠে। এমনকি প্রভাবশালী নেতার মুরগীরও ভিআইপি স্ট্যাটাস পাবার নজির দেখা গেছে।
আপনার দৈনন্দিন জীবনে নানা সমস্যার মধ্যে আপনারা ভিআইপির উপস্থিতি টের পাবেন। এই দেশটি স্পষ্টতই ভিআইপিদের দেশ হয়ে উঠেছে। আপনি ভিআইপি হলেন তো বিনা ঘুষে, বিনা পুলিশী ঝামেলায় আপনার জীবন চলবে। আপনার ট্রাফিক জ্যামে পড়তে হবে না, কারন বিশেষ পুলিশি ব্যবস্থায় আপনার চলাচল। আপনি বিদেশের ভিসা সহজে পাবেন। ভিআইপিদের মধ্যে কি কেউ বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডে মারা গেছে?
এই কারনেই আমরা সবাই ভিআইপি হতে চাই। পরিচয়ের পর কয়েকটি বাক্যের মধ্যে আমরা উচ্চারণ করে ফেলি আমরা কোন ভিআইপির কত কাছের। ভাবি এতেই যদি শিকে ছিঁড়ে। সকলের জন্যে সমান অধিকার এই জিনিষটি আমরা মুখে বললেও তলে তলে লালায়িত থাকি একটু ভিআইপি সুখের।
এই ভিআইপিতন্ত্রের বুকে কিছুটা চির ধরিয়েছে প্রযুক্তিনির্ভর টুলস। ইন্টারনেট ও মোবাইল সহজলভ্য হবার সাথে সাথে যোগাযোগের নিমিত্ত এখন হাতের মুঠোয়। ব্লগে, ফেসবুকে সবাই আমাদের মনের ভাব প্রকাশ করতে পারি। এখন বুদ্ধিজীবীরা আগের মত আর বিবৃতি দিয়ে সুখ পান না- কারন আম জনতা তাদের চেয়ে বুদ্ধিদীপ্ত কথা বলে ফেলে। বিশ্বের অনেক নামিদামী পত্রিকা বিদেশী সংবাদদাতা তুলে নিচ্ছে - কারন ব্লগ-টুইটারে ব্রেকিং নিউজ মিলে। ওপেনসোর্স, ক্রিয়েটিভ কমন্স, ক্রাউডসোর্সিং, কমিউনিটি, কোলাবরেশনের মাধ্যমে শেয়ার্ড নলেজ - উইকিপিডিয়া, ইউটিউব, ফ্লিকার, ফেসবুক, ব্লগ কমিউনিটি। ওয়েবের মাধ্যমে কোটি লোকের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সৃষ্টি সবার হাতের মুঠোয়। এইসব শত শত ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের ২০০৬ সালের ম্যান অফ দা ইয়ার সম্মান দেয়।
১৯৯৯ সালে ন্যাপস্টার সবার নিজস্ব সঙ্গীত আর্কাইভ উন্মুক্ত করার মাধ্যমে একে অপরের মধ্যে গান আদান প্রদান সহজলভ্য করে দিল। সঙ্গীত ইন্ডাস্ট্রি প্রমাদ গুনল। অচিরেই তাদের নামে মামলা হল এবং ২০০১ সালে এটি বন্ধ হয়ে গেল। ন্যাপস্টারের দুর্বলতাগুলো জয় করে পরে র্যাপিডশেয়ার, মেগাআপলোড, ড্রপবক্স এর মত শেয়ারিং সাইট জন্ম নেয়। সম্প্রতি আবার এইসব শেয়ারিং সাইট ও কোলাবরেটিভ কন্টেন্ট এর বিরুদ্ধে আটঘাট বেঁধে লাগা হচ্ছে। বহুল আলোচিত সোপা ও পিপা আইন চালু হলে টুইটার বা ইউটিউবএর মত সাইটকে প্রতিটি পোস্ট পরীক্ষা করে পাবলিশ করতে হত (এখানে বিস্তারিত)- যা বাস্তবে সম্ভব নয়। ব্যপক প্রতিবাদের মুখে আইনগুলো পাশ করা থেকে বিরত রাখা গেছে, কিন্তু এরকম চাপ আরও আসবে মেধাস্বত্ত রক্ষার নামে।
মোগাআপলোডের বিরুদ্ধে কপিরাইট লংঘন আর ৫০০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশী ক্ষতিসাধনের অভিযোগ এসেছে এবং একে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। মেগাআপলোড কোম্পানিটি হংকংএর এবং পাইরেসীর অভিযোগে অভিযুক্ত এর কিছু কন্টেন্ট আমেরিকার লিজড সার্ভারে রাখার কারনে ফেডারেল কোর্ট তাদের জুরিস্ডিকশন দাবী করে। আমেরিকার অনুরোধে নিউজিল্যান্ড থেকে এর তিনজন (জার্মান ও ডাচ) হর্তাকর্তাকে গ্রেফতার করা হয়। এর প্রতিবাদে বেনামী হ্যাকাররা আমেরিকার জাস্টিস ডিপার্টমেন্ট, এফবিআই, কপিরাইট অফিস, ইউনিভার্সাল মিউজিক গ্রুপ ইত্যাদির ওয়েবসাইট হ্যাক করে।
এক স্বদেশীর বিরুদ্ধে বিদেশ থেকে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেবার জন্যে মামলা ঠোকা হয়েছে। ফেসবুক একটি ক্লোজড সাইট। কাজেই এখানে অসদাচরণ প্রদর্শনের (?) জন্যে বড়জোড় চাকুরিজীবির বিভাগীয় শাস্তি হতে পারে, মামলা নয় (জুরিস্ডিকশনের ব্যাপারটিও আছে), যেখানে সে ভুল স্বীকার করে স্ট্যাটাসটি মুছে দিয়েছে। তার অনুপস্থিতির কারনে আদালত অবমাননার শাস্তি প্রদান যেন ঝিকে মেরে বৌকে শেখান - খবরদার বাড়াবাড়ি করবে না। অথচ জামাত নেতা জনসভায় প্রকাশ্যে প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে হুমকি দেয়। তার বিরুদ্ধে মামলা হয় না - কারন সে রাজনৈতিক ভিআইপি।
এইভাবে বিশ্বজুড়ে সাধারণ অনলাইন ব্যবহারকারির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে সংবাদ বা তাদের মনের ভাব প্রকাশ করার জন্যে। ওদিকে অসাধু ভিআইপি রাজনীতিবিদরা তাদের বিশ্বব্যাপী গোপন ব্যান্ক অ্যাকাউন্ট থেকে লক্ষ কোটি টাকা আদান প্রদান করে অস্ত্র বা নিষিদ্ধ জিনিষ কিনছে -কারুরই মাথা ব্যাথা নেই।
গুয়াতেমালাতে আমেরিকার চাপে একটি বিশেষ কোর্ট এবং দুটি বিশেষ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে কপিরাইট আইনের জন্যে। দেড় কোটি মানুষের এই দেশে প্রতি বছর ৬০০০ লোক খুন হয় এবং খুনীদের বিচার হয় না। মাইকেল জ্যাকসনের পাইরেট গান ডাউনলোড করার জন্যে কারও পাঁচ বছরের সাজা হতে পারে - অথচ তাকে খুনের দায়ে ডাক্তারের সাজা হয়েছে একবছর।
ইন্টারনেটকে সাধারণ মানুষের হাত থেকে ভিআইপিদের কব্জায় নিয়ে আসার জন্যে তোড়জোড় হচ্ছে আমাদের দেশেও। কপিরাইট আর সাইবার আইনের পক্ষে সোচ্চার হচ্ছে কতিপয় গোষ্ঠি। প্রথমে একশ্রেণীর মিডিয়া কর্পোরেট ব্লগ চালু করে মতামত প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছে কিন্তু ব্যর্থ হওয়ায় নতুন নতুন ফন্দি আঁটছে। এটি করছে তাদের ব্যবসা টিকিয়ে রাখার স্বার্থে। বিভিন্ন সভা সমিতির মাধ্যমে তারা ব্লগ ভিআইপি সাজার চেষ্টায় ব্যস্ত।
ইন্টারনেটকে ভয় ভীতির উর্ধ্বে রেখে সাধারণ মানুষের ব্যবহার্য না করতে পারলে এটি অন্য সব মাধ্যমের মতই ভিআইপি নিয়ন্ত্রিত হবে। মানুষের কণ্ঠ রোধ করতে পারলে কাদের লাভ হয় তা মানুষ চীন, উত্তর কোরিয়া, ইরান ইত্যাদি স্বৈরাচারী শাসকের দেশ থেকে অনুমেয়। আমাদের তাই ভাবতে হবে - আমরা আমাদের এবং সাধারণ মানুষের অধিকারের লক্ষ্যে লড়ব না ভিআইপি হবার ইঁদুর দৌড়ে যোগ দেব।
ভিআইপির সঠিক কোন সংজ্ঞা নেই, স্বার্থ আর ক্ষমতাই তাদের নিয়ন্ত্রক। ভিআইপি হতে লাগে না কোন যোগ্যতা, ন্যুনতম মনুষ্যত্ব বা পড়াশোনা। 'লেখাপড়া করে যে গাড়ি-ঘোড়া চড়ে সে' ধরণের তত্ব এক্ষেত্রে অচল। বাংলাদেশের শতাধিক এমপির শিক্ষাগত যোগ্যতা "স্বশিক্ষিত"। সেই স্বশিক্ষিতদের হাতে আমার শৈশবের হিরো পুলিশকে অনায়াসেই চড় খেয়েও তা হজম করতে হয়। বহু বিচারকের একটি করে অন্তত থার্ড ডিভিশন রয়েছে। তারপরও আপনি যদি ভুলে যান যে তারা সাধারণ মানুষ নয়, বিচারপতি, তাহলে হয়ত আপনাকে হাইকোর্টে হাজির হয়ে হাত জোড় করে ক্ষমা চাইতে হবে।
এই ভিআইপি সংস্কৃতি কি করে বাঙ্গালীদের গ্রাস করল? মুগল সম্রাটেরা তাদের আর্থ-রাজনৈতিক স্বার্থ পূরণের জন্য বংশানুক্রমিক উত্তরাধিকারসূত্রে জমির মালিক ভূঁইয়া বা ভূপতিদের নিয়ে জমিদারতন্ত্র চালু করেন। মুগল আমলে জমি ছিল মর্যাদার প্রতীক এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব-প্রতিপত্তির একটি উৎস - কারন জমিদারকে পুলিশ, বিচার বিভাগ ও সামরিক বাহিনীর কিছু দায়িত্ব পালন করতে হতো। উচ্চাভিলাসী জমিদাররা শাসকশ্রেণীকে তুষ্ট করার বিনিময়ে সার্বভৌম ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসেবে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করতেন। ঔপনিবেশিক আমলেও জমিদাররা ছিলেন বহাল তবিয়তেই তবে তাদের খাজনা আদায় ছাড়া অন্যান্য ক্ষমতা হ্রাস পায়। ১৯৫১ সালে জমিদারি ব্যবস্থার আনুষ্ঠানিক বিলোপ হলেও জমিদার বাহাদুররা ঠিকই রয়ে গেছেন অন্য চেহারায়। আমাদের দেশের মানুষের মধ্যে জমিদারতন্ত্রের মীথ প্রথিত। ফলে অর্থের প্রাচুর্য বা ক্ষমতাধর হলে সেই জমিদারী মানসিকতা জেগে ওঠে। তারা এবং তাদের আশেপাশের লোকেরা ভিআইপি স্ট্যাটাসের সুবিধা ভোগে তৎপর হয়ে ওঠে। এমনকি প্রভাবশালী নেতার মুরগীরও ভিআইপি স্ট্যাটাস পাবার নজির দেখা গেছে।
আপনার দৈনন্দিন জীবনে নানা সমস্যার মধ্যে আপনারা ভিআইপির উপস্থিতি টের পাবেন। এই দেশটি স্পষ্টতই ভিআইপিদের দেশ হয়ে উঠেছে। আপনি ভিআইপি হলেন তো বিনা ঘুষে, বিনা পুলিশী ঝামেলায় আপনার জীবন চলবে। আপনার ট্রাফিক জ্যামে পড়তে হবে না, কারন বিশেষ পুলিশি ব্যবস্থায় আপনার চলাচল। আপনি বিদেশের ভিসা সহজে পাবেন। ভিআইপিদের মধ্যে কি কেউ বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডে মারা গেছে?
এই কারনেই আমরা সবাই ভিআইপি হতে চাই। পরিচয়ের পর কয়েকটি বাক্যের মধ্যে আমরা উচ্চারণ করে ফেলি আমরা কোন ভিআইপির কত কাছের। ভাবি এতেই যদি শিকে ছিঁড়ে। সকলের জন্যে সমান অধিকার এই জিনিষটি আমরা মুখে বললেও তলে তলে লালায়িত থাকি একটু ভিআইপি সুখের।
এই ভিআইপিতন্ত্রের বুকে কিছুটা চির ধরিয়েছে প্রযুক্তিনির্ভর টুলস। ইন্টারনেট ও মোবাইল সহজলভ্য হবার সাথে সাথে যোগাযোগের নিমিত্ত এখন হাতের মুঠোয়। ব্লগে, ফেসবুকে সবাই আমাদের মনের ভাব প্রকাশ করতে পারি। এখন বুদ্ধিজীবীরা আগের মত আর বিবৃতি দিয়ে সুখ পান না- কারন আম জনতা তাদের চেয়ে বুদ্ধিদীপ্ত কথা বলে ফেলে। বিশ্বের অনেক নামিদামী পত্রিকা বিদেশী সংবাদদাতা তুলে নিচ্ছে - কারন ব্লগ-টুইটারে ব্রেকিং নিউজ মিলে। ওপেনসোর্স, ক্রিয়েটিভ কমন্স, ক্রাউডসোর্সিং, কমিউনিটি, কোলাবরেশনের মাধ্যমে শেয়ার্ড নলেজ - উইকিপিডিয়া, ইউটিউব, ফ্লিকার, ফেসবুক, ব্লগ কমিউনিটি। ওয়েবের মাধ্যমে কোটি লোকের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সৃষ্টি সবার হাতের মুঠোয়। এইসব শত শত ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের ২০০৬ সালের ম্যান অফ দা ইয়ার সম্মান দেয়।
১৯৯৯ সালে ন্যাপস্টার সবার নিজস্ব সঙ্গীত আর্কাইভ উন্মুক্ত করার মাধ্যমে একে অপরের মধ্যে গান আদান প্রদান সহজলভ্য করে দিল। সঙ্গীত ইন্ডাস্ট্রি প্রমাদ গুনল। অচিরেই তাদের নামে মামলা হল এবং ২০০১ সালে এটি বন্ধ হয়ে গেল। ন্যাপস্টারের দুর্বলতাগুলো জয় করে পরে র্যাপিডশেয়ার, মেগাআপলোড, ড্রপবক্স এর মত শেয়ারিং সাইট জন্ম নেয়। সম্প্রতি আবার এইসব শেয়ারিং সাইট ও কোলাবরেটিভ কন্টেন্ট এর বিরুদ্ধে আটঘাট বেঁধে লাগা হচ্ছে। বহুল আলোচিত সোপা ও পিপা আইন চালু হলে টুইটার বা ইউটিউবএর মত সাইটকে প্রতিটি পোস্ট পরীক্ষা করে পাবলিশ করতে হত (এখানে বিস্তারিত)- যা বাস্তবে সম্ভব নয়। ব্যপক প্রতিবাদের মুখে আইনগুলো পাশ করা থেকে বিরত রাখা গেছে, কিন্তু এরকম চাপ আরও আসবে মেধাস্বত্ত রক্ষার নামে।
মোগাআপলোডের বিরুদ্ধে কপিরাইট লংঘন আর ৫০০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশী ক্ষতিসাধনের অভিযোগ এসেছে এবং একে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। মেগাআপলোড কোম্পানিটি হংকংএর এবং পাইরেসীর অভিযোগে অভিযুক্ত এর কিছু কন্টেন্ট আমেরিকার লিজড সার্ভারে রাখার কারনে ফেডারেল কোর্ট তাদের জুরিস্ডিকশন দাবী করে। আমেরিকার অনুরোধে নিউজিল্যান্ড থেকে এর তিনজন (জার্মান ও ডাচ) হর্তাকর্তাকে গ্রেফতার করা হয়। এর প্রতিবাদে বেনামী হ্যাকাররা আমেরিকার জাস্টিস ডিপার্টমেন্ট, এফবিআই, কপিরাইট অফিস, ইউনিভার্সাল মিউজিক গ্রুপ ইত্যাদির ওয়েবসাইট হ্যাক করে।
এক স্বদেশীর বিরুদ্ধে বিদেশ থেকে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেবার জন্যে মামলা ঠোকা হয়েছে। ফেসবুক একটি ক্লোজড সাইট। কাজেই এখানে অসদাচরণ প্রদর্শনের (?) জন্যে বড়জোড় চাকুরিজীবির বিভাগীয় শাস্তি হতে পারে, মামলা নয় (জুরিস্ডিকশনের ব্যাপারটিও আছে), যেখানে সে ভুল স্বীকার করে স্ট্যাটাসটি মুছে দিয়েছে। তার অনুপস্থিতির কারনে আদালত অবমাননার শাস্তি প্রদান যেন ঝিকে মেরে বৌকে শেখান - খবরদার বাড়াবাড়ি করবে না। অথচ জামাত নেতা জনসভায় প্রকাশ্যে প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে হুমকি দেয়। তার বিরুদ্ধে মামলা হয় না - কারন সে রাজনৈতিক ভিআইপি।
এইভাবে বিশ্বজুড়ে সাধারণ অনলাইন ব্যবহারকারির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে সংবাদ বা তাদের মনের ভাব প্রকাশ করার জন্যে। ওদিকে অসাধু ভিআইপি রাজনীতিবিদরা তাদের বিশ্বব্যাপী গোপন ব্যান্ক অ্যাকাউন্ট থেকে লক্ষ কোটি টাকা আদান প্রদান করে অস্ত্র বা নিষিদ্ধ জিনিষ কিনছে -কারুরই মাথা ব্যাথা নেই।
গুয়াতেমালাতে আমেরিকার চাপে একটি বিশেষ কোর্ট এবং দুটি বিশেষ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে কপিরাইট আইনের জন্যে। দেড় কোটি মানুষের এই দেশে প্রতি বছর ৬০০০ লোক খুন হয় এবং খুনীদের বিচার হয় না। মাইকেল জ্যাকসনের পাইরেট গান ডাউনলোড করার জন্যে কারও পাঁচ বছরের সাজা হতে পারে - অথচ তাকে খুনের দায়ে ডাক্তারের সাজা হয়েছে একবছর।
ইন্টারনেটকে সাধারণ মানুষের হাত থেকে ভিআইপিদের কব্জায় নিয়ে আসার জন্যে তোড়জোড় হচ্ছে আমাদের দেশেও। কপিরাইট আর সাইবার আইনের পক্ষে সোচ্চার হচ্ছে কতিপয় গোষ্ঠি। প্রথমে একশ্রেণীর মিডিয়া কর্পোরেট ব্লগ চালু করে মতামত প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছে কিন্তু ব্যর্থ হওয়ায় নতুন নতুন ফন্দি আঁটছে। এটি করছে তাদের ব্যবসা টিকিয়ে রাখার স্বার্থে। বিভিন্ন সভা সমিতির মাধ্যমে তারা ব্লগ ভিআইপি সাজার চেষ্টায় ব্যস্ত।
ইন্টারনেটকে ভয় ভীতির উর্ধ্বে রেখে সাধারণ মানুষের ব্যবহার্য না করতে পারলে এটি অন্য সব মাধ্যমের মতই ভিআইপি নিয়ন্ত্রিত হবে। মানুষের কণ্ঠ রোধ করতে পারলে কাদের লাভ হয় তা মানুষ চীন, উত্তর কোরিয়া, ইরান ইত্যাদি স্বৈরাচারী শাসকের দেশ থেকে অনুমেয়। আমাদের তাই ভাবতে হবে - আমরা আমাদের এবং সাধারণ মানুষের অধিকারের লক্ষ্যে লড়ব না ভিআইপি হবার ইঁদুর দৌড়ে যোগ দেব।
জাগো বাংলাদেশ নিয়ে যত কথা
গতকাল অফিসে যাবার সময়ে শেরাটন হোটেলের সামনের মোড়ে দেখলাম হলুদ টিশার্ট
পরা কয়েকজন ছেলেমেয়ে বিভিন্ন গাড়ির কাছে এসে কিছু জিজ্ঞেস করছে। গাড়ি
সিগন্যালে থামতেই ১৪-১৫ বছর বয়সী এক কিশোরী এগিয়ে এল। স্যার বলে সম্ভাষণ
করে তাদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলা শুরু করতেই গাড়ি আবার নড়ল। দ্রুত পকেটে
হাত দিয়ে কিছু টাকা হস্তান্তর করতেই Primary Education For All লেখা একটি
স্টিকার পেলাম। অন্য গাড়িতে দেখলাম ফুল দেয়া হচ্ছে।
এরপর অফিস যেতে যেতে ভাবছিলাম যে ওইখানে প্রায়ই পথশিশুরা ফুল নিয়ে দাড়িয়ে থাকে অথচ তাদের কাছ থেকে কালে ভদ্রে কিছু কেনা হয় না। তাহলে আমি ঐ হলুদ পোশাক পড়া কিশোরীকে কেন সাহায্য করলাম?
বিভিন্ন ব্লগে এই নিয়ে লেখালেখি হচ্ছে যার বেশীরভাগেই দেখলাম তথ্যের অভাবে গালগল্প, ব্র্যান্ডিং ও কাঁদা-ছোড়াছুড়ি চলছে। এইসব কিশোর-কিশোরী বা তাদের কে পাঠিয়েছে তা সম্পর্কে আমরা কতটুকু জানি? কালকের এই আয়োজনটি কিন্তু রীতিমত পাবলিক ক্যাম্পেইন করা একটি কর্পোরেট পৃষ্ঠপোষকতার উদ্যোগ। ডেইলি স্টারে এসেছে যে জাগো বাংলাদেশ নামক এনজিওর ভলান্টিয়ার্স ফর বাংলাদেশ শাখার প্রায় ৭০০০ স্বেচ্ছাসেবক যারা বিভিন্ন ইংরেজী ও বাংলা মাধ্যমের স্কুল এবং কলেজ ইউনিভার্সিটিতে পড়ে তারা দেশের দশটি শহরে রাস্তার মোড়ে মোড়ে দাড়িয়ে জাতিসংঘের উৎসাহে প্রবর্তিত ইউনিভার্সাল চিলড্রেনস ডে সম্পর্কে জানাবে এবং পথশিশুদের জন্যে অর্থ সংগ্রহ করবে ৩রা নভেম্বর ২০১১ তারিখে। একই দিনে তারা ১৮০০ পথশিশুকে বিভিন্ন খেলার যায়গায় নিয়ে যাবে, তাদের খাবার এবং চিকিৎসা দেবে। এর মূল স্পন্সর আমেরিকান দুতাবাস এবং সহায়তা করেছে এয়ারটেল, পিজ্জা হাট, কেএফসি, ফারইস্ট লি: ওয়ান্ডারল্যান্ড, টিটিএল এবং অন্যান্য সংস্থা। অনেক প্রতিথযশা যেমন জাফর ইকবাল স্যারও তাদের উৎসাহিত করেছেন ( এবং তার বিরুদ্ধে ফতোয়া দেবার ধৃষ্টতা পেয়েছে ছাগুরা)। জাগো বাংলাদেশ ২০০৭ সাল থেকেই ইউনিভার্সাল চিলড্রেনস ডে পালন করে আসছে।
সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা ২৫ বছর বয়সী বাংলাদেশী যুব্ক করভি রক্ষান্দ ধ্রুবের গল্প স্বপ্নের মতন, অন্তত দেশে বিদেশে সেভাবেই প্রচারিত। বিলেত থেকে ২১ বছর বয়সে আইনে স্নাতক ডিগ্রি নিয়ে দেশে ফেরে ধ্রুব। কথা ছিল পারিবারিক ব্যবসা সামলাবে সে, কিন্তু মাথায় ভুত চাপল পথশিশুদের জন্যে স্কুল করবে সে। ২০০৭ সালের এপ্রিল মাসে রায়ের বাজারে বন্ধুদের সাহায্যে একটি রুম ভাড়া নেয় জাগো এবং একটি ছোট ইংরেজী স্কুল খোলে যেখানে ইউনিভার্সিটি অফ লন্ডনের এডএক্সেল কারিকুলামে পড়ানো হয়। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পাশাপাশি মেলে খাবার ও চিকিৎসা। বাড়ি যাবার সময় আবার আধা কেজি চালও পায়। ধ্রুব করিৎকর্মা ছেলে, তার যোগাযোগ, সামাজিক মর্যাদা ইত্যাদি কাজে লাগিয়ে দেশী-বিদেশী সাহায্য যোগাড় করে স্কুলটি এগিয়ে নেয়। এর জন্যে আকর্ষনীয় প্রেজেন্টেশন, ভিডিও ও নানা ক্যাম্পেইনের উদ্যোগ নেয়।
বর্তমানে এই বিল্ডিং এর দুই তলা জুড়ে ৩৬০ জন করে দুই শিফটে ৭২০ জন পথশিশু শিক্ষা নেয়। তাদের ঢাকা, চট্টগ্রাম সহ অন্যান্য কয়েকটি শহরে আরও গুটি কয়েক ছোট স্কুল আছে। ইতিমধ্যে দেশী ও আন্তর্জাতিক পুরস্কারও পেয়েছে ধ্রুব। এছাড়াও দ্যা ঢাকা প্রজেক্ট নামে আরেকটি স্কুল আছে যেখানে বিশেষ ভাবে এমিরেটস এর বিমানবালাদের অর্থায়নে বাংলা ও ইংরেজী মাধ্যমে পড়ানো হয়।
দুবছর আগে বাড়ি থেকে তাকে জানিয়ে দেয়া হয়, বেছে নাও - পারিবারিক ব্যবসা না তোমার খামখেয়ালি। ধ্রুব বাড়ি থেকে বের হয়ে স্কুলের একটি রুমে আশ্রয় নিয়ে বলে দিনের অধিকাংশ সময়তো এখানেই থাকি, নাহয় আরেকটু থাকলাম। জাগো বাংলাদেশে আরও বিভিন্ন সামাজিক কাজের সাথে জড়িত - তাদের ওয়েবসাইট অনুযায়ী।
ইউনিভার্সাল চিলড্রেনস ডের ২০১০ সালের অনুষ্ঠানে প্রায় ২০০০ স্বেচ্ছাসেবক অংশ নেয়। এইসব স্বেচ্ছসেবকদের আনুষ্ঠানিক কাঠামো দিতে অঙ্গসংস্থা ভলান্টিয়ার ফর বাংলাদেশ গঠিত হয় কাকরাইলে এবছর আমেরিকান দুতাবাসের সহযোগীতায়। উদ্দেশ্য আগামী ২ বছরের মধ্যে ২১টি স্বেচ্ছাসেবক দল তৈরি করা। তাদের চুড়ান্ত লক্ষ্য ৬৪টি জেলায় স্বেচ্ছাসেবক দল তৈরি করা। তাদের কার্যক্রমের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে সামাজিক মিডিয়ার ব্যবহার - আপনি যোগ দিতে চান? ফেসবুক লগিন ব্যবহার করে যোগ দিতে পারেন। ফেসবুকে তাদের স্বেচ্ছাসেবকের সংখ্যা ৬০০০ এর উপরে। এবারের ইউনিভার্সাল চিলড্রেনস ডে উপলক্ষ্যে ভলান্টিয়ার ফর বাংলাদেশ বেশ কটি ওয়ার্কশপের আয়োজন করে দেশজুড়ে -চট্টগ্রাম, ঢাকার আইএসডি, সেইন্ট যোসেফ ইত্যাদি নামকরা স্কুল ছাড়াও ওয়ান্ডারল্যান্ডে ছিল এইসব আয়োজন। নয়নকাড়া ভিডিও এবং ছবি ফেইসবুক ও ইউটিউবে শেয়ার করা হয়েছে এবং আরও ছাত্রছাত্রী উদ্বুদ্ধ হয়েছে। আমি কেন সেই কিশোরীকে সাহায্য করলাম সেটি এখন খোলাসা হল। এটি ছিল পূর্ব প্রস্তুতি নেয়া ইভেন্ট এবং এতে একটি স্টানিং ইফেক্ট ছিল। এতজনের স্বতস্ফুর্ত অংশগ্রহণের পেছনে সামাজিক মিডিয়ার অবদান অনস্বীকার্য। টুইটারের মাধ্যমে জানা যায় যে ঢাকার উত্তরাংশে পুলিশ গতকাল তাদের কার্যক্রমে বাধা দেয় এবং ধ্রুব গুলশান থানায় গিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেয়।
আজকে অরিত্রের লেখায় জাগো বাংলাদেশের পক্ষে বিপক্ষে অনেক কথা এসেছে। অনেকে স্বেচ্ছাসেবকদের পোষাক নিয়ে আপত্তি করেছেন (সাবিহ ওমর ভালো জবাব দিয়েছেন তাদের)। অনেকে কত টাকা উঠেছে তার হিসেব চা্চ্ছেন। অনেক স্বেচ্ছাসেবককে টিশার্ট পরিহিত অবস্থায় শিশা বারে দেখা গেছে সেসব ছবি এসেছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে এই সবই কিন্তু বিভিন্ন ব্লগে আসার সাথে সাথে তাদের ফেসবুক গ্রুপে পোস্ট হয়ে যাচ্ছে এবং জবাব চাচ্ছে অনেকে। আগ্রহীরা চাইলে ধ্রুব, জাগো ফাউন্ডেশন এবং ভলান্টিয়ার ফর বাংলাদেশ ফেসবুক পেইজে এইসব নিয়ে আলোচনা দেখতে পারেন। সামাজিক মিডিয়ার সুবিধাটা এইখানে - পত্রিকার মত একপেশে রিপোর্ট না। জবাবদিহীতার আশা করা যায়।
এইসব স্বেচ্ছাসেবক দেশের দুর্নীতিগ্রস্ত সমাজের অন্তর্গত - কাজেই গুটিকয়েকের ব্যক্তিগত দুর্নীতিকে জেনেরালাইজ করা হয়ত ঠিক হবে না। ২০১০ সালে ৬ ঘন্টায় তোলা হয়েছিল ২৪ লাখ টাকা, এবার শোনা যাচ্ছে ৩৮ লাখ টাকার কথা - জাগো বাংলাদেশ তাদের আয় ব্যয়ের রিপোর্ট প্রদানে স্বচ্ছ হবেন এ আশা রইল - না হলে সবাই যা বোঝার বুঝে যাবেন।
ধ্রুবর ফেইসবুক স্ট্যাটাস থেকে একটি অংশ তুলে ধরার লোভ সামলাতে পারছি না:
এই প্রশ্নোত্তর পর্ব দিয়ে বোঝা যায় যে জাগোকে অনেক প্রতিবন্ধকতার মোকাবেলা করতে হয়েছে বুদ্ধিমত্তা দিয়ে এতজন স্বেচ্ছাসেবকদের একত্রিত করতে। তবে তাদের জন্যেই দামী স্কুলের এইসব উচ্চবিত্ত ঘরের স্বেচ্ছাসেবকরা যাদের অনেকে আদর করে ফার্মের মুরগি বলে ডাকে তারা এই প্রথমবার অ্যাক্টিভিজমের স্বাদ পাচ্ছে। আমেরিকান দুতাবাসের পৃষ্ঠপোষকতায় অনুষ্ঠান বলে হয়ত তাদের পিতামাতা তাদের রাস্তায় ছেড়েছে। তারা ভবিষ্যৎে দেশের সংকটময় মুহূর্তগুলোতে এইভাবে নেমে আসবে কিনা এবং কর্পোরেট বেনিয়া গন্ধ ছাড়া উদ্যোগগুলোতে তাদের অংশগ্রহণ কেমন সেটা দেখার আকাঙ্খা রইল। তারাও দেশেরই অংশ এবং আমরা শ্রেণীভেদ করে তাদের যেন দুরে না ঠেলি। স্বেচ্ছাসেবকতা করা তাদেরও অধিকার এবং দেখা যাক তেল গ্যাস রক্ষার মত বা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এর মত জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোতে তাদের ভূমিকা কেমন থাকে।
এখানে উল্লেখযোগ্য গতকালের আয়োজনে আলোকচিত্রে স্বেচ্ছাসেবা দিয়ে সহায়তা করেছে থ্রু দ্যা লেন্স (টিটিএল) নামক অ্যামেচার ফটোগ্রাফারদের সংগঠন (আমার কয়েক বন্ধুও আছে সেখানে)। জাতীয় অন্যান্য অ্যাক্টিভিজমে তাদের সচরাচর দেখা যায় না। ভবিষ্যৎে কি তাদের পাওয়া যাবে?
জাগো বাংলাদেশ আর ভলান্টিয়ার ফর বাংলাদেশের উদ্দেশ্য মহৎ হলেও আমেরিকান সরকারের ভূমিকা এখানে প্রশ্নবিদ্ধ। ৬৪টি জেলায় স্বেচ্ছাসেবক নেটওয়ার্ক হলে তাদের কি লাভ? বিষয়টা এতটা জটিল যে বলতে হয় খুব খেয়াল কৈরা।
এরপর অফিস যেতে যেতে ভাবছিলাম যে ওইখানে প্রায়ই পথশিশুরা ফুল নিয়ে দাড়িয়ে থাকে অথচ তাদের কাছ থেকে কালে ভদ্রে কিছু কেনা হয় না। তাহলে আমি ঐ হলুদ পোশাক পড়া কিশোরীকে কেন সাহায্য করলাম?
বিভিন্ন ব্লগে এই নিয়ে লেখালেখি হচ্ছে যার বেশীরভাগেই দেখলাম তথ্যের অভাবে গালগল্প, ব্র্যান্ডিং ও কাঁদা-ছোড়াছুড়ি চলছে। এইসব কিশোর-কিশোরী বা তাদের কে পাঠিয়েছে তা সম্পর্কে আমরা কতটুকু জানি? কালকের এই আয়োজনটি কিন্তু রীতিমত পাবলিক ক্যাম্পেইন করা একটি কর্পোরেট পৃষ্ঠপোষকতার উদ্যোগ। ডেইলি স্টারে এসেছে যে জাগো বাংলাদেশ নামক এনজিওর ভলান্টিয়ার্স ফর বাংলাদেশ শাখার প্রায় ৭০০০ স্বেচ্ছাসেবক যারা বিভিন্ন ইংরেজী ও বাংলা মাধ্যমের স্কুল এবং কলেজ ইউনিভার্সিটিতে পড়ে তারা দেশের দশটি শহরে রাস্তার মোড়ে মোড়ে দাড়িয়ে জাতিসংঘের উৎসাহে প্রবর্তিত ইউনিভার্সাল চিলড্রেনস ডে সম্পর্কে জানাবে এবং পথশিশুদের জন্যে অর্থ সংগ্রহ করবে ৩রা নভেম্বর ২০১১ তারিখে। একই দিনে তারা ১৮০০ পথশিশুকে বিভিন্ন খেলার যায়গায় নিয়ে যাবে, তাদের খাবার এবং চিকিৎসা দেবে। এর মূল স্পন্সর আমেরিকান দুতাবাস এবং সহায়তা করেছে এয়ারটেল, পিজ্জা হাট, কেএফসি, ফারইস্ট লি: ওয়ান্ডারল্যান্ড, টিটিএল এবং অন্যান্য সংস্থা। অনেক প্রতিথযশা যেমন জাফর ইকবাল স্যারও তাদের উৎসাহিত করেছেন ( এবং তার বিরুদ্ধে ফতোয়া দেবার ধৃষ্টতা পেয়েছে ছাগুরা)। জাগো বাংলাদেশ ২০০৭ সাল থেকেই ইউনিভার্সাল চিলড্রেনস ডে পালন করে আসছে।
সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা ২৫ বছর বয়সী বাংলাদেশী যুব্ক করভি রক্ষান্দ ধ্রুবের গল্প স্বপ্নের মতন, অন্তত দেশে বিদেশে সেভাবেই প্রচারিত। বিলেত থেকে ২১ বছর বয়সে আইনে স্নাতক ডিগ্রি নিয়ে দেশে ফেরে ধ্রুব। কথা ছিল পারিবারিক ব্যবসা সামলাবে সে, কিন্তু মাথায় ভুত চাপল পথশিশুদের জন্যে স্কুল করবে সে। ২০০৭ সালের এপ্রিল মাসে রায়ের বাজারে বন্ধুদের সাহায্যে একটি রুম ভাড়া নেয় জাগো এবং একটি ছোট ইংরেজী স্কুল খোলে যেখানে ইউনিভার্সিটি অফ লন্ডনের এডএক্সেল কারিকুলামে পড়ানো হয়। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পাশাপাশি মেলে খাবার ও চিকিৎসা। বাড়ি যাবার সময় আবার আধা কেজি চালও পায়। ধ্রুব করিৎকর্মা ছেলে, তার যোগাযোগ, সামাজিক মর্যাদা ইত্যাদি কাজে লাগিয়ে দেশী-বিদেশী সাহায্য যোগাড় করে স্কুলটি এগিয়ে নেয়। এর জন্যে আকর্ষনীয় প্রেজেন্টেশন, ভিডিও ও নানা ক্যাম্পেইনের উদ্যোগ নেয়।
বর্তমানে এই বিল্ডিং এর দুই তলা জুড়ে ৩৬০ জন করে দুই শিফটে ৭২০ জন পথশিশু শিক্ষা নেয়। তাদের ঢাকা, চট্টগ্রাম সহ অন্যান্য কয়েকটি শহরে আরও গুটি কয়েক ছোট স্কুল আছে। ইতিমধ্যে দেশী ও আন্তর্জাতিক পুরস্কারও পেয়েছে ধ্রুব। এছাড়াও দ্যা ঢাকা প্রজেক্ট নামে আরেকটি স্কুল আছে যেখানে বিশেষ ভাবে এমিরেটস এর বিমানবালাদের অর্থায়নে বাংলা ও ইংরেজী মাধ্যমে পড়ানো হয়।
দুবছর আগে বাড়ি থেকে তাকে জানিয়ে দেয়া হয়, বেছে নাও - পারিবারিক ব্যবসা না তোমার খামখেয়ালি। ধ্রুব বাড়ি থেকে বের হয়ে স্কুলের একটি রুমে আশ্রয় নিয়ে বলে দিনের অধিকাংশ সময়তো এখানেই থাকি, নাহয় আরেকটু থাকলাম। জাগো বাংলাদেশে আরও বিভিন্ন সামাজিক কাজের সাথে জড়িত - তাদের ওয়েবসাইট অনুযায়ী।
ইউনিভার্সাল চিলড্রেনস ডের ২০১০ সালের অনুষ্ঠানে প্রায় ২০০০ স্বেচ্ছাসেবক অংশ নেয়। এইসব স্বেচ্ছসেবকদের আনুষ্ঠানিক কাঠামো দিতে অঙ্গসংস্থা ভলান্টিয়ার ফর বাংলাদেশ গঠিত হয় কাকরাইলে এবছর আমেরিকান দুতাবাসের সহযোগীতায়। উদ্দেশ্য আগামী ২ বছরের মধ্যে ২১টি স্বেচ্ছাসেবক দল তৈরি করা। তাদের চুড়ান্ত লক্ষ্য ৬৪টি জেলায় স্বেচ্ছাসেবক দল তৈরি করা। তাদের কার্যক্রমের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে সামাজিক মিডিয়ার ব্যবহার - আপনি যোগ দিতে চান? ফেসবুক লগিন ব্যবহার করে যোগ দিতে পারেন। ফেসবুকে তাদের স্বেচ্ছাসেবকের সংখ্যা ৬০০০ এর উপরে। এবারের ইউনিভার্সাল চিলড্রেনস ডে উপলক্ষ্যে ভলান্টিয়ার ফর বাংলাদেশ বেশ কটি ওয়ার্কশপের আয়োজন করে দেশজুড়ে -চট্টগ্রাম, ঢাকার আইএসডি, সেইন্ট যোসেফ ইত্যাদি নামকরা স্কুল ছাড়াও ওয়ান্ডারল্যান্ডে ছিল এইসব আয়োজন। নয়নকাড়া ভিডিও এবং ছবি ফেইসবুক ও ইউটিউবে শেয়ার করা হয়েছে এবং আরও ছাত্রছাত্রী উদ্বুদ্ধ হয়েছে। আমি কেন সেই কিশোরীকে সাহায্য করলাম সেটি এখন খোলাসা হল। এটি ছিল পূর্ব প্রস্তুতি নেয়া ইভেন্ট এবং এতে একটি স্টানিং ইফেক্ট ছিল। এতজনের স্বতস্ফুর্ত অংশগ্রহণের পেছনে সামাজিক মিডিয়ার অবদান অনস্বীকার্য। টুইটারের মাধ্যমে জানা যায় যে ঢাকার উত্তরাংশে পুলিশ গতকাল তাদের কার্যক্রমে বাধা দেয় এবং ধ্রুব গুলশান থানায় গিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেয়।
আজকে অরিত্রের লেখায় জাগো বাংলাদেশের পক্ষে বিপক্ষে অনেক কথা এসেছে। অনেকে স্বেচ্ছাসেবকদের পোষাক নিয়ে আপত্তি করেছেন (সাবিহ ওমর ভালো জবাব দিয়েছেন তাদের)। অনেকে কত টাকা উঠেছে তার হিসেব চা্চ্ছেন। অনেক স্বেচ্ছাসেবককে টিশার্ট পরিহিত অবস্থায় শিশা বারে দেখা গেছে সেসব ছবি এসেছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে এই সবই কিন্তু বিভিন্ন ব্লগে আসার সাথে সাথে তাদের ফেসবুক গ্রুপে পোস্ট হয়ে যাচ্ছে এবং জবাব চাচ্ছে অনেকে। আগ্রহীরা চাইলে ধ্রুব, জাগো ফাউন্ডেশন এবং ভলান্টিয়ার ফর বাংলাদেশ ফেসবুক পেইজে এইসব নিয়ে আলোচনা দেখতে পারেন। সামাজিক মিডিয়ার সুবিধাটা এইখানে - পত্রিকার মত একপেশে রিপোর্ট না। জবাবদিহীতার আশা করা যায়।
এইসব স্বেচ্ছাসেবক দেশের দুর্নীতিগ্রস্ত সমাজের অন্তর্গত - কাজেই গুটিকয়েকের ব্যক্তিগত দুর্নীতিকে জেনেরালাইজ করা হয়ত ঠিক হবে না। ২০১০ সালে ৬ ঘন্টায় তোলা হয়েছিল ২৪ লাখ টাকা, এবার শোনা যাচ্ছে ৩৮ লাখ টাকার কথা - জাগো বাংলাদেশ তাদের আয় ব্যয়ের রিপোর্ট প্রদানে স্বচ্ছ হবেন এ আশা রইল - না হলে সবাই যা বোঝার বুঝে যাবেন।
ধ্রুবর ফেইসবুক স্ট্যাটাস থেকে একটি অংশ তুলে ধরার লোভ সামলাতে পারছি না:
এই প্রশ্নোত্তর পর্ব দিয়ে বোঝা যায় যে জাগোকে অনেক প্রতিবন্ধকতার মোকাবেলা করতে হয়েছে বুদ্ধিমত্তা দিয়ে এতজন স্বেচ্ছাসেবকদের একত্রিত করতে। তবে তাদের জন্যেই দামী স্কুলের এইসব উচ্চবিত্ত ঘরের স্বেচ্ছাসেবকরা যাদের অনেকে আদর করে ফার্মের মুরগি বলে ডাকে তারা এই প্রথমবার অ্যাক্টিভিজমের স্বাদ পাচ্ছে। আমেরিকান দুতাবাসের পৃষ্ঠপোষকতায় অনুষ্ঠান বলে হয়ত তাদের পিতামাতা তাদের রাস্তায় ছেড়েছে। তারা ভবিষ্যৎে দেশের সংকটময় মুহূর্তগুলোতে এইভাবে নেমে আসবে কিনা এবং কর্পোরেট বেনিয়া গন্ধ ছাড়া উদ্যোগগুলোতে তাদের অংশগ্রহণ কেমন সেটা দেখার আকাঙ্খা রইল। তারাও দেশেরই অংশ এবং আমরা শ্রেণীভেদ করে তাদের যেন দুরে না ঠেলি। স্বেচ্ছাসেবকতা করা তাদেরও অধিকার এবং দেখা যাক তেল গ্যাস রক্ষার মত বা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এর মত জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোতে তাদের ভূমিকা কেমন থাকে।
এখানে উল্লেখযোগ্য গতকালের আয়োজনে আলোকচিত্রে স্বেচ্ছাসেবা দিয়ে সহায়তা করেছে থ্রু দ্যা লেন্স (টিটিএল) নামক অ্যামেচার ফটোগ্রাফারদের সংগঠন (আমার কয়েক বন্ধুও আছে সেখানে)। জাতীয় অন্যান্য অ্যাক্টিভিজমে তাদের সচরাচর দেখা যায় না। ভবিষ্যৎে কি তাদের পাওয়া যাবে?
জাগো বাংলাদেশ আর ভলান্টিয়ার ফর বাংলাদেশের উদ্দেশ্য মহৎ হলেও আমেরিকান সরকারের ভূমিকা এখানে প্রশ্নবিদ্ধ। ৬৪টি জেলায় স্বেচ্ছাসেবক নেটওয়ার্ক হলে তাদের কি লাভ? বিষয়টা এতটা জটিল যে বলতে হয় খুব খেয়াল কৈরা।
পার্বত্য চট্টগ্রাম ও পাহাড়িরা কি দূরে সরে যাচ্ছে?
ছুটি এলেই মনটা পালাই পালাই করে কিন্তু আলস্যের কারনে কোথাও যাওয়া হয়না। এবার পুজোর ছুটিতে আড়মোড়া ভেঙ্গে সপরিবারে খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটি বেরিয়ে এলাম। আমার জন্যে ব্যাপারটি ছিল উত্তেজনাকর, কারন হিল্লি দিল্লি করার সুযোগ হলেও দেখা হয়নি চক্ষু মেলিয়া দেশের ভেতরের এই সবুজ ও নীলের পাহাড়-হ্রদের মেলা।
এ অঞ্চলের সৌন্দর্য নিয়ে নতুন কিছু বলার নেই (ছবি দ্রষ্টব্য: রাঙ্গামাটি , খাগড়াছড়ি, বান্দরবান )। আমাদের সফরসঙ্গী পরিবারের কর্তাটি বললেন দেখুন এইরকম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখতে মানুষ অনেক পয়সা খরচ করে বিদেশে যায়। তবে বাস্তব হচ্ছে যে পার্বত্য চট্টগ্রাম দিনে দিনে তার রুপ হারাচ্ছে। পর্যটন ও বসতি বাড়ার সাথে পাহাড় কেটে বানানো হচ্ছে বাড়িঘর, হোটেল-রিসোর্ট। বাশ ও সেগুন গাছের গুড়ি ভর্তি সারি সারি ট্রাক তো নিজ চোখেই দেখলাম রাস্তায়। পাহাড় থেকে খাদ্যাভাবে জনপদে নেমে আসে হাতির পাল এমন শুনেছি, কাপ্তাই লেকে আর আগের মত মাছ পাওয়া যায় না। হায় কে কার খবর রাখে।
সত্যিই এগুলো খবর হয় না। খবর হয় না যখন সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদীরা পাহাড়ি-বাঙ্গালী নির্বিশেষে চাঁদা তোলে বা অপহরণ করে, পাহাড়ি-বাঙ্গালী উভয়ের উপর হামলা করে। খবর হয়না যখন পাহাড়িদের জীবন, বসতি নিয়ে রাজনীতি করে জ্ঞানপাপী মানুষ আর তাদের এতটুকু মাথা গোঁজার ঠাই কেড়ে নেয়। খবর হয় না যখন আইন শৃঙ্খলা বাহিনী (বিশেষ করে পুলিশ) টাকার জন্যে নিপীড়িতের পাশে না এসে নির্যাতনকারীর পাশে এসে দাড়ায়। খবর হয় না যখন কল্পনা চাকমারা হারিয়ে যায়। খবর হয়না যখন খাগড়াছড়ির ১৯২টি কাজের বিনিময়ে খাদ্য প্রকল্পের শতভাগ টাকা মেরে দেয় রাজনৈতিক নেতারা যার মধ্যে অধিকাংশই পাহাড়ি। নিজেদের রক্ত নিজেরাই খেয়ে কুমীর বনে যায় (উদাহরণ: ইউনিপের নামে ৩০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে উদ্দীপন চাকমা )।
খবর হয় যখন দেয়ালে পিঠ ঠেকা মানুষ রুখে দাড়ায় এবং নিজের হাতে আইন তুলে নেয়। খবর হয় যখন শান্তিরক্ষার দায়িত্বপ্রাপ্ত বাহিনী দুপক্ষের মধ্যে এসে দাড়ায় এবং লোক মারা যায়। খবর হয় যখন পাহাড়ি দুইপক্ষ নিজেদের রক্তে গা ভাসায় আর নিরীহ জনগনকে ত্রাসের রাজ্যে রাখে। খবর হয় যখন আদিবাসী নামকরণ নিয়ে সরকারের মনোভাব প্রতিষ্ঠায় অদ্ভুত সব যুক্তি দেখানো হয়।
এসবের মাঝে একটি জিনিষ আমরা ভুলে যাচ্ছি - তিন পার্বত্য জেলার ১৪টি উপজাতির মনে কি খেলা করছে। এই মূহুর্তে তারা আর বাঙ্গালী দের বিশ্বাস করছে না, এই মূহুর্তে তারা নিজেদের দেশের ভেতরে অবাঞ্ছিত ভাবছে। সংবিধানে আদিবাসীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যে ডাকা বিক্ষোভে দুর্গম অঞ্চল থেকে চার ঘন্টা হেটে বর্ষীয়ান পাহাড়ি যোগ দিয়েছেন। তাদের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। এরপর হয়ত শান্তিচুক্তি রদ হয়ে আবার সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু হবে। কিন্তু এমন তো কথা ছিল না।
১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু পার্বত্য চট্টগ্রামে গিয়েছিলেন এবং মানবেন্দ্র লারমা স্বায়ত্তশাসন সহ বিভিন্ন উপজাতির দাবী তুলে ধরলে তিনি বলেন "তোরা সব বাঙ্গালী হইয়া যা"। ১৯৭৩ সালে সংসদের কাছে তার আহ্বানেও সাড়া দেওয়া হয় না। ফলশ্রুতিতে ১৯৭৪ সালে এম এন লারমা জনসংহতি সমিতির একটি সশস্ত্র গ্রুপ গঠন করেন, যা পরে শান্তিবাহিনী নামে পরিচিতি লাভ করে এবং পরে তারা অত্র অঞ্চলে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। ১৯৮১ সালে শান্তিবাহিনী দ্বিধাবিভক্ত হয় এবং ১৯৮৩ সালে বিপক্ষ দলের হাতে মানবেন্দ্র মারা যান। তবে তার অনুজ সন্তু লারমার নেতৃত্বে শান্তিবাহিনী গেরিলা যুদ্ধ অব্যহত রাখে। জিয়া এবং এরশাদ সরকারের আমলে শান্তিবাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযান চালায় সেনাবাহিনী এবং আশির দশকে উপজাতিদের উপর নির্লজ্জ্ব হত্যাকান্ড চালানো হয়। কোন সরকারের আমলেই এইসব হত্যাকান্ডের বিচার হয়নি। এছাড়া গ্রেপ্তার, নির্যাতন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, মানবাধিকার কর্মীদের হেনস্থা করা, যৌন নিপীড়ন প্রভৃতি মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়েছে নিয়মিতই। সাথে সাথে শান্তিবাহিনীরও অনুরূপ মানবাধিকার লংঘনের মূল্য দিতে হয়েছে পাহাড়ি-বাঙ্গালি উভয়কেই।
এরশাদের আমলে ১৯৮২-৮৩ সালে ২৬ হাজারের ও বেশী ছিন্নমূল ও ভাঙ্গনের ফলে উদ্বাস্তু পরিবারকে চট্টগ্রামের তিন পার্বত্য জেলায় পুনর্বাসনের জন্যে নিয়ে আসা হয়। তাদের মধ্যে প্রায় ২০ হাজারেরও বেশি পরিবারের স্থান হয় খাগড়াছড়িতে। আশির দশকের শেষের দিকে তাদের উপর ‘শান্তিবাহিনী’র হামলার ঘটনা বাড়তে থাকলে সেখান থেকে লোকজনকে সেনাক্যাম্প সংলগ্ন ৮১টি গুচ্ছগ্রামে স্থানান্তর করা হয়।
১৯৯৭ সালের ২রা ডিসেম্বর সম্পাদিত আওয়ামী লীগের শান্তিচুক্তি নিশ্চয়ই এই অবস্থা থেকে উত্তরণের একটি বলিষ্ঠ পদক্ষেপ। এ অবস্থায় আনতে কি পরিমান রাজনৈতিক গণসংযোগ করতে হয়েছে তা অনুমেয়। শান্তিচুক্তির পর তিন পর্বে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে সেনা প্রত্যাহার করা হয়েছে। আশির দশকের তুলনায় বর্তমানে অর্ধেকের কম সেনাক্যাম্প পার্বত্য চট্টগ্রামে রয়েছে। বর্তমানে যা হচ্ছে তাতে উল্টোস্রোত দেখা যাচ্ছে আর সরকারেরও মাথা ব্যাথা নেই।
শান্তিচুক্তি অনুযায়ী ১৯৯৮ সালের ফেব্রুয়ারীতে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) এর প্রায় দুই হাজার সশস্ত্র সদস্য স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে। তবে প্রসিত বিকাশ খীসার নেতৃত্বে একটি দল চুক্তি মানতে অপারগতা প্রকাশ করে এবং পূর্ণ স্বায়ত্বশাসনের দাবীতে ১৯৯৮ সালে গঠন করে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)। এই বিভাজন অবশ্য জেএসএসকে দমাতে পারেনি এবং তারা দাপটেই কার্যক্রম চালিয়েছে খাগড়াছড়ি অঞ্চল ছাড়া যেখানে বেশীরভাগ অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ ছিল ইউপিডিএফ এর। কিন্তু ২০০৬ সালের জরুরী সরকারের সময় সন্তু লারমার একক নেতৃত্ব থেকে দল বাঁচাতে সংস্কারের দাবীতে জনসংহতি থেকে বেরিয়ে গিয়ে নতুন আরেকটি রাজনৈতিক দল গঠন করে বেশ কিছু প্রতিবাদী নেতারা। এদের মধ্যে আছেন সন্তু লারমার ঘনিষ্ট সহকর্মী রূপায়ন দেওয়ান, তাতিন্দ্র লাল চাকমা পেলে, সুধাসিন্ধু খীসা, চন্দ্রশেখর চাকমা,শক্তিমান চাকমা প্রমূখ এবং তারা দলের নাম দেন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (এমএনলারমা)। এই বিভাজনে লাভ হয় ইউপিডিএফ এর যার নমুনা দেখা যাচ্ছে এবারকার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে - অনেক অঞ্চলে ইউপিডিএফ সমর্থিত প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছে।
বর্তমানে গতানুগতিক রাজনৈতিক দলগুলোর জনপ্রিয়তা একেবারে তলানীতে এসে ঠেকেছে। বিএনপি বরাবরই সেটেলার ভোটব্যাংক ভিত্তিক একটি দল, কাজেই ভবিষ্যতে তাদের ভোট পাবার চান্স কম। ভাড়াটে পাহাড়ী নেতা দিয়ে তারা এতদিন পার পেলেও যেহেতু তারা শান্তিচুক্তি ও সেনা প্রত্যাহারের বিরোধীতা (আওয়ামী লীগ একটি ব্রিগেড এবং ৩৫টি অস্থায়ী ক্যাম্প প্রত্যাহার করে ২০০৯ সালে এবং এর বিরুদ্ধে হাইকোর্টে পিটিশন করে তারা) করেছে সব সময়, তাদের আর গ্রহণযোগ্যতা নেই।
আওয়ামী লীগের গ্রহণযোগ্যতা এখন বিশ্বাস ঘাতকের পর্যায়ে। ২০০৮ ও ২০০৯ সালে পররাষ্ট্র মন্ত্রী দীপুমনি আদিবাসী দিবসে আদিবাসীদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে সংহতি প্রকাশ করেন। আর সেই তিনিই এবছর থেকে তিন পার্বত্য জেলার অধিবাসীদের আদিবাসী সম্বোধন করতে বারণ করেছেন এবং বলেছেন বাংলাদেশে কোন আদিবাসী নেই; বিভিন্ন উপজাতি আছে। তার এই অবস্থান পরিবর্তন বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনের ফলশ্রুতিতে হয়েছে বলে রিপোর্টে বলা হয়েছে। আদিবাসী নিয়ে দেশী-বিদেশী যে বৃহত্তর রাজনীতি চলছে তা সামাল দিতেই যদি সরকারের এই পদক্ষেপ হয় তাহলে বলতে হয় এই পদক্ষেপটি চতুরতার সাথে নেয়া হয়নি। এই একটি ইস্যুকে পুজি করে পাহাড়ি বিচ্ছিন্নতাবাদীরা অনেককে তাদের চেতনায় সম্পৃক্ত করতে পেরেছে। পার্বত্য অঞ্চলে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ব্যর্থতা সম্পর্কে নতুন করে বলার নেই। জেলা-উপজেলা পর্যায়ের সকল নেতারাই ঠিকাদারিতে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। আগে উন্নয়ন কার্যক্রমের ৭০ ভাগ লোক পেত এখন পুরোটাই যায় তাদের পেটে। পাহাড়িরা তাদের কেন বিশ্বাস করবে?
পার্বত্য উপজেলাগুলোতে প্রাথমিক শিক্ষার হার ভাল। সরকারী স্কুল ছাড়াও ব্র্যাক ও অন্যান্য বেসরকারী স্কুল রয়েছে। আমি প্রচুর ছেলেমেয়েকে দেখেছি স্কুল ড্রেস পড়ে রাস্তায় হাটতে। কিন্তু উচ্চশিক্ষার হার কম - হাতে গোনা গুটিকয়েক কলেজ এবং কোন বিশ্ববিদ্যালয় নেই। এই অঞ্চলে নেই কোন বিশ্ববিদ্যালয় - প্রধানমন্ত্রী হাসিনা একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘোষণা দিলেও পাহাড়িদের একপক্ষ এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। ফলে সেটি এখনও পরিকল্পনা পর্যায়েই আছে। পাহাড়িদের উচ্চশিক্ষার জন্যে তাই বাইরে যেতে হয়। আর উচ্চ শিক্ষিতদের চাকুরির উপায় কি? নেই কোন কলকারখানা, উল্লেখযোগ্য বেসরকারী বাণিজ্য। তাই একমাত্র কাজ মিলে এনজিও বা সাহায্য সংস্থার অফিসে।
এরপর রয়েছে সাহায্য সংস্থা/এনজিওর দৌরাত্ম্য। এই সব সংস্থায় উচ্চশিক্ষিত ইউপিডিএফ এর কর্মীরা অনায়াসে কাজ পাচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে ইএনডিপির ২০১৩ পর্যন্ত প্রকল্প রয়েছে হাজার কোটি টাকার। তাদের স্বাস্থ্য কর্মসূচি গুলো খুবই উপযোগী (এবং অকার্যকর সরকারী স্বাস্থ্য সেবার বিকল্প) কিন্তু উন্নয়ন কার্যক্রমের আওতায় বিভিন্ন কমিউনিটিকে তারা ৪ লাখ করে অনুদান দিচ্ছে যা রিপোর্ট মোতাবেক ইউপিডিএফ এর কর্মীরা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কাজে লাগাচ্ছে। ২০০৭ সাল থেকে ইউপিডিএফ সকল মাইক্রোক্রেডিট কার্যক্রম বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছে ফলে কিছু পাহাড়ি কাজ কর্ম বাদ দিয়ে দানে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছে এবং তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে লাগানো যাচ্ছে।
অনেক এনজিওদের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ। মানবাধিকারের ইস্যুকে পুঁজি করে সব দোষ সরকারের ঘাড়ে, শান্তিচুক্তির উপর অথবা সুযোগ বুঝে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দিকে চাপিয়ে দিলেই কি সমস্যার সমাধান হয়ে যায়? পাহাড়ের সমস্যার শতভাগ বহিরাগত বা সেনাদের দ্বারা উদ্ভুত নয় আর পাহাড়ের রাজনীতিতেও বহিরাগতদের নিয়ন্ত্রণে নেই। সমীকরণটা ভিন্ন- দুর্নীতিতে পাহাড়ি নেতারাও পিছিয়ে নেই আর ইউপিডিএফ-জেএসএস এর সংঘাত অনেক ক্ষেত্রে পরিস্থিতির অবনতি ঘটাচ্ছে। যেখানে ভূমি, রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও শিক্ষার দিক থেকে বহিরাগতরা পিছিয়ে, সেখানে কিছুসংখ্যক ভূমি সন্ত্রাসীদের জন্যে এসব দরিদ্র মানুষকে ঢালাওভাবে রাজনৈতিক গিনিপিগ বানানো হচ্ছে। এটি হচ্ছে বিভাজনের রাজনীতি যা খেলছে সব পক্ষই।
এদেশ পাহাড়ি-বাঙ্গালি সবার। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিচ্ছিন্ন কোনো জনপদ নয় - একে গড়ে তুলতে হবে পাহাড়ি-বাঙ্গালি মিলেই। পাহাড়ি-বাঙ্গালি বা জাতি-উপজাতি কেন্দ্রিক বৈষম্য থাকা চলবে না। ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি করতে হবে, উচ্চশিক্ষা, কর্মসংস্থান, উন্নয়ন ইত্যাদি চালিয়ে যেতে হবে। পাহাড়িদের ন্যায়সঙ্গত দাবির প্রতি শ্রদ্ধা শান্তির নিশ্চয়তা দিতে পারে। অথচ সেটা করার জন্যে একসাথে কাজ করার পূর্বশর্ত - পরস্পর বিশ্বাসটুকু হারিয়ে যাচ্ছে।
বর্তমান পরিস্থিতি খুবই নাজুক পরিস্থিতি। পাহাড়িরা শান্তি চুক্তিতে একটি ভুয়া প্রতিশ্রুতি ভাবছে। প্রতিনিয়তই নানা গুজব মানুষকে বিচলিত ও আতঙ্কিত করে। স্থানীয় সূত্রমতে আগামী যে কোন নির্বাচনে এলাকায় একচ্ছত্রভাবে পাহাড়িদের জয় হবে, ইতোমধ্যেই যার আলামত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে পাওয়া গিয়েছে। এখানে পুরো ১৯৭১ এর ফর্মুলার সাথে মিল পাওয়া যাচ্ছে। বহিরাগতদের অত্যাচার, মানবাধিকার লঙ্ঘন, পাহাড়িদের অধিকার আদায়ের লড়াই, আর নিজভূমে মেজরিটি (যেমন ১৯৭০ এর নির্বাচনে পশ্চিম পাকিস্তানী কোন দল জিততে পারেনি এ বঙ্গে) এই স্ক্রিপ্টটি মিলে যাচ্ছে। এর সমাধান বা তাদের আপন করার কোন পরিকল্পনা নেই সরকারের বা অন্যান্য রাজনৈতিক দলের। তারা আদিবাসী নামকরণ ইস্যুতে তাদের দুরে ঠেলে দিচ্ছে। তাদের ধারনা সেনাবাহিনীর বুলেটের নীচেই সব ঠিক থাকবে - এভাবে সেনাবাহিনীকেও সংঘর্ষের দিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। এর পরিণতি কি হবে তা আমরা জানি।
ফলে পাহাড়িরা এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের সাথে আমাদের দূরত্ব তৈরি হচ্ছে। এই দূরত্ব ঘুচাতে এবং পাহাড়িদের অধিকার নিশ্চিত করতে আমরা সাধারণ মানুষেরা কি করতে পারি?
গুগল অনুবাদ, হাস্যকর নয় মোটেই
বিশ্বের ৬০ কোটি ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের ২৭.৩% হচ্ছে ইংরেজী ভাষী (সূত্র) আর ২২.৬% হচ্ছে চৈনিক ভাষী। অন্যান্য ভাষাভাষীরা অনেক পিছিয়ে (স্প্যানিশ ৭.৮%, জাপানী ৫%, পর্তুগীজ ৪.৩%, জার্মান ৩.৮%, আরবী ৩.৩%) - বাংলা, হিন্দিভাষী বিশাল জনগোষ্ঠী ইন্টারনেটে তাদের ভাষায় কথা বলে তুলনামূলকভাবে কম। রয়েছে আরও অসামঞ্জস্যতা - ৩১৩ বিলিয়ন ওয়েবপেইজের ৬৮.৪% ইংরেজী ভাষায় তার পরে মাত্র ৫.৯% জাপানি ভাষায় আর ৫.৮% জার্মান ভাষায় (সূত্র)। ২২.৬% চৈনিক ভাষী ব্যবহারকারী ওয়েব কন্টেন্টের মাত্র ৩.৯% তৈরি করে।এই সব পরিসংখ্যান একটি কথা বলে - আমরা বিশ্বকে জানি বা দেখি ইংরেজী ভাষীদের দৃষ্টিতে - হবেই না কেন বিশ্বের ৬২.৫৫% সংবাদপত্র/ম্যাগাজিন, ২২% বই, ৪৫% জার্নাল, ৩৫% ছবি ও ভিডিও ইংরেজী ভাষায়। কিন্তু এটি একে অপরকে বোঝার ক্ষেত্রে সমস্যার সৃষ্টি করছে নানা স্টেরিওটাইপ তৈরির মাধ্যমে। আমরা ব্রাজিলের কোন ব্লগারের বক্তব্য জানতে পারব না যদি না কেউ অনুবাদ করে দেয় তার ব্লগ। তেমনি বাংলা ব্লগারের লেখা একজন ব্রাজিলিয় পড়তে পারে না।
বিশ্ব সমাজকে এগিয়ে নিতে গেলে তাই অনুবাদ একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। অনুবাদের কার্যকরী টুলটি সেক্ষেত্রে একটি জরুরী উদ্ভাবন। কিন্তু বাস্তবিক ক্ষেত্রে মেশিন ট্রান্সলেশন কি পর্যায়ে আছে? এক ক্লিকে অনুবাদের ব্যবস্থাটি এখনও নিখুঁত নয়। তার চেয়ে বড় কথা হল মেশিন সব অনুবাদ করে দেবে এই ধারনাটি কম্পিউটার কবিতা লিখবে এরই সমার্থক।
অনুবাদ একটি শিল্প। একজন অনুবাদকের দুই ভাষা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে ধারণা থাকা লাগে, পাঠকদের কথা চিন্তা করতে হয় - তবেই সে সঠিক অর্থ ফুটিয়ে তুলতে পারে। আমাদের অনেকেরই জানা নেই যে অনুবাদ একটি ১৮-২০ বিলিয়ন ডলার ইন্ডাস্ট্রি। বিশ্বাস হচ্ছে না? ছবির সাবটাইটেল একটি বড় অনুবাদের জায়গা। এরপর ধরুন ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের অনেক প্রকাশনা নিয়ম অনুযায়ী সদস্য দেশগুলোর ২৩টি ভাষায় অনূদিত হয়। অনেক পেশাদারী অনুবাদের প্রতিষ্ঠান রয়েছে এসব ক্ষেত্রে কর্মরত। তাদের কাজের সুবিধার জন্যে নানা সফট্ওয়্যারের উদ্ভব হয়েছে - যেমন প্রোপাইটরী সিসট্রান, ট্রাডোস ইত্যাদি - বা ওপেন সোর্স - যেমন লিঙ্গোটেক, লুসি সফটওয়্যার, আপেরিটিয়াম ইত্যাদি। এইসব সফট্ওয়্যারের মূল মন্ত্র হচ্ছে একই বাক্যের অনুবাদ যাতে দুইবার না করতে হয়। সেজন্যে তারা সাহায্য নেয় ট্রান্সলেশন মেমোরির। মেশিন অনুবাদে যেই ভাষায় সবচেয়ে বেশী কন্টেন্ট পাওয়া যায় সেই ভাষায় অনুবাদ সবচেয়ে বোধগম্যভাবে হয়। কিন্তু এইসব ট্রান্সলেশন মেমোরি বিনামূল্যের নয় - বাজারে বিক্রি হয়। তবে যেই সফ্টওয়্যার ব্যবহার করা হোক মানুষ কর্তৃক মান নিয়ন্ত্রণই সফল বাণিজ্যিক অনুবাদের চাবিকাঠী।
অনুবাদকে তার ব্যয়বহুল ইন্ডাস্ট্রির কবল থেকে মুক্ত করে সার্বজনীন করার লক্ষ্যে ওপেন ট্রান্সলেশন ধারনার উদ্ভব ঘটে। এখানে ক্রাউড সোর্সিং এবং স্বেচ্ছাসেবী অনুবাদের মাধ্যমে মেশিন ট্রান্সলেশন টুলস ব্যবহার করা হয়। গুগলের ট্রান্সলেটর টুলকিট এমন একটি ওপেন ট্রান্সলেশন টুল যেখানে স্বেচ্ছাসেবীরা নিত্য নতুন অনুবাদ সৃষ্টি করে চলেছে এবং সবার জন্যে উন্মুক্ত ট্রান্সলেশন মেমোরি রিপোজিটরি তৈরি করছে।
টেড তাদের ভিডিও অনুবাদের জন্যে অর্ধ মিলিয়ন ডলার খরচ করেছে। তাদের পেশাদারী সংস্থা দিয়ে করা কিছু বাংলা অনুবাদ দেখে যারপরনাই বিরক্ত হয়েছিলাম এবং তাদের একজনকে বলেছিলাম গ্লোবাল ভয়েসেস বাংলা সংস্করণে স্বেচ্ছাসেবীদের দ্বারা এর থেকে অনেক উঁচু মানের কাজ হয়। তাদের সমস্যা ছিল কাজটি বুঝে নিয়েছিল অবাঙ্গালী কেউ - তাই যা ইচ্ছা বুঝিয়ে দিয়েছিল অনুবাদ সংস্থা। টেড এর পরে কমিউনিটি বেইজড ওপেন ট্রান্সলেশন মডেল চালু করে যা সাফল্য পায়।
বাংলা বা তামিলের মত বহু ব্যবহৃত ভাষার জন্যে কার্যকরী মেশিন ট্রান্সলেশন টুলস এতদিন তৈরি না হওয়ার পেছনে রয়েছে পর্যাপ্ত উদ্যোগ ও অর্থের অভাব - অনুবাদক ও অন্কুর এর মত গুটিকয়েক প্রকল্প বেশি দুর আগাতে পারেনি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে।
এছাড়াও রয়েছে প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ - অনুবাদ কিন্তু শুধু শব্দের প্রতিস্থাপন নয় - রয়েছে ব্যাকরণ, বাক্যের গঠন, রুপক, বাগধারা ইত্যাদির প্রভাব। যেমন ধরুন দক্ষিণ এশীয় ভাষাগুলোতে বাক্যগুলো (subject-object-verb * আমি-ভাত-খাই) নিয়মে গঠিত হয় যেখানে ইংরেজীতে বাক্য গঠিত হয় (subject-verb-object * I eat rice) এই নিয়মে। এছাড়াও পর্যাপ্ত উন্মুক্ত কন্টেন্টের অভাব একটি বড় কারন ছিল। বিষয়টা ব্যাখ্যা করি। একটি মেশিন ট্রান্সলেশন টুলস তিনটি নিয়ম মেনে কাজ করতে পারে:
ক) রুলস বেইজড (ব্যাকরণের নিয়ম আর অভিধান)
খ) স্ট্যাটিস্টিকাল (দ্বিভাষী ট্রান্সলেশন মেমোরি বা করপাস নিয়ে কাজ করে) আর
গ) হাইব্রিড (উপরের দুয়ের সংমিশ্রণ)
গুগল প্রথম দিকে রুলস বেইজড প্রক্রিয়ায় অনুবাদ করলেও ২০০৭ সাল থেকে স্ট্যাটিসটিক্যাল মেথড চালু করে। এই প্রক্রিয়ায় বিশালাকার টেক্সট কর্পোরা এর দরকার হয়। এটি কার্যকরী করতে ন্যুনতম ২০ লাখ শব্দ নিয়ে কাজ করতে হয় এবং অনেক কম্পিউটিং শক্তি লাগে। এই প্রক্রিয়ার সুবিধা হল যে এটি অনুবাদকারীকে সুযোগ দেয় বেশ কিছু কাছাকাছি শব্দ থেকে বেছে নিতে।
এই পদ্ধতিতে আরেকটি সুযোগ আছে - ক্রমাগত অনুবাদের মান বৃদ্ধি করা। গুগল ব্লগ অনুযায়ী আপনি ভুল অনুবাদকে ঠিক করতে পারবেন অনায়াসেই এবং গুগল সেটি মনে রাখবে এবং পরবর্তী বার সঠিক অনুবাদ উপস্থাপন করবে।
কাজেই আমি মনে করি গুগল ট্রান্সলেইটে বাংলা ভাষাভাষীদের জন্যে একটি যুগান্তকারী টুল। এটি এযাবৎকালে পাওয়া যাওয়া একমাত্র টুল অনুবাদক অনলাইনের চেয়ে বহুগুণে সমৃদ্ধ। আর এখন বাংলা ভাষা থেকে বিশ্বের ৬২টি ভাষায় (ভুল হলেও) অনুবাদ সম্ভব - এর শক্তি নিশ্চয়ই অনুমেয়। আসুন ওপেন ট্রান্সলেশন ধারনা আপন করে গুগল ট্রান্সলেট এর ভুলগুলো নিজেরা শুদ্ধ করে দেই ভবিষ্যৎ কল্যাণের জন্যে অথবা গুগল ট্রান্সলেটর টুলকিট ব্যবহার করে গুগলের ট্রান্সলেশন মেমরিকে সমৃদ্ধ করি।
সরষের ভেতরেই ভূতের অবস্থান
ভূত তাড়ানোর কাজে সরষের ব্যবহার পুরনো কথা। এখন সরষের ভেতরেই ভূতের অবস্থান
নিয়ে অনেক কথা শোনা যায়। অপরাধ দমন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা করা যাদের
দায়িত্ব, সেই পুলিশ বাহিনীর ভেতরেই এখন অপরাধ বাড়ছে বলে গতকালের পত্রিকায়
খবর বেরিয়েছে। কেন দেশে অপরাধপ্রবণতা লাগামহীন হয়ে পড়েছে, এ ঘটনা থেকে সেটা
কিছুটা হলেও অনুমান করা যায়।
গত ১৪ মাসেই বিভিন্ন ইউনিটে কর্মরত প্রায় ১৭ হাজার পুলিশ সদস্যকে বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকায় শাস্তি দেয়া হয়েছে। চলতি বছরের ৩ মাসেই প্রায় আড়াই হাজার পুলিশ সদস্য ও কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া উদ্বেগজনকই বটে। কনস্টেবল থেকে এসআই পর্যন্ত ১২শ’র বেশি পুলিশ সদস্যের লঘুদণ্ড হয়েছে। ১৫ জনকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। আর গত বছর চাকরিচ্যুত হয়েছে প্রায় ৮০ জন। এছাড়া পুলিশের ইন্সপেক্টর পদমর্যাদার ৪০ জনকে লঘুদণ্ড আর ৪ জনকে গুরুদণ্ড দেয়া হয়েছে। এএসপি থেকে ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের মোট ১৪ জনও শাস্তি পেয়েছে। এর মধ্যে ১০ জন লঘুদণ্ড আর ৪ জনকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। আরও প্রায় ১ হাজারের বেশি অভিযোগ বিভাগীয় বিচার প্রক্রিয়ায় আছে বলে জানা গেছে। এই সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। তবে অনেকের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেলেও প্রমাণের অভাবে অভিযুক্তরা ছাড়া পেয়ে যায়। বাস্তব কারণেই পুলিশের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে অনেকেই সাহসী হয় না। হয়রানির আশঙ্কায় অনেক অভিযোগই প্রমাণিত হয় না। তাছাড়া নানা ধরনের তদবির তো আছেই। এর মধ্যে রাজনৈতিক তদবিরই সবচেয়ে বেশি কার্যকর বলে জানা যায়। বিশেষ করে যারা রাজনৈতিক কারণে চাকরি পেয়েছেন, এক্ষেত্রে তাদের খুঁটির জোরই বেশি। আর ঘুষ ও দীর্ঘদিন এক জায়গায় চাকরি করার সুবাদে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, প্রভাবশালী ও সংসদ সদস্যের হস্তক্ষেপও কম নয়। ফলে পুলিশ বাহিনীতে অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধির তুলনায় প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ সামান্যই।
শুধু পুলিশের মধ্যে কেন—কোথায় অনিয়ম-দুর্নীতি নেই সেটা কেউই জোর দিয়ে বলতে পারবে না। যারা পুলিশ প্রশাসন নিয়ন্ত্রণ করে তাদের সম্পর্কেও অনেক কথাই মুখে মুখে আলোচিত হয়। গতকালের একটি কাগজে আবারও এক সংসদ সদস্যের অনিয়ম ও বেআইনি কাজের কথা ছাপা হয়েছে। রাজশাহী অঞ্চলের সেই সংসদ সদস্য অনেককে টপকে এবারও তার সদস্যপদ ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছেন, যার বিরুদ্ধে আইন ভঙ্গের অভিযোগ মোটেই নতুন নয়। তার মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান এনা প্রপার্টিজ রাজধানীর উত্তরায় রাজউকের উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্প ও রাজশাহী সিটি সেন্টার নির্মাণ কাজে পুরোপুরি ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। নির্ধারিত সময়ে ৮৭ শতাংশ কাজের স্থলে মাত্র এক দশমিক ১৫ শতাংশ কাজ করায় শেষ পর্যন্ত উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্প থেকে সংসদ সদস্যের প্রতিষ্ঠানকে বাদ দিতে বাধ্য হয়েছে রাজউক। আর ৩১ মার্চের মধ্যে রজশাহী সিটি সেন্টার নির্মাণের কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এ পর্যন্ত মাত্র ৩০ শতাংশ কাজ হয়েছে। এই কাজের জন্য চার বছর আগেই এক কোটি ২০ লাখ টাকা জামানত দেয়ার কথা থাকলেও এ পর্যন্ত সে টাকা না দিয়েই নির্মাণাধীন ভবনের অংশবিশেষ বিক্রি করে দেয়ার অভিযোগও মানুষের মুখে মুখে। সংসদ সদস্যের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান এ দুটি কাজ পেয়েছে আইন লঙ্ঘন করে।
অথচ গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের (আরপিও) ১২ ধারায় সুস্পষ্টভাবে বলা আছে, কোনো সংসদ সদস্য সরকারের সঙ্গে ব্যবসা করতে পারবে না। রাষ্ট্রের আইন প্রণেতা যারা তারাই যখন এমন বেআইনি কাজে লিপ্ত সেখানে আইন রক্ষায় নিয়োজিতরা কেন হাত গুটিয়ে থাকবে? তাই সমাজের অন্যান্য ক্ষেত্রের মতো পুলিশেও অপরাধপ্রবণতা বাড়ছে। এর শেষ কোথায় সেটাই এখন দেখার বিষয়।
গত ১৪ মাসেই বিভিন্ন ইউনিটে কর্মরত প্রায় ১৭ হাজার পুলিশ সদস্যকে বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকায় শাস্তি দেয়া হয়েছে। চলতি বছরের ৩ মাসেই প্রায় আড়াই হাজার পুলিশ সদস্য ও কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া উদ্বেগজনকই বটে। কনস্টেবল থেকে এসআই পর্যন্ত ১২শ’র বেশি পুলিশ সদস্যের লঘুদণ্ড হয়েছে। ১৫ জনকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। আর গত বছর চাকরিচ্যুত হয়েছে প্রায় ৮০ জন। এছাড়া পুলিশের ইন্সপেক্টর পদমর্যাদার ৪০ জনকে লঘুদণ্ড আর ৪ জনকে গুরুদণ্ড দেয়া হয়েছে। এএসপি থেকে ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের মোট ১৪ জনও শাস্তি পেয়েছে। এর মধ্যে ১০ জন লঘুদণ্ড আর ৪ জনকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। আরও প্রায় ১ হাজারের বেশি অভিযোগ বিভাগীয় বিচার প্রক্রিয়ায় আছে বলে জানা গেছে। এই সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। তবে অনেকের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেলেও প্রমাণের অভাবে অভিযুক্তরা ছাড়া পেয়ে যায়। বাস্তব কারণেই পুলিশের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে অনেকেই সাহসী হয় না। হয়রানির আশঙ্কায় অনেক অভিযোগই প্রমাণিত হয় না। তাছাড়া নানা ধরনের তদবির তো আছেই। এর মধ্যে রাজনৈতিক তদবিরই সবচেয়ে বেশি কার্যকর বলে জানা যায়। বিশেষ করে যারা রাজনৈতিক কারণে চাকরি পেয়েছেন, এক্ষেত্রে তাদের খুঁটির জোরই বেশি। আর ঘুষ ও দীর্ঘদিন এক জায়গায় চাকরি করার সুবাদে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, প্রভাবশালী ও সংসদ সদস্যের হস্তক্ষেপও কম নয়। ফলে পুলিশ বাহিনীতে অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধির তুলনায় প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ সামান্যই।
শুধু পুলিশের মধ্যে কেন—কোথায় অনিয়ম-দুর্নীতি নেই সেটা কেউই জোর দিয়ে বলতে পারবে না। যারা পুলিশ প্রশাসন নিয়ন্ত্রণ করে তাদের সম্পর্কেও অনেক কথাই মুখে মুখে আলোচিত হয়। গতকালের একটি কাগজে আবারও এক সংসদ সদস্যের অনিয়ম ও বেআইনি কাজের কথা ছাপা হয়েছে। রাজশাহী অঞ্চলের সেই সংসদ সদস্য অনেককে টপকে এবারও তার সদস্যপদ ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছেন, যার বিরুদ্ধে আইন ভঙ্গের অভিযোগ মোটেই নতুন নয়। তার মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান এনা প্রপার্টিজ রাজধানীর উত্তরায় রাজউকের উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্প ও রাজশাহী সিটি সেন্টার নির্মাণ কাজে পুরোপুরি ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। নির্ধারিত সময়ে ৮৭ শতাংশ কাজের স্থলে মাত্র এক দশমিক ১৫ শতাংশ কাজ করায় শেষ পর্যন্ত উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্প থেকে সংসদ সদস্যের প্রতিষ্ঠানকে বাদ দিতে বাধ্য হয়েছে রাজউক। আর ৩১ মার্চের মধ্যে রজশাহী সিটি সেন্টার নির্মাণের কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এ পর্যন্ত মাত্র ৩০ শতাংশ কাজ হয়েছে। এই কাজের জন্য চার বছর আগেই এক কোটি ২০ লাখ টাকা জামানত দেয়ার কথা থাকলেও এ পর্যন্ত সে টাকা না দিয়েই নির্মাণাধীন ভবনের অংশবিশেষ বিক্রি করে দেয়ার অভিযোগও মানুষের মুখে মুখে। সংসদ সদস্যের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান এ দুটি কাজ পেয়েছে আইন লঙ্ঘন করে।
অথচ গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের (আরপিও) ১২ ধারায় সুস্পষ্টভাবে বলা আছে, কোনো সংসদ সদস্য সরকারের সঙ্গে ব্যবসা করতে পারবে না। রাষ্ট্রের আইন প্রণেতা যারা তারাই যখন এমন বেআইনি কাজে লিপ্ত সেখানে আইন রক্ষায় নিয়োজিতরা কেন হাত গুটিয়ে থাকবে? তাই সমাজের অন্যান্য ক্ষেত্রের মতো পুলিশেও অপরাধপ্রবণতা বাড়ছে। এর শেষ কোথায় সেটাই এখন দেখার বিষয়।
কেউ রক্ত দেয় কারো রক্ত নেয়
শেখ মুজিবকে আমি একটু আলাদা দৃষ্টিতে দেখি। তার জীবনটি সত্যিই অনন্য। তার
সাফল্য এবং ভুল-ভ্রান্তি তথা ব্যর্থতা দুটি থেকেই আমরা শিক্ষা নিতে পারি।
তার ভালো গুণগুলো অনুসরণ করতে পারি। আর যে যে কারণে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন
সেগুলো বর্জন করতে পারি। সুতরাং শেখ মুজিব আমাদের জন্য সত্যিই দুটি পথই
রেখে গেছেন। একটি জাতির জন্য তার জীবন তো দিশারীর ভূমিকা পালন করতে পারত।
কিন্তু শেখ মুজিবের একান্ত অনুসারীরা তো দূরের কথা, এমনকি তার সন্তানরাই তার জীবন থেকে কোনো শিক্ষা নিয়েছেন বলে মনে হয় না। নিন্দুকরা বলে তারা শেখ মুবিবের ভুল নীতিগুলোকেই শক্তভাবে আঁকড়ে রেখেছেন এবং সদ্গুণাবলী, বিশেষত তার স্বদেশপ্রেম, বিশেষত পররাষ্ট্রনীতি, সরাসরি বর্জন করছেন। তার অনুসারীরা তাদের ব্যক্তিগত ও বংশগত স্বার্থসিদ্ধির জন্য শেখ মুজিবকে ব্যবহার করছেন, বাস্তবে শেখ মুজিবের প্রতি তাদের দায়িত্ববোধ তাদের মধ্যে আছে বলে মনে হয় না।
শেখ মুজিবের এমন করুণ পরিণতির কারণগুলো শেখ হাসিনার অবশ্যই জানা আছে। ওই সময়ে শেখ হাসিনার মতো বয়সী লাখ লাখ মানুষ এখনও বেঁচে আছেন। তারা শেখ মুজিবের সাড়ে তিন বছরের শাসনের প্রত্যক্ষদর্শী। শেখ মুজিব কেন কাদের কারণে এভাবে নিহত হলেন, সেটা জানার জন্য আমাদেরকে শেখ হাসিনা কিংবা অন্য কারো কাছ থেকে ছবক নিতে হবে না। আমরা সবাই তা দেখেছি। তাই শেখ হাসিনার এমন মন্তব্যে কেউ কোনোভাবেই সায় দেয়নি যে শেখ মুজিব দেশের জন্য ‘বুকের রক্ত দিয়েছেন’।
২৯ মার্চ বিআইডব্লিউটিসি’র নবনির্মিত যাত্রীবাহী জাহাজ ‘এমভি বাঙালি’র উদ্বোধন শেষে জাহাজে করে চাঁদপুর জেলার মতলব থানার মোহনপুর ঘাটে তিনি এ মন্তব্য করেন। এ ধরনের মন্তব্য আবেগতাড়িত কিংবা ইতিহাসকে ঘুরিয়ে দেয়ার অথবা বিকৃত করার ইচ্ছাপ্রসূত হতে পারে, এমনকি নতুন প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করা যেতে পারে। কিন্তু এর সঙ্গে বাস্তবের কোনো মিল নেই। এটাও নিরেট ইতিহাস বিকৃতির উদ্দেশ্যপ্রসূত হতে পারে।
শেখ মুজিবকে বিতর্কিত, ব্যর্থ তথা অপমানিত করার জন্য তার প্রতিপক্ষের ভূমিকা একেবারেই নগণ্য। তার আপনজনেরা (তার মৃত্যুর আগে ও পরে) তাকে বিতর্কিত করার জন্য মূল ভূমিকা পালন করেছিলেন। নিজ নিজ স্বার্থ বাগাতে এবং নিজেদের চুরি-চামারি থেকে রেহাই পেতে তারা চাটুকারের ভূমিকা পালন করে। তারা শেখ মুজিবকে অতিমাত্রায় ওপরে তুলতে গিয়ে এমনসব বেফাঁস ও অতিরঞ্জিত প্রশংসা এবং তাদের প্রতিপক্ষকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য এবং তাদের অবদানকে সরাসরি অস্বীকার করার উদ্দেশ্যে তাদের মনগড়া তথ্য জাতির কাছে উত্থাপন করার অপকৌশল অবলম্বন করে। এভাবে তারাই অকারণে শেখ মুজিবের প্রতিপক্ষ সৃষ্টি করেছেন, তাদেরকে সঠিক তথ্য প্রদানে বাধ্য করছেন। তাদেরকে শেখ মুজিবের দোষ-ত্রুটি-ছিদ্রান্বেষণ করতে প্ররোচিত করছেন। এমনকি এ নিবন্ধের অবতারণাও হতো না, যদি শেখ হাসিনা এমন মন্তব্য না করতেন যে, তিনি তার ‘বাবার মতো প্রয়োজনে বুকের রক্ত দেবেন’।
শেখ মুজিবকে যারা ডুবিয়েছে তাদের সবাই তারই অনুসারী, তার কাছ থেকে সুবিধাপ্রাপ্ত। আজকে যারা তার জন্য মায়াকান্না করে, তারাও এর বাইরে নয়। এরা শেখ মুজিবকে তাদের অবৈধ সম্পদ ও ক্ষমতাপ্রাপ্তির সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করেছে। ধ্বংসপ্রাপ্ত দেশকে না গড়ে তারা চুরি-চামারিতে লিপ্ত হয়। জনগণের জন্য আসা সম্পদ এরা নিজেদের পকেটে ঢোকায়। শেখ মুজিব নিজেই ক্ষোভে-দুঃখে প্রকাশ্যে বলেছিলেন : ‘আমি যেদিকে তাকাই শুধু চোর দেখি।’ ‘সবাই পায় সোনার খনি, আর আমি পেয়েছি চোরের খনি।’ দলীয় লোকদের প্রতি তার আচরণ প্রসঙ্গে অকপটে স্বীকার করেছেন। বলেছেন : খুন করে এসে ‘বঙ্গবন্ধু আমি খুন করেছি বললেও, আমি এদেরকে মাফ করেছি’।
এসব সার্টিফিকেট ও বক্তব্য শেখ মুজিবের। তাদের চুরি-চামারি, খুন-রাহাজানি, চোরাচালান এবং প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য চক্রান্তের কারণেই মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় শেখ মুজিবের আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা ধূলায় মিশে যায় । তাদের কারণেই তাদের জন্যই শেখ মুজিবের নির্মম মৃত্যু হয়। তার মৃত্যুর পর তার কাছ থেকে সার্বিকভাবে প্রাপ্ত সুবিধাভোগী সহযোগীদের মাতম করতে পাওয়া যায়নি। তিনি যদি দেশের জন্য মানুষের জন্য বুকের রক্ত দিতেন তাহলে তার কাছ থেকে সুবিধাপ্রাপ্তরাও কেন আত্মগোপনে গেছেন, নীরব ছিলেন। আর শেখ হাসিনা এখন জনগণের ইচ্ছের বিপরীতে গিয়ে যদি বলেন, তিনিও তার বাবার মতো জীবন দিবেন, তাহলেও মানুষের মনে কোনো দাগ কাটবে বলে মনে হয় না। তাদের মতে শেখ হাসিনা তার ছেলে তথা বংশানুক্রমিক স্বার্থে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কেবল নির্মম শক্তি ব্যবহার করে তার অপশাসনকে ধরে রাখতে চান।
শেখ মুজিবের অবদান বাংলাদেশের জন্য যা-ই হোক তার মৃত্যু কিন্তু বাংলাদেশ কিংবা বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থে ছিল না। জনগণের জন্য তিনি মৃত্যুবরণ করেননি। জনগণও তাকে মারেনি। দেশের মানুষের জন্য জীবন দিলে তার নিহত হওয়ার খবর প্রচারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঢাকার রাজপথে মানুষের প্লাবণ বয়ে যেত। তেমনটি তো দূরের কথা, এক সময়ে তার জন্য পাগলপারা মানুষকে সামান্যতম শোক করতেও দেখা যায়নি। এমনকি তার দলের সুবিধাভোগীরা রাস্তায় না নেমে অনেকেই পালিয়ে গিয়েছিলেন। আমি চিনি শেখ মুজিবের এমন অতি নিকটের নেতৃস্থানীয় কেউ কেউ ১৫ আগস্ট খুব ভোরে প্রাণ বাঁচানোর জন্য গামছা পরে বুড়িগঙ্গা সাঁতরে কেরানীগঞ্জে আশ্রয় নিয়ে পরে ফরিদপুরের দিকে গিয়েছিলেন। তত্কালীন সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী, নৌবাহিনী, রক্ষীবাহিনীর প্রধান (এমনকি প্রধান উপদেষ্টা তোফায়েল আহমেদ) তথা আজকের সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের হোতারা অথবা আজকে বঙ্গবন্ধুর জন্য জান-কোরবান আমু, নাসিম, তোফায়েল, টুকু, হানিফ গংদের ১৫ আগস্টের পর থেকে দেখা যায়নি। তারা কেন মুজিব হত্যার প্রতিবাদ করেনি? তাদের কোনো গর্জন কেন জাতি শুনতে পায়নি? এসব রাঘব-বোয়ালরা ওই সময় কোথায় ছিলেন? কোথায় ছিলেন ইনু মতিয়া মেননসহ সব সুবিধাভোগী পরজীবী ভণ্ড কমিউনিস্ট বুর্জোয়া ও ভোগবাদীরা, যারা আজকে শেখ হাসিনাকে মই হিসেবে ব্যবহার করে উপরে উঠেছেন আর শেখ হাসিনাকেও ডুবাচ্ছেন?
ভারতীয় চর খালেদ মোশাররফের হাতে খন্দকার মোশতাক ও তত্কালীন সেনাবাহিনী প্রধান জিয়াউর রহমান বন্দি হওয়ার পর ৭ ডিসেম্বর সিপাহী-জনতা রাস্তায় নেমে পড়ে। খালেদ মোশাররফের পতন ঘটিয়ে তারা জিয়াদের মুক্ত করে আনে। তাহলে শেখ মুজিবের মৃত্যুর পর এ জনগণ কেন নীরব ছিল? তারা কেন রাস্তায় নেমে পড়েনি? কারণ একটাই শেখ মুজিব জনগণের জন্য মৃত্যুবরণ করেননি। তিনি জনগণের কারণে যেমন মরেননি, তেমনি জনগণের জন্যও মরেননি। তিনি জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলেন।
এখন শেখ হাসিনা বলছেন, ‘বাংলার মানুষকে বিশ্বসভায় মর্যাদার আসনে আসীন করতে যে কোনো ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত আছি। প্রয়োজনে বাবার মতো বুকের রক্ত দেব। তবুও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করব।’
একজন প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে এমন ধরনের সস্তা ও অবাস্তব মন্তব্য তথা শপথ কোনোভাবেই কাম্য নয়। ‘বাংলার মানুষকে বিশ্বসভায় মর্যাদার আসনে আসীন করতে যে কোনো ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত’— এ কথার মানে কি? বিশ্বের বা অন্য দেশের কেউ কি তাকে তেমন কাজ করতে বাধা সৃষ্টি করছে? তাকে বুকের রক্ত দিতে হবে কেন? তিনি বাংলাদেশকে বিশ্বসভায় মর্যাদার আসনে আসীন প্রতিষ্ঠিত করতে কি করছেন, তাও তো স্পষ্ট নয়। সবচেয়ে বড় পতাকা বানানো কিংবা দরিদ্র দেশের ৯০ কোটি টাকা দিয়ে মানুষ এনে ‘আমার সোনার বাংলা’ গান গাওয়ার কারণে বিশ্বসভায় বাংলাদেশ কোনোভাবেই মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এ ধরনের উদ্দেশ্যমূলক কাজের মাধ্যমে ফালতু সেনেসশন তৈরি করা যায়, কোনোদিন কোনো জাতি মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত হয় না, বাংলাদেশও হবে না। যে দেশের মানুষ কথা বলতে পারে না, ভোট দিতে পারে না, প্রতিনিয়ত গুম-অপহরণ-খুন হয়, রাস্তায়-ডোবা-নালায় লাশ হয়ে পড়ে থাকে, বিচার বিভাগ আইনসভাসহ সবকিছু একব্যক্তি নিয়ন্ত্রণ করে, যে দেশের সরকার কেবল ক্ষমতায় থাকার জন্য দেশের স্বার্থ অন্য দেশের কাছে তুলে দিতে পারে, সারা বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে তা কোনোভাবেই ‘বিশ্বসভায় মর্যাদার আসনে আসীন’ হয় না। দেশের নাজুক পরিস্থিতি থেকে শেখ হাসিনা জনগণের দৃষ্টিকে অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিতে চান। দেশে দুর্যোগময় পরিস্থিতি বিরাজ থাকা সত্ত্বেও ক্রিকেট খেলার ব্যবস্থা করা, ভারত থেকে নট-নটী এনে নাচ-গান করানো কিংবা আমার সোনার বাংলা গাওয়ানোর মধ্য দিয়ে তিনি বিশ্ববাসীকে দেখাতে চান মৃত্যুর কূপ হিসেবে দুর্নাম অর্জনকারী বাংলাদেশ নামক দুর্ভাগা দেশটির মানুষ মহাসুখে আছেন।
শেখ হাসিনা কোটি কোটি টাকা খরচ করে তার হাজারো ব্যর্থতা, দুর্নীতি, হত্যা, দুঃশাসনের অপকীর্তি ঢাকার চেষ্টা করছেন। মানুষ জানে যে কোনো দেশই যে কোনো সময় ইচ্ছে করলে এ ধরনের রেকর্ড মুহূর্তের মধ্যে ভেঙে দিতে পারে। সুতরাং বিশাল পতাকা কিংবা দুই লক্ষাধিক মানুষকে দিয়ে আমার সোনার বাংলা গান গাওয়ানো কোনোভাবেই স্থায়ী রেকর্ড নয়, বরং একেবারেই ভঙ্গুর। এ কাজ করায় বিশ্বসভায় বাংলাদেশ কোনোভাবেই মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এটা কেবল তারাই বলে বেড়ায় যারা তাদের দুর্নীতি, চুরি-চামারি, মামলা-হামলা, গুম, অপহরণ, খুন-খারাবি আড়াল করতে চায়।
শেখ হাসিনা একাধিকবার বলেছেন, তিনি হয়তো গুলি কিংবা বোমার আঘাতে মারা যাবেন। তিনি এটা জেনে রাখুন তিনি যদি ভালো কাজই করতেন, তবে জনগণ তাকে মাথায় তুলে রাখতো, নিন্দুকদের ভাষায় ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার নজরদারিতে বন্দি অবস্থায় প্রধানমন্ত্রীত্ব করতে হতো না। প্রতিনিয়ত বুলেট কিংবা মৃত্যু তাকে তাড়িয়ে বেড়াত না। এমনকি মন্দ কাজ করলেও তাকে বুকের রক্ত দিতে হবে না, যদি তিনি তার মন্দ কাজের পরিণতি অনুভব করে সেগুলো পরিহার করেন কিংবা জনগণ কী চায় সে অনুসারে কাজ করেন, অথবা ক্ষমতা থেকে সরে পড়েন। শক্তি প্রয়োগ করে, সত্যকে মিথ্যা কিংবা মিথ্যাকে সত্যি হিসেবে প্রচার করে, অন্যায়ভাবে মানুষ মেরে তিনি জনগণকে সাময়িকভাবে দাবিয়ে রাখতে পারবেন। এতে জনরোষ কমবে না, বরং বাড়বে। রাষ্ট্রযন্ত্রকে, রাষ্ট্রীয় শক্তিকে জনগণের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে সাময়িক পার পাওয়া যায়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদের জন্য তার প্রতিফল শুভ হয় না। শেখ মুজিবই তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
শেখ হাসিনার কাজকর্ম ও তার বক্তব্য প্রমাণ করে তিনি দেশের জনগণের পক্ষে নন, বরং তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। এ অবস্থায় তার রক্ত দেয়ার ঘোষণা নিয়ে মানুষ হাসিঠাট্টা, বিদ্রুপ-মশ্করা করে। তাই শেখ হাসিনার ‘বাবার মতো বুকের রক্ত দেয়ার ঘোষণা’ সংক্রান্ত প্রতিবেদন পাঠকদের মধ্যে কেমন প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে সেদিকে দৃষ্টি দিলেই শেখ হাসিনা আঁচ করতে পারবেন জনগণের কাছে তার অবস্থান কোন পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে। তা অনুধাবন করার জন্য শেখ হাসিনার বুকের রক্ত দেয়ার বক্তব্য পাঠান্তে ‘দৈনিক আমার দেশ’র কিছু পাঠকের প্রতিক্রিয়া শেখ হাসিনা ও তার স্যাঙ্গাতদের জ্ঞাতার্থে এখানে তুলে ধরতে চাই। মন্তব্যে বেরিয়ে এসেছে কী কারণে শেখ মুজিবকে মরতে হয়েছে, জনগণ শেখ হাসিনাকে কীভাবে বিবেচনা করে এবং জনগণের কাছে শেখ হাসিনার অবস্থান কোথায়?
· সিলেট থেকে এসবি উদ্দিন বাংলাকে ইংরেজিতে বানান করে লিখেছেন : মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করার কারণে বাবা মুজিবের পরাণ গেছে। একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হয়, তাই। এজন্য আহ্লাদ করবার কী আছে? আর হাসিনা জীবন দিবে এই কথা ১০০% মিথ্যা। লোভীরা বেশি দিন বাঁচতে চায়।
· মুরতুজা হক অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড থেকে লিখেছেন : কেউই আপনার রক্ত চায় না, দেশের প্রত্যেকে অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন চান।
· আফজাল খানের মতে : ‘প্রয়োজনে বাবার মতো রক্ত দেব : প্রধানমন্ত্রী একথা বিরুদ্ধবাদীদের বলা অতি সহজ, কিন্তু রক্ত দেয়া (আত্মত্যাগ করা) বড় কঠিন। বাকশালের অনুঘটকরা রক্ষীবাহিনীকে ব্যবহার করেছিল এবং ৩০,০০০ মানুষের জীবন নিয়েছিল এবং রক্ত দিয়ে গোসল করেছিল। (তার) বাবা জাতির জন্য বুকের রক্ত দেননি, বরং বাকশালের জন্য আত্মত্যাগ করেছিলেন। দয়া করে আত্মত্যাগ করবেন না এবং বাংলাদেশের মানুষ সেটা চায় না। আপনি যদি ভারতের জন্য কিছু করতে চান তবে তা করুন।...আপনি বাংলাদেশের জনগণের জন্য অনেক কিছু করেছেন, এখন বিদায় নেবার সময় এসেছে।
· আসিম মাহমুদ লিখেছেন : দয়া করে...আপনার রক্ত-ফক্ত দেয়ার দরকার নাই। রক্ত দেয়ার কথা বলে দেশের ১২টা বাজাইয়া দেন। আপনার যদি রক্ত দেয়ার থাকে, তবে ইন্ডিয়ায় গিয়া তা দেন। বাংলাদেশে আপনার রক্ত দেয়ার দরকার না(ই)।
· চট্টগ্রাম কলেজের কামাল চৌধুরী লিখেছেন : পঞ্চদশ সংশোধনীর প্রয়োজনটা কী? কে চায় না যুদ্ধাপরাধের বিচার? বিপক্ষকে ঘায়েল করতে জামায়াত, বিএনপি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা, গণতন্ত্র রক্ষা, যুদ্ধাপরাধের বিচার সব কিছুকে একসঙ্গে সামনে এনে জনগণকে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে। যুদ্ধাপরাধের বিচারের সঙ্গে গণতন্ত্র, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কী সম্পর্ক? গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া কোথায়? এখানে গণতন্ত্রের চর্চা হয় না। ভবিষ্যতেও গণতন্ত্র চর্চা হওয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বরং গণতন্ত্রকে হত্যা করার জন্য যা দরকার তা-ই চলছে। নির্বাচন গণতন্ত্র নয়। এটা একটা চর্চা যা কাজের মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়। সবাই আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতার কথা বলছে। অথচ বিএনপি একটু এগোলেই এমনভাবে খোঁচা মারা হয় যাতে সে আর সামনের দিকে না এগোয়। প্রতিটি বক্তৃতায় জামায়াত-বিএনপি। বিভিন্নজন বলা শুরু করেছেন এ সরকার পাঁচ বছরের জন্য ক্ষমতায় এসেছে। সারা পৃথিবী চাচ্ছে ভোটারবিহীন এ নির্বাচন বাদ দিয়ে নতুন একটা নির্বাচন হোক। জামায়াতকে নিয়ে তো প্রধানমন্ত্রীই খেলছেন। প্রথম পাঁচ বছর কান্নাকাটি করে ক্ষমতায় থাকলেন যে আপনার বাবাকে মেরে ফেলা হয়েছে। এরপর মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তি বলে আরও পাঁচ বছর নিয়ে গেলেন। এরপর এলেন যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে, এরপরে কী? জাতীয় নির্বাচনে ১৫৩টি আসনে কোনো প্রার্থী নেই! প্রায় অর্ধশত কেন্দ্রে কেউ ভোট দিতে যায়নি। সেখানে আওয়ামী লীগের ভোটগুলো গেল কোথায়? ওই কেন্দ্রগুলোয় যাওয়া-আসার পথে কেউ আহত-নিহত হয়েছেন এমন কোনো সংবাদও তো শুনিনি। তাহলে আওয়ামী লীগের ভোটাররা গেল না কেন? যারা ক্ষমতায় ছিলেন বা যে কোনোভাবে হোক এখনো ক্ষমতায় আছেন, তারা কোনো ভুলভ্রান্তি করেছেন তা স্বীকার করতে চাচ্ছেন না। তারা যেভাবে কৌতুক, হাসাহাসি, মন্তব্য করছেন তাতে মনে হচ্ছে একাই যথেষ্ট। এ দেশে যে ১৬ কোটি মানুষ আছে, তারা যে দেশের জন্য ভাবে, তাদেরও যে মতামতের প্রয়োজন আছে এটা মনেই করছেন না। কোনো জাতির জন্য এ ধরনের পরিস্থিতি খুব ভয়ঙ্কর।
· ঢাকা কলেজের ‘আমি তৃঞ্চার্ত পথিক’ লিখেছেন : মাননীয় অবৈধ প্রধানমন্ত্রী। আপনি বাংলাদেশে মানুষের মুখের হাসি সেভাবেই ফোটাতে চান যেভাবে আপনার বাবা ’৭৪ সালে ফুটিয়েছিল। তখন বাংলাদেশের মানুষ হাসতে হাসতে না খেয়ে রাস্তায় লাশ হয়ে পড়ে ছিল। আপনি সেভাবেই মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে চান যেভাবে আপনার বাবা সিরাজ শিকদারের মুখে হাসি ফুটিয়েছিলেন। তিনি হাসতে হাসতে পুলিশের গুলিতে ক্রসফায়ারের মাধ্যমে মরে পড়েছিলেন। সেভাবেই হাসি ফোটাতে চান যেভাবে আপনার বাবার চামচারা কলকাতার বাজারে বাংলাদেশের খাদ্যদ্রব্য বিক্রি করে দিয়ে বাংলাদেশের ৪ লক্ষ হতভাগা জনগণকে হাসতে হাসতে মৃত্যুবরণ করতে বাধ্য করেছিলেন। আপনিও ঠিক সেভাবেই মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে অবৈধভাবে ক্ষমতায় এসেছেন।
· ‘আমি তৃঞ্চার্ত পথিক’কে সমর্থন করে পিনু চৌধুরী লিখেছেন : এসব মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ। হাসিনা দিদি কয় কী? বুকের রক্ত দিবো? দিদির বুকের ভিতর বাকশাল আছে। তবে কি অভাগা দেশের শেষ রক্ষা নেই? (হায়রে বাঙালি + হায়রে বাংলাদেশী।)
· এমডি শাহাজাহান খান লিখেছেন : কেউ রক্ত দেয় কারো রক্ত নেয়। দেয়া আর নেয়া দুটো এক নয়। আপনার বাসনা যত তাড়াতাড়ি পূর্ণ হবে, ততই দেশের মঙ্গল।
· নুর আবসার জনি প্রশ্ন প্রকাশ করেছেন, তার মানে কি আবার বাংলাদেশের জনগণের জন্য ৭২-৭৫ (এর) মতো কালো অধ্যায়ের সূচনা হলো?
· আহমেদ রুমান শামসি লিখেছেন : অনাকাঙ্ক্ষিত উত্তেজনা ও নাটকীয় ইউ-টার্ন (পল্টি) করার জন্য বাল (বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ) প্রধানের (অনুরাগীরা ও ভারত সরকার) আপনাকে নির্দয়ভাবে হত্যা করবে এবং দেশের জন্য আপনাকে আত্মত্যাগের (কথা বলিয়ে) আপনাকে সে বার্তাই (হিন্দুত্ববাদের বলি) পৌঁছিয়ে দেয়া হচ্ছে। আপনি আপনার পাপের জন্য চিন্তিত এবং জাহান্নাম হতে মুক্তি পাবার জন্য আপনি (এ) ধরনের মৃত্যু কামনা করছেন। কিন্তু আল্লাহ (ছুবহান্নাল্লাহু) সবকিছু জানেন অথবা আপনার অন্তরে তা সৃজন করেছেন। আরো ক্ষতিসাধন হতে দেশকে রক্ষা করতে আল্লাহ আপনাকে সাহায্য করুন।
· জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আল হোসাইন লিখেছেন : বাবাতো দেশের মানুষের জন্য রক্ত দেন নাই, নিজ বংশের আধিপত্য বিস্তারের জন্য রক্ত দিয়েছিলেন। ‘বাকশালের জন্য বর্তমানে শেখ মুজিব বাংলাদেশের সবচেয়ে ঘৃণিত ব্যক্তি’। আপনিও কি ওই পথে যেতে চান, তাহলে তো জনগণের আর বুঝতে বাকি রইলো না, ‘বাপকা বেটা, সিপাইকা ঘোড়া’। তাহলে বাংলার মানুষ আর একটি ঘৃণিত মুখ দেখবে, সেই অপেক্ষায় রইলাম।
· কাওসার খানের মন্তব্য : ২৫ মার্চ মুজিব...আত্মসমর্পণ করে পাকিস্তানে চলে যান। বাঙালি আর্মডফোর্স প্রতিরোধ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ২৫ মার্চ রাতে ওসমানী সাহেবকে হত্যার জন্য এক প্লাটুন পাকিস্তানি সৈন্য উনার বাড়িতে আক্রমণ করে। আল্লাহর রহমতে ওসমানী সাহেব বেঁচে যান। এদিকে চট্টগ্রামে প্রতিরোধ যুদ্ধরত কর্নেল এম আর চৌধুরী শহীদ হন। ২৭ মার্চ জিয়া নেতৃত্ব নিয়ে নিজেকে প্রেসিডেন্ট বলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন...।
· কাজী শাহাজাহন বলেন, ৭ মার্চ শেখ মুজিব রেস কোর্স (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) ময়দানে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরো দেব, তবুও এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ। প্রকৃতপক্ষে শেখের পরিবার থেকে স্বাধীনতা যুদ্ধ থেকে শুরু করে আজ অবধি দেশের জন্য এক ফুটা (ফোঁটা) রক্ত কেউ বিসর্জন দিয়েছেন কি? ফাল্তু কথা ছেড়ে দিন। আপনার ভাওতাবাজি জনগণের আর বুঝার বাকি নাই।
· আবদুল সালামের মন্তব্য এ রকম : তুই নিজের ভোটটা দিতে পারলি না, তুই ভারতের তলের কুটুম।
· কাজী শাহাজাহন আরেকটি মন্তব্যে লিখেছেন : আল্লাহ, তুমি হাসিনার মনোবাসনা পুরা করে দাও। আমিন।
· সোলা খানের পরামর্শ : আপনি দয়া করে বিদায় নিন, আপনার পচা রক্ত বাংলাদেশের প্রয়োজন নাই, ভারতেরই প্রয়োজন।
· শেখ মোহাম্মদ বোরহান উদ্দিনের সাফ কথা : রক্তটক্ত দিতে হবে না বোন, দয়া করে বিশ্রামে যান, বাংলার মানুষকে বিশ্বসভায় মর্যাদার আসনে আসীন করার জন্য এইটুকু যথেষ্ট আপনার পক্ষ থেকে। আপনার পায়ে পড়ে অঝোর ধারায় কান্না করে মিনতি করছি আমি সবার পক্ষ থেকে...!
· ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্দিক মিয়া প্রশ্ন রেখেছেন : হাসিনা যদি এতই সাহসী হয়ে থাকেন, তাহলে তিনি কেন ছয় স্তরবিশিষ্ট নিরাপত্তা বেষ্টনী ছাড়া চলাফেরা করেন না।
· জিন্দাল জুবলি হাইস্কুলের মনির হোসেন লিখেছেন : হায়েনা রক্ত ছাড়া কিছু বোঝে না। আমার ফাঁসি চাই বইটি পড়ে দেখুন। (hayena rokto chara kichui buje na. amar fasi chai boiti pore dekhun)
· কামাল রহমান ইংরেজিতে লিখেছেন : প্রিয় প্রধানমন্ত্রী, আমি খুশি যে, আপনার বাবার জন্য আপনার গভীর ভালোবাসা রয়েছে। মহান ব্যক্তিরা উদাহরণ সৃষ্টি করেই বেঁচে থাকেন (অমর হন), লম্বা লম্বা কথা বলে নয়। আপনার কথার মধ্যে বেশ স্ববিরোধিতা (discrepancy) বৈপরীত্য রয়েছে। আপনি আপনার বাবার ধারেকাছেও নেই। আপনার বাবার মতো রক্ত দেয়ার কোনো প্রস্তুতি আপনার নেই, বরং আপনি শিশুদের হত্যা করে বাবাদের রক্ত নিচ্ছেন, যেমনটি আপনার বাবা হিটলারের মতোই বাংলাদেশের প্রতিটি পিতার সন্তানদের রক্ত নিয়েছে।
· সানা দীন মনে করেন : রক্ত নিয়ে লেখা বন্ধ করার এটাই প্রকৃষ্ট সময়। আপনি আপনার পিতা থেকে উত্তম হতে পারেন । রক্ত দেয়ার নির্বোধ বক্তব্য ছাড়ুন। বাংলাদেশের জনগণ আপনার রক্ত চায় না। তারা আপনার ভালোবাসা চায়। একটি দলের নেত্রী হিসেবে এবং একজন মহিলার মুখে এমন ধরনের বক্তব্য অসুস্থ মানসিকতার পরিচয় বহন করে। প্রাচীন প্রবাদ বলে, ডাণ্ডা দিয়ে আপনি একটি মৌমাছিও ধরতে পারবেন না, কিন্তু মধু দিয়ে মৌমাছি ধরতে পারবেন। এটা হলো সহজতম উপায়। লোভের বশীভূত হয়ে এবং আপনার দলের মানুষদের অসুস্থ মানসিকতার কারণে আপনি আপনার রাজনৈতিক জীবন ধ্বংস করেছেন। তাদের নিয়ন্ত্রণ করার কোনো ক্ষমতা আপনার নেই। যদি আপনি তা চান, তবে ধীরে ধীরে তা করতে পারেন। কিন্তু এজন্য প্রথমে আপনি আপনাকে শুধরিয়ে নিন। ...
· আহমেদ আরিফ লিখেছেন : যিনি লঞ্চ ভ্রমণে নিরাপত্তার জন্য পুরো এক দিন দেশের সবচেয়ে বড় টার্মিনাল বন্ধ করে দেন, যিনি কোথাও যাওয়ার আগে সে রাস্তা ৫ ঘণ্টা আগে বন্ধ করে দেন, যিনি বুলেটপ্রুফ বাক্সের ভেতর দাঁড়িয়ে জাতীয় সংগীত গান, তিনি ‘প্রয়োজনে বাবার মতো বুকের রক্ত দেব’ বলেন, তখন কি আর আবেগে না কাইন্দা পারা যায়?
· ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনৈক শিক্ষার্থীর প্রশ্ন : বাবা বাকশাল করে রক্ত দিছেন, আপনি কেন ব্লাড (রক্ত) দিবেন? এমন কী কাজ করেছেন যে, আপনাকে রক্ত দিতে হবে? আপনি একনায়ক (ডিক্টেটর) তাই?
· ‘এই তো আমি’র মন্তব্য : তার বাবা স্বেচ্ছায় রক্ত দেননি, বরং তিনি ৩০ হাজার বাংলাদেশী মানুষকে খুন করেছেন। ওই রক্ত-শোষক তার অপকর্মের জন্যই খুন হয়েছিলেন। হাসিনা তার পিতার ভাগ্য বরণ করতে যাচ্ছেন।
· রনি চৌধুরীর লিখেছেন : আপনি দেহরক্ষী ছাড়া জনগণের কাছে এসেছেন? আপনার বুকের রক্ত নেয়া হবে, আপনার ইচ্ছাটা পূরণ হবে।
শেখ হাসিনা তার বাবার মৃত্যু থেকে না হোক, অন্তত এসব মন্তব্য থেকে শিক্ষা নিতে পারতেন। শেখ মুজিব যে যে কারণে তার জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছেন, সেগুলো পরিহার করে শেখ হাসিনা জনগণের কাছে নেমে আসতে পারতেন। ক্ষমতায় থাকার জন্য জনগণের ভোটাধিকার ছিনতাই করে নিজেকে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী বা সরকারপ্রধান হিসেবে দাবি করে তিনি প্রমাণ করেছেন তার বিবেক থেকে ন্যায়-অন্যায়ের অনুভূতি মরে গেছে। পবিত্র কোরআনে সুরা নিসার ৪২নং আয়াতে স্পষ্ট বলা হয়েছে : তোমরা সত্যকে মিথ্যার সঙ্গে মিশিয়ে দিয়ো না এবং জানা সত্যকে তোমরা গোপন কোরো না। অন্যদিকে মহানবীর একটি অতি পরিচিত হাদিসে বলা হয়েছে : যখন তোমার উত্তম কাজ তোমাকে আনন্দ দেয় এবং মন্দ কাজ পীড়া দেয়, তখন তুমি প্রকৃত মোমেন। মদিনা সনদ বাস্তবায়নে ওয়াদাবদ্ধ শেখ হাসিনাই এখন ঠিক করুন তার অবস্থান আসলে কোথায়?
কিন্তু শেখ মুজিবের একান্ত অনুসারীরা তো দূরের কথা, এমনকি তার সন্তানরাই তার জীবন থেকে কোনো শিক্ষা নিয়েছেন বলে মনে হয় না। নিন্দুকরা বলে তারা শেখ মুবিবের ভুল নীতিগুলোকেই শক্তভাবে আঁকড়ে রেখেছেন এবং সদ্গুণাবলী, বিশেষত তার স্বদেশপ্রেম, বিশেষত পররাষ্ট্রনীতি, সরাসরি বর্জন করছেন। তার অনুসারীরা তাদের ব্যক্তিগত ও বংশগত স্বার্থসিদ্ধির জন্য শেখ মুজিবকে ব্যবহার করছেন, বাস্তবে শেখ মুজিবের প্রতি তাদের দায়িত্ববোধ তাদের মধ্যে আছে বলে মনে হয় না।
শেখ মুজিবের এমন করুণ পরিণতির কারণগুলো শেখ হাসিনার অবশ্যই জানা আছে। ওই সময়ে শেখ হাসিনার মতো বয়সী লাখ লাখ মানুষ এখনও বেঁচে আছেন। তারা শেখ মুজিবের সাড়ে তিন বছরের শাসনের প্রত্যক্ষদর্শী। শেখ মুজিব কেন কাদের কারণে এভাবে নিহত হলেন, সেটা জানার জন্য আমাদেরকে শেখ হাসিনা কিংবা অন্য কারো কাছ থেকে ছবক নিতে হবে না। আমরা সবাই তা দেখেছি। তাই শেখ হাসিনার এমন মন্তব্যে কেউ কোনোভাবেই সায় দেয়নি যে শেখ মুজিব দেশের জন্য ‘বুকের রক্ত দিয়েছেন’।
২৯ মার্চ বিআইডব্লিউটিসি’র নবনির্মিত যাত্রীবাহী জাহাজ ‘এমভি বাঙালি’র উদ্বোধন শেষে জাহাজে করে চাঁদপুর জেলার মতলব থানার মোহনপুর ঘাটে তিনি এ মন্তব্য করেন। এ ধরনের মন্তব্য আবেগতাড়িত কিংবা ইতিহাসকে ঘুরিয়ে দেয়ার অথবা বিকৃত করার ইচ্ছাপ্রসূত হতে পারে, এমনকি নতুন প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করা যেতে পারে। কিন্তু এর সঙ্গে বাস্তবের কোনো মিল নেই। এটাও নিরেট ইতিহাস বিকৃতির উদ্দেশ্যপ্রসূত হতে পারে।
শেখ মুজিবকে বিতর্কিত, ব্যর্থ তথা অপমানিত করার জন্য তার প্রতিপক্ষের ভূমিকা একেবারেই নগণ্য। তার আপনজনেরা (তার মৃত্যুর আগে ও পরে) তাকে বিতর্কিত করার জন্য মূল ভূমিকা পালন করেছিলেন। নিজ নিজ স্বার্থ বাগাতে এবং নিজেদের চুরি-চামারি থেকে রেহাই পেতে তারা চাটুকারের ভূমিকা পালন করে। তারা শেখ মুজিবকে অতিমাত্রায় ওপরে তুলতে গিয়ে এমনসব বেফাঁস ও অতিরঞ্জিত প্রশংসা এবং তাদের প্রতিপক্ষকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য এবং তাদের অবদানকে সরাসরি অস্বীকার করার উদ্দেশ্যে তাদের মনগড়া তথ্য জাতির কাছে উত্থাপন করার অপকৌশল অবলম্বন করে। এভাবে তারাই অকারণে শেখ মুজিবের প্রতিপক্ষ সৃষ্টি করেছেন, তাদেরকে সঠিক তথ্য প্রদানে বাধ্য করছেন। তাদেরকে শেখ মুজিবের দোষ-ত্রুটি-ছিদ্রান্বেষণ করতে প্ররোচিত করছেন। এমনকি এ নিবন্ধের অবতারণাও হতো না, যদি শেখ হাসিনা এমন মন্তব্য না করতেন যে, তিনি তার ‘বাবার মতো প্রয়োজনে বুকের রক্ত দেবেন’।
শেখ মুজিবকে যারা ডুবিয়েছে তাদের সবাই তারই অনুসারী, তার কাছ থেকে সুবিধাপ্রাপ্ত। আজকে যারা তার জন্য মায়াকান্না করে, তারাও এর বাইরে নয়। এরা শেখ মুজিবকে তাদের অবৈধ সম্পদ ও ক্ষমতাপ্রাপ্তির সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করেছে। ধ্বংসপ্রাপ্ত দেশকে না গড়ে তারা চুরি-চামারিতে লিপ্ত হয়। জনগণের জন্য আসা সম্পদ এরা নিজেদের পকেটে ঢোকায়। শেখ মুজিব নিজেই ক্ষোভে-দুঃখে প্রকাশ্যে বলেছিলেন : ‘আমি যেদিকে তাকাই শুধু চোর দেখি।’ ‘সবাই পায় সোনার খনি, আর আমি পেয়েছি চোরের খনি।’ দলীয় লোকদের প্রতি তার আচরণ প্রসঙ্গে অকপটে স্বীকার করেছেন। বলেছেন : খুন করে এসে ‘বঙ্গবন্ধু আমি খুন করেছি বললেও, আমি এদেরকে মাফ করেছি’।
এসব সার্টিফিকেট ও বক্তব্য শেখ মুজিবের। তাদের চুরি-চামারি, খুন-রাহাজানি, চোরাচালান এবং প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য চক্রান্তের কারণেই মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় শেখ মুজিবের আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা ধূলায় মিশে যায় । তাদের কারণেই তাদের জন্যই শেখ মুজিবের নির্মম মৃত্যু হয়। তার মৃত্যুর পর তার কাছ থেকে সার্বিকভাবে প্রাপ্ত সুবিধাভোগী সহযোগীদের মাতম করতে পাওয়া যায়নি। তিনি যদি দেশের জন্য মানুষের জন্য বুকের রক্ত দিতেন তাহলে তার কাছ থেকে সুবিধাপ্রাপ্তরাও কেন আত্মগোপনে গেছেন, নীরব ছিলেন। আর শেখ হাসিনা এখন জনগণের ইচ্ছের বিপরীতে গিয়ে যদি বলেন, তিনিও তার বাবার মতো জীবন দিবেন, তাহলেও মানুষের মনে কোনো দাগ কাটবে বলে মনে হয় না। তাদের মতে শেখ হাসিনা তার ছেলে তথা বংশানুক্রমিক স্বার্থে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কেবল নির্মম শক্তি ব্যবহার করে তার অপশাসনকে ধরে রাখতে চান।
শেখ মুজিবের অবদান বাংলাদেশের জন্য যা-ই হোক তার মৃত্যু কিন্তু বাংলাদেশ কিংবা বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থে ছিল না। জনগণের জন্য তিনি মৃত্যুবরণ করেননি। জনগণও তাকে মারেনি। দেশের মানুষের জন্য জীবন দিলে তার নিহত হওয়ার খবর প্রচারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঢাকার রাজপথে মানুষের প্লাবণ বয়ে যেত। তেমনটি তো দূরের কথা, এক সময়ে তার জন্য পাগলপারা মানুষকে সামান্যতম শোক করতেও দেখা যায়নি। এমনকি তার দলের সুবিধাভোগীরা রাস্তায় না নেমে অনেকেই পালিয়ে গিয়েছিলেন। আমি চিনি শেখ মুজিবের এমন অতি নিকটের নেতৃস্থানীয় কেউ কেউ ১৫ আগস্ট খুব ভোরে প্রাণ বাঁচানোর জন্য গামছা পরে বুড়িগঙ্গা সাঁতরে কেরানীগঞ্জে আশ্রয় নিয়ে পরে ফরিদপুরের দিকে গিয়েছিলেন। তত্কালীন সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী, নৌবাহিনী, রক্ষীবাহিনীর প্রধান (এমনকি প্রধান উপদেষ্টা তোফায়েল আহমেদ) তথা আজকের সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের হোতারা অথবা আজকে বঙ্গবন্ধুর জন্য জান-কোরবান আমু, নাসিম, তোফায়েল, টুকু, হানিফ গংদের ১৫ আগস্টের পর থেকে দেখা যায়নি। তারা কেন মুজিব হত্যার প্রতিবাদ করেনি? তাদের কোনো গর্জন কেন জাতি শুনতে পায়নি? এসব রাঘব-বোয়ালরা ওই সময় কোথায় ছিলেন? কোথায় ছিলেন ইনু মতিয়া মেননসহ সব সুবিধাভোগী পরজীবী ভণ্ড কমিউনিস্ট বুর্জোয়া ও ভোগবাদীরা, যারা আজকে শেখ হাসিনাকে মই হিসেবে ব্যবহার করে উপরে উঠেছেন আর শেখ হাসিনাকেও ডুবাচ্ছেন?
ভারতীয় চর খালেদ মোশাররফের হাতে খন্দকার মোশতাক ও তত্কালীন সেনাবাহিনী প্রধান জিয়াউর রহমান বন্দি হওয়ার পর ৭ ডিসেম্বর সিপাহী-জনতা রাস্তায় নেমে পড়ে। খালেদ মোশাররফের পতন ঘটিয়ে তারা জিয়াদের মুক্ত করে আনে। তাহলে শেখ মুজিবের মৃত্যুর পর এ জনগণ কেন নীরব ছিল? তারা কেন রাস্তায় নেমে পড়েনি? কারণ একটাই শেখ মুজিব জনগণের জন্য মৃত্যুবরণ করেননি। তিনি জনগণের কারণে যেমন মরেননি, তেমনি জনগণের জন্যও মরেননি। তিনি জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলেন।
এখন শেখ হাসিনা বলছেন, ‘বাংলার মানুষকে বিশ্বসভায় মর্যাদার আসনে আসীন করতে যে কোনো ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত আছি। প্রয়োজনে বাবার মতো বুকের রক্ত দেব। তবুও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করব।’
একজন প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে এমন ধরনের সস্তা ও অবাস্তব মন্তব্য তথা শপথ কোনোভাবেই কাম্য নয়। ‘বাংলার মানুষকে বিশ্বসভায় মর্যাদার আসনে আসীন করতে যে কোনো ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত’— এ কথার মানে কি? বিশ্বের বা অন্য দেশের কেউ কি তাকে তেমন কাজ করতে বাধা সৃষ্টি করছে? তাকে বুকের রক্ত দিতে হবে কেন? তিনি বাংলাদেশকে বিশ্বসভায় মর্যাদার আসনে আসীন প্রতিষ্ঠিত করতে কি করছেন, তাও তো স্পষ্ট নয়। সবচেয়ে বড় পতাকা বানানো কিংবা দরিদ্র দেশের ৯০ কোটি টাকা দিয়ে মানুষ এনে ‘আমার সোনার বাংলা’ গান গাওয়ার কারণে বিশ্বসভায় বাংলাদেশ কোনোভাবেই মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এ ধরনের উদ্দেশ্যমূলক কাজের মাধ্যমে ফালতু সেনেসশন তৈরি করা যায়, কোনোদিন কোনো জাতি মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত হয় না, বাংলাদেশও হবে না। যে দেশের মানুষ কথা বলতে পারে না, ভোট দিতে পারে না, প্রতিনিয়ত গুম-অপহরণ-খুন হয়, রাস্তায়-ডোবা-নালায় লাশ হয়ে পড়ে থাকে, বিচার বিভাগ আইনসভাসহ সবকিছু একব্যক্তি নিয়ন্ত্রণ করে, যে দেশের সরকার কেবল ক্ষমতায় থাকার জন্য দেশের স্বার্থ অন্য দেশের কাছে তুলে দিতে পারে, সারা বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে তা কোনোভাবেই ‘বিশ্বসভায় মর্যাদার আসনে আসীন’ হয় না। দেশের নাজুক পরিস্থিতি থেকে শেখ হাসিনা জনগণের দৃষ্টিকে অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিতে চান। দেশে দুর্যোগময় পরিস্থিতি বিরাজ থাকা সত্ত্বেও ক্রিকেট খেলার ব্যবস্থা করা, ভারত থেকে নট-নটী এনে নাচ-গান করানো কিংবা আমার সোনার বাংলা গাওয়ানোর মধ্য দিয়ে তিনি বিশ্ববাসীকে দেখাতে চান মৃত্যুর কূপ হিসেবে দুর্নাম অর্জনকারী বাংলাদেশ নামক দুর্ভাগা দেশটির মানুষ মহাসুখে আছেন।
শেখ হাসিনা কোটি কোটি টাকা খরচ করে তার হাজারো ব্যর্থতা, দুর্নীতি, হত্যা, দুঃশাসনের অপকীর্তি ঢাকার চেষ্টা করছেন। মানুষ জানে যে কোনো দেশই যে কোনো সময় ইচ্ছে করলে এ ধরনের রেকর্ড মুহূর্তের মধ্যে ভেঙে দিতে পারে। সুতরাং বিশাল পতাকা কিংবা দুই লক্ষাধিক মানুষকে দিয়ে আমার সোনার বাংলা গান গাওয়ানো কোনোভাবেই স্থায়ী রেকর্ড নয়, বরং একেবারেই ভঙ্গুর। এ কাজ করায় বিশ্বসভায় বাংলাদেশ কোনোভাবেই মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এটা কেবল তারাই বলে বেড়ায় যারা তাদের দুর্নীতি, চুরি-চামারি, মামলা-হামলা, গুম, অপহরণ, খুন-খারাবি আড়াল করতে চায়।
শেখ হাসিনা একাধিকবার বলেছেন, তিনি হয়তো গুলি কিংবা বোমার আঘাতে মারা যাবেন। তিনি এটা জেনে রাখুন তিনি যদি ভালো কাজই করতেন, তবে জনগণ তাকে মাথায় তুলে রাখতো, নিন্দুকদের ভাষায় ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার নজরদারিতে বন্দি অবস্থায় প্রধানমন্ত্রীত্ব করতে হতো না। প্রতিনিয়ত বুলেট কিংবা মৃত্যু তাকে তাড়িয়ে বেড়াত না। এমনকি মন্দ কাজ করলেও তাকে বুকের রক্ত দিতে হবে না, যদি তিনি তার মন্দ কাজের পরিণতি অনুভব করে সেগুলো পরিহার করেন কিংবা জনগণ কী চায় সে অনুসারে কাজ করেন, অথবা ক্ষমতা থেকে সরে পড়েন। শক্তি প্রয়োগ করে, সত্যকে মিথ্যা কিংবা মিথ্যাকে সত্যি হিসেবে প্রচার করে, অন্যায়ভাবে মানুষ মেরে তিনি জনগণকে সাময়িকভাবে দাবিয়ে রাখতে পারবেন। এতে জনরোষ কমবে না, বরং বাড়বে। রাষ্ট্রযন্ত্রকে, রাষ্ট্রীয় শক্তিকে জনগণের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে সাময়িক পার পাওয়া যায়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদের জন্য তার প্রতিফল শুভ হয় না। শেখ মুজিবই তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
শেখ হাসিনার কাজকর্ম ও তার বক্তব্য প্রমাণ করে তিনি দেশের জনগণের পক্ষে নন, বরং তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। এ অবস্থায় তার রক্ত দেয়ার ঘোষণা নিয়ে মানুষ হাসিঠাট্টা, বিদ্রুপ-মশ্করা করে। তাই শেখ হাসিনার ‘বাবার মতো বুকের রক্ত দেয়ার ঘোষণা’ সংক্রান্ত প্রতিবেদন পাঠকদের মধ্যে কেমন প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে সেদিকে দৃষ্টি দিলেই শেখ হাসিনা আঁচ করতে পারবেন জনগণের কাছে তার অবস্থান কোন পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে। তা অনুধাবন করার জন্য শেখ হাসিনার বুকের রক্ত দেয়ার বক্তব্য পাঠান্তে ‘দৈনিক আমার দেশ’র কিছু পাঠকের প্রতিক্রিয়া শেখ হাসিনা ও তার স্যাঙ্গাতদের জ্ঞাতার্থে এখানে তুলে ধরতে চাই। মন্তব্যে বেরিয়ে এসেছে কী কারণে শেখ মুজিবকে মরতে হয়েছে, জনগণ শেখ হাসিনাকে কীভাবে বিবেচনা করে এবং জনগণের কাছে শেখ হাসিনার অবস্থান কোথায়?
· সিলেট থেকে এসবি উদ্দিন বাংলাকে ইংরেজিতে বানান করে লিখেছেন : মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করার কারণে বাবা মুজিবের পরাণ গেছে। একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হয়, তাই। এজন্য আহ্লাদ করবার কী আছে? আর হাসিনা জীবন দিবে এই কথা ১০০% মিথ্যা। লোভীরা বেশি দিন বাঁচতে চায়।
· মুরতুজা হক অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড থেকে লিখেছেন : কেউই আপনার রক্ত চায় না, দেশের প্রত্যেকে অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন চান।
· আফজাল খানের মতে : ‘প্রয়োজনে বাবার মতো রক্ত দেব : প্রধানমন্ত্রী একথা বিরুদ্ধবাদীদের বলা অতি সহজ, কিন্তু রক্ত দেয়া (আত্মত্যাগ করা) বড় কঠিন। বাকশালের অনুঘটকরা রক্ষীবাহিনীকে ব্যবহার করেছিল এবং ৩০,০০০ মানুষের জীবন নিয়েছিল এবং রক্ত দিয়ে গোসল করেছিল। (তার) বাবা জাতির জন্য বুকের রক্ত দেননি, বরং বাকশালের জন্য আত্মত্যাগ করেছিলেন। দয়া করে আত্মত্যাগ করবেন না এবং বাংলাদেশের মানুষ সেটা চায় না। আপনি যদি ভারতের জন্য কিছু করতে চান তবে তা করুন।...আপনি বাংলাদেশের জনগণের জন্য অনেক কিছু করেছেন, এখন বিদায় নেবার সময় এসেছে।
· আসিম মাহমুদ লিখেছেন : দয়া করে...আপনার রক্ত-ফক্ত দেয়ার দরকার নাই। রক্ত দেয়ার কথা বলে দেশের ১২টা বাজাইয়া দেন। আপনার যদি রক্ত দেয়ার থাকে, তবে ইন্ডিয়ায় গিয়া তা দেন। বাংলাদেশে আপনার রক্ত দেয়ার দরকার না(ই)।
· চট্টগ্রাম কলেজের কামাল চৌধুরী লিখেছেন : পঞ্চদশ সংশোধনীর প্রয়োজনটা কী? কে চায় না যুদ্ধাপরাধের বিচার? বিপক্ষকে ঘায়েল করতে জামায়াত, বিএনপি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা, গণতন্ত্র রক্ষা, যুদ্ধাপরাধের বিচার সব কিছুকে একসঙ্গে সামনে এনে জনগণকে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে। যুদ্ধাপরাধের বিচারের সঙ্গে গণতন্ত্র, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কী সম্পর্ক? গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া কোথায়? এখানে গণতন্ত্রের চর্চা হয় না। ভবিষ্যতেও গণতন্ত্র চর্চা হওয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বরং গণতন্ত্রকে হত্যা করার জন্য যা দরকার তা-ই চলছে। নির্বাচন গণতন্ত্র নয়। এটা একটা চর্চা যা কাজের মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়। সবাই আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতার কথা বলছে। অথচ বিএনপি একটু এগোলেই এমনভাবে খোঁচা মারা হয় যাতে সে আর সামনের দিকে না এগোয়। প্রতিটি বক্তৃতায় জামায়াত-বিএনপি। বিভিন্নজন বলা শুরু করেছেন এ সরকার পাঁচ বছরের জন্য ক্ষমতায় এসেছে। সারা পৃথিবী চাচ্ছে ভোটারবিহীন এ নির্বাচন বাদ দিয়ে নতুন একটা নির্বাচন হোক। জামায়াতকে নিয়ে তো প্রধানমন্ত্রীই খেলছেন। প্রথম পাঁচ বছর কান্নাকাটি করে ক্ষমতায় থাকলেন যে আপনার বাবাকে মেরে ফেলা হয়েছে। এরপর মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তি বলে আরও পাঁচ বছর নিয়ে গেলেন। এরপর এলেন যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে, এরপরে কী? জাতীয় নির্বাচনে ১৫৩টি আসনে কোনো প্রার্থী নেই! প্রায় অর্ধশত কেন্দ্রে কেউ ভোট দিতে যায়নি। সেখানে আওয়ামী লীগের ভোটগুলো গেল কোথায়? ওই কেন্দ্রগুলোয় যাওয়া-আসার পথে কেউ আহত-নিহত হয়েছেন এমন কোনো সংবাদও তো শুনিনি। তাহলে আওয়ামী লীগের ভোটাররা গেল না কেন? যারা ক্ষমতায় ছিলেন বা যে কোনোভাবে হোক এখনো ক্ষমতায় আছেন, তারা কোনো ভুলভ্রান্তি করেছেন তা স্বীকার করতে চাচ্ছেন না। তারা যেভাবে কৌতুক, হাসাহাসি, মন্তব্য করছেন তাতে মনে হচ্ছে একাই যথেষ্ট। এ দেশে যে ১৬ কোটি মানুষ আছে, তারা যে দেশের জন্য ভাবে, তাদেরও যে মতামতের প্রয়োজন আছে এটা মনেই করছেন না। কোনো জাতির জন্য এ ধরনের পরিস্থিতি খুব ভয়ঙ্কর।
· ঢাকা কলেজের ‘আমি তৃঞ্চার্ত পথিক’ লিখেছেন : মাননীয় অবৈধ প্রধানমন্ত্রী। আপনি বাংলাদেশে মানুষের মুখের হাসি সেভাবেই ফোটাতে চান যেভাবে আপনার বাবা ’৭৪ সালে ফুটিয়েছিল। তখন বাংলাদেশের মানুষ হাসতে হাসতে না খেয়ে রাস্তায় লাশ হয়ে পড়ে ছিল। আপনি সেভাবেই মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে চান যেভাবে আপনার বাবা সিরাজ শিকদারের মুখে হাসি ফুটিয়েছিলেন। তিনি হাসতে হাসতে পুলিশের গুলিতে ক্রসফায়ারের মাধ্যমে মরে পড়েছিলেন। সেভাবেই হাসি ফোটাতে চান যেভাবে আপনার বাবার চামচারা কলকাতার বাজারে বাংলাদেশের খাদ্যদ্রব্য বিক্রি করে দিয়ে বাংলাদেশের ৪ লক্ষ হতভাগা জনগণকে হাসতে হাসতে মৃত্যুবরণ করতে বাধ্য করেছিলেন। আপনিও ঠিক সেভাবেই মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে অবৈধভাবে ক্ষমতায় এসেছেন।
· ‘আমি তৃঞ্চার্ত পথিক’কে সমর্থন করে পিনু চৌধুরী লিখেছেন : এসব মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ। হাসিনা দিদি কয় কী? বুকের রক্ত দিবো? দিদির বুকের ভিতর বাকশাল আছে। তবে কি অভাগা দেশের শেষ রক্ষা নেই? (হায়রে বাঙালি + হায়রে বাংলাদেশী।)
· এমডি শাহাজাহান খান লিখেছেন : কেউ রক্ত দেয় কারো রক্ত নেয়। দেয়া আর নেয়া দুটো এক নয়। আপনার বাসনা যত তাড়াতাড়ি পূর্ণ হবে, ততই দেশের মঙ্গল।
· নুর আবসার জনি প্রশ্ন প্রকাশ করেছেন, তার মানে কি আবার বাংলাদেশের জনগণের জন্য ৭২-৭৫ (এর) মতো কালো অধ্যায়ের সূচনা হলো?
· আহমেদ রুমান শামসি লিখেছেন : অনাকাঙ্ক্ষিত উত্তেজনা ও নাটকীয় ইউ-টার্ন (পল্টি) করার জন্য বাল (বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ) প্রধানের (অনুরাগীরা ও ভারত সরকার) আপনাকে নির্দয়ভাবে হত্যা করবে এবং দেশের জন্য আপনাকে আত্মত্যাগের (কথা বলিয়ে) আপনাকে সে বার্তাই (হিন্দুত্ববাদের বলি) পৌঁছিয়ে দেয়া হচ্ছে। আপনি আপনার পাপের জন্য চিন্তিত এবং জাহান্নাম হতে মুক্তি পাবার জন্য আপনি (এ) ধরনের মৃত্যু কামনা করছেন। কিন্তু আল্লাহ (ছুবহান্নাল্লাহু) সবকিছু জানেন অথবা আপনার অন্তরে তা সৃজন করেছেন। আরো ক্ষতিসাধন হতে দেশকে রক্ষা করতে আল্লাহ আপনাকে সাহায্য করুন।
· জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আল হোসাইন লিখেছেন : বাবাতো দেশের মানুষের জন্য রক্ত দেন নাই, নিজ বংশের আধিপত্য বিস্তারের জন্য রক্ত দিয়েছিলেন। ‘বাকশালের জন্য বর্তমানে শেখ মুজিব বাংলাদেশের সবচেয়ে ঘৃণিত ব্যক্তি’। আপনিও কি ওই পথে যেতে চান, তাহলে তো জনগণের আর বুঝতে বাকি রইলো না, ‘বাপকা বেটা, সিপাইকা ঘোড়া’। তাহলে বাংলার মানুষ আর একটি ঘৃণিত মুখ দেখবে, সেই অপেক্ষায় রইলাম।
· কাওসার খানের মন্তব্য : ২৫ মার্চ মুজিব...আত্মসমর্পণ করে পাকিস্তানে চলে যান। বাঙালি আর্মডফোর্স প্রতিরোধ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ২৫ মার্চ রাতে ওসমানী সাহেবকে হত্যার জন্য এক প্লাটুন পাকিস্তানি সৈন্য উনার বাড়িতে আক্রমণ করে। আল্লাহর রহমতে ওসমানী সাহেব বেঁচে যান। এদিকে চট্টগ্রামে প্রতিরোধ যুদ্ধরত কর্নেল এম আর চৌধুরী শহীদ হন। ২৭ মার্চ জিয়া নেতৃত্ব নিয়ে নিজেকে প্রেসিডেন্ট বলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন...।
· কাজী শাহাজাহন বলেন, ৭ মার্চ শেখ মুজিব রেস কোর্স (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) ময়দানে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরো দেব, তবুও এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ। প্রকৃতপক্ষে শেখের পরিবার থেকে স্বাধীনতা যুদ্ধ থেকে শুরু করে আজ অবধি দেশের জন্য এক ফুটা (ফোঁটা) রক্ত কেউ বিসর্জন দিয়েছেন কি? ফাল্তু কথা ছেড়ে দিন। আপনার ভাওতাবাজি জনগণের আর বুঝার বাকি নাই।
· আবদুল সালামের মন্তব্য এ রকম : তুই নিজের ভোটটা দিতে পারলি না, তুই ভারতের তলের কুটুম।
· কাজী শাহাজাহন আরেকটি মন্তব্যে লিখেছেন : আল্লাহ, তুমি হাসিনার মনোবাসনা পুরা করে দাও। আমিন।
· সোলা খানের পরামর্শ : আপনি দয়া করে বিদায় নিন, আপনার পচা রক্ত বাংলাদেশের প্রয়োজন নাই, ভারতেরই প্রয়োজন।
· শেখ মোহাম্মদ বোরহান উদ্দিনের সাফ কথা : রক্তটক্ত দিতে হবে না বোন, দয়া করে বিশ্রামে যান, বাংলার মানুষকে বিশ্বসভায় মর্যাদার আসনে আসীন করার জন্য এইটুকু যথেষ্ট আপনার পক্ষ থেকে। আপনার পায়ে পড়ে অঝোর ধারায় কান্না করে মিনতি করছি আমি সবার পক্ষ থেকে...!
· ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্দিক মিয়া প্রশ্ন রেখেছেন : হাসিনা যদি এতই সাহসী হয়ে থাকেন, তাহলে তিনি কেন ছয় স্তরবিশিষ্ট নিরাপত্তা বেষ্টনী ছাড়া চলাফেরা করেন না।
· জিন্দাল জুবলি হাইস্কুলের মনির হোসেন লিখেছেন : হায়েনা রক্ত ছাড়া কিছু বোঝে না। আমার ফাঁসি চাই বইটি পড়ে দেখুন। (hayena rokto chara kichui buje na. amar fasi chai boiti pore dekhun)
· কামাল রহমান ইংরেজিতে লিখেছেন : প্রিয় প্রধানমন্ত্রী, আমি খুশি যে, আপনার বাবার জন্য আপনার গভীর ভালোবাসা রয়েছে। মহান ব্যক্তিরা উদাহরণ সৃষ্টি করেই বেঁচে থাকেন (অমর হন), লম্বা লম্বা কথা বলে নয়। আপনার কথার মধ্যে বেশ স্ববিরোধিতা (discrepancy) বৈপরীত্য রয়েছে। আপনি আপনার বাবার ধারেকাছেও নেই। আপনার বাবার মতো রক্ত দেয়ার কোনো প্রস্তুতি আপনার নেই, বরং আপনি শিশুদের হত্যা করে বাবাদের রক্ত নিচ্ছেন, যেমনটি আপনার বাবা হিটলারের মতোই বাংলাদেশের প্রতিটি পিতার সন্তানদের রক্ত নিয়েছে।
· সানা দীন মনে করেন : রক্ত নিয়ে লেখা বন্ধ করার এটাই প্রকৃষ্ট সময়। আপনি আপনার পিতা থেকে উত্তম হতে পারেন । রক্ত দেয়ার নির্বোধ বক্তব্য ছাড়ুন। বাংলাদেশের জনগণ আপনার রক্ত চায় না। তারা আপনার ভালোবাসা চায়। একটি দলের নেত্রী হিসেবে এবং একজন মহিলার মুখে এমন ধরনের বক্তব্য অসুস্থ মানসিকতার পরিচয় বহন করে। প্রাচীন প্রবাদ বলে, ডাণ্ডা দিয়ে আপনি একটি মৌমাছিও ধরতে পারবেন না, কিন্তু মধু দিয়ে মৌমাছি ধরতে পারবেন। এটা হলো সহজতম উপায়। লোভের বশীভূত হয়ে এবং আপনার দলের মানুষদের অসুস্থ মানসিকতার কারণে আপনি আপনার রাজনৈতিক জীবন ধ্বংস করেছেন। তাদের নিয়ন্ত্রণ করার কোনো ক্ষমতা আপনার নেই। যদি আপনি তা চান, তবে ধীরে ধীরে তা করতে পারেন। কিন্তু এজন্য প্রথমে আপনি আপনাকে শুধরিয়ে নিন। ...
· আহমেদ আরিফ লিখেছেন : যিনি লঞ্চ ভ্রমণে নিরাপত্তার জন্য পুরো এক দিন দেশের সবচেয়ে বড় টার্মিনাল বন্ধ করে দেন, যিনি কোথাও যাওয়ার আগে সে রাস্তা ৫ ঘণ্টা আগে বন্ধ করে দেন, যিনি বুলেটপ্রুফ বাক্সের ভেতর দাঁড়িয়ে জাতীয় সংগীত গান, তিনি ‘প্রয়োজনে বাবার মতো বুকের রক্ত দেব’ বলেন, তখন কি আর আবেগে না কাইন্দা পারা যায়?
· ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনৈক শিক্ষার্থীর প্রশ্ন : বাবা বাকশাল করে রক্ত দিছেন, আপনি কেন ব্লাড (রক্ত) দিবেন? এমন কী কাজ করেছেন যে, আপনাকে রক্ত দিতে হবে? আপনি একনায়ক (ডিক্টেটর) তাই?
· ‘এই তো আমি’র মন্তব্য : তার বাবা স্বেচ্ছায় রক্ত দেননি, বরং তিনি ৩০ হাজার বাংলাদেশী মানুষকে খুন করেছেন। ওই রক্ত-শোষক তার অপকর্মের জন্যই খুন হয়েছিলেন। হাসিনা তার পিতার ভাগ্য বরণ করতে যাচ্ছেন।
· রনি চৌধুরীর লিখেছেন : আপনি দেহরক্ষী ছাড়া জনগণের কাছে এসেছেন? আপনার বুকের রক্ত নেয়া হবে, আপনার ইচ্ছাটা পূরণ হবে।
শেখ হাসিনা তার বাবার মৃত্যু থেকে না হোক, অন্তত এসব মন্তব্য থেকে শিক্ষা নিতে পারতেন। শেখ মুজিব যে যে কারণে তার জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছেন, সেগুলো পরিহার করে শেখ হাসিনা জনগণের কাছে নেমে আসতে পারতেন। ক্ষমতায় থাকার জন্য জনগণের ভোটাধিকার ছিনতাই করে নিজেকে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী বা সরকারপ্রধান হিসেবে দাবি করে তিনি প্রমাণ করেছেন তার বিবেক থেকে ন্যায়-অন্যায়ের অনুভূতি মরে গেছে। পবিত্র কোরআনে সুরা নিসার ৪২নং আয়াতে স্পষ্ট বলা হয়েছে : তোমরা সত্যকে মিথ্যার সঙ্গে মিশিয়ে দিয়ো না এবং জানা সত্যকে তোমরা গোপন কোরো না। অন্যদিকে মহানবীর একটি অতি পরিচিত হাদিসে বলা হয়েছে : যখন তোমার উত্তম কাজ তোমাকে আনন্দ দেয় এবং মন্দ কাজ পীড়া দেয়, তখন তুমি প্রকৃত মোমেন। মদিনা সনদ বাস্তবায়নে ওয়াদাবদ্ধ শেখ হাসিনাই এখন ঠিক করুন তার অবস্থান আসলে কোথায়?
অভ্যেস যায় না মলে
ভোটবিহীন নির্বাচনে জয়ী হয়ে সংসদ সদস্যরা যেন এলাকায় এক-একজন বিজয়ী বীর হয়ে
উঠেছেন। নিজেদের সংবর্ধনায় ‘হাতি-ঘোড়া’ আনার ব্যবস্থা করতেও পিছিয়ে থাকতে
চান না তারা। বাস্তবে হাতি-ঘোড়া পাওয়া না গেলেও এলাকার কোমলমতি শিশুদের
ঠিকই পাওয়া যায়। হাতে ফুল নিয়ে প্রচণ্ড রোদের মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা
দাঁড়িয়ে রাখার দৃশ্য পত্রিকায় ছাপা হওয়ার পর সমালোচনার মুখে শীর্ষ পর্যায়
থেকে তা বন্ধের নির্দেশ ঘটা করে প্রচারিত হয়েছিল। কিন্তু কে শোনে কার কথা!
বিনা ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি বলে কথা!
গত সোমবার নারায়ণগঞ্জের এক আলোচিত সংসদ সদস্য সিদ্ধিরগঞ্জের একটি স্কুল অ্যান্ড কলেজে গিয়েছিলেন। সেখানকার বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণ, কৃতী শিক্ষার্থী এবং জাতীয় স্কুল পর্যায়ে কৃতী খেলোয়াড়দের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি তিনি। পদাধিকারবলে এই প্রতিষ্ঠানের সভাপতিও। আর দাপুটে নেতা হিসেবে তিনি জগত্জুড়েই পরিচিত। এমন একজনের মনোরঞ্জনে প্রতিষ্ঠানটির কর্তৃপক্ষ কিছু করতে বাকি রাখেনি। কয়েকশ’ শিশু শিক্ষার্থীকে রাস্তার দু’পাশে জাতীয় পতাকা হাতে দাঁড় করিয়ে রাখতেও পিছিয়ে থাকেননি তারা। চৈত্রের খরতাপে মানুষ যখন ঘরের ভেতরেই হাসফাঁস করছে, তখন কচি কচি ছেলেমেয়েদের এমন রৌদ্রদণ্ড দিয়ে হলেও তারা নেতার মন রক্ষা করতে চেয়েছেন। জননেতা বলে কথা! তাই অনুষ্ঠান শুরুর আধা ঘণ্টা পর আসেন তিনি। নির্দিষ্ট সময়ের এক ঘণ্টা আগে থেকে প্রচণ্ড রোদে দাঁড়িয়ে থাকতে শিশুদের কী অবস্থা হয়েছিল সেটা বুঝতে কারও অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। তবে ওই জননেতাকে গাড়িতে চড়ে অনুষ্ঠান শেষে ফেরার পথে গরমে অসুস্থ হয়ে রাজধানীর একটি অভিজাত হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল বলে খবর পাওয়া গেছে। এর আগেও গত মাসের শেষ দিকে একইভাবে অন্য একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অনুষ্ঠানে তার আগমন উপলক্ষে স্কুলের শিক্ষার্থীদের প্রচণ্ড রোদের মধ্যে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছিল। অর্থাত্ এটাই তার পছন্দের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে বলা যায়।
আওয়ামী লীগের আলোচিত নেতা হলেও নারায়ণগঞ্জে তার সম্পর্কে অনেক কথাই শোনা যায়। দেশের মানুষও তাকে ভালো করেই চেনে অতীত ও বর্তমান কর্মকাণ্ডের কারণে। সরকার ও দলের শীর্ষ পর্যায়ের নির্দেশ থোরাই কেয়ার করেন তিনি। জনপ্রতিনিধিদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে স্কুলের শিক্ষার্থীদের রাস্তায় দাঁড় করিয়ে রাখার ওপর সরকারের কড়াকড়ি বিধিনিষেধ থাকলেও তিনি তা মানার বান্দা যে নন সেটা দেখাই যাচ্ছে। আওয়ামী লীগে এখন এমন নেতাদেরই কদর বেশি। ছাত্রলীগ-যুবলীগেরও একই চিত্র। অস্ত্রবাজ, সন্ত্রাসী, টেন্ডারবাজ, চাঁদাবাজদের ভিড় জমেছে সর্বত্র। অভিজাত এলাকায় বায়িং হাউস বানিয়ে মাদক সেবনের আড্ডা ও নির্যাতন কেন্দ্র চালু রাখার খবর গতকালের কাগজেই ফলাও করে ছাপা হয়েছে। অর্থাত্ ক্ষমতাসীনদের কোনো অপকর্মের এখন আর রাখঢাক নেই। তারা তো পাঁচ বছরের জণ্যই ক্ষমতা পেয়ে গেছে! তাই এতটাই বেপরোয়াপনা দেখা যাচ্ছে যা আগে কমই হয়েছে। এসব যেন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। কথায় বলে—অভ্যেস যায় না মলে, ইল্লত যায়না ধুলে!
গত সোমবার নারায়ণগঞ্জের এক আলোচিত সংসদ সদস্য সিদ্ধিরগঞ্জের একটি স্কুল অ্যান্ড কলেজে গিয়েছিলেন। সেখানকার বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণ, কৃতী শিক্ষার্থী এবং জাতীয় স্কুল পর্যায়ে কৃতী খেলোয়াড়দের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি তিনি। পদাধিকারবলে এই প্রতিষ্ঠানের সভাপতিও। আর দাপুটে নেতা হিসেবে তিনি জগত্জুড়েই পরিচিত। এমন একজনের মনোরঞ্জনে প্রতিষ্ঠানটির কর্তৃপক্ষ কিছু করতে বাকি রাখেনি। কয়েকশ’ শিশু শিক্ষার্থীকে রাস্তার দু’পাশে জাতীয় পতাকা হাতে দাঁড় করিয়ে রাখতেও পিছিয়ে থাকেননি তারা। চৈত্রের খরতাপে মানুষ যখন ঘরের ভেতরেই হাসফাঁস করছে, তখন কচি কচি ছেলেমেয়েদের এমন রৌদ্রদণ্ড দিয়ে হলেও তারা নেতার মন রক্ষা করতে চেয়েছেন। জননেতা বলে কথা! তাই অনুষ্ঠান শুরুর আধা ঘণ্টা পর আসেন তিনি। নির্দিষ্ট সময়ের এক ঘণ্টা আগে থেকে প্রচণ্ড রোদে দাঁড়িয়ে থাকতে শিশুদের কী অবস্থা হয়েছিল সেটা বুঝতে কারও অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। তবে ওই জননেতাকে গাড়িতে চড়ে অনুষ্ঠান শেষে ফেরার পথে গরমে অসুস্থ হয়ে রাজধানীর একটি অভিজাত হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল বলে খবর পাওয়া গেছে। এর আগেও গত মাসের শেষ দিকে একইভাবে অন্য একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অনুষ্ঠানে তার আগমন উপলক্ষে স্কুলের শিক্ষার্থীদের প্রচণ্ড রোদের মধ্যে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছিল। অর্থাত্ এটাই তার পছন্দের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে বলা যায়।
আওয়ামী লীগের আলোচিত নেতা হলেও নারায়ণগঞ্জে তার সম্পর্কে অনেক কথাই শোনা যায়। দেশের মানুষও তাকে ভালো করেই চেনে অতীত ও বর্তমান কর্মকাণ্ডের কারণে। সরকার ও দলের শীর্ষ পর্যায়ের নির্দেশ থোরাই কেয়ার করেন তিনি। জনপ্রতিনিধিদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে স্কুলের শিক্ষার্থীদের রাস্তায় দাঁড় করিয়ে রাখার ওপর সরকারের কড়াকড়ি বিধিনিষেধ থাকলেও তিনি তা মানার বান্দা যে নন সেটা দেখাই যাচ্ছে। আওয়ামী লীগে এখন এমন নেতাদেরই কদর বেশি। ছাত্রলীগ-যুবলীগেরও একই চিত্র। অস্ত্রবাজ, সন্ত্রাসী, টেন্ডারবাজ, চাঁদাবাজদের ভিড় জমেছে সর্বত্র। অভিজাত এলাকায় বায়িং হাউস বানিয়ে মাদক সেবনের আড্ডা ও নির্যাতন কেন্দ্র চালু রাখার খবর গতকালের কাগজেই ফলাও করে ছাপা হয়েছে। অর্থাত্ ক্ষমতাসীনদের কোনো অপকর্মের এখন আর রাখঢাক নেই। তারা তো পাঁচ বছরের জণ্যই ক্ষমতা পেয়ে গেছে! তাই এতটাই বেপরোয়াপনা দেখা যাচ্ছে যা আগে কমই হয়েছে। এসব যেন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। কথায় বলে—অভ্যেস যায় না মলে, ইল্লত যায়না ধুলে!
লঙ্ঘিত মানবাধিকারের কিছু কথা
সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে যে অধিকারগুলো মানুষের মৌলিক অধিকার হিসেবে
স্বীকৃতি পেয়েছে তা-ই মানবাধিকার। যার মর্মবাণী হলো ধর্ম, বর্ণ, গোত্র,
ধনী-গরিব নির্বিশেষে সব মানুষ সমান অধিকার ভোগ করবে। মানুষের সুশৃঙ্খল
জীবনযাত্রায় থাকবে না কোনো বিভেদের প্রাচীর। কিন্তু বিগত শতাব্দীতে ঘোষিত
মানবাধিকারের ঘোষণাগুলো একবিংশ শতাব্দীতে যেন প্রহসনের সংলাপে পরিণত হয়েছে।
সারা বিশ্বে নানাভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে মানবতা, পুঁজিবাদী দেশগুলোর আগ্রাসন আর
উন্নয়নশীল দেশগুলোর দারিদ্র্যে স্পষ্টত প্রতীয়মান, বিশ্বে লঙ্ঘিত হচ্ছে
মানবতা যেখানে বাংলাদেশের মানবাধিকার অবস্থা অনেক শোচনীয়। বিগত দিনগুলো
থেকে ক্রমে মানবাধিকার পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে। বৈশ্বিক মানবাধিকার
পরিস্থিতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতর প্রকাশিত মানবাধিকার
প্রতিবেদনে বাংলাদেশে বিচার কাজের দীর্ঘসূত্রতা, গণমাধ্যমে মত প্রকাশের ওপর
সরকারের কড়াকড়ি, হত্যা, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডসহ দলীয় ব্যক্তিদের
গ্রেফতারি পরোয়ানাসহ সব ধরনের অন্যায় নিয়ে ২০১৩ সালে এবং বর্তমানেও
বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেছে।
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে থাকা ব্যক্তিদের নিরাপওা নিয়েও
সমালোচনা করা হয়। বলা হয়, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে বন্দি থাকা ব্যক্তিদের
নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। কিন্তু তথাকথিত বন্দুকযুদ্ধের নামে
মেগাসিরিয়াল ঘটনা সাজিয়ে ক্রসফায়ারে আসামি হত্যা বন্ধ হচ্ছে না। এই ধরনের
হত্যাকাণ্ড মানবাধিকার পরিপন্থী। দেশের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক বোয়ালদের শিকার
হচ্ছে সাধারণ মানুষ। ক্ষমতাসীনরা নিজেদের ইচ্ছামত আইনকে ব্যবহার করে বিরোধী
দলকে হেনস্তা করছে। মানবাধিকার কমিশনার ক্ষোভ জানিয়ে সরাসরি বলেছেন যে,
২০১৩ সালের শেষ থেকে ২০১৪ সালের এ পর্যন্ত বিচারবহির্ভূত হত্যা ও
মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে মারাত্মক হারে। বিশ্বের প্রতিটি দেশের মধ্যে
শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক ও মানবতাবিরোধী কাজ থেকে সবাইকে দূরে রাখার জন্য সব
ধরনের বৈষম্য বিলোপ এবং সার্বজনীন মানবাধিকার রক্ষার জন্য ১৯৪৮ সালের ১০
ডিসেম্বর জাতিসংঘ প্যারিসে মানবাধিকার ঘোষণা করা হয় । বর্তমান বাংলাদেশের
মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে সমলোচনা করতে গিয়ে এই সঙ্কট থেকে উওরণের জন্য
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জাতিসংঘের হস্তক্ষেপও কামনা করে। যে
কোনো দেশের মানবাধিকার লঙ্ঘন রোধে অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারে
মানবাধিকার কমিশন। কিন্তু মানবাধিকার কমিশনারের উচ্চ বক্তব্য ও চোখের জল
ছাড়া জনগণ তেমন কিছুই দেখতে পায় না, সুফলও ভোগ করে না। অকল্পনীয় হলেও
বাস্তব যে, যে দেশের মানবাধিকার এতভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে সে দেশের জাতীয়
মানবাধিকার কমিশন লোকবলের অভাবে কাজ করতে পারছে না। এই ছোট দেশে যখন সরকারি
হিসাবে ১৬ কোটি লোক বাস করে, লাখ লাখ শিক্ষিত যুবক-যুবতী বেকার দিন যাপন
করে—সে দেশের মানবাধিকার কমিশনে কাজ করার মতো লোক নেই এটা শুধু দুঃখের নয়,
হতাশার বিষয়।
বিচারবহির্ভূত হত্যা ও মানবাধিকার লঙ্ঘন সম্পর্কে কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান বলেন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড কিছুতেই থামছে না। প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের পর প্রায় একই রকম গল্প বলছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তবে বিচারবহির্ভূত এসব হত্যাকাণ্ডকে মানবাধিকার কর্মীরা দেখছেন রাষ্ট্রীয় হত্যা হিসেবে। রাষ্ট্রের মদত না থাকলে ধারাবাহিকভাবে এমন হত্যাকাণ্ড সম্ভব হতো না। দীর্ঘদিন ধরেই এ ধরনের হত্যাকাণ্ড বন্ধ করে অভিযুক্তদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানানো হচ্ছে। সরকারের কর্তব্য ব্যক্তিরা বলছে, তাদের সময়ে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড কোনোভাবেই মেনে নেয়া হবে না। তাহলে দেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড চলছে কার ইশারায়। কাদের প্রশ্রয়ে? মানবাধিকার পরিস্থিতির অবনতির জন্য যারা দায়ী তারা যেমন নিজেদের বিবেকের কাছে বন্দি, তেমনি জাতির কাছেও অপরাধী। তিনি আরও বলেন, বর্তমানে যে লোকবল নিয়ে কমিশন চলছে, এই লোকবল নিয়ে কাজ করা অসম্ভব। তবে মানবাধিকার কমিশন চুপ নেই। তা চলমান আছে, আমরা পার্শ্ববর্তী উন্নত দেশগুলোর মানবাধিকারের কাজ করার অভিজ্ঞতা নিয়ে কাজ করতে পারি, সেজন্য যেমন প্রয়োজন লোকজনের তেমনি বিচার বিভাগের স্বচ্ছতাও প্রয়োজন। লোক বাড়ানোর জন্য আমরা অনেক আগেই আহ্বান জানিয়েছি। প্রতিশ্রুতি পেলেও এখনও বাস্তবায়ন আমরা পাইনি। তার পরও বলব, আগের চেয়ে কিছুটা হলেও কাজ চলছে। জনগণ জানে যে তাদের অধিকার লঙ্ঘিত হলে কোথায় জানাতে হবে। এখন এখানে অনেক অভিযোগ আসে। আমরা চেষ্টা করছি।
মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যানের কথাগুলো নতুন কিছু নয়। সেই লিমনের ঘটনার পর থেকে এমন বক্তব্য আমরা প্রায়ই শুনে আসছি। বর্তমানে যে কোনো সময়েই যে কোনো ইস্যুতে বক্তব্য দিতে গিয়ে ক্ষমতাসীন দলের নেতারা বলেন, ওনারা দেশ পরিচালনা করে নির্বাচন দিয়ে গণতন্ত্রকে রক্ষা করছেন। আর অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তি বলেছেন, এভাবে দেশ পরিচালনায় গণতন্ত্রকে হত্যা করা হচ্ছে। আবার গণতন্ত্রের সঙ্গে সংবিধানের কথাও উঠে আসছে। প্রাবন্ধিক-কলামিস্ট, রাজনীতিক ও জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের সভাপতি বদরুদ্দীন উমর বলেন, দেশে যে সংবিধান আছে সেই সংবিধান জনগণের মাথা ন্যাড়া করছে। এ সংবিধানকে কুর্ণিশ করার কারণ জনগণের নেই। যাদের কুর্ণিশ করার দরকার তারা করছে, জনগণকে শোষণ করার জন্য সংবিধানের দোহাই দিয়ে তারা তাদের স্বার্থ হাসিল করছে।
গণতন্ত্র ও মানবাধিকার একটি অপরটির পরিপূরক। মানবাধিকার রক্ষিত হলেই গণতন্ত্র রক্ষিত হবে। গণতন্ত্রের পথ সহজ ও সরল হবে। কিন্তু রাজনীতির দাবার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে আমাদের গণতন্ত্র ও সংবিধান। সরকারের দায়িত্ব হলো আইনকে তার নিজস্ব গতিতে চলতে দেয়া, কিন্তু সরকার আইনকে তাদের হাতের মাটির পুতুল বানিয়ে রেখেছে। সরকারের মুখোমুখি না দাঁড়িয়ে পেছন থেকে ঢিল ছুড়ছে বিরোধী দলগুলো। একে অন্যের দিকে ঢিল ছুড়ে, সেই ঢিল গিয়ে পড়ে সাধারণের গায়ে।
জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করা প্রতিষ্ঠানটিতে কাজ করার লোকের সংখ্যা শুনলেও অট্টহাসি না এসে পারে না। বর্তমান চেয়ারম্যানসহ সাত সদস্য ও জনপ্রশাসন থেকে প্রেষণে আসা পাঁচ কর্মকর্তা দিয়ে পুরো মানবাধিকার কমিশনের কাজ চলছে। তার মধ্যে চেয়ারম্যান ও এক সদস্য ছাড়া বাকি ৫ জন অবৈতনিক হিসেবে কাজ করছেন। প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের যুগ্ম সচিব, উপসচিব, সিনিয়র সহকারী সচিব পদমর্যাদায় যারা আছেন তারাও চাকরির কারণে সরকারের আজ্ঞাবহ হিসেবে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন—এমন শোনা যায়। তাহলে যেখানে সরকারের ইশারায় কাজ হয়, প্রশাসনকে চলতে পথ দেখায় সরকার—সে দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি আর কেমন হওয়ার কথা। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন-২০০৯ এর ১২(১) (ট) ধারায় বলা হয়েছে—‘মানবাধিকার লঙ্ঘন বা লঙ্ঘিত হতে পারে এমন অভিযোগের উপর তদন্ত অনুসন্ধান করিয়া মধ্যস্থতা ও সমঝোতার মাধ্যমে অভিযোগ নিষ্পত্তি করা।’ কিন্তু লঙ্ঘিত হতে পারে এমন নয়, লঙ্ঘিত হওয়ার পরও কাজ করতে পারছে না কমিশন। মানবাধিকার কমিশন সম্পর্কে জনগণ আগের চেয়ে জানতে পারছে বিধায় জনগণ তাদের অভিযোগ জানাতে আসে। কিন্তু অভিযোগ রাখা পর্যন্তই অনেক অভিযোগ সীমাবদ্ধ থাকে। কিছু কিছু তদন্তের নামে যা হয় তাও আবার প্রকাশের জন্য দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হয়। আর তদন্তে রুই-কাতলা-বোয়াল কিছু উঠে এলে তো কথাই নেই। তদন্ত সেখানেই ঘুমিয়ে পড়ে। লঙ্ঘন যেমন অপরাধ, তেমনি তদন্ত প্রকাশ না করাও বিরাট অপরাধ। এ থেকে আর কবে মুক্তি আসবে।
বিচারবহির্ভূত হত্যা ও মানবাধিকার লঙ্ঘন সম্পর্কে কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান বলেন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড কিছুতেই থামছে না। প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের পর প্রায় একই রকম গল্প বলছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তবে বিচারবহির্ভূত এসব হত্যাকাণ্ডকে মানবাধিকার কর্মীরা দেখছেন রাষ্ট্রীয় হত্যা হিসেবে। রাষ্ট্রের মদত না থাকলে ধারাবাহিকভাবে এমন হত্যাকাণ্ড সম্ভব হতো না। দীর্ঘদিন ধরেই এ ধরনের হত্যাকাণ্ড বন্ধ করে অভিযুক্তদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানানো হচ্ছে। সরকারের কর্তব্য ব্যক্তিরা বলছে, তাদের সময়ে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড কোনোভাবেই মেনে নেয়া হবে না। তাহলে দেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড চলছে কার ইশারায়। কাদের প্রশ্রয়ে? মানবাধিকার পরিস্থিতির অবনতির জন্য যারা দায়ী তারা যেমন নিজেদের বিবেকের কাছে বন্দি, তেমনি জাতির কাছেও অপরাধী। তিনি আরও বলেন, বর্তমানে যে লোকবল নিয়ে কমিশন চলছে, এই লোকবল নিয়ে কাজ করা অসম্ভব। তবে মানবাধিকার কমিশন চুপ নেই। তা চলমান আছে, আমরা পার্শ্ববর্তী উন্নত দেশগুলোর মানবাধিকারের কাজ করার অভিজ্ঞতা নিয়ে কাজ করতে পারি, সেজন্য যেমন প্রয়োজন লোকজনের তেমনি বিচার বিভাগের স্বচ্ছতাও প্রয়োজন। লোক বাড়ানোর জন্য আমরা অনেক আগেই আহ্বান জানিয়েছি। প্রতিশ্রুতি পেলেও এখনও বাস্তবায়ন আমরা পাইনি। তার পরও বলব, আগের চেয়ে কিছুটা হলেও কাজ চলছে। জনগণ জানে যে তাদের অধিকার লঙ্ঘিত হলে কোথায় জানাতে হবে। এখন এখানে অনেক অভিযোগ আসে। আমরা চেষ্টা করছি।
মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যানের কথাগুলো নতুন কিছু নয়। সেই লিমনের ঘটনার পর থেকে এমন বক্তব্য আমরা প্রায়ই শুনে আসছি। বর্তমানে যে কোনো সময়েই যে কোনো ইস্যুতে বক্তব্য দিতে গিয়ে ক্ষমতাসীন দলের নেতারা বলেন, ওনারা দেশ পরিচালনা করে নির্বাচন দিয়ে গণতন্ত্রকে রক্ষা করছেন। আর অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তি বলেছেন, এভাবে দেশ পরিচালনায় গণতন্ত্রকে হত্যা করা হচ্ছে। আবার গণতন্ত্রের সঙ্গে সংবিধানের কথাও উঠে আসছে। প্রাবন্ধিক-কলামিস্ট, রাজনীতিক ও জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের সভাপতি বদরুদ্দীন উমর বলেন, দেশে যে সংবিধান আছে সেই সংবিধান জনগণের মাথা ন্যাড়া করছে। এ সংবিধানকে কুর্ণিশ করার কারণ জনগণের নেই। যাদের কুর্ণিশ করার দরকার তারা করছে, জনগণকে শোষণ করার জন্য সংবিধানের দোহাই দিয়ে তারা তাদের স্বার্থ হাসিল করছে।
গণতন্ত্র ও মানবাধিকার একটি অপরটির পরিপূরক। মানবাধিকার রক্ষিত হলেই গণতন্ত্র রক্ষিত হবে। গণতন্ত্রের পথ সহজ ও সরল হবে। কিন্তু রাজনীতির দাবার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে আমাদের গণতন্ত্র ও সংবিধান। সরকারের দায়িত্ব হলো আইনকে তার নিজস্ব গতিতে চলতে দেয়া, কিন্তু সরকার আইনকে তাদের হাতের মাটির পুতুল বানিয়ে রেখেছে। সরকারের মুখোমুখি না দাঁড়িয়ে পেছন থেকে ঢিল ছুড়ছে বিরোধী দলগুলো। একে অন্যের দিকে ঢিল ছুড়ে, সেই ঢিল গিয়ে পড়ে সাধারণের গায়ে।
জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করা প্রতিষ্ঠানটিতে কাজ করার লোকের সংখ্যা শুনলেও অট্টহাসি না এসে পারে না। বর্তমান চেয়ারম্যানসহ সাত সদস্য ও জনপ্রশাসন থেকে প্রেষণে আসা পাঁচ কর্মকর্তা দিয়ে পুরো মানবাধিকার কমিশনের কাজ চলছে। তার মধ্যে চেয়ারম্যান ও এক সদস্য ছাড়া বাকি ৫ জন অবৈতনিক হিসেবে কাজ করছেন। প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের যুগ্ম সচিব, উপসচিব, সিনিয়র সহকারী সচিব পদমর্যাদায় যারা আছেন তারাও চাকরির কারণে সরকারের আজ্ঞাবহ হিসেবে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন—এমন শোনা যায়। তাহলে যেখানে সরকারের ইশারায় কাজ হয়, প্রশাসনকে চলতে পথ দেখায় সরকার—সে দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি আর কেমন হওয়ার কথা। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন-২০০৯ এর ১২(১) (ট) ধারায় বলা হয়েছে—‘মানবাধিকার লঙ্ঘন বা লঙ্ঘিত হতে পারে এমন অভিযোগের উপর তদন্ত অনুসন্ধান করিয়া মধ্যস্থতা ও সমঝোতার মাধ্যমে অভিযোগ নিষ্পত্তি করা।’ কিন্তু লঙ্ঘিত হতে পারে এমন নয়, লঙ্ঘিত হওয়ার পরও কাজ করতে পারছে না কমিশন। মানবাধিকার কমিশন সম্পর্কে জনগণ আগের চেয়ে জানতে পারছে বিধায় জনগণ তাদের অভিযোগ জানাতে আসে। কিন্তু অভিযোগ রাখা পর্যন্তই অনেক অভিযোগ সীমাবদ্ধ থাকে। কিছু কিছু তদন্তের নামে যা হয় তাও আবার প্রকাশের জন্য দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হয়। আর তদন্তে রুই-কাতলা-বোয়াল কিছু উঠে এলে তো কথাই নেই। তদন্ত সেখানেই ঘুমিয়ে পড়ে। লঙ্ঘন যেমন অপরাধ, তেমনি তদন্ত প্রকাশ না করাও বিরাট অপরাধ। এ থেকে আর কবে মুক্তি আসবে।
Subscribe to:
Posts (Atom)