লঙ্ঘিত মানবাধিকারের কিছু কথা

সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে যে অধিকারগুলো মানুষের মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে তা-ই মানবাধিকার। যার মর্মবাণী হলো ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, ধনী-গরিব নির্বিশেষে সব মানুষ সমান অধিকার ভোগ করবে। মানুষের সুশৃঙ্খল জীবনযাত্রায় থাকবে না কোনো বিভেদের প্রাচীর। কিন্তু বিগত শতাব্দীতে ঘোষিত মানবাধিকারের ঘোষণাগুলো একবিংশ শতাব্দীতে যেন প্রহসনের সংলাপে পরিণত হয়েছে। সারা বিশ্বে নানাভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে মানবতা, পুঁজিবাদী দেশগুলোর আগ্রাসন আর উন্নয়নশীল দেশগুলোর দারিদ্র্যে স্পষ্টত প্রতীয়মান, বিশ্বে লঙ্ঘিত হচ্ছে মানবতা যেখানে বাংলাদেশের মানবাধিকার অবস্থা অনেক শোচনীয়। বিগত দিনগুলো থেকে ক্রমে মানবাধিকার পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে। বৈশ্বিক মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতর প্রকাশিত মানবাধিকার প্রতিবেদনে বাংলাদেশে বিচার কাজের দীর্ঘসূত্রতা, গণমাধ্যমে মত প্রকাশের ওপর সরকারের কড়াকড়ি, হত্যা, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডসহ দলীয় ব্যক্তিদের গ্রেফতারি পরোয়ানাসহ সব ধরনের অন্যায় নিয়ে ২০১৩ সালে এবং বর্তমানেও বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে থাকা ব্যক্তিদের নিরাপওা নিয়েও সমালোচনা করা হয়। বলা হয়, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে বন্দি থাকা ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। কিন্তু তথাকথিত বন্দুকযুদ্ধের নামে মেগাসিরিয়াল ঘটনা সাজিয়ে ক্রসফায়ারে আসামি হত্যা বন্ধ হচ্ছে না। এই ধরনের হত্যাকাণ্ড মানবাধিকার পরিপন্থী। দেশের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক বোয়ালদের শিকার হচ্ছে সাধারণ মানুষ। ক্ষমতাসীনরা নিজেদের ইচ্ছামত আইনকে ব্যবহার করে বিরোধী দলকে হেনস্তা করছে। মানবাধিকার কমিশনার ক্ষোভ জানিয়ে সরাসরি বলেছেন যে, ২০১৩ সালের শেষ থেকে ২০১৪ সালের এ পর্যন্ত বিচারবহির্ভূত হত্যা ও মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে মারাত্মক হারে। বিশ্বের প্রতিটি দেশের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক ও মানবতাবিরোধী কাজ থেকে সবাইকে দূরে রাখার জন্য সব ধরনের বৈষম্য বিলোপ এবং সার্বজনীন মানবাধিকার রক্ষার জন্য ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর জাতিসংঘ প্যারিসে মানবাধিকার ঘোষণা করা হয় । বর্তমান বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে সমলোচনা করতে গিয়ে এই সঙ্কট থেকে উওরণের জন্য মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জাতিসংঘের হস্তক্ষেপও কামনা করে। যে কোনো দেশের মানবাধিকার লঙ্ঘন রোধে অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারে মানবাধিকার কমিশন। কিন্তু মানবাধিকার কমিশনারের উচ্চ বক্তব্য ও চোখের জল ছাড়া জনগণ তেমন কিছুই দেখতে পায় না, সুফলও ভোগ করে না। অকল্পনীয় হলেও বাস্তব যে, যে দেশের মানবাধিকার এতভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে সে দেশের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন লোকবলের অভাবে কাজ করতে পারছে না। এই ছোট দেশে যখন সরকারি হিসাবে ১৬ কোটি লোক বাস করে, লাখ লাখ শিক্ষিত যুবক-যুবতী বেকার দিন যাপন করে—সে দেশের মানবাধিকার কমিশনে কাজ করার মতো লোক নেই এটা শুধু দুঃখের নয়, হতাশার বিষয়।
বিচারবহির্ভূত হত্যা ও মানবাধিকার লঙ্ঘন সম্পর্কে কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান বলেন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড কিছুতেই থামছে না। প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের পর প্রায় একই রকম গল্প বলছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তবে বিচারবহির্ভূত এসব হত্যাকাণ্ডকে মানবাধিকার কর্মীরা দেখছেন রাষ্ট্রীয় হত্যা হিসেবে। রাষ্ট্রের মদত না থাকলে ধারাবাহিকভাবে এমন হত্যাকাণ্ড সম্ভব হতো না। দীর্ঘদিন ধরেই এ ধরনের হত্যাকাণ্ড বন্ধ করে অভিযুক্তদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানানো হচ্ছে। সরকারের কর্তব্য ব্যক্তিরা বলছে, তাদের সময়ে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড কোনোভাবেই মেনে নেয়া হবে না। তাহলে দেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড চলছে কার ইশারায়। কাদের প্রশ্রয়ে? মানবাধিকার পরিস্থিতির অবনতির জন্য যারা দায়ী তারা যেমন নিজেদের বিবেকের কাছে বন্দি, তেমনি জাতির কাছেও অপরাধী। তিনি আরও বলেন, বর্তমানে যে লোকবল নিয়ে কমিশন চলছে, এই লোকবল নিয়ে কাজ করা অসম্ভব। তবে মানবাধিকার কমিশন চুপ নেই। তা চলমান আছে, আমরা পার্শ্ববর্তী উন্নত দেশগুলোর মানবাধিকারের কাজ করার অভিজ্ঞতা নিয়ে কাজ করতে পারি, সেজন্য যেমন প্রয়োজন লোকজনের তেমনি বিচার বিভাগের স্বচ্ছতাও প্রয়োজন। লোক বাড়ানোর জন্য আমরা অনেক আগেই আহ্বান জানিয়েছি। প্রতিশ্রুতি পেলেও এখনও বাস্তবায়ন আমরা পাইনি। তার পরও বলব, আগের চেয়ে কিছুটা হলেও কাজ চলছে। জনগণ জানে যে তাদের অধিকার লঙ্ঘিত হলে কোথায় জানাতে হবে। এখন এখানে অনেক অভিযোগ আসে। আমরা চেষ্টা করছি।
মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যানের কথাগুলো নতুন কিছু নয়। সেই লিমনের ঘটনার পর থেকে এমন বক্তব্য আমরা প্রায়ই শুনে আসছি। বর্তমানে যে কোনো সময়েই যে কোনো ইস্যুতে বক্তব্য দিতে গিয়ে ক্ষমতাসীন দলের নেতারা বলেন, ওনারা দেশ পরিচালনা করে নির্বাচন দিয়ে গণতন্ত্রকে রক্ষা করছেন। আর অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তি বলেছেন, এভাবে দেশ পরিচালনায় গণতন্ত্রকে হত্যা করা হচ্ছে। আবার গণতন্ত্রের সঙ্গে সংবিধানের কথাও উঠে আসছে। প্রাবন্ধিক-কলামিস্ট, রাজনীতিক ও জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের সভাপতি বদরুদ্দীন উমর বলেন, দেশে যে সংবিধান আছে সেই সংবিধান জনগণের মাথা ন্যাড়া করছে। এ সংবিধানকে কুর্ণিশ করার কারণ জনগণের নেই। যাদের কুর্ণিশ করার দরকার তারা করছে, জনগণকে শোষণ করার জন্য সংবিধানের দোহাই দিয়ে তারা তাদের স্বার্থ হাসিল করছে।
গণতন্ত্র ও মানবাধিকার একটি অপরটির পরিপূরক। মানবাধিকার রক্ষিত হলেই গণতন্ত্র রক্ষিত হবে। গণতন্ত্রের পথ সহজ ও সরল হবে। কিন্তু রাজনীতির দাবার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে আমাদের গণতন্ত্র ও সংবিধান। সরকারের দায়িত্ব হলো আইনকে তার নিজস্ব গতিতে চলতে দেয়া, কিন্তু সরকার আইনকে তাদের হাতের মাটির পুতুল বানিয়ে রেখেছে। সরকারের মুখোমুখি না দাঁড়িয়ে পেছন থেকে ঢিল ছুড়ছে বিরোধী দলগুলো। একে অন্যের দিকে ঢিল ছুড়ে, সেই ঢিল গিয়ে পড়ে সাধারণের গায়ে।
জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করা প্রতিষ্ঠানটিতে কাজ করার লোকের সংখ্যা শুনলেও অট্টহাসি না এসে পারে না। বর্তমান চেয়ারম্যানসহ সাত সদস্য ও জনপ্রশাসন থেকে প্রেষণে আসা পাঁচ কর্মকর্তা দিয়ে পুরো মানবাধিকার কমিশনের কাজ চলছে। তার মধ্যে চেয়ারম্যান ও এক সদস্য ছাড়া বাকি ৫ জন অবৈতনিক হিসেবে কাজ করছেন। প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের যুগ্ম সচিব, উপসচিব, সিনিয়র সহকারী সচিব পদমর্যাদায় যারা আছেন তারাও চাকরির কারণে সরকারের আজ্ঞাবহ হিসেবে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন—এমন শোনা যায়। তাহলে যেখানে সরকারের ইশারায় কাজ হয়, প্রশাসনকে চলতে পথ দেখায় সরকার—সে দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি আর কেমন হওয়ার কথা। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন-২০০৯ এর ১২(১) (ট) ধারায় বলা হয়েছে—‘মানবাধিকার লঙ্ঘন বা লঙ্ঘিত হতে পারে এমন অভিযোগের উপর তদন্ত অনুসন্ধান করিয়া মধ্যস্থতা ও সমঝোতার মাধ্যমে অভিযোগ নিষ্পত্তি করা।’ কিন্তু লঙ্ঘিত হতে পারে এমন নয়, লঙ্ঘিত হওয়ার পরও কাজ করতে পারছে না কমিশন। মানবাধিকার কমিশন সম্পর্কে জনগণ আগের চেয়ে জানতে পারছে বিধায় জনগণ তাদের অভিযোগ জানাতে আসে। কিন্তু অভিযোগ রাখা পর্যন্তই অনেক অভিযোগ সীমাবদ্ধ থাকে। কিছু কিছু তদন্তের নামে যা হয় তাও আবার প্রকাশের জন্য দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হয়। আর তদন্তে রুই-কাতলা-বোয়াল কিছু উঠে এলে তো কথাই নেই। তদন্ত সেখানেই ঘুমিয়ে পড়ে। লঙ্ঘন যেমন অপরাধ, তেমনি তদন্ত প্রকাশ না করাও বিরাট অপরাধ। এ থেকে আর কবে মুক্তি আসবে।