ভোটবিহীন নির্বাচনে জয়ী হয়ে সংসদ সদস্যরা যেন এলাকায় এক-একজন বিজয়ী বীর হয়ে
উঠেছেন। নিজেদের সংবর্ধনায় ‘হাতি-ঘোড়া’ আনার ব্যবস্থা করতেও পিছিয়ে থাকতে
চান না তারা। বাস্তবে হাতি-ঘোড়া পাওয়া না গেলেও এলাকার কোমলমতি শিশুদের
ঠিকই পাওয়া যায়। হাতে ফুল নিয়ে প্রচণ্ড রোদের মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা
দাঁড়িয়ে রাখার দৃশ্য পত্রিকায় ছাপা হওয়ার পর সমালোচনার মুখে শীর্ষ পর্যায়
থেকে তা বন্ধের নির্দেশ ঘটা করে প্রচারিত হয়েছিল। কিন্তু কে শোনে কার কথা!
বিনা ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি বলে কথা!
গত সোমবার নারায়ণগঞ্জের এক আলোচিত সংসদ সদস্য সিদ্ধিরগঞ্জের একটি স্কুল
অ্যান্ড কলেজে গিয়েছিলেন। সেখানকার বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার পুরস্কার
বিতরণ, কৃতী শিক্ষার্থী এবং জাতীয় স্কুল পর্যায়ে কৃতী খেলোয়াড়দের সংবর্ধনা
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি তিনি। পদাধিকারবলে এই প্রতিষ্ঠানের সভাপতিও। আর
দাপুটে নেতা হিসেবে তিনি জগত্জুড়েই পরিচিত। এমন একজনের মনোরঞ্জনে
প্রতিষ্ঠানটির কর্তৃপক্ষ কিছু করতে বাকি রাখেনি। কয়েকশ’ শিশু শিক্ষার্থীকে
রাস্তার দু’পাশে জাতীয় পতাকা হাতে দাঁড় করিয়ে রাখতেও পিছিয়ে থাকেননি তারা।
চৈত্রের খরতাপে মানুষ যখন ঘরের ভেতরেই হাসফাঁস করছে, তখন কচি কচি
ছেলেমেয়েদের এমন রৌদ্রদণ্ড দিয়ে হলেও তারা নেতার মন রক্ষা করতে চেয়েছেন।
জননেতা বলে কথা! তাই অনুষ্ঠান শুরুর আধা ঘণ্টা পর আসেন তিনি। নির্দিষ্ট
সময়ের এক ঘণ্টা আগে থেকে প্রচণ্ড রোদে দাঁড়িয়ে থাকতে শিশুদের কী অবস্থা
হয়েছিল সেটা বুঝতে কারও অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। তবে ওই জননেতাকে গাড়িতে চড়ে
অনুষ্ঠান শেষে ফেরার পথে গরমে অসুস্থ হয়ে রাজধানীর একটি অভিজাত হাসপাতালে
ভর্তি হতে হয়েছিল বলে খবর পাওয়া গেছে। এর আগেও গত মাসের শেষ দিকে একইভাবে
অন্য একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অনুষ্ঠানে তার আগমন উপলক্ষে স্কুলের
শিক্ষার্থীদের প্রচণ্ড রোদের মধ্যে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছিল। অর্থাত্ এটাই
তার পছন্দের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে বলা যায়।
আওয়ামী লীগের আলোচিত নেতা হলেও নারায়ণগঞ্জে তার সম্পর্কে অনেক কথাই শোনা
যায়। দেশের মানুষও তাকে ভালো করেই চেনে অতীত ও বর্তমান কর্মকাণ্ডের কারণে।
সরকার ও দলের শীর্ষ পর্যায়ের নির্দেশ থোরাই কেয়ার করেন তিনি।
জনপ্রতিনিধিদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে স্কুলের শিক্ষার্থীদের রাস্তায় দাঁড়
করিয়ে রাখার ওপর সরকারের কড়াকড়ি বিধিনিষেধ থাকলেও তিনি তা মানার বান্দা যে
নন সেটা দেখাই যাচ্ছে। আওয়ামী লীগে এখন এমন নেতাদেরই কদর বেশি।
ছাত্রলীগ-যুবলীগেরও একই চিত্র। অস্ত্রবাজ, সন্ত্রাসী, টেন্ডারবাজ,
চাঁদাবাজদের ভিড় জমেছে সর্বত্র। অভিজাত এলাকায় বায়িং হাউস বানিয়ে মাদক
সেবনের আড্ডা ও নির্যাতন কেন্দ্র চালু রাখার খবর গতকালের কাগজেই ফলাও করে
ছাপা হয়েছে। অর্থাত্ ক্ষমতাসীনদের কোনো অপকর্মের এখন আর রাখঢাক নেই। তারা
তো পাঁচ বছরের জণ্যই ক্ষমতা পেয়ে গেছে! তাই এতটাই বেপরোয়াপনা দেখা যাচ্ছে
যা আগে কমই হয়েছে। এসব যেন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। কথায় বলে—অভ্যেস যায় না
মলে, ইল্লত যায়না ধুলে!