ইসির প্রহসন

ব্যাপক অনিয়ম, কারচুপি ও সহিংসতার মধ্য দিয়ে পঞ্চম পর্বের উপজেলা পরিষদ নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। ইলেকট্রনিক মিডিয়ার ফুটেজ ও সংবাদপত্রের শিরোনাম থেকে নির্বাচনী অপরাধের ব্যাপ্তি ও নির্বাচনব্যবস্থার ওপর এর প্রভাব সম্পর্কে একটি সম্যক ধারণা পাওয়া গেছে। উদাহরণস্বরূপ, নির্বাচনের পরের দিনের প্রথম আলোর হেডলাইন ছিল: ‘নির্বাচনব্যবস্থা তছনছ, প্রশ্নের মুখে আওয়ামী লীগ’ (২ এপ্রিল ২০১৪)। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠান। কিন্তু এটি সুস্পষ্ট যে কমিশন তার দায়িত্ব পালনে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।
নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে বলে প্রথম দিকে সাফাই গাইলেও কমিশন এখন আইনের দুর্বলতার কারণে নির্বাচনে কিছু অনিয়ম হয়েছে বলে দাবি করছে। ক্রমবর্ধমান অনিয়মের মুখে কমিশনের সদস্যরা বলছেন, রিটার্নিং কর্মকর্তা নির্বাচনে অনিয়মের প্রতিবেদন না দিলে কমিশনের পক্ষ থেকে কিছুই করার থাকে না। অর্থাৎ, কমিশন সরকারি কর্মকর্তাদের ওপর, যাঁরা উপজেলা নির্বাচনে রিটার্নিং ও প্রিসাইডিং কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করেন, সম্পূর্ণরূপে নির্ভরশীল। কমিশন বস্তুত ‘পোস্ট অফিস’-এর ভূমিকা পালন করে। তাই কমিশন এখন নির্বাচনী ফলাফল বাতিল করার ক্ষমতা চাইছে, যে ক্ষমতা বর্তমানে তাদের নেই বলে তারা দাবি করছে (আলোকিত বাংলাদেশ, ৬ এপ্রিল ২০১৪)।
কমিশন নিজেদের ক্ষমতাহীনতার, বিশেষত তাদের ফলাফল বাতিলের ক্ষমতা নেই বলে যে দাবি করছে, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। এ ব্যাপারে আমাদের উচ্চ আদালতের একাধিক সুস্পষ্ট রায় রয়েছে। তাই রিটার্নিং কর্মকর্তার অসহযোগিতার মুখে কমিশনের সদস্যদের পক্ষে কিছুই করার নেই—এই দাবির মাধ্যমে জনগণকে শুধু বিভ্রান্তই করছেন না, তাঁরা নিজেদের সততা, নিরপেক্ষতা ও যোগ্যতা সম্পর্কে জনমনে বিরাজমান ব্যাপক সন্দেহকে আরও ঘনীভূত করছেন।
এ কথা সত্য যে হালনাগাদকৃত উপজেলা পরিষদ নির্বাচন বিধিমালা, ২০১৩-এর ৩৯ ধারায় কতিপয় পরিস্থিতিতে প্রিসাইডিং কর্মকর্তাকে যেকোনো ভোটকেন্দ্রের নির্বাচন বন্ধ রাখবার ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে। ভোট গ্রহণ বন্ধ করা হলে অবশ্য প্রিসাইডিং কর্মকর্তা তা রিটার্নিং কর্মকর্তাকে অবগত করবেন এবং রিটার্নিং কর্মকর্তা সেই ঘটনা অবিলম্বে নির্বাচন কমিশনকে অবহিত করবেন। আর ওই ভোটকেন্দ্রের ওপর সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী এলাকার সার্বিক ফলাফল নির্ধারণ নির্ভর করলে কমিশন ওই ভোটকেন্দ্রে পুনর্নির্বাচনের ব্যবস্থা করবে।
এ ছাড়া নির্বাচন বিধিমালার ৫৫ ধারায় বলা হয়েছে, নির্বাচনী বিরোধের ক্ষেত্রে নির্বাচন ট্রাইব্যুনালে ‘নির্বাচনী দরখাস্ত দাখিল ব্যতীত, নির্বাচন সম্পর্কে কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করা যাইবে না’। অর্থাৎ, নির্বাচন বিধিমালায় সুস্পষ্টভাবে কমিশনকে নির্বাচন স্থগিত বা বাতিল করার ক্ষমতা দেওয়া হয়নি। প্রসঙ্গত, উপজেলা পরিষদ আইন, ১৯৯৮-এর ৬৩ ধারার ক্ষমতাবলে কমিশন নিজেই নির্বাচন বিধিমালা প্রণয়ন এবং তা সংশোধন করতে পারে। এর জন্য জাতীয় সংসদের অনুমোদনের প্রয়োজন হয় না। তাই কমিশন ইচ্ছা করলেই যেকোনো দিন বিধি সংশোধন করে নির্বাচন বাতিল করার সুস্পষ্ট ক্ষমতা গ্রহণ করতে পারে। উল্লেখ্য, ভারতীয় নির্বাচন কমিশনের বহু কথিত অতুলনীয় ক্ষমতার ব্যাপারে জনশ্রুতি থাকলেও বাস্তবে ভারতীয় নির্বাচন কমিশনের বিধি প্রণয়নের ক্ষমতা নেই। ফলে আমাদের কমিশন ভারতীয় কমিশন থেকে অনেক বেশি ‘ক্ষমতায়িত’।
উপরন্তু, উপজেলা পরিষদ নির্বাচন বিধিমালায় নির্বাচন কমিশনকে নির্বাচন বাতিল করার ক্ষমতা সুস্পষ্টভাবে না দেওয়া থাকলেও আমাদের উচ্চ আদালতের মতে, নির্বাচন কমিশনের সেই ক্ষমতা রয়েছে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের একাধিক রায় রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, আলতাফ হোসেন বনাম আবুল কাশেম মামলার [৪৫ডিএলআর (এডি)(১৯৯৩)] রায়ে বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ সর্বসম্মত রায়ে বলেন: ‘“তত্ত্বাবধান, নির্দেশ ও নিয়ন্ত্রণে”র বিধানের অধীনে নির্বাচন কমিশনকে যে অন্তর্নিহিত ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে তার অর্থ হল যে, শুধুমাত্র সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের লক্ষ্যে কমিশনের আইনি বিধিবিধানের সঙ্গে সংযোজনেরও ক্ষমতা রয়েছে।’ আইনি বিধিবিধান প্রণয়ন করার ক্ষমতা একমাত্র আইনসভার। কিন্তু সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের খাতিরে আমাদের সংবিধান নির্বাচন কমিশনকে সেই ক্ষমতাও দিয়েছে। অর্থাৎ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিধিবিধানের সীমাবদ্ধতা ও অস্পষ্টতা দূর করার ক্ষমতা কমিশনের রয়েছে। প্রসঙ্গত, অনিয়মের তদন্ত করা আইনি বিধিবিধানের সঙ্গে সংযোজন করার ক্ষমতার অংশ [আলতাফ হোসেন বনাম আবুল কাশেম]।
উল্লিখিত রায়ে আরও সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে: ‘নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে এবং রিটার্নিং অফিসার বা প্রিসাইডিং অফিসার কর্তৃক কোনো গোলযোগের বা কারচুপির রিপোর্ট না দেওয়ার কারণে নির্বাচন কমিশনের হস্তক্ষেপ করার কোনো ক্ষমতা নেই বলে যে সাধারণ নিয়ম রয়েছে তা সর্বক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। উদাহরণস্বরূপ, যদি ইস্যুকৃত ব্যালট পেপার থেকে বা নিবন্ধিত ভোটার সংখ্যা থেকে ভোট প্রদানের হার বেশি হয়, তাহলে কমিশন হস্তক্ষেপ করতে পারে, সবকিছু শান্তিপূর্ণভাবে হয়েছে বলে রিপোর্ট প্রদান সত্ত্বেও।’
নির্বাচন কমিশনের নির্বাচনী ফলাফল বাতিলের ক্ষমতা সম্পর্কে আমাদের উচ্চ আদালতে আরও রায় রয়েছে। নূর হোসেন বনাম মো. নজরুল ইসলাম মামলার [৪৫বিএলসি (এডি)(২০০০)] রায়ে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ কমিশনের নির্বাচনী ফলাফল বাতিলের এবং নতুন করে নির্বাচন অনুষ্ঠানের নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে বলে সুস্পষ্ট রায় দেন। ওই মামলার বিবরণী থেকে জানা যায়, ১৯৯৭ সালে অনুষ্ঠিত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে নূর হোসেন, মো. নজরুল ইসলামসহ ১৪ জন সিদ্ধিরগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। নির্বাচনে মো. নজরুল ইসলাম জয়লাভ করেন। নির্বাচনের দিন নূর হোসেনের নির্বাচনী এজেন্ট প্রথমে কর্তব্যরত ম্যাজিস্ট্রেট এবং পরবর্তী সময়ে দুটি কেন্দ্রের প্রিসাইডিং কর্মকর্তার কাছে নির্বাচনে অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগ উত্থাপন করেন। একই দিন তিনি প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছেও অনুরূপ অভিযোগ করেন। ম্যাজিস্ট্রেট ও প্রিসাইডিং কর্মকর্তা অভিযোগের প্রতি কোনোরূপ কর্ণপাত করেননি; বরং রিটার্নিং কর্মকর্তা সব কেন্দ্রের নির্বাচনী ফলাফল একত্র করে মো. নজরুল ইসলামকে বিজয়ী ঘোষণা করেন এবং ফলাফল গেজেটে প্রকাশের জন্য কমিশনে প্রেরণ করেন।
নূর হোসেনের নির্বাচনী এজেন্টের আরেকবার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচন কমিশন একজন ডেপুটি নির্বাচন কমিশনার দিয়ে তদন্ত করে অভিযোগকৃত দুটি কেন্দ্রে গোলযোগের প্রমাণ পায়, যার পরিপ্রেক্ষিতে কমিশন কেন্দ্র দুটির নির্বাচন বাতিল করে পুনর্নির্বাচনের নির্দেশ দেয়। পরবর্তী সময়ে রিটার্নিং কর্মকর্তা কর্তৃক ঘোষিত নির্বাচিত চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলামের একটি রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ ‘নির্বাচন-পরবর্তীকালে অভিযোগ’ উত্থাপনের অজুহাতে কমিশনের নির্বাচনী ফলাফল বাতিলের সিদ্ধান্তকে অবৈধ বলে রায় দেন, যার বিরুদ্ধে নূর হোসেন আপিল বিভাগের শরণাপন্ন হন।
প্রধান বিচারপতি লতিফুর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত আপিল বিভাগের চার সদস্যের বেঞ্চ হাইকোর্টের রায় খারিজ করে দেন। বিচারপতি এবাদুল হকের লিখিত এবং ১৯৯৮ সালের ১৩ এপ্রিল ঘোষিত রায়ে বিচারপতিরা বলেন: ‘আমরা এ কথা পুনর্ব্যক্ত না করে পারি না যে, নির্বাচন চলাকালে গোলযোগের, ব্যালট পেপার কারচুপির বা নির্বাচন সঠিক, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন হয়নি বলে রিপোর্ট বা অভিযোগ উত্থাপিত হলে, উক্ত রিপোর্ট বা অভিযোগের সত্যতা যাচাইপূর্বক কমিশনের ফলাফল বাতিল ও পুনর্নির্বাচনের নির্দেশ দেওয়ার সিদ্ধান্ত সঠিক। কিন্তু নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হলে নির্বাচন-পরবর্তী অভিযোগের প্রেক্ষিতে নির্বাচনী ফলাফল বাতিল করার কমিশনের সিদ্ধান্ত সঠিক হবে না।’
এ প্রসঙ্গে আদালত এ এফ এম শাহ আলম বনাম মুজিবুর রহমান এবং অন্যান্য [৪১ডিএলআর(এডি) (১৯৮৯)] মামলার রায় উদ্ধৃত করেন, যে রায়ে আগে আপিল বিভাগ বলেন: ‘নির্বাচন নেই অর্থাৎ গণতন্ত্র নেই। গণতন্ত্র অব্যাহত রাখার জন্য নির্বাচন প্রয়োজন এবং বিকৃত অথবা ভোটারবিহীন নির্বাচন গণতন্ত্রকে ধ্বংস করে।’ তাই বিধিতে প্রদত্ত কমিশনের রিভিউ করার ক্ষমতা সততা, সঠিক ও নিরপেক্ষভাবে নির্বাচন সম্পন্ন করার জন্য আবশ্যক। প্রসঙ্গত, গত ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত বিতর্কিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে আমাদের উচ্চ আদালতের এ মতামত অত্যন্ত প্রণিধানযোগ্য।
পরিশেষে শোনা যায় যে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ব্যাপক অনিয়ম, কারচুপি ও সহিংসতার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচন কমিশন বিভিন্ন এলাকার রিটার্নিং ও প্রিসাইডিং কর্মকর্তাদের এসব অভিযোগের ব্যাপারে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছে।
আমরা জানি না, এর মাধ্যমে কমিশন কার চোখে ধুলা দেওয়ার চেষ্টা করছে! কারণ, অভিযোগ কিন্তু এসব কর্মকর্তার অনেকের বিরুদ্ধেই, যাঁরা হয় নিজেরাই বিভিন্ন ধরনের নির্বাচনী অপরাধের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত কিংবা তাঁরা এসব অপরাধের অভিযোগ আমলে নেননি। তাই আমরা মনে করি, কমিশনের এই উদ্যোগ আরেকটি প্রহসন বৈ কিছুই নয়!


পাঠকের মন্তব্য

  • “গোলাপি এখন ট্রেনে” ছবির একটি গান ”আছেন আমার মোক্তার, আছেন আমার ব্যারিষ্টার, শেষ বিচারের হাইকোর্টেতে তিনি আমায় করবেন পার; আমি পাপী তিনি জামিনদার; আমি পাপী তিনি জামিনদার.......”

  • একটা গাছ খুব গুছিয়ে মরে।পাতা হলুদ হয়ে ঝরে যায়, ডালগুলো শুকায় সবশেষে শেকড় কুকড়ে যায়। মানুষ এত পরিপাটি মরতে পারেনা। এক জীবনে কতবার যে মরে যায় মানুষ!

  • উলুবনে মুক্তো ছড়িয়ে লাভ কি ?

  • মুক্ত মানুষের মধ্যে বিরোধ নিষ্পত্তির সবচেয়ে ভাল মাধ্যম ব্যালট। বাংলাদেশে ব্যালটের পরিবর্তে চলছে নির্মূলের রাজনীতি। কিন্তু উপজেলা নির্বাচন এ বার্তাই দিয়ে গেল আপনি চাইলেও ভিন্নমতকে গণতন্ত্রের ক্লাব থেকে মাইনাস করতে পারবেন না।

  • আমাদের সাংবিদানিক প্রতিষ্ঠান নির্বাচন কমিশনকে দলীয় প্রতিষ্ঠানে পরিনত এবং সাংবিদানিক কাজে অবহেলার দায়ে তাদের বিরুদ্দে আইনি ব্যবস্থা গ্রহন করা যায়না ????

  • জাতীয় নির্বাচনে নির্বাচন কমিশন যে চমক দেখিয়েছিল, উপজেলা নির্বাচনে তা মোটেই ধরে রাখতে পারেনি। নির্বাচন কমিশন উপজেলা নির্বাচনে বিএনপিকে মোটেই সাইজ করতে পারেনি। বিএনপির একক প্রার্থী যেখানে আছে, সেখানে মনোনয়নপত্র বাতিলের ব্যবস্থা করলেই ল্যাঠা চুকে যেতো। আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীদেরও মনোনয়ন বাতিল করা যেতো।

  • গত ৪৪ বছরে বাংলাদেশে ১২টি নির্বাচন কমিশন ছিল। যদিও আমাদের দেশে কোন কোন প্রধান নির্বাচন কমিশনার হয়েছেন নন্দিত, কেউ হয়েছেন নিন্দিত। তবে বর্তমান কমিশনের মতো এমন নির্লিপ্ত নির্বাচন কমিশন বাংলাদেশ আগে কখনও দেখেনি। যদিও তারা নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে সফল হয়েছেন। তবে নির্বাচনী ব্যবস্থার মৃত্যু হয়েছে। এ যেন অপারেশন সফল, তবে রোগী মারা গেছেন। ভোট চুরির উৎসব দেখেও নির্বাচন কমিশনার আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করেছেন।

  • অস্বীকার করার যো নেই, উপজেলা নির্বাচন অবাধই হচ্ছে। কেন্দ্র দখল অভিযানে শাসক দলের ক্যাডাররা কোন বাধাই পাননি। নির্বাচনী কর্মকর্তা আর আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সাধ্যমতো সহযোগিতা করছে। কোথাও কোথাও নির্বাচনী কর্মকর্তারা নিজেরাই ব্যালট পেপারে সিল মেরেছেন। এমন অবাধ নির্বাচন আয়োজনের জন্য নির্বাচন কমিশন অবশ্যই ধন্যবাদ প্রাপ্য। তাদের স্বচ্ছতারও প্রশংসা করতে হয়। একজন নির্বাচন কমিশনার খুবই সাহসের সঙ্গে বলেছেন, তাদের কোন অনুশোচনা নেই। আর ক্ষমতাসীন দল আরও স্বচ্ছ। নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হচ্ছে বলে প্রতিনিয়ত কোরাস গাইছেন তারা। এ যেন তারা বলছেন, তোমরা সবাই অন্ধ। আমরাই শুধু চোখে দেখি।

  • মানুষ উৎসাহ নিয়ে ভোট দিয়েছে আর নির্বাচন কমিশন স্বাধীন । আপনি কি প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যের সাথে একমত ? প্রথম আলো পত্রিকা তার পাঠকদের কাছে জানতে চেয়েছিল । অবশ্যই একমত ! উৎসাহ না থাকলে একজনেই ১০০ টা ভোট দিতে পারে ? তাদের কেউ কি ভয় দেখিয়ে- বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে এটা করিয়েছে ? না। উৎসাহ নিয়ে এরা ভোটের অধিকার প্রয়োগ করেছে ....! আর স্বাধীন বলেই তো প্রধান নির্বাচন কমিশনার ভোটের সময় বিদেশে বসে আছেন। কারো অধীনে থাকলে তিনি কি এটা করতে পারতেন ?

  • সততা নিরপেক্ষতা যোগ্যতা এর কোনটাই বর্তমান নির্বাচন কমিশনের নাই, তাই দেশ, গণতন্ত্র , সুষ্ঠ রাজনীতির সার্থে তাঁদের পদত্যাগেরও বিকল্প নাই ।

  • Nation badly needs brave heart people like you at that moment sir, as the country heading to long time tyrant government.

ঘরজামাই

মেয়েরা এখন অনেক দায়িত্ব পালন করেন। দায়িত্ব শেষ হয় না বিয়ের পরও। মা-বাবা বৃদ্ধ, একা থাকেন। কিংবা সন্তান ছোট। তাকে দেখার কেউ নেই। তখন মেয়েটি তাঁর স্বামীসহ নিজের মা-বাবার কাছে থাকেন। মেয়েটির উপকার হলেও লোকে স্বামীকে ‘ঘরজামাই’ অপবাদ দিতে ছাড়ে না। তাহলে কি আসলেই সমাজ বদলেছে?
‘আমরা চার বোন, বাবা মারা গেছেন ছোটবেলাতেই। বড় তিন বোন বিয়ে করে চলে গেছেন আলাদা সংসারে। মা একা। আমার বিয়ের সময়ই মা বলে রেখেছিলেন, যেন আমি স্বামীসহ তাঁর সঙ্গেই থাকি। এতে আমার চাচারা খুব নিশ্চিন্ত হয়ে গেলেন, কারণ তাঁদের আর বড় ভাইয়ের বিধবা স্ত্রীর খোঁজখবর রাখতে হচ্ছিল না। এদিকে আমার বড় বোনেরাও আমার ওপর মায়ের দায়িত্ব চাপিয়ে খালাস। মায়ের কোনো কিছু হলেই ওঁরা আমার স্বামীকে বলতেন, “তুমি থাকতে এটা কেন হলো, ওটা কেন হলো?” মোহাম্মদপুরের স্বর্ণা বলছিলেন নিজের অভিজ্ঞতার কথা। তিনি আরও জানালেন, আর অন্য আত্মীয়স্বজনেরাও আড়ালে-আবডালে আমার স্বামীকে নিয়ে বাঁকা কথা বলতে ছাড়তেন না। প্রতিবেশীদের কেউ কেউ অনেক সময় করুণার সুরে আমাকে বলতেন, “ও, তুমি মায়ের বাড়িতে থাকো।” একদিকে মাকে ছেড়ে যেতেও পারছি না, অন্যদিকে এসব এমন বাঁকা কথাবার্তাও সহ্য হচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত আলাদা ফ্ল্যাট কিনে মাকে আমার কাছে নিয়ে এলাম। মাকে বললাম, “ঘরজামাই” থাকা সমস্যা কিন্তু “ঘরশাশুড়ি” হলে তো আর অসুবিধা নেই। এখন চাচারাও মায়ের খোঁজখবর করেন, আবার অন্য বোনেরাও মাকে মাঝেমধ্যে নিজেদের কাছে নিয়ে রাখেন। মানুষের ইঙ্গিতপূর্ণ কথাবার্তাও শুনতে হয় না।’
বিয়ের পর মেয়েরা স্বামীর বাড়ি চলে যাবেন, এটাই আমাদের সমাজে বহুকাল ধরে চলে আসা সাধারণ নিয়ম। আর সেই নিয়ম ভেঙে যদি বিয়ের পর মেয়ের স্বামী শ্বশুরবাড়িতে এসে থাকেন, তবে তাঁকে বলা হয় ‘ঘরজামাই’। আর ঘরজামাই শুনলেই মনে হয়—বেকার, শ্বশুরবাড়ির ওপর নির্ভরশীল।
তবে সময় পাল্টাচ্ছে। প্রয়োজনের তাগিদে অনেক মেয়ে তাঁর স্বামীসহ এখন থাকছেন বাবার বাড়িতে। বিশেষ করে চাকরিজীবী দম্পতিকে সন্তান লালনপালনের জন্য অনেক সময় নির্ভর করতে হয় শাশুড়ির ওপর। সে ক্ষেত্রে, শ্বশুরবাড়িতে থাকার বিকল্প নেই। আবার এমনও দেখা গেছে, বৃদ্ধ মা-বাবাকে দেখাশোনার কেউ নেই, তাঁদের দেখভালের জন্য মেয়ে আর জামাইকেই সঙ্গে থাকতে হচ্ছে। এখনও সমাজে এ বিষয়টিকে খোলা মনে সবাই মেনে নিতে পারেন না। তেমনটা বললেন মাজেদা খাতুন।
‘আমার ছোট মেয়ে আর জামাই থাকে আমার সঙ্গে। যদিও জামাইয়ের সেটা অপছন্দ, ও তো এ বাসায় একদম থাকতেই চায় না, অনেকটা বাধ্য হয়ে থাকছে। আসলে ওরা দুজনই চাকরি করে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত অফিস, বাচ্চাটা ছোট, ওকে দেখাশোনা করার কেউ নেই, তাই বাচ্চাকে আমার কাছে রেখে ওরা যে যার কাজ করে।’ কিছুটা কুণ্ঠার সঙ্গেই, যেন মেয়ে আর জামাইয়ের পক্ষে বললেন মাজেদা খাতুন। ‘বাচ্চাটা আরেকটু বড় হয়ে গেলেই হয়তো আর এই বাসায় থাকবে না ওরা।’
আমাদের সমাজে এখনো বেশির ভাগ পুরুষ মনে করেন, শ্বশুরবাড়িতে থাকলে আত্মসম্মান বা আত্মমর্যাদা নিয়ে থাকা যায় না। সমাজেও ‘অকর্মণ্য’ বলে অপবাদ জোটে। তবে এর ব্যতিক্রমও আছে। একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আসাদ আহমেদ কোনো রকম রাখঢাক ছাড়াই মজা করে বলেন, ‘আমি ভাই, ঘরজামাই।’ আসাদ আহমেদের স্ত্রী সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করেন। তিনি তাঁর মা-বাবার একমাত্র মেয়ে। মা মারা গেছেন আগেই। বাবা যেমন মেয়েকে কাছ-ছাড়া করতে চান না। তেমনি মেয়েও বিপত্নীক বাবাকে একা ছেড়ে যেতে নারাজ। ফলে, আসাদ আহমেদ স্ত্রী, নিজের ছেলেমেয়ে নিয়ে শ্বশুরের সঙ্গেই থাকেন। এই একত্র-বাস নিয়ে তিনি প্রকাশ্যে কোনো রকম হীনন্মন্যতায় ভোগেন না।
অনেক শ্বশুর-শাশুড়িই জামাইকে ছেলের মর্যাদা দেন, আবার জামাইও শ্বশুর-শাশুড়িকে নিজের মা-বাবার মতোই শ্রদ্ধা, সম্মান ও যত্ন-আত্তি করেন। যেসব পরিবারে ছেলে নেই, সেসব পরিবারের মা-বাবা অনেক সময় হয়তো নিজেদের প্রয়োজনেই মেয়ে-জামাইকে কাছে রাখতে চান। আবার সন্তান লালনপালনের জন্য অনেক মেয়েই মা-বাবার সংসারে থাকাটাকে দরকারি বলে মনে করেন। আজকাল তো একই ফ্ল্যাটের ওপর-নিচে মা-বাবা এবং মেয়ে ও জামাইয়ের সহাবস্থান দেখা যায়। এ নিয়ে সমাজেও খুব একটা নেতিবাচক মনোভাব নেই।
এ বিষয়ে সমাজবিজ্ঞানী মাহবুবা নাসরীন বলেন, ঘরজামাই নিয়ে সমাজের প্রচলিত ধারণা হয়তো রাতারাতি বদলাবে না। তবে যতই দিন যাচ্ছে, ততই প্রয়োজনের তাগিদে পাল্টাচ্ছে অনেক মূল্যবোধ, ধ্যান-ধারণা। সেই পরিবর্তনের স্রোতেই হয়তো একসময় পাল্টে যাবে ‘ঘরজামাই’ নিয়ে সমাজের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি।
আসল কথা হলো, পরিবারের মেয়ে এখন আগের চেয়ে অনেক দায়িত্বশীল। মা বা বাবার দায়িত্ব মেয়েরা এড়াতে পারেন না। সঙ্গীর মা-বাবা নিজের মা-বাবা ভাবলে দেখবেন, নিজেকে আর ‘ঘরজামাই’ মনে হচ্ছে না, ওই বাড়ির ছেলেই মনে হচ্ছে। পাছে লোকে কী বলল, সেসব কথায় কান না দিলেই ভালো।

এই দিন দিন নয়, আরও দিন আছে.

৫ জানুয়ারির প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন এবং সম্প্রতি কয়েকটি ধাপে অনুষ্ঠিত উপজেলা নির্বাচন নিয়ে গণমাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের যথেষ্ট সমালোচনা হয়েছে। কিন্তু তাতে কী? এসব প্রতিবেদন ও সমালোচনায় আওয়ামী লীগের কী এসে যায়! তারা তো কৌশল ও শক্তি প্রয়োগ করে তাদের লক্ষ্য অর্জন করে ফেলেছে। বাংলাদেশে মিডিয়া ও পর্যবেক্ষকদের সমালোচনায় রাজনৈতিক দলের বা সরকারের কিছু যায়-আসে না। দল ও সরকার জানে যে এসব সমালোচনা দুই বা তিন মাস থাকবে। তারপর নতুন ইস্যু আসবে। নতুন সমালোচনা শুরু হবে।
৫ জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনে ‘নির্বাচিত’ এমপি বা মন্ত্রীদের কথা বলতে বা কাজ করতে কোনো সমস্যা হচ্ছে? ১৫৩ জন সাংসদ যে জনগণের ভোট পেয়ে আসেননি, তাতে জাতীয় সংসদে গলাবাজি করতে সংকোচ হচ্ছে তাঁদের? বর্তমান জাতীয় সংসদের কয়েকজন সাংসদ সংসদকক্ষকে আওয়ামী লীগের ‘সভাকক্ষ’ বানিয়ে ছেড়েছে। জাতীয় সংসদ অধিবেশন তাঁদের কাছে বিরোধী দল ও নেতাদের বিরুদ্ধে খিস্তিখেউড়ের জায়গা। আইন প্রণয়নের জন্য বিতর্ক সভা নয়। আওয়ামী লীগের মন্ত্রী, এমপি ও নেতাদের উদ্দেশে শুধু একটা কথা বলি: প্রয়াত কথাশিল্পী হুমায়ূন আহমেদের সেই কথাটি অফিসের টেবিলে লিখে রাখুন। ‘এই দিন দিন নয়, আরও দিন আছে।’
আমাদের ধারণা, বিএনপির কোনো টিম আওয়ামী লীগের সরকারের সব কাণ্ডকীর্তি লিপিবদ্ধ করছে। বিচারব্যবস্থা থেকে শুরু করে বালুভর্তি দুই ট্রাকের পাহারা, মামলা আর মামলা, পুলিশ দিয়ে অফিস ঘেরাও, জামিন নামঞ্জুর, কারা নির্যাতন, সম্ভব হলে সংবিধান সংশোধন ও আরও বহু কীর্তি। অনুমান করি, আওয়ামী লীগের সরকারের নির্দেশিত দমন-পীড়নের সব রকম পথই বিএনপি অনুসরণ করতে চেষ্টার ত্রুটি করবে না।
অবশ্য যদি কোনো দিন বিএনপি নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন করে, তবে বিএনপির সেই নেতৃত্ব যদি ক্ষমাশীল হয়, তাহলে ভিন্ন কথা। যদি প্রতিশোধপরায়ণ হয়, তাহলে সেই দিনের কথা কল্পনা করলে শিউরে উঠতে হয়। আমরা প্রার্থনা করব, নির্বাচিত বিএনপির নেতৃত্ব যেন ক্ষমাশীল হয়। আওয়ামী লীগের সরকার যে এত দমন-নিপীড়ন করছে, তার পেছনে তাদের একটা প্রচণ্ড মনোবল রয়েছে। আওয়ামী লীগের সভানেত্রী বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগকে কেউ আর কোনো দিন নির্বাচনে পরাজিত করতে পারবে না।’ হয়তো নির্বাচনে জেতার সব কৌশল আওয়ামী লীগ রপ্ত করে ফেলেছে। এমনও হতে পারে, সংসদ নির্বাচনে পরাজয়ের আশঙ্কা দেখা দিলে দেশে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হতে পারে, যাতে বিজয়ী দল ক্ষমতা গ্রহণ করতে পারবে না। সেই ব্যবস্থাও হয়তো আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব করে রেখেছেন। সে রকম কিছু আলামত মাঝেমধ্যে গণমাধ্যমে পাওয়া যায়।
ইতিহাস ইতিহাসের মতোই এগোবে। এ ব্যাপারে বাধা সৃষ্টি করা আমাদের কারও পক্ষে সম্ভব নয়। শুধু এটুকু আবার বলব: ‘এই দিন দিন নয়, আরও দিন আছে।’ এই কথা যদি বর্তমান সরকার বিশ্বাস করে, তাহলে তাদের দমন-নিপীড়নের মাত্রা কমে আসতে পারে বলে মনে হয়। আওয়ামী লীগের কিছু নেতা হয়তো বিদেশে চলে যেতে পারবেন। সবাই তো আর পারবেন না। এত হম্বিতম্বি করে কী লাভ?
আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ সব দল গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, সহিষ্ণুতা ও পরস্পরের প্রতি আস্থার মধ্য দিয়ে দেশ পরিচালনা করলে সারা জীবন সবাই সম্মানের সঙ্গে রাজনীতি করতে পারবেন। সব দলই যেন মনে রাখে, সরকার পরিবর্তনশীল। বিদেশি শক্তির ওপর ভরসা করে টিকে থাকতে চাইলে তা সব সময় সম্ভব হয় না। বিএনপিও একদিন হাওয়া ভবনের দাপটে নিজেদের চিরস্থায়ী ভেবেছিল। বাস্তবে তা ঘটেনি। আজ দুই পুত্রকে নির্বাসিত জীবনযাপন করতে হচ্ছে। এ রকম ঘটনার পুনরাবৃত্তি যে হবে না তা কে বলতে পারে!
দুই
বিএনপিসহ সংসদ নির্বাচন বর্জনকারী অন্যান্য বিরোধী দল এখনো সরকারের কাছে সব দলের অংশগ্রহণের মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য সংসদ নির্বাচনের জন্য আলোচনার আহ্বান জানায়নি। আমার এই কলামে আগেও লিখেছিলাম, বিরোধী দলগুলোকে এ ব্যাপারে আলোচনার প্রস্তাব দিতে হবে। আমাদের ধারণা, সরকার এই আলোচনার প্রস্তাব দেবে না। দেশে একটি স্বাভাবিক রাজনৈতিক অবস্থা সৃষ্টির জন্য একটি গ্রহণযোগ্য সংসদ নির্বাচনের বিকল্প নেই। কাজেই বিরোধী দলগুলোকে এ ব্যাপারে এগিয়ে আসতে হবে। সংবাদপত্র সূত্রে জানতে পেরেছি, ‘রোজার পর বিএনপি আন্দোলন গড়ে তুলতে চায়।’ বিএনপির উদ্দেশে আমরা আবার বলতে চাই: আপনারা নির্বাচনের ব্যাপারে সরকারের সঙ্গে আলোচনার প্রস্তাব দিন। আলোচনার মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান করুন। আলোচনা ব্যর্থ হলে আন্দোলনের কথা ভাববেন। আগে নয়।
তিন
উপজেলা নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি, সহিংসতা, ব্যালট বাক্স ছিনতাই ইত্যাদির মাধ্যমে আওয়ামী লীগ নিজের পায়ে নিজেই কুড়াল মেরেছে। উপজেলা নির্বাচনের ঘটনাবলি প্রমাণ করেছে, সংসদ নির্বাচনে বিএনপি অংশ না নিয়ে খুব ভুল করেনি। তারা আগেই বুঝতে পেরেছিল আওয়ামী লীগের নীলনকশা। উপজেলা নির্বাচনে আওয়ামী লীগ একটি আসনও না পেলে সরকার পরিচালনায় কোনো বিঘ্ন সৃষ্টি হতো না। এ রকম উপজেলা নির্বাচনেই আওয়ামী লীগ এমন ভোট কারচুপি করতে পারলে, সরকার বদলের জন্য সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও তাদের নতজানু প্রশাসন কী কাণ্ড করত, তা এখন কিছুটা কল্পনা করা যায়। মনে হয়, সংসদ নির্বাচনে বিএনপিকে ১০টা আসনেও জিততে দেওয়া হতো না।
৫ জানুয়ারির আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রায়ই গর্ব করে বলতেন: ‘তাঁর শাসনামলে পাঁচ হাজার স্থানীয় নির্বাচন নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে।’ কথাটা সত্যি। কিন্তু সাম্প্রতিক উপজেলা নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রী আর এ কথা বলতে পারবেন? এখন কি বিএনপির আগের অভিযোগটিই ঠিক প্রমাণিত হলো না? দলীয় সরকারের অধীনে বিএনপির পক্ষে সংসদ নির্বাচনে যাওয়া কি আর সম্ভব? যাওয়া উচিত? আওয়ামী লীগ ও বর্তমান সরকার উপজেলা নির্বাচনে ব্যাপক ভোট কারচুপি করে নিজেরাই সেই পথ বন্ধ করে দিয়েছে। সেই সঙ্গে একেবারে প্রায় শূন্যের ঘরে নামিয়ে এনেছে ‘নির্বাচন কমিশনের’ বিশ্বাসযোগ্যতা। আওয়ামী লীগ ও সরকার বেশি চালাকি করতে গিয়ে নির্বাচন ব্যাপারটিই তামাশায় পরিণত করেছে। এর মূল্য নিশ্চয় আওয়ামী লীগকে একদিন দিতে হবে। ‘আজিজ মার্কা নির্বাচন’ করে বিএনপিকেও একদিন মূল্য দিতে হয়েছিল। ‘অতি চালাকের গলায় দড়ি’—কথাটির নিশ্চয় একটা অর্থ আছে।
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগ বা প্রশাসন উপজেলায় ভোট ডাকাতি করেনি। যা হয়েছে তা করেছে বিএনপি ও জামায়াত।’ অনুমান করি, প্রধানমন্ত্রী তাঁর কোনো বিশ্বস্ত এজেন্সি থেকে ‘সঠিক খবর’ পেয়ে এমন মন্তব্য করেছেন। এই উক্তির মধ্য দিয়ে তিনি পরোক্ষভাবে ‘একাত্তর টিভি’, ‘এটিএন নিউজ’, ‘সময় টিভি’, ‘ইনডিপেনডেন্ট টিভি, ‘এটিএন বাংলা’সহ প্রায় সব টিভি চ্যানেল এবং প্রায় সব সংবাদপত্রকে ভুল ও বিকৃত রিপোর্ট প্রচারের জন্য দায়ী করেছেন। ‘বিএনপি ও জামায়াত’ উপজেলায় ভোট ডাকাতি করেছে, গণমাধ্যমে কিন্তু এমন খবর প্রচারিত হয়নি। প্রধানমন্ত্রীর এই মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে সব গণমাধ্যম কর্তৃপক্ষ কি তাদের ‘ভুল স্বীকার’ করতে প্রস্তুত রয়েছে? কোনটা ঠিক? গণমাধ্যমের রিপোর্ট ও ছবি? নাকি প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য? এ ব্যাপারে আরও একটি কথা বলা যায়। উপজেলা নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াত যদি সন্ত্রাস ও ভোট ডাকাতি করেই থাকে, তাহলে তাদের গ্রেপ্তার করা হলো না কেন? সেই সব ভোটকেন্দ্র বন্ধ করে দেওয়া হয়নি কেন? নির্বাচন কমিশন বা স্থানীয় প্রশাসন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিল না কেন? বিএনপি ও জামায়াতের যেসব নেতা ভোট জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তাঁদের আমরা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। সেই সব কেন্দ্রে আবার ভোট হোক। আশা করি প্রধানমন্ত্রী এ ব্যাপারে সহযোগিতা করবেন।

ভারত-বাংলাদেশ কূটনৈতিক সম্পর্ক

১৪ এপ্রিল ২০১৪, সোমবার, ৯:২৪
বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার সম্প্রতি এক বিবৃতিতে বলেছেন, দিল্লিতে যে দলই মতায় আসুক, ভারত বাংলাদেশ সম্পর্কের েেত্র তার প্রভাব পড়বে না। কথাটা এক দিক থেকে যথেষ্ট সত্যি। কারণ, ভারতের আপন স্বার্থে যে দলই মতায় আসুক, তার ল্য হবে বাংলাদেশকে তার নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাওয়া। তাকে ভারত ছাড়া আর কোনো শক্তির কব্জায় যেতে না দেয়া। তাই মনে করা চলে, দিল্লিতে যারাই মতায় আসুক না কেন, বাংলা-ভারতের সম্পর্কের তাতে খুব একটা হের-ফের হওয়ার সম্ভাবনা কম। কিন্তু তবু মানুষে মানুষে পার্থক্য থাকে। দিল্লিতে মোরারজি দেশাই মাত্র কিছু দিনের জন্য প্রধানমন্ত্রী হন। তখন বাংলাদেশ গংগার পানি পেতে পেরেছিল এখনকার চেয়ে কিছুটা বেশি। ভারতের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে বয়ে আসছে অনেক নদী। বাংলাদেশ ভাটির দেশ। ভারত নদীর পানি না দিতে চাইলে শুকনো মওসুমে বাংলাদেশে আবাদের তি হতে বাধ্য। বাংলাদেশের সাথে ভারতের সম্পর্ক উন্নয়নের েেত্র একটা বড় গুণক (Factor) হয়ে উঠেছে নদীর পানি। ভারতের নির্বাচনে কোন দল জিতবে, আমরা তা বলতে পারি না। তবে কংগ্রেস মতায় থাকলে যে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের মতায় থাকা অনেক সহজ সাধ্য হবে, সেটা অনুমান করতে কষ্ট হয় না। ভারতে নির্বাচন হচ্ছে। বাংলাদেশের মানুষ অত্যন্ত বাস্তব কারণেই ভাবছে বিষয়টি নিয়ে। সম্ভবত তাই বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইমকিশনারকে বলতে শোনা গেল, দিল্লিতে যে দলই মতায় আসুক, তাতে বাংলাদেশের ভাবিত হওয়ার কিছুই নেই। কিন্তু একটি দেশের কূটনীতিকের কি আর একটি দেশে অবস্থানের সময় এরকম মন্তব্য করা কূটনৈতিক শিষ্টাচারের মধ্যে পড়ে? যেটা হয়ে উঠতে চাচ্ছে একটি প্রশ্ন।
নরেন্দ্র মোদি বলছেন, আজকের ভারত আসলে পরিচালিত হচ্ছে সোনিয়া গান্ধীকে দিয়ে। সোনিয়া গান্ধী দেশের কথা ভাবছেন না। তিনি রাজনীতি করছেন তার ছেলে রাহুলের ভবিষ্যতের কথা ভেবে। মোদির বক্তব্য, ভারতে এই যে গণতন্ত্রের আড়ালে গড়ে উঠতে চাচ্ছে একটি পরিবারের শসন, তিনি এর বিরোধী। জওয়াহেরলাল নেহরু নিজেকে দাবি করতেন একজন খাঁটি উদার গণতন্ত্রী হিসেবে। কিন্তু তিনি করে যান তার একমাত্র সন্তান ইন্দিরা গান্ধীর মতা পাবার ত্রে। ঘাতকের হাতে ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যুর পর মতায় আসেন ছেলে রাজীব গান্ধী। মায়ের মতো ঘাতকের হাতে তারও মৃত্যু ঘটে। এবং মৃত্যুর পর কার্যত মতায় আসেন তার স্ত্রী সোনিয়া গান্ধী। আর সোনিয়া চাচ্ছেন তার ছেলে রাহুলকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী করতে। এভাবে ভারতে প্রতিষ্ঠিত হতে চলেছে একটি বিশেষ বংশের রাজনীতি, যা ভারতের গণতন্ত্রকে ঠেলে দিতে চাচ্ছে পুরাকালের স্বেচ্ছাচারী রাজতন্ত্রের দিকে। ভারতে উদার গণতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখতে এই বংশকেন্দ্রিক রাজনীতির গতিরোধ করতে হবে। নির্বাচনের মাধ্যমে ভারতে কোন দল মতায় আসতে যাচ্ছে আমরা তা এখনো অনুমান করতে পারছি না। তবে কংগ্রেস হারবার একটা অর্থ দাঁড়াবে, ভারতে বংশের রাজনীতির প্রবণতা কমা। যেটা আমাদেরও কাম্য। কারণ, ভারতে বংশের রাজনীতি কমে যাওয়ার প্রভাব এসে পড়বে বাংলাদেশেরও ওপর। মতাসীনেরা বাংলাদেশেও নিজেদের সন্তানদের মতায় বসাবার কথা না ভেবে, করতে বাধ্য হবেন দেশের কথা ভেবে রাজনীতি। ভারতে কংগ্রেস বলছে, সোনিয়া গান্ধী বিদেশিনী। সংস্কৃতি ও জন্মসূত্রে তিনি ভারতীয় নন। কিন্তু তিনি ভারতের পুত্রবধূ। তাই তাকে সম্মান করতে হবে। কিন্তু সম্মান দেখানো এক জিনিস আর তাকে দেশনেত্রী করে তোলা হলো সম্পূর্ণ আরেক ব্যাপার। সোনিয়াকে নিয়ে কংগ্রেসের মাতামাতি আমাদের চোখেও বেশ কিছুটা বৈসাদৃশ্য ঠেকছে।
ভারতের সমস্যা অনেক। ভারত আসলে ঠিক এক জাতির দেশ নয়। বহু ভাষাভাষী মানুষের দেশ। আর এসব ভাষার বেশির ভাগই হলো খুব উন্নত। কেননা এদের আছে দীর্ঘ দিনের লিখিত সাহিত্য। এরা কেবলই মুখের ভাষা নয়, অনেকে তাই ভারতকে গড়তে চাচ্ছেন একটা আলগা ধরনের ফেডারেশন হিসেবে। কিন্তু কংগ্রেস করছে এই ধারণার বিরোধিতা। এর ফলে ভারতে বাড়তে পারে জাতিসত্তার সঙ্ঘাত। আর বর্তমান ভারত এর ফলে ভেঙে যেতেই পারে। জওয়াহেরলাল নেহরু মনে করতেন, হিন্দি ভাষার মাধ্যমে ভারতে এক শক্তিশালী ঐক্যবদ্ধ জাতি গড়ে তোলা সম্ভব হবে। কিন্তু এখন আর তা মনে হচ্ছে না। কিন্তু অদূরভবিষ্যতে ভারতকে তার জাতিসত্তা সমস্যার সমাধানে সচেষ্ট হতে হবে।
বাংলাদেশের আওয়ামী লীগ সরকার চাচ্ছে, ভারতে কংগ্রেস সরকার টিকুক। কিন্তু বাংলাদেশে সরকারের ইচ্ছা দিয়ে ভারতের জনমত গঠিত হবে না। ভারতের প্রয়োজন দিয়েই গঠিত হবে ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের জনমত। ভারত একটি ছোট দেশ নয়। এর সব অঞ্চলের ইতিহাসও নয় এক। এক নয় মানবধারা। এসব বাস্তবতা এখন আগের তুলনায় অনেক প্রকট লাভ করছে। ভারতে যে দলই মতায় আসুক, বাংলাদেশকে তাকে স্বীকার করতে হবে। তার সাথে সহযোগিতা করে চলতে হবে আমাদের জাতীয় স্বার্থকে সমুন্নত রেখে। তবে আমাদের দেশের ভৌগোলিক অবস্থান এবং ইতিহাসের ধারা এমন যে, আমাদের কূটনীতিতে ভারত পেতে বাধ্য সর্বোচ্চ বিশেষ বিবেচনা।
ঢাকায় ভারতের হাইকমিশন সম্পর্কে নানা কথা শোনা যায়। ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনে যত লোক কাজ করেন, অন্য কোনো দেশের কূটনৈতিক কেন্দ্রে তা করেন না। কেন ভারতের হাইকমিশনে এত লোক কাজ করবে, সেটা নিয়ে উঠছে অনেক প্রশ্ন। আমরা অনেকে মনে করি যে, ভারতীয় হাইকমিশনে কর্মচারীর সংখ্যা অন্য দেশের কূটনৈতিক সংস্থারই অনুরূপ হওয়া উচিত। ভারতের হাইকমিশন থেকে একটি মাসিক পত্রিকা প্রকাশিত হয়, যা পড়ে মনে প্রশ্ন জাগে এটা ভারতের না বাংলাদেশের পত্রিকা। এই পত্রিকা বাংলাদেশের জন্য হতে পারছে বেশ কিছটিা তির কারণ। বিরাট দেশ ভারত। ভারতের সমস্যা অনেক।
ভারতের মানুষ এসব সমস্যার সমাধান করে অগ্রসর হতে চাচ্ছে। আমরা ভারত বিচিত্রা পড়ে যদি এই অগ্রগতি সম্পর্কে অবগত হতে পারি, তবে সেটা আসতে পারে আমাদেরও দেশ গড়ার কাছে। কিন্তু ভারত বিচিত্রায় ভারতের অগ্রগতি সম্পর্কে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ থাকে না। বিশেষ একটি উদ্দেশ্য নিয়েই চলেছে পত্রিকাটির প্রকাশনা। এ প্রসঙ্গে আমাদের সচেতন হওয়া প্রয়োজন।
গত বছর শাহবাগে যখন তথাকথিত তরুণ প্রজন্মের সমাবেশ হচ্ছিল, তখন এক ভারতীয় মন্ত্রী এসেছিলেন আমাদের দেশে। যতদূর মনে পড়ছে, তিনি আমাদের তথিত তরুণ প্রজন্মকে করেছিলেন প্রশংসা। এরকম প্রশংসা একটা দেশের ঘরোয়া রাজনীতিতে             হস্তেেপর সামিল এবং কূটনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত। কিন্তু বাংলাদেশের েেত্র ভারত যেন মানতে চাচ্ছে না স্বীকৃত কূটনৈতিক শিষ্টাচারসমূহ সংরণ করতে। এটা দুঃখজনক। অন্য দিকে বাংলাদেশ সরকার সম্প্রতি বলেছে, বাংলাদেশ ভারতে স্থিতিশীল সরকার দেখতে চান। এরকম মন্তব্যও কূটনৈতিক শিষ্টাচারের মধ্যে পড়ে না। কারণ, ভারতের জনগণ বোঝেন, তারা কেমন সরকার চান। এটা তাদের নিজস্ব রাজনীতির ব্যাপার। আমাদের এতে সরকারিভাবে মন্তব্য করা সাজে না। যদিও দেশের পত্রপত্রিকা বেসরকারিভাবে অনেক কিছুই পারে বলতে।

পয়লা বৈশাখ

বাংলা সনের মাসগুলো আমাদের গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত ও বসন্ত ঋতুচক্রের আগমন-নির্গমনের মধ্য দিয়ে দেশের আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত। ছায়ানট-উদীচীর নটনটীরা রবীন্দ্রনাথের গান পরিবেশনের মাধ্যমে ‘ঋতুবরণ’ করুক বা না করুক বিধাতার অমোঘ বিধানে প্রাকৃতিক নিয়মে ঋতু পরিবর্তন হবেই। এর প্রভাব পড়বে ধর্ম-বর্ণ-গোত্র-ভাষা নির্বিশেষে এ দেশের সমগ্র জনগোষ্ঠীর ওপর। হিন্দু সম্প্রদায়ের যাবতীয় ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, পূজা-পার্বণ, উৎসব উদযাপিত হয়ে থাকে বাংলা সনের পঞ্জিকা অনুযায়ী। চৈত্রের শেষ দিনটিতে পালন করা হয়ে থাকে চৈত্রসংক্রান্তি। পূজা অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে তারা বাংলা নববর্ষ উদযাপনের সূচনা করে থাকে। ছায়ানটের শিল্পীরা রমনা বটমূলে রবীন্দ্রনাথের গান এবং ধানমন্ডি রবীন্দ্র সরোবরে মঙ্গল প্রদীপ প্রজ্বলনের মধ্য দিয়ে নববর্ষ উদযাপনের সূচনা করে থাকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে শুরু হয় ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’।
হিজরি বর্ষপঞ্জির প্রতিটি মাসের প্রভাব বিশ্বব্যাপী প্রধানত মুসলিম উম্মাহর ধর্মীয় বিধিনিষেধ, উৎসব অনুষ্ঠান পালনের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত।
 মোগল শাসনের ৭০০ বছরে এ উপমহাদেশের শাসনকার্য পরিচালিত হয়েছে হিজরি সাল অনুযায়ী এবং তখনকার রাষ্ট্রভাষা ছিল ফারসি। মোগল সাম্রাজ্যের পতনের পর ১৯০ বছর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এবং ব্রিটিশ শাসনামলে শাসনকার্য চলত গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী। তাদের রাষ্ট্রভাষা ছিল ইংরেজি। ব্রিটিশরা উপমহাদেশ ছেড়ে চলে গেলেও শাসনকার্য পরিচালিত হতে থাকে তাদের প্রবর্তিত ক্যালেন্ডার অনুযায়ী। রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক কাজে ইংরেজি ভাষার প্রাধান্য এখনো বিদ্যমান। সব অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী। সর্বক্ষেত্রে ইংরেজির প্রাধান্য এখনো দৃশ্যমান।
মোগল বাদশাহ আকবর রাজকার্য পরিচালনার ব্যয়ভার নির্বাহের জন্য, কৃষিকাজে সম্পৃক্ত প্রজাকুলের কাছ থেকে রাজকর আদায়ের সুবিধার্থে ‘তারিখ-ই-ইলাহী’ বা ‘ফসলী সন’ উদ্ভাবনের জন্য সে সময়ের পণ্ডিত, বিজ্ঞানী এবং জোতির্বিজ্ঞানী আমির ফতেহ উল্লাহ সিরাজীকে নির্দেশ দেন। আকবরের নবরতœ সভার সদস্য এবং পণ্ডিত আবুল ফজলের ‘আকবরনামা’ থেকে জানা যায়, কৃষকদের জন্য হিজরি সাল অনুযায়ী খাজনা নির্ধারণকে প্রজাহিতৈষী আকবর অন্যায় কাজ বলে বিবেচনা করতেন। কারণ, ফসল উৎপাদিত হয় সৌরসাল অনুযায়ী, অথচ খাজনা নির্ধারণ করা হতো চান্দ্রসনের ভিত্তিতে। দেখা যায়, প্রতি ৩১ চান্দ্রসন প্রায় ৩০ সৌরসনের সমান।
৯৯২ হিজরি (১৫৮৪ খ্রি:) আবুল ফজল ফসলি সনের ফরমান জারি করেন। এতে উল্লেখ করেন, বাদশাহ আকবরের সিংহাসনারোহণকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য ৯৬৩ হিজরির প্রথম মাস মহররম থেকে ‘তারিখ-ই-ইলাহী’র সময় গণনা শুরু হবে। তখনো বঙ্গে ‘শকাব্দ’ চালু ছিল এবং এর প্রথম মাস ছিল ‘চৈত্র’। ৯৬৩ হিজরির মহররম মাসে শকাব্দের বৈশাখ মাস মিলে যাওয়ায় এ ফরমানে তারিখ-ই-ইলাহীর বর্ষ শুরুর মাস ‘বৈশাখ’কে নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়। সে থেকেই চৈত্রের পরিবর্তে বৈশাখেই বাংলা নববর্ষের সূচনা।
গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের মতো বাংলা সনেও ৩৬৫ দিন গণনা করা হয়ে থাকে। উল্লেখ্য, সূর্যকে একবার প্রদক্ষিণ করে আসতে পৃথিবীর সময় লাগে ৩৬৫ দিন ৫ ঘণ্টা ৪৮ মিনিট ৪৭ সেকেন্ড। সময়ের এ ব্যবধানকে ঘুচানোর জন্য গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারে প্রতি চার বছর অন্তর ফেব্রুয়ারি মাসে লিপ ইয়ার হিসেবে এক দিন যোগ করা হয়ে থাকে। আগে এ নিয়মটি ছিল না। বাংলা সনের সাথে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের সমন্বয় করার জন্য জ্ঞানতাপস ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহকে প্রধান করে বাংলা একাডেমির উদ্যোগে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। ওই কমিটি ১৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৬ সালে বাংলা সনের নি¤œবর্ণিত সংস্কার সাধন করেÑ
১. বছরের প্রথম পাঁচ মাস, বৈশাখ থেকে ভাদ্র পর্যন্ত প্রতিটি মাস গণনা করা হবে ৩১ দিন।
২. বাকি সাতটি মাস, আশ্বিন থেকে চৈত্র পর্যন্ত প্রতিটি মাস গণনা করা হবে ৩০ দিন।
৩. গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের প্রতি লিপ ইয়ার বর্ষে বাংলা সনের ফাল্গুন মাসের সাথে অতিরিক্ত একটি দিন যুক্ত হবে (যা ২৯ ফেব্রুয়ারির ১৪ দিন পর)।
এ সংস্কারের ফলে আমরা প্রতি ইংরেজি বছরের ১৪ এপ্রিল পয়লা বৈশাখ উদযাপন করতে পারছি। সংশোধিত এ বাংলা বর্ষপঞ্জি বাংলাদেশে কার্যকর হয় ১৯৮৭ সালে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিরা এ সংশোধন গ্রহণ করেননি। বাংলা সনের সাথে হিন্দু সংস্কৃতির নিগূঢ় সম্পর্কের কারণে তারা তাদের পুরনো ক্যালেন্ডারের ভিত্তিতেই ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি উদযাপন করে থাকেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইন আর্টস ইনস্টিটিউটের কিছু ছাত্র যশোরে গিয়ে ‘চারুপীঠ’ নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলে। বাংলা নববর্ষ উদযাপনে মঙ্গল শোভাযাত্রার উদ্বোধন ছিল যশোরে ১৯৮৬ সালে। এর উদ্দেশ্য হিসেবে উদ্যোক্তারা দাবি করেনÑ রঙ-বেরঙের মুখোশ পরে শোভাযাত্রায় অংশ নিলে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ সহজ হবে। চৈত্রের শেষ রাতে যশোর শহরে রঙ-বেরঙের আল্পনা আঁকা হয়েছিল। ভূতপ্রেত, দেও-দানবের মুখোশ, ফুল-পাখি ও বাঘের রেপলিকা ব্যবহার করা হয় সেই শোভাযাত্রায়। ঢাকার চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে ১৯৮৮ সালে প্রথম মঙ্গল শোভাযাত্রা বের হয় বলে শোনা যায়। এতে ব্যবহৃত হয় শিল্পীদের তৈরী দশটি ছোট আকৃতির ঘোড়া, একটি বৃহদাকার হাতি (যাকে হিন্দুরা ‘গণেশ’ বলে পূজা করে থাকে) এবং ৫০টি মুখোশ। এরপর থেকে প্রতি বছর মঙ্গল শোভাযাত্রা বের হয়; যাতে ব্যবহৃত হয় লক্ষ্মীপেঁচা, গণেশ, বাঁদর, হনুমান, উল্লুক, পেখম তোলা ময়ূর, রাক্ষস-খোক্ষসের রেপলিকা। দেব-দেবীদের মুখোশ ব্যবহৃত হয়। ঢাক-ঢোল-কাঁসার ঘণ্টার তালে তালে চলতে থাকে নৃত্য ও আনন্দ উল্লাস। শোভাযাত্রার সাথে যোগ হয়েছে এখন বিশেষ মহলের রাজনীতির প্রলেপ ও প্রচারণা।
এ দেশে সাংস্কৃতিক বিপর্যয় চরমে পৌঁছেছে। ভিনদেশী হিন্দির দাপটে বাঙালি শিশুরা এখন বাংলার চেয়ে হিন্দিতে বাতচিত করতে অনেক বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছে। দেশী টিভি চ্যানেলগুলো অনেক ক্ষেত্রে অপসংস্কৃতির প্রচার এবং প্রসারের বিনা বাধায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। বিদেশী মোবাইল অপারেটররা পাল্লা দিয়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের নামে বিদেশী নায়ক-নায়িকা, গায়ক-গায়িকাদের এ দেশে এনে যেসব অনুষ্ঠান করছে, সেগুলো আমাদের দেশজ সংস্কৃতিকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। কখনো জাতীয় স্টেডিয়ামে, কখনো আর্মি স্টেডিয়ামে প্রতিবেশী দেশ থেকে আগত শিল্পীরা অশ্লীল পোশাক পরে নাচগান করে থাকে, তা সুস্থ রুচি এবং সমাজের জন্য রীতিমতো বিব্রতকর। হিন্দি চ্যানেলগুলোতে প্রচারিত নাটক, সিনেমা এবং ‘খোলামেলা’ নৃত্যগীত আমাদের দেশজ সংস্কৃতিকে উচ্ছন্নে নিয়ে যাচ্ছে। পারিবারিক শৃঙ্খলা, সামাজিক সৌজন্যবোধ নৈতিকতার স্থলনে দ্রুত পতনোন্মুখ। পয়লা বৈশাখেও অবাধ মেলামেশা হলে তা হবে দেশীয় ঐতিহ্যের পরিপন্থী।

সত্য বলা বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়িয়েছে


১৯৭২-৭৫ সালে শেখ মুজিবের শাসনকালে পরলোকগত সাংবাদিক নির্মল সেন দৈনিক বাংলায় এই শিরোনামে কলাম লিখেছিলেন, ‘সত্য বলা বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়িয়েছে’। সে সময়ের সংবাদপত্রে সত্য প্রকাশিত হলেই আওয়ামী শাসক মহলে একেবারে হৈ হৈ রৈ রৈ পড়ে যেত। এরা রাজাকার, এরা পাকিস্তান ও চীনের এজেন্ট। এদের মুজিববাদের নিড়ানি দিয়ে উপড়ে ফেলতে হবে। সেরকম উপড়ে ফেলার জন্য নানা ধরনের বাহিনী তৈরি করেছিলেন। লাল বাহিনী, নীল বাহিনী গঠিত হয়েছিল শাসক দলের নেতৃত্বে। আর সরকারিভাবে গঠিত হয়েছিল রক্ষীবাহিনী। শুনেছি, আগের দিনে শিশু কাঁদলে মায়েরা তাদের এই বলে থামাবার চেষ্টা করতেন যে, চুপ চুপ, বর্গি আসবে। আওয়ামী লীগের প্রথম শাসনকালে শিশুদের কান্না থামাতে বলা হতো, চুপ চুপ, রক্ষীবাহিনী আসবে। হাজারো মায়ের বুক খালি করে, বহু বোনকে বিধবা করে, বহু শিশুকে পিতৃহারা করে এসব বাহিনী বাংলাদেশে হাজার হাজার মানুষকে খুন করেছে।
এমন সব ঘটনার প্রতিবাদের সহজ কোনো পথ সে সময় আর অবশিষ্ট ছিল না। পত্রিকা অফিসে তালা, যখন তখন হামলা, সাংবাদিকদের ওপর বর্বর পুলিশি নির্যাতনÑ এগুলো ছিল সেই শাসনকালে দৈনন্দিন ঘটনা। ১৯৭২ সালে যখন নবগঠিত রাজনৈতিক দল জাসদ দৈনিক গণকণ্ঠ পত্রিকা প্রকাশ করল, তখন থেকেই পত্রিকাটির ওপর খুব রুষ্ট ছিলেন তখনকার সরকারপ্রধান। রেসকোর্সের জনসভায় দাঁড়িয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘৩০ বচ্ছর রাজনীতি করলাম, একটা পত্রিকা বের করতে পারলাম না। টাকা কোথা হইতে আসে?’ ওই গণকণ্ঠ পত্রিকা অফিসে হামলা তখন নিত্যদিনের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তখন জাসদের গণকণ্ঠ, মওলানা ভাসানীর হক কথা, সাপ্তাহিক হলিডে, স্পোক্সম্যান, মুখপত্র ও চট্টগ্রামের ইস্টার্ন এক্সামিনার এগুলোই ছিল বিরোধী সংবাদপত্র। এগুলোর মধ্যে প্রচার সংখ্যা সবচেয়ে বেশি ছিল গণকণ্ঠ ও হক কথা’র। সে সময় হেন নির্যাতন নেই, যা এসব পত্রিকার বিরুদ্ধে করা হয়নি। এসব পত্রিকার সম্পাদকদের গ্রেফতার করে জেলে পোরা হয়েছে। জাতীয় সংসদ থেকে শুরু করে সব ফোরামে এদের চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করা হয়েছে এবং এখনকার মতোই অশোভন ভাষায় তাদের গালাগাল করা হয়েছে। তারা এখনো যা করছেন, সে সময়ও তাই করেছিলেন। ৪০ বছর পরেও তাদের ভেতরে নতুন শিক্ষা কিংবা বয়সের প্রাজ্ঞতার পরিচয় দেখতে পাচ্ছি না। ‘ফরগিভ’ না পাওয়া এক মন্ত্রী ফরগিভ না কিসের আশায় এমন ভাষায় কথা বলছেন যে, যেগুলো মাতারিদেরও হার মানায়। কেউ যখন যুক্তিতে পারে না, তখন সে গালিগালাজের আশ্রয় নেয়। ভদ্রলোকেরা গালিগালাজ করতে পারে না। তাদের সুরুচিতে বাধে। ফলে ভদ্রলোকেরা অনেক সময়ই হেরে যায়। এখনো পরিস্থিতি তেমনি আছে। পৃথিবী বদলে গেলেও ঠ্যাঙাড়ে চরিত্র কখনো বদলাবার নয়।
সম্প্রতি বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দু’টি বক্তব্য নিয়ে এমনই এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। প্রথম দফায় তারেক রহমান বলেছেন যে, জিয়াউর রহমান ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম প্রেসিডেন্ট। দ্বিতীয় বক্তব্য হচ্ছে, শেখ মুজিব ১৯৭২ সালে অবৈধভাবে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। এ কথাগুলো না বললে চলত কি না সে প্রসঙ্গ ভিন্ন। কারণ আমরা দেখি, আওয়ামী লীগ নন-ইস্যুকে অবিরাম ইস্যু বানিয়ে মূল ইস্যু থেকে মানুষের দৃষ্টি ভিন্ন দিকে সরিয়ে নেয়। এর মধ্যে মতলব আছে। মতলবের ফাঁদে আমরা ধরাও দিই। আর আড়ালে আওয়ামী লীগ তার অপকর্মগুলো চালিয়ে যেতে থাকে। তখন আলোচনার শোরগোল উঠতে শুনি না। জিয়াউর রহমান যে বাংলাদেশের প্রথম প্রেসিডেন্ট ছিলেন সেটি এখন একটি বিশেষ আলোচিত প্রসঙ্গ। তার ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণা যারা শুনেছেন, তারা জানেন। তিনি বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনীর প্রধান ও অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে সে ঘোষণা দিয়েছিলেন। পরে চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতারা তাকে বোঝান যে, ঘোষণাটি শেখ মুজিবের নামে দিলে তা অধিকতর কার্যকর হবে। সেটিও যৌক্তিক ছিল। ফলে ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ তিনি যে ঘোষণাটি দেন, তা দিয়েছিলেন শেখ মুজিবের পক্ষে।
সে ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ নেতারা জিয়াউর রহমানের বদলে নিজেরা ঘোষণাটি দিতে চাননি। কারণ তারা এটা উপলব্ধি করেছিলেন যে, যুদ্ধের জন্য পেছনে একজন সেনা কর্মকর্তা থাকা ভালো। এ নিয়ে পরবর্তী সময়ে আর কোনো উচ্চবাচ্য হয়নি। কার্যত ১৯৭১ সালে ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠিত হওয়ার আগ পর্যন্ত বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব জিয়াউর রহমানের হাতেই ছিল। প্রেসিডেন্টই বলি, স্বাধীনতাযুদ্ধই বলি, রাষ্ট্রের চালিকাশক্তিই বলিÑ সব কিছুর দায়িত্বই পালন করেন তিনি। সেটি বই লিখে স্বীকার করেছেন জেনারেল সফিউল্লাহ, আবুল মাল আবদুল মুহিতসহ আওয়ামী লীগ নেতারা।
এখন কেউ কেউ বলছেন, শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন বলেই পাকিস্তান বাহিনী তাকে গ্রেফতার করেছিল। এটি ডাহা মিথ্যা কথা। এ কথা সত্য যে, ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ শেখ মুজিবুর রহমান রেসকোর্স ময়দানে তার ভাষণে বলেছিলেন যে, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ এটিই যদি তার স্বাধীনতার ঘোষণা হয়ে থাকে তাহলে পাকিস্তান সরকার ২৩ মার্চ পর্যন্ত তার সাথে এক টেবিলে বসে আলোচনায় প্রবৃত্ত হতো না। বরং সে সময়ই তাকে গ্রেফতার করত এবং গোটা পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য তিনি শেষ পর্যন্ত পাকিস্তান সরকারের সাথে আলোচনা চালিয়ে গেছেন। ১৯৭৩ সালে দৈনিক বাংলায় প্রকাশিত বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের সাক্ষাৎকারে দেখা যায় আরেক চিত্র। ফলে এ চ্যাপ্টারগুলো ওখানেই শেষ হওয়ার কথা।
এবার নতুন প্রসঙ্গ। তারেক রহমান গত ৯ এপ্রিল লন্ডনের ওয়েস্টমিনস্টার সেন্ট্রাল হলে এক সুধী সমাবেশে বলেছেন যে, বাংলাদেশের প্রথম ‘অবৈধ’ প্রধানমন্ত্রী ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। অবৈধ কেন ছিলেন তারও প্রমাণ তিনি উপস্থিত করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল গৃহীত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে লেখা রয়েছে যে, ‘এতদ্বারা দৃঢ়ভাবে ঘোষণা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিতেছি যে, সংবিধান প্রণীত না হওয়া পর্যন্ত শেখ মুজিবুর রহমান প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপতি থাকিবেন এবং সৈয়দ নজরুল ইসলাম প্রজাতন্ত্রের উপ-রাষ্ট্রপতি থাকিবেন।’ সঙ্গতভাবেই তারেক রহমান প্রশ্ন তুলেছেন যে, কিন্তু ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে শেখ মুজিব ১২ জানুয়ারি কিভাবে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন? তখনো তো সংবিধান প্রণীত হয়নি।
তিনি এই প্রশ্ন উত্থাপনের পর জাতীয় সংসদ থেকে শুরু করে সর্বত্র খিস্তি-খেউরের ঝড় উঠেছেÑ তারেক রহমান অর্বাচীন, তারেক রহমানের মস্তিষ্ক পরীক্ষা করা উচিত, ‘তোর বাপ স্যার বলতে বলতে মুখে ফেনা তুলত’, ‘খালেদা জিয়া আপনার ছেলেকে সামলান’। কোনটি সত্য ইতিহাসই সাক্ষ্য দেবে। কিন্তু সত্যিই তো সংবিধান যখন প্রণীতই হয়নি, তাহলে দেশে ফিরে সংবিধান প্রণীত হওয়া পর্যন্ত শেখ মুজিবের রাষ্ট্রপতিই থাকা উচিত ছিল। কী বিধানবলে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র উপেক্ষা করে শেখ মুজিবুর রহমান প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারলেন। এই সময়টুকুর জন্য স্বাধীনতাযুদ্ধ পরিচালনাকারী তাজউদ্দীন আহমদ প্রধানমন্ত্রী থাকলে এমন কোন্ মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যেত?
সে হিসেবে কোনো বিধি-বিধানেরই তোয়াক্কা করেনি তখনকার আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব। তাদের ইচ্ছা হয়েছে, তিনি স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র লঙ্ঘন করেছেন। এই কথা শুধু তারেক রহমান বলেননি। এটাই ঐতিহাসিক সত্য যে, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে রাষ্ট্রপতি ও উপরাষ্ট্রপতি সম্পর্কে এমন বিধানই ছিল। গত ১০ এপ্রিল ‘স্বাধীন বাংলা সরকার গঠন দিবস আজ’ শিরোনামে দৈনিক ইত্তেফাক-এর প্রথম পৃষ্ঠার চতুর্থ কলামের শীর্ষে একটি সংবাদ পরিবেশিত হয়েছে। তাতেও উল্লেখ করা হয়েছে যে, ‘১৯৭১ সালের এদিন মানুষের প্রতি মমতা, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে স্বাধীন সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার গঠন করা হয়। সরকার গঠনের পর আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র (প্রোকেমেশন অব ইন্ডিপেন্ডেন্স) পাঠ করা হয়।’ ‘ঘোষণায় বলা হয়, স্বাধীন বাংলাদেশে সংবিধান প্রণীত না হওয়া পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি এবং সৈয়দ নজরুল ইসলাম উপরাষ্ট্রপতি থাকবেন। সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাজউদ্দীন আহমদ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে ভাষণ দেন।’
এবার কি তাহলে আপনারা সমস্বরে আপনাদের মন্ত্রিসভার সদস্য আনোয়ার হোসেনকে অর্বাচীন, তুই তুকারি করে গালিগালাজ করবেন? স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রকে আমরা যদি দলিল হিসেবে মানি, তাহলে হুট করে শেখ মুজিবের প্রধানমন্ত্রী হওয়া অবশ্যই রীতিসম্মত ছিল না। আওয়ামী লীগের রুচি-বিবর্জিত মন্ত্রীরা এ কথা বলছেন না যে, তারেক রহমান মিথ্যা বলেছেন কোথায়। তিনি সত্য বলেছেন এবং বিপদে পড়েছেন। তিনি শুধু একা নন, এই সমাজে যারাই সত্য বলে, তারাই সরকারের এরকম কঠোর সমালোচনার মুখোমুখি হয়। ফলে সত্য বলা আবারো বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গিনেস বুকে নাম

১৩ এপ্রিল ২০১৪, রবিবার, ১০:০৮
আয়ারল্যান্ডের রাজধানী ডাবলিনে গিনেস ব্রুয়ারির ম্যানেজিং ডিরেক্টর পদে কাজ করতেন স্যার হিউ বিভার। তিনি ছুটির দিনে তার বন্ধুদের নিয়ে পাখি শিকার করতে ভালোবাসতেন। তারা যেতেন বনে জঙ্গলে এবং পাহাড়ি এলাকায়। নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য খুজে বেড়াতেন নতুন জাতির পাখিকে।
১০ নভেম্বর ১৯৫১-তে এমনই এক শুটিং টৃপে আয়ারল্যান্ডের নর্থ স্লব নামে একটি জায়গায় গিয়েছিলেন স্যার হিউ এবং তার বন্ধুরা। স্লেনি নদীর তীরে এই জায়গাটি গাছপালায় ভর্তি। এক সময়ে গাছের ডালে বসা একটি গোলডেন প্লোভার (Golden Plover)-এর দিকে বন্দুক তাক করলেন স্যার হিউ।
কিন্তু তার লক্ষ্য ব্যর্থ হলো।
তিনি বন্ধুদের বললেন, তার মিস করার কারণ হলো গোলডেন প্লোভার-ই ইওরোপের সবচেয়ে দ্রুতগামী পাখি। বন্ধুরা দ্বিমত প্রকাশ করে বললেন, ইওরোপে সবচেয়ে দ্রুতগামী পাখি হচ্ছে রেড গ্রাউস (Red Grouse)।

শুটিং টৃপের শেষে তারা সবাই ফিরে গেলেন কাসলবৃজ হাউজে। কিন্তু তর্কের শেষ হচ্ছিল না।
এক পর্যায়ে স্যার হিউ বুঝলেন, শুধু পাখি বিষয়েই নয়, অন্যান্য বহু বিষয়েও নিশ্চয়ই এ রকম অনেক প্রশ্ন আছে যার উত্তর আয়ারল্যান্ড তথা ইওরোপে অমীমাংসিত আছে। চায়ের দোকানে, বিয়ার খাওয়ার পাব (Pub)-এ, অফিসে লাঞ্চ আওয়ারে অথবা বাড়িতে ডিনার পার্টিতে এ রকম তর্ক নিশ্চয়ই প্রতিদিনই হয়। সুতরাং এমন একটা বই যদি হয় যেখানে বিভিন্ন রেকর্ডের সব লিস্ট থাকবে তাহলে সেটি নিশ্চয়ই জনপ্রিয় হবে।

যেমন ভাবনা তেমনই কাজ। পরদিন স্যার হিউ লন্ডনে অবস্থানরত তার দৌড়বিদ ইংরেজ বন্ধু কৃস্টফার চ্যাটাওয়ে-কে ফোন করলেন।
তুমি তো মাটিতে মিডল আর লং ডিসটান্স রানিংয়ে অন্যতম দ্রুতগামী মানুষ হিসেবে বিশ্বজোড়া নাম করেছ। কিন্তু বলতে পারো আকাশে সবচেয়ে দ্রুতগামী পাখি কোনটি? স্যার হিউ তাকে জিজ্ঞাসা করলেন।
চ্যাটাওয়ে তার অপারগতা প্রকাশ করলেন। কিন্তু তিনি বললেন, এ বিষয়ে দুই যমজ ভাই নরিস ও রস ম্যাকহুইর্টার, সাহায্য করতে পারবেন। আমার সঙ্গে তারা ইউনিভার্সিটিতে পড়ত। তখনই দেখেছি ওরা ফ্যাক্টস ও ফিগার্স নিয়ে অনেক রিসার্চ করে। এখন ওরা লন্ডনেই ফ্যাক্টস ও ফিগার্সের একটা এজেন্সি খুলেছে।

স্যার হিউ যোগাযোগ করলেন নরিস ও রসের সঙ্গে। জানতে পারলেন তিনিই সঠিক ছিলেন। রেড গ্রাউসের চাইতে বেশি স্পিডে উড়তে পারে গোলডেন প্লোভার। তবে, লেভেল ফাইটে বিশ্বে সবচেয়ে দ্রুতগামী পাখি হচ্ছে অ্যানাটিডে (Anatidae) নামে এক জাতির হাস। এরা ঘণ্টায় ৫৬-৬২ মাইল (৯০-১০০ কিলোমিটার) স্পিডে উড়তে পারে। আর শিকার ধরতে আকাশ থেকে নিচে সবচেয়ে বেশি স্পিডে ডাইভ দিতে পারে পেরেগন ফ্যালকন। ডাইভের সময় তার স্পিড হতে পাড়ে ঘন্টায় ১৮৬ মাইল (৩০০ কিলোমিটার)।

এরপর স্যার হিউ বিভিন্ন রেকর্ড সংগ্রহ করে একটি বই প্রকাশের জন্য নরিস ও রসকে চুক্তিবদ্ধ করলেন। লন্ডনের ১০৭ ফিট স্টৃটে দুই ভাই একটি নতুন অফিস ভাড়া নিয়ে কাজ শুরু করলেন। পরিণতিতে আগস্ট ১৯৫৪-তে দি গিনেস বুক অফ রেকর্ডস নামে একটি বই প্রকাশিত হয়। এই বইয়ের মাত্র ১,০০০ কপি ছাপা হয়েছিল এবং বন্ধু ও পরিচিতজনদের মধ্যে ফৃ বিলি করেছিলেন স্যার হিউ।
বইটি বিলি করার পর স্যার হিউ আরো কপির জন্য অসংখ্য অনুরোধ পেলেন। অপ্রত্যাশিত সাড়া পাওয়ার পর বইটি বাণিজ্যিকভাবে প্রকাশের জন্য স্যার হিউ গিনেস সুপারলেটিভস লিমিটেড নামে একটি কম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৭ পৃষ্ঠার বাধানো দি গিনেস বুক অফ রেকর্ড ২৭ আগস্ট ১৯৫৫-তে বৃটেনে বাজারজাত হয় এবং এটি ডিসেম্বরে কৃসমাসের সময়ে বৃটিশ বেস্টসেলার লিস্টে টপে যায়।
এই সাফল্যে উৎসাহিত হয়ে পরের বছরে বইটি আমেরিকা সংস্করণ প্রকাশ করেন স্যার হিউ। সেখানে প্রথম বছরেই বইয়ের ৭০,০০০ কপি বিক্রি হয়ে যায়।
এরপর বিভিন্ন ভাষায় বিভিন্ন দেশে প্রতি বছর বইটি প্রকাশিত হতে থাকে। প্রতি বছরই বইটির নতুন সংস্করণ বাজারে আসা শুরু করে সেপ্টেম্বর অথবা অক্টোবরে যেন ডিসেম্বরে কৃসমাস বাজারটা ধরা যায়। ঈদ বার্ষিকী অথবা পূজা বার্ষিকীর মতোই গিনেসের নতুন সংস্করণের জন্য কৃসমাসের সময়ে পাঠকরা আগ্রহে অপেক্ষা করে। বিশেষত কিশোর-কিশোরীরা। নতুন বইয়ে কিছু পুরনো রেকর্ড বাদ দিয়ে বিগত বছরের নতুন রেকর্ডগুলো সংযোজিত হয়। তবে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক অবস্থানে যারা রেকর্ড করেন, বা রেকর্ড প্রত্যাশী, যেমন, স্পোর্টসে (অলিম্পিক, ফুটবল, কৃকেট, সুইমিং, ট্র্যাক ইভেন্টস) মুভি, বিজনেস অথবা পলিটিক্সে, তারা এই বইয়ে নিজের নাম ওঠানোর চাইতে নিজস্ব ক্ষেত্রে স্পেশালাইজড রেকর্ড বুকে নাম ওঠাতে বেশি উৎসাহী। যেমন, ক্রিকেট প্লেয়াররা চান উইসডেন (Wisden) বুকে নিজের নাম ওঠাতে যেখানে বাংলাদেশের সাকিব আল হাসানের নাম উঠেছে। উইসডেন প্রতি বছর নতুন সংস্করণ প্রকাশ করে। অর্থাৎ যারা স্বভাবগতভাবে প্রতিযোগিতাপরায়ণ তারা গিনেস বুকের তোয়াক্কা করেন না।

ম্যাকহুইর্টার ভাই দুজন বহু বছর বইটির তথ্য সংকলক ও সম্পাদক ছিলেন। এই বইয়ের সাফল্যের পিঠে চড়ে তারা রেকর্ড ব্রেকার্স নামে একটি টিভি সিরিজ উপস্থাপন করেন। এই অনুষ্ঠানে কিশোর কিশোরীরা বিশ্বের বিভিন্ন বিচিত্র রেকর্ড বিষয়ে প্রশ্ন করত দুই ভাইকে। এই দুই যমজ ভাইয়ের স্মৃতিশক্তি ছিল অসাধারণ।
ইতিমধ্যে উত্তর আয়ারল্যান্ডের স্বাধীনতাকামী গেরিলা দল আইআরএ (IRA) দুই ভাইকে চিহ্নিত করেছিল আয়ারল্যান্ডের স্বাধীনতা বিরোধী রূপ। তাদের হাতে ১৯৭৫-এ নিহত হন রস ম্যাকহুইর্টার। এরপর এই টিভি অনুষ্ঠানটির নতুন নাম হয় নরিস অন দি স্পট।

নিজস্ব গুন ও বৈচিত্র এবং পাশাপাশি এই টিভি অনুষ্ঠানের ফলে দি গিনেস বুক অফ রেকর্ডস হয় একটি সুপরিচিত নাম এবং সফল পণ্য, বিশেষত বিনোদনের জগতে বা এন্টারটেইনমেন্ট ওয়ার্ল্ডে।
গিনেস ব্রুয়ারি কর্তৃপক্ষ প্রথমে বইটি গিনেস সুপারলেটিভস লিমিটেডের নামে প্রকাশ করলেও দ্রুত এই কম্পানির নাম বদলে করেন গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস লিমিটেড। আমেরিকায় তারা স্টার্লিং বুকসের নামে বইটি প্রকাশ করেন। এরপর বইটি প্রকাশিত হতে থাকে ডায়াজিও (Diageo)-র ব্যানারে ২০০১ পর্যন্ত। তারপর বইটির কপিরাইট কিনে নেয় জুলেইন এন্টারটেইনমেন্ট (Guillane Entertainment)। মাত্র এক বছর পরেই জুলেইন এন্টারটেইনমেন্টকে কিনে নেয় এইচআইটি এন্টারটেইনমেন্ট (HIT Entertainment)। ২০০৬-এ এপ্যাক্স পার্টনার্স কিনে নেয় এইচআইটি এন্টারটেইনমেন্টকে। এর দুই বছর পরে ২০০৮-এ দি জিম প্যাটিসন গ্রুপ কিনে নেয় এপ্যাক্স পার্টনার্সকে। এখন জিম প্যাটিসন গ্রুপই গিনেস বুকের প্রকাশক। কিন্তু জিম প্যাটিসন গ্রুপের মালিক কে?
উত্তর : রিপলি এন্টারটেইনমেন্ট (Ripley Entertainment) যাদের হেড কোয়ার্টার্স হচ্ছে আমেরিকায় ফোরিডার অরল্যান্ডো শহরে। তবে তারা গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডের হেড কোয়ার্টার্স রেখেছে লন্ডনে। এই কম্পানি যুগপৎ গিনেস ওয়ার্ল্ড রের্কস এট্রাকশন্স নামেও বিশ্বের বিভিন্ন শহরে মিউজিয়াম বা যাদুঘর চালাচ্ছে। পাশাপাশি রিপলির বিলিভ ইট অর নট (বিশ্বাস করুন বা না-ই করুন) যাদুঘরও চালাচ্ছে।

বলা যায়, ১৯৫৪-তে সিরিয়াস তথ্য এবং রেকর্ড সংকলনের জন্য প্রতিষ্ঠিত কম্পানিটি এখন ৬০ বছর পরে নতুন মালিকানায় সিরিয়াস এবং ননসিরিয়াস, হালকা ফালতু ও আনন্দদায়ক তথ্য ও রেকর্ডের বইটির প্রকাশক হয়েছে। বর্তমান গিনেস বুকের এন্টাইটেইনিং চরিত্রের সঙ্গে মিল আছে রিপলি এন্টারটেইনমেন্ট নামের। ইতিমধ্যে গিনেস বুকের নামও বদলে গেছে। এখন এটি গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস নামে বের হয়- দি গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস নামে নয়।

সাম্প্রতিক সংস্করণগুলোতে গিনেস বেশি জোর দিয়েছে মানুষের প্রতিযোগিতা ও বিচিত্র কর্মকাণ্ডের ওপর। যেমন, কে সবচেয়ে বেশি ভার উত্তোলন করতে পারল অথবা কে সবচেয়ে বেশি হ্যামবার্গার দশ মিনিটে খেতে পারল। তবে খাওয়া এবং মদ্যপান বিষয়ে এখন গিনেস আর নতুন কোনো দাবি গ্রহণ করছে না মামলা-মোকদ্দমায় জড়িয়ে যাওয়ার ভয়ে। এসব রেকর্ড ছাড়াও গিনেস প্রকাশ করেছে সবচেয়ে বড় টিউমার কার ছিল, সবচেয়ে বিষাক্ত সাপ কোনটি, সবচেয়ে ছোট নদী কোনটি, সবচেয়ে বেশি সময় জুড়ে প্রচারিত টিভি সিরিয়াল কোনটি অথবা সবচেয়ে কম বয়স ব্যক্তি কে পৃথিবীর সব দেশে ঘুরে এসেছে। কে নাক দিয়ে সবচেয়ে বেশি নুডলস বের করতে পারে। কার চুল, নখ কতো লম্বা, ইত্যাদি।

১৯৯৫-এ নরিস ম্যাকহুইর্টার গিনেস প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান থেকে পদচ্যুত হন। তার বিদায়ের পর গিনেস বুক ক্রমেই বদলে যেতে থাকে। টেক্সটসহ তথ্যের বদলে ছবিসহ তথ্য গিনেসের পাতা দখল করে। এটাও একটা বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত ছিল। কারণ গিনেস বুকের মূল পাঠক কিশোর-কিশোরীরা লেখার চাইতে ছবি বেশি পছন্দ করে। এর একটি তাৎপর্য হচ্ছে এই যে অধিকাংশ বিশ্ব রেকর্ডই এখন আর বইতে (অথবা তাদের অনলাইন ওয়েবসাইটে) নেই। গিনেস বুকের বর্তমান প্রকাশক নিঃসঙ্কোচে তথ্য পরিবেশনের বদলে আনন্দ পরিবেশনে এগিয়ে গিয়েছেন। তবে কেউ যদি কোনো রেকর্ড প্রতিষ্ঠায় আগ্রহী হন তাহলে তারা সংশ্লিষ্ট তথ্য জানতে পারেন যদি লিখিতভাবে গিনেস বুক প্রকাশকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ঠিকানা : www.guinnessworldrecords.com
সাধারণত এসব চিঠির উত্তর বিনা দামে মাস দেড়েকের মধ্যে দেওয়া হয়। তবে কেউ যদি দ্রুত উত্তর চান তাহলে ৪৫০ ডলার (প্রায় ৩৬,০০০ টাকা) ফিস দিতে হবে।

এটা ঠিক যে বিশ্বের বহু রেকর্ডই গিনেস বুকে পাওয়া যাবে এবং সেখানে সেটা না থাকলে গিনেস কর্তৃপক্ষের ডেটা বেইসে পাওয়া যাবে। বিভিন্ন কারণে গিনেস বুকে পুরনো রেকর্ড সরিয়ে ফেলা হয়। সেটা হতে দৈহিক বিপদ অথবা নৈতিক অথবা পরিবেশগত কারণে। একবার সবচাইতে বেশি ওজনের মাছের রেকর্ড প্রকাশিত হবার পর অনেকেই তাদের ফার্মে মাছকে বেশি খাইয়ে মোটা করার চেষ্টায় ব্রতী হন। ওয়াইন, বিয়ার, হুইস্কি জাতীয় অ্যালকোহলিক ডৃংক খাওয়ায় রেকর্ড প্রতিষ্ঠায় অনেকেই উৎসাহী হন। কেউ কেউ মোটর সাইকেল খাওয়া অথবা ব্লেড গলার মধ্যে ঢোকানোতে আগ্রহী হন। এসব এখন বন্ধ করা হয়েছে।
আরেকটি বিষয়ে গিনেস বুক রেকর্ড প্রতিষ্ঠা করে না। সেটি হচ্ছে সৌন্দর্য। গিনেস কর্তৃপক্ষ বলেন, সৌন্দর্যের পরিমাপ সম্ভব নয় Ñ সেটা নির্ভর করে যিনি দেখছেন তার চোখের ওপর। সুতরাং বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর নারী অথবা সুন্দর পুরুষটি কে সেটা গিনেস বুকে জানা যাবে না।

গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস এখন ইংরেজিসহ মোট ২৯টি ভাষায় প্রকাশিত হয়। সাধারণ এ-ফোর সাইজে এই বইয়ের পৃষ্ঠা সংখ্যা হয় ২৮০-র কম। গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস ২০১৪ বৃটিশ সংস্করণের পৃষ্ঠা সংখ্যা ২৭২ এবং দাম ২০ পাউন্ড (প্রায় ২,৫০০ টাকা)।

বইটি নিজেই বিশ্ব রেকর্ড

বইটির নিজের সম্পর্কেই তথ্যগুলো ইনটারেসটিং। যেমন :
বিশ্বে কপিরাইট থাকা বইগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বই প্রতি বছর বিক্রি হয় গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস। বইটির বর্তমানে সম্পাদক ক্রেইগ গ্লেনডে (twitter@craigglenday)। কপিরাইট মুক্ত সবচেয়ে বেশি বিক্রীত বই বাইবেল।
আমেরিকার পাবলিক লাইব্রেরি থেকে সবচেয়ে বেশি চুরি হওয়া বই গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস।
বৃটেন, আমেরিকা, কানাডা, ফ্রেঞ্চ কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিউ জিল্যান্ড, ডেনমার্ক, হল্যান্ড, সুইডেন, ফিনল্যান্ড, ফ্রান্স, ইটালি, নরওয়ে, পর্টুগাল, রাশিয়া, স্পেন, ব্রাজিল ও সাউথ আমেরিকার অন্যান্য দেশের কপিগুলো ছাপা হয় স্পেনের বার্সেলোনাতে।
উপরোক্ত সব সংস্করণ ছাপতে ৯৫ দিন লাগে। এর জন্য দরকার হয় ৪৮,৫০০ মিটার (১০,৬৬৮ গ্যালন) কালি যার সমপরিমাণ তেল দিয়ে চারটি ৭৪৭ জাম্বো জেটের ফিউয়েল ট্যাংক ভরা যায়।
কভারের জন্য প্রয়োজনীয় সিলভার ফয়েল-এর দৈর্ঘ্য হয় ৪৭১ কিলোমিটার (২৯২ মাইল)। কভার বাইন্ডিংয়ের জন্য দরকার হয় ৬৭২.৭ টন কার্ডবোর্ড।
বইয়ের কাগজের জন্য দরকার হয় ৩,৫০০ টন ১১০ gsm ফিনেস ২২০ পেপার যা আসে ফিনল্যান্ড ও জার্মানি থেকে।
অন্যান্য সব সংস্করণ (জার্মানি, গৃস, ইসরেল, চায়না, জাপান, ক্রোয়েশিয়া, চেক রিপাবলিক, এস্টোনিয়া, হাঙ্গেরি, আইসল্যান্ড, ল্যাটভিয়া, পোল্যান্ড, রোমানিয়া এবং আরব দেশগুলোর জন্য) কপিগুলো ছাপা হয় একযোগে বিভিন্ন দেশে। বলা বাহুল্য, এদের জন্য যে কালি, ফয়েল, কার্ডবোর্ড ও কাগজ দরকার তার হিসাব আলাদা।
মাত্র একটি বই প্রতি বছরে একবার প্রকাশের জন্য যে বিরাট কর্মযজ্ঞ চলে সেটাই আরেকটা রেকর্ড।

গিনেস, গ্রীনিচ, গ্রীনিজ

গিনেস রেকর্ড বিষয়ে যখন বাংলাদেশের পত্রপত্রিকা এবং রাজনৈতিক নেতানেত্রীরা উৎসাহিত হওয়া শুরু করেন তখন তাদের অধিকাংশই জানতেন না গিনেস নামটির সঠিক বানান ও উচ্চারণ এবং এই রেকর্ড সংকলনের উৎপত্তি কিভাবে শুরু হলো। দৈনিক ইত্তেফাকে লেখা হতো গ্রীনিচ বুক অফ রেকর্ডস। তাই নেতানেত্রীরা একে বলতেন গ্রীনিচ রেকর্ডস। এই ভুলটি তারা করেছিলেন কারণ তারা বিবিসির বাংলা খবরের সূচনাতেই শুনতেন, এখন গ্রীনিচ মান সময় বাক্যটি। তারই ফলে আয়ারল্যান্ডের গিনেস বাংলাদেশে হয়ে যায় গ্রীনিচ!
এই ভুল নতুন মাত্রা পায় ওয়েস্ট ইন্ডিজের কৃকেটার গর্ডন গ্রীনিজ বাংলাদেশ কৃকেট টিমের কোচ নিযুক্ত হবার পর। পত্রপত্রিকা এবং নেতানেত্রীরা বলা শুরু করেন গ্রীনিজ রেকর্ডস। অর্থাৎ, ভুল সংশোধন করতে গিয়ে আরেকটি ভুল তারা করতে থাকেন। এ বিষয়ে সাপ্তাহিক যায়যায়দিন-এ একাধিকবার লেখালেখির পর ক্রমে গিনেস নামটি বাংলাদেশে চালু হতে থাকে।

মজার কথা এই যে, পশ্চিমের কোনো দেশে গিনেস শব্দটি উচ্চারণ করলে, মানুষ মনে করবে গিনেস বিয়ারের কথা বলা হচ্ছেÑ গিনেস রেকর্ডের কথা নয়। কারণ বিশ্বের ৬০টির বেশি দেশে উৎপাদিত এবং ১০০টির বেশি দেশে বিক্রি হওয়া গিনেস বিয়ারের জনপ্রিয়তা।
বিয়ার বিভিন্ন ধরনের হতে পারে, যেমন লাগার (Lager), পিলসনার, স্টাউট, ইত্যাদি। বিয়ারে এলকোহলের পরিমাণ ২% থেকে ৮% পর্যন্ত হতে পারে। সাধারণত বিয়ারে এলকোহলের পরিমাণ হয় ৫%। বাংলাদেশে বিক্রি হওয়া হাইনিকেন ৫% এবং ফস্টার্স-এ ৪.৯% এলকোহল থাকে।

বিয়ার উৎপাদিত হয় ব্রুয়ারিতে। ১৭৫৯-এ আয়ারল্যান্ডের রাজধানী ডাবলিনে আর্থার গিনেস প্রতিষ্ঠা করেন গিনেস ব্রুয়ারি। গিনেস বিয়ার পরিচিত হয় স্টাউট (Stout) নামে এবং এর রং ও স্বাদ হয় অন্য বিয়ারের চাইতে ভিন্ন। দামও কিছুটা বেশি। গিনেসের রং গাঢ় চকোলেট বা প্রায় কালো। এটি ঘন এবং ফেনায়িত। বিভিন্ন ধরনের গিনেস স্টাউটে বিভিন্ন পরিমাণ এলকোহল থাকে এবং তার পরিমাণ হতে পারে সর্বোচ্চ ৭.৫% (গিনেস ফরেইন একস্ট্রা স্টাউট-এ)। তবে বিশ্ব জুড়ে যে গিনেস অরিজিনাল স্টাউট বিক্রি হয় সেখানে এলকোহলের পরিমাণ থাকে ৪.২% যেটা হাইনিকেন, কালর্সবাগ, ফস্টার্সের চাইতে কম।

গিনেসের স্বাদ তিতা। এর স্বাদ কষ্ট করে আয়ত্ত করতে হয়। কিন্তু কেন গিনেসপায়ীরা কষ্ট করে গিনেসের স্বাদ আয়ত্ত করেন এবং তারপর বেশি দাম দিয়ে গিনেস খেতে অভ্যস্ত হন? এই প্রশ্নের উত্তরটা হচ্ছে অনেকে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, গিনেস স্বাস্থ্যের জন্য ভালো।

স্বাস্থ্যের জন্য ভালো
১৯৫৭-তে লন্ডনে গিয়ে বড় বড় বিলবোর্ডে দেখতাম গিনেস ইজ গুড ফর ইউ (Guinness is good for you) স্লোগান সংবলিত বিজ্ঞাপন। ওইসব বিজ্ঞাপনে দেখা যেত, একজন গিনেসপায়ী পুরুষ বিশাল ভারের লোহার স্ল্যাব স্বচ্ছন্দে তুলে দাড়িয়ে আছে।
অথবা গিনেসপায়ী পুরুষ দৌড়ে, সাতারে, নৌকা বাইচে প্রথম হচ্ছে। ইংরেজ লেখিকা ডরোথি এল. সেয়ার্স এই সেøাগানটির উদ্ভাবক ছিলেন।
গিনেস যে স্বাস্থ্যের জন্য ভালো সেটা প্রমাণ করতে এক সময়ে গিনেস কর্তৃপক্ষ ডাক্তারদের কাছে গিনেসের বোতল (সেই সময়ে ক্যান ছিল না) পাঠিয়ে দিতেন তাদের পেশেন্টকে ফৃ দিতে।
গিনেসের এই মার্কেটিং ট্যাকটিক্সের বিরুদ্ধে আপত্তি জানায় অন্যান্য বিয়ার উৎপাদনকারীরা। তখন গিনেস কর্তৃপক্ষ ওই বিজ্ঞাপনী সেøাগান বাদ দিতে বাধ্য হন।
এই বিতর্ক সত্ত্বেও এটা স্বীকৃত সত্য যে, সব বিয়ারের মধ্যে গিনেসেই এমন সব কেমিকাল মিশ্রিত আছে যা কলেস্টেরল কম রাখতে এবং দেহে রক্ত চলাচল ভালো রাখতে সহায়ক।

বাংলাদেশে গিনেস ম্যানিয়া

গিনেস ব্রুয়ারি প্রতিষ্ঠাতা আর্থার গিনেস, অথবা গিনেস বুক অফ রেকর্ডসের জন্মদাতা স্যার হিউ বিভার অথবা গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস বইটির বর্তমান মালিক রিপলি এন্টারটেইনমেন্ট কখনো কল্পনাও করেননি যে, সুদূর বাংলাদেশে, যেখানের মানুষ কখনো গিনেস খায়নি, এমনকি গিনেসের নামও শোনেনি, তারা গিনেসে এত উৎসাহী হবে।
গত কয়েক মাস যাবৎ বাংলাদেশে গিনেস বুকে নাম ওঠানোর ম্যানিয়া সৃষ্টি করা হয়েছে।

প্রথমে এই কর্মটি করেন রবি মোবাইল ফোন কর্তৃপক্ষ। তারা বাণিজ্যিক স্বার্থে বাংলাদেশের একটি মানবপতাকা গঠনে অংশ নিতে আহ্বান জানান। ১৬ ডিসেম্বর ২০১৩-তে তারিখে ঢাকায় প্যারেড গ্রাউন্ডে এই মানবপতাকাটি গঠিত হয়। তবে যেহেতু এটি ছিল মানবসহ এবং স্থলভূমিতে আবদ্ধ সেহেতু সাধারণ পতাকার মতো এটিকে আকাশে ওড়ানো সম্ভব হয়নি। কিন্তু তাতে কী? গিনেস বুকে তো নাম উঠলো।
এই আত্মপ্রসাদ বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। কয়েক দিন পরেই জানা গেল পাকিস্তান এই রেকর্ড ভেঙ্গে দিয়েছে। সেখানে বাংলাদেশের চাইতে বড় মানবপতাকা ভূমিতে তৈরি হয়েছে।
মানবপতাকার এই রেকর্ড সৃষ্টি এবং সেটি ভঙ্গের পর প্রচার উৎসাহী আওয়ামী লীগ সরকার স্থির করে এবার ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসে সর্বাধিক কণ্ঠে জাতীয় সঙ্গীত গাইবার রেকর্ড সৃষ্টি করতে হবে।
এই প্ল্যান কার্যকর করতে রাজধানী জুড়ে বড় বড় বিলবোর্ড স্থাপিত হয়। মোবাইল ফোনে এসএমএস পাঠান হয়। মিডিয়া জুড়ে ব্যাপক প্রচারণা চালান হয়। বাংলাদেশের মানুষকে দেশপ্রেমের প্রতিদ্বন্দ্বীবিহীন প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে আহবান জানান হয়। গুজব ছড়িয়ে পড়ে ২৬ মার্চে প্যারেড গ্রাউন্ডে উপস্থিত হলে জনপ্রতি ১,০০০ টাকা দেওয়া হবে। আবার কেউ কেউ বলেন, ১০০০ টাকা নয় মাত্র ৬০ টাকা দেওয়া হবে। তবে আসা-যাওয়া এবং দুপুরের খাওয়া ফৃ দেয়া হবে। এদের আনা নেওয়ার জন্য সরকারি নির্দেশে আন্ত:জেলা রুটের কোচগুলো দুইদিন ধরে স্ট্যান্ডবাই রাখা হয়। এই গিনেস প্রকল্পে মোট কত টাকা সরকার খরচ করেছে আশা করি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে অচিরেই জানা যাবে।

আওয়ামী লীগ সরকার কয়েক কোটি টাকা খরচ করে আবার প্রমাণ করে ইংরেজ চিন্তাবিদ ড. স্যামুয়েল জনসন (১৭০৯-১৭৮৪) ঠিকই বলেছিলেন। তার বিখ্যাত উক্তি Patriotism is the last refuge of a scoundrel (প্যাটৃয়টিজম ইজ দি লাস্ট রিফিউজ অফ এ স্কাউনড্রেল) বা শয়তানের নিরাপত্তার শেষ ভরসা হচ্ছে মানুষকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করানো।

বর্তমান প্রজন্মের তরুণরা এবং দেশপ্রেমিকরা বুঝতে পারেননি গিনেস বুকে নাম ওঠানোর “সাফল্য” “কৃতিত্ব” ইত্যাদি অলিম্পিক বা ওয়ার্ল্ড কাপ ফুটবলে সাফল্যের সাথে কোনোমতেই তুলনীয় নয় এবং সেখানে সাফল্যের মতো সম্মানিতও নয়। উল্লেখ করা যেতে পারে ছোট দেশ হওয়া সত্ত্বেও কিউবা ও জ্যামাইকা অলিম্পিকে বহু সাফল্য অর্জন করেছে। ছোট দেশ হওয়া সত্ত্বেও উরুগুয়ে ওয়ার্ল্ড কাপ ফুটবলের ফাইনালে ব্রাজিলকে হারিয়েছে এবং এবারও তারা ২০১৪-র চূড়ান্ত রাউন্ডে ব্রাজিলে খেলবে।
প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও প্রতিযোগিতামূলক এসব ইভেন্টে বাংলাদেশ কোথায়? উত্তর: এসব ইভেন্টের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের পতাকা হাতে কিছু স্পোর্টস কর্মকর্তার উপস্থিতিতে।

গণপ্রচারণায় আসক্ত আওয়ামী লীগ

প্রতিদ্বন্দ্বিতাবিহীন নির্বাচন ‘বিজয়ী’ নির্লজ্জ আওয়ামী লীগ এখন শঙ্কিত চিত্তে অপেক্ষা করছে ২৬ মার্চে প্রতিষ্ঠিত গণসঙ্গীত গাইবার রেকর্ড পাকিস্তান অথবা অন্য কোনো দেশ অচিরেই ভাঙ্গবে কিনা।
মানুষ উৎপাদনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্বের একটি অগ্রণী দেশ। ১৯৪৭-এ এই ভূখন্ডের জনসংখ্যা ছিল সাড়ে চার কোটি। ১৯৭১-এ ছিল সাড়ে সাত কোটি। এখন ২০১৪-তে ধারণা করা হয় বাংলাদেশের জনসংখ্যা ষোল থেকে আঠার কোটির মধ্যে। সঠিক সংখ্যাটি যাই হোক না কেন, আওয়ামী লীগ সরকার তার আর্থিক ও প্রশাসনিক শক্তি এবং আওয়ামী লীগ তার সাংগঠনিক শক্তি দিয়ে সবসময়ই চেষ্টা করে যাবে, বাংলাদেশের মানবশক্তিকে প্রচারণার কাজে লাগিয়ে গিনেস বুকে তাদের নাম ওঠাতে।
বিশ্বের সপ্তম জনবহুল দেশ এখন বাংলাদেশ। বাংলাদেশের চাইতে বেশি জনবহুল ছয়টি দেশ, যথাক্রমে, চায়না, ইন্ডিয়া, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র, ইন্দোনেশিয়া, ব্রাজিল ও পাকিস্তান। এদের মধ্যে পাকিস্তান বাদে আর কোনো দেশ জনসংখ্যার ভিত্তিতে বাংলাদেশের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে বলে মনে হয় না।

আওয়ামী লীগের এই মহান কর্মকাণ্ডে সহায়ক হবার জন্য দুই ধরনের গিনেস রেকর্ড প্রকল্প শুরু হতে পারে। এক. যেসব ক্ষেত্রে অলরেডি গিনেস রেকর্ড প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে সেসবের দাবি করে গিনেস কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে আওয়ামী সরকার। এবং দুই. নতুন কিছু রেকর্ড প্রতিষ্ঠার জন্য এখন থেকেই কাজে নেমে যাওয়া, অর্থাৎ বিলবোর্ড প্রস্তুত করা এবং টাকা খরচ করা।

যেসব ক্ষেত্রে গিনেস রেকর্ড প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে তাদের অন্তত দশটি নিচে উল্লেখ করা হলো :
রানা প্লাজা দুর্ঘটনা : কোনো গার্মেন্টস ভবনে ধসে সর্বোচ্চ সংখ্যক মানুষ নিহত।
তাজরীন গার্মেন্টস : কোনো গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে অগ্নিকাণ্ডে সর্বোচ্চ সংখ্যক মানুষ নিহত।
ডেসটিনি : কোনো পিরামিড ফাইনান্স ব্যবস্থায় সর্বোচ্চ সংখ্যক বিনিয়োগকারী প্রতারিত।
শাহবাগ গণজাগরণ মঞ্চ : আদালতে দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে ফাসির দণ্ডে দণ্ডিত করার লক্ষ্যে আইন বদলানো দাবিতে সর্বোচ্চ সংখ্যক জনসমাবেশ এবং তার প্রেক্ষিতে প্রচলিত আইন বদলিয়ে ফাসির দণ্ড দিয়ে সেটা কার্যকর।
শাপলা চত্বরে হেফাজতের মে ২০১৩ সম্মেলন : ধর্মপরায়ণ মানুষের প্রতিবাদ সম্মেলনে সর্বোচ্চ সংখ্যাকের সমাবেশ এবং সেখানে সরকারি বাহিনীর গুলিচালনার পর প্রধানমন্ত্রীর দাবি সর্বোচ্চ সংখ্যক মানুষের “পাখি হয়ে ফুরুৎ করে আকাশে উড়ে যাওয়া”।
সারা দেশ জুড়ে সর্বোচ্চ সংখ্যক গণহুলিয়া জারি করা।
ব্যাপকতম প্রশ্নপত্র ফাস হওয়া।
সরকারি ব্যাংকগুলো থেকে সর্বোচ্চ পরিমাণ টাকা চুরি ও লুট হওয়া।
৫ জানুয়ারি ২০১৪-র নির্বাচন : নির্বাচন ছাড়াই ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫৩টিতে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীদের বিজয়ী হওয়া এবং বাকি ১৪৭টি আসনে ৩% থেকে ৫% মানুষের ভোটে অংশগ্রহণে বিজয়ী হওয়া।
এবার আপনি আপনার পছন্দ মতো আরো কিছু নাম এই লিস্টে যোগ করতে পারেন। যেমন, সর্বোচ্চ সংখ্যক মামলা ঝুলে থাকা, সর্বোচ্চ সংখ্যক সরকারি কর্মচারিদের ওএসডি হওয়া। ইত্যাদি।

অন্তত পাচটি নিউ গিনেস প্রজেক্ট আওয়ামী সরকার শুরু করতে পারে। যেমন :
ঢাকার বেড়িবাধের পাশে তুরাগ নদীকে ভূমিদস্যুদের কবলমুক্ত করার জন্য জনসমাবেশ করা।
ঢাকার পাশে চার নদী, বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা এবং বালুকে দূষণমুক্ত করার লক্ষ্যে জনকর্মীদের সম্মিলিত করা।
সারা দেশে শিক্ষা প্রসারের লক্ষ্যে ঢাকাস্থ ইউনিভার্সিটিগুলোর সর্বোচ্চ সংখ্যক ছাত্রছাত্রীকে তাদের পাঠ্যক্রমের অংশ হিসেবে মফস্বলে অন্ততপক্ষে ছয় মাস অবস্থান ও মফস্বলের স্কুলে শিক্ষা দানের ব্যবস্থা করা।
পরিচ্ছন্ন রাজধানী দিবস পালন উপলক্ষে সর্বোচ্চ সংখ্যক জনকর্মীর সমাবেশ ঘটানো।
তিস্তা এবং পদ্মাকে বাচানোর জন্য সর্বোচ্চ সংখ্যক মানুষের মিছিল করে ওই দুই নদীর তীরে যাওয়া।

পারবে কি ইনডিয়া ব্র্যান্ড আওয়ামী সরকার এসব করতে?
এসব যদি পারতো তাহলে গিনেস বুকে নাম উঠুক বা না উঠুক, বাংলাদেশের অবস্থার কিছু উন্নতি হতো।