সরষের ভেতরেই ভূতের অবস্থান

ভূত তাড়ানোর কাজে সরষের ব্যবহার পুরনো কথা। এখন সরষের ভেতরেই ভূতের অবস্থান নিয়ে অনেক কথা শোনা যায়। অপরাধ দমন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা করা যাদের দায়িত্ব, সেই পুলিশ বাহিনীর ভেতরেই এখন অপরাধ বাড়ছে বলে গতকালের পত্রিকায় খবর বেরিয়েছে। কেন দেশে অপরাধপ্রবণতা লাগামহীন হয়ে পড়েছে, এ ঘটনা থেকে সেটা কিছুটা হলেও অনুমান করা যায়।
গত ১৪ মাসেই বিভিন্ন ইউনিটে কর্মরত প্রায় ১৭ হাজার পুলিশ সদস্যকে বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকায় শাস্তি দেয়া হয়েছে। চলতি বছরের ৩ মাসেই প্রায় আড়াই হাজার পুলিশ সদস্য ও কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া উদ্বেগজনকই বটে। কনস্টেবল থেকে এসআই পর্যন্ত ১২শ’র বেশি পুলিশ সদস্যের লঘুদণ্ড হয়েছে। ১৫ জনকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। আর গত বছর চাকরিচ্যুত হয়েছে প্রায় ৮০ জন। এছাড়া পুলিশের ইন্সপেক্টর পদমর্যাদার ৪০ জনকে লঘুদণ্ড আর ৪ জনকে গুরুদণ্ড দেয়া হয়েছে। এএসপি থেকে ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের মোট ১৪ জনও শাস্তি পেয়েছে। এর মধ্যে ১০ জন লঘুদণ্ড আর ৪ জনকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। আরও প্রায় ১ হাজারের বেশি অভিযোগ বিভাগীয় বিচার প্রক্রিয়ায় আছে বলে জানা গেছে। এই সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। তবে অনেকের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেলেও প্রমাণের অভাবে অভিযুক্তরা ছাড়া পেয়ে যায়। বাস্তব কারণেই পুলিশের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে অনেকেই সাহসী হয় না। হয়রানির আশঙ্কায় অনেক অভিযোগই প্রমাণিত হয় না। তাছাড়া নানা ধরনের তদবির তো আছেই। এর মধ্যে রাজনৈতিক তদবিরই সবচেয়ে বেশি কার্যকর বলে জানা যায়। বিশেষ করে যারা রাজনৈতিক কারণে চাকরি পেয়েছেন, এক্ষেত্রে তাদের খুঁটির জোরই বেশি। আর ঘুষ ও দীর্ঘদিন এক জায়গায় চাকরি করার সুবাদে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, প্রভাবশালী ও সংসদ সদস্যের হস্তক্ষেপও কম নয়। ফলে পুলিশ বাহিনীতে অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধির তুলনায় প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ সামান্যই।
শুধু পুলিশের মধ্যে কেন—কোথায় অনিয়ম-দুর্নীতি নেই সেটা কেউই জোর দিয়ে বলতে পারবে না। যারা পুলিশ প্রশাসন নিয়ন্ত্রণ করে তাদের সম্পর্কেও অনেক কথাই মুখে মুখে আলোচিত হয়। গতকালের একটি কাগজে আবারও এক সংসদ সদস্যের অনিয়ম ও বেআইনি কাজের কথা ছাপা হয়েছে। রাজশাহী অঞ্চলের সেই সংসদ সদস্য অনেককে টপকে এবারও তার সদস্যপদ ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছেন, যার বিরুদ্ধে আইন ভঙ্গের অভিযোগ মোটেই নতুন নয়। তার মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান এনা প্রপার্টিজ রাজধানীর উত্তরায় রাজউকের উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্প ও রাজশাহী সিটি সেন্টার নির্মাণ কাজে পুরোপুরি ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। নির্ধারিত সময়ে ৮৭ শতাংশ কাজের স্থলে মাত্র এক দশমিক ১৫ শতাংশ কাজ করায় শেষ পর্যন্ত উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্প থেকে সংসদ সদস্যের প্রতিষ্ঠানকে বাদ দিতে বাধ্য হয়েছে রাজউক। আর ৩১ মার্চের মধ্যে রজশাহী সিটি সেন্টার নির্মাণের কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এ পর্যন্ত মাত্র ৩০ শতাংশ কাজ হয়েছে। এই কাজের জন্য চার বছর আগেই এক কোটি ২০ লাখ টাকা জামানত দেয়ার কথা থাকলেও এ পর্যন্ত সে টাকা না দিয়েই নির্মাণাধীন ভবনের অংশবিশেষ বিক্রি করে দেয়ার অভিযোগও মানুষের মুখে মুখে। সংসদ সদস্যের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান এ দুটি কাজ পেয়েছে আইন লঙ্ঘন করে।
অথচ গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের (আরপিও) ১২ ধারায় সুস্পষ্টভাবে বলা আছে, কোনো সংসদ সদস্য সরকারের সঙ্গে ব্যবসা করতে পারবে না। রাষ্ট্রের আইন প্রণেতা যারা তারাই যখন এমন বেআইনি কাজে লিপ্ত সেখানে আইন রক্ষায় নিয়োজিতরা কেন হাত গুটিয়ে থাকবে? তাই সমাজের অন্যান্য ক্ষেত্রের মতো পুলিশেও অপরাধপ্রবণতা বাড়ছে। এর শেষ কোথায় সেটাই এখন দেখার বিষয়।