গণতন্ত্রের জন্য রাজপথে না নামলে জনআস্থা হারাবে দলগুলো

একতরফা নির্বাচনের পর দেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যত কী? সরকার কোন পরিকল্পনা নিয়ে এগুচ্ছে আর বিরোধীদলেরই বা কী কর্মসূচি? সব কিছু ছাপিয়ে বিশ্লেষকদের মত, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে রাজপথে না নামলে আস্থা হারাবে রাজনৈতিক দলগুলো।
অবশ্য, নির্দলীয় সরকারের অধীনে দ্রুত নির্বাচনের দাবিতে হাল্কা কর্মসূচি নিয়ে শিগগিরই আন্দোলনের মাঠে নামবে বিএনপি। তবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বলছে, আন্দোলনের হুমকি দিয়ে লাভ হবে না, পুরো মেয়াদেই ক্ষমতায় থাকবে বর্তমান সরকার।
গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, বর্তমান অবস্থা থেকে উত্তরণ না ঘটলে জনগণের আস্থা হারাবে রাজনৈতিক দলগুলো। আর জেঁকে বসবে স্বৈরতন্ত্র। আর এর থেকে বাঁচতে সবার অংশগ্রহণে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের তাগিদ দিয়েছেন তারা।
দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলসহ বেশিরভাগ রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ ছাড়াই অনুষ্ঠিত হয়েছে ৫ জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচন। বহু বিতর্কিত এ নির্বাচনে রয়েছে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার রেকর্ড। রয়েছে বহু সংখ্যক ভোটকেন্দ্রে একটিও ভোট না পড়ার বিশ্বরেকর্ডসহ বহু নেতিবাচক দিক। তা সত্ত্বেও এর ভেতর দিয়ে সরকার গঠন, দশম জাতীয় সংসদের কার্যক্রম শুরু হওয়া এবং পরবর্তীতে অনেকটা সহিংস পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে পাঁচ দফায় অনুষ্ঠিত হওয়া উপজেলা নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ দেশে-বিদেশে সর্বত্র।
প্রশ্নবিদ্ধ, বিতর্কিত কিংবা অগ্রহণযোগ্য যে কোনো অভিধায়ই একে অভিহিত করা হোক না কেন, দেশ-বিদেশে যতো আলোচনা সমালোচনাই হোক না কেন, এর মাধ্যমে যে সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তার সেসব শোনার যেন ফুরসত নেই?
সব মিলিয়ে দেশের রাজনীতির গতিপথ আজ কোন দিকে—এ প্রশ্নই ঘুরে ফিরে উঠছে সবার মনে। আওয়ামী লীগ বলছে, পুরো পাঁচ বছরই ক্ষমতায় থাকবে তাদের সরকার।
সরকারি দলের অনড় অবস্থান প্রসঙ্গে বিএনপি নেতা লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘সরকার বলেছিল, সাংবিধানিক অনিবার্যতার জন্য এই দশম সংসদ প্রয়োজন হচ্ছে। আমরা সে কথা মেনে নিয়েছি।’
‘গত ৫ জানুয়ারি তো দশম সংসদ হয়ে গেছে। তার পর এক মাস ধরে কাজ করার পরই সে সংসদ ভেঙে দেয়ার কথা। এবং সেই সংসদ বাতিল করে একাদশ সংসদের কর্মকাণ্ড শুরু হওয়ার কথা’—যোগ করেন তিনি।
আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেছেন, ‘আমাদের মেয়াদকাল পর্যন্ত আমরা ক্ষমতায় থাকবো ইনশাল্লাহ। আমরা কাজ করবো, জনগণের আলোচনা সমালোচনার মধ্য দিয়েই আমরা কাজ করে যাবো।’ তিনি বলেন, ‘তিন মাস আগে নির্বাচন হয়েছে। ভবিষ্যতে সংবিধান অনুযায়ী তো বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর অধীনেই নির্বাচন হবে। নির্ধারিত সময়ে যখন নির্বাচন হবে, তারা আসুক, নির্বাচনে অংশগ্রহণ করুক। জনগণের রায় পেলে তারাই ক্ষমতায় যাবে।’
তবে অচিরেই সরকারকে চাপ দিতে বিএনপির রয়েছে আন্দোলনের চিন্তাভাবনা। হাল্কা কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামার পরিকল্পনা আছে দলটির। তৃণমূল নেতাকর্মীদের আন্দোলনের প্রস্তুতি নেয়ার নির্দেশনাও দিয়েছেন দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া।
জেনারেল মাহবুব বলেন, ‘আমাদের কর্মসূচি হবে অহিংস ও শান্তিপূর্ণ এবং গণমানুষকে সম্পৃক্ত করে সরকারকে বাধ্য করা, বুঝিয়ে দেয়া যে সরকার ভুল পথে হাঁটছে।’
জবাবে নাসিম বলেন, ‘আমাদের যদি কোনো ব্যর্থতা থাকে, ভুলত্রুটি থাকে- যে কোনো দলের অধিকার আছে সে ভুলত্রুটি ধরিয়ে দেয়া। বিএনপির নেতৃবৃন্দেরও সে অধিকার আছে। তারা ধরিয়ে দিক। কিন্তু আন্দোলনের হুমকি দিয়ে কোনো লাভ হবে না।’
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেন, ‘অপজিশন যতো দুর্বল হয়ে পড়বে ততোই স্বৈরতান্ত্রিক সরকার আরো শক্তিশালী হবে, ততোই তারা জেঁকে বসবে। কারণ, যে দুয়েকজন তখন সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলতে চাইবে তাদেরকে স্তব্ধ করার জন্য যা কিছু দরকার তাই তারা করবে।’
পরিস্থিতি উত্তরণের পথ কী? বরং একটি আশঙ্কার কথাই শোনালেন কলামিস্ট আবুল মকসুদ। তিনি বলেন, ‘এ পরিস্থিতিতে দু’দলই যদি গণতান্ত্রিক চেতনার প্রকাশ না ঘটায় তাহলে উগ্র রাজনীতি মাথাচারা দিয়ে উঠবে। উগ্র রাজনীতি বলতে শুধু ইসলামিক মৌলবাদী রাজনীতি তা নয়, বাম উগ্র রাজনীতিরও একটা আবির্ভাব এখানে ঘটতে পারে।’
তার মতে, আন্দোলনের মাধ্যমেই সরকারকে জনগণের দাবি মানতে বাধ্য করার বিকল্প নেই। সেজন্য চাই ঐক্যবদ্ধ কিংবা যুগপত্ আন্দোলন— ছোট-বড়, মাঝারি সব দলের। অন্যথায় তারা জনগণের আস্থা হারাবে।
সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, ‘মাঝারি এবং ছোট দলগুলো ঐক্যবদ্ধভাবে হোক বা বিচ্ছিন্নভাবে হোক যদি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য তারা বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করে, তাহলে কিন্তু সরকার বাধ্য হবে আরেকটি নতুন নির্বাচন দিয়ে একটি প্রতিনিধিত্বশীল সরকার প্রতিষ্ঠিত করতে।’
মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অসাম্প্রদায়িক দেশ গড়তে রাজনৈতিক দলগুলোকে বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলকে সমঝোতার রূপরেখা নিরূপণ এবং বিরোধী মতের ওপর গুরুত্ব দেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন এই বিশ্লেষকরা।