এ লেখা যখন লিখছি তখন আমি সত্যি সত্যি কাঁদছি। কম্পিউটারের মনিটর ঝাঁপসা
দেখছি। এ বর্বরতার শেষ কোথায় এটা ভেবে আমি আতঙ্কিত, ক্ষুব্ধ ও ব্যথিত।
বরিশালে মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে পৃথক দুটি ঘটনায় ছয়জন মুসলমান
শিশু-কিশোরকে জবাই করেছে সংখ্যালঘু তকমা নিয়ে সহানুভূতি পাওয়া বর্বর
সন্ত্রাসীরা। পৃথক এ দুটি ঘটনায় দু’জন নিহত ও বাকিদের অবস্থা বেশ
আশঙ্কাজনক। কিন্তু হলুদ মিডিয়ার একপেশে ভূমিকায় এসব ঘটনা চিত্রায়িত হয়েছে
ভিন্নভাবে।
প্রথম ঘটনাটি ঘটে বরিশালের চরকাউয়া প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে। ব্যাডমিন্টন
খেলায় তর্ক-বিতর্ককে কেন্দ্র করে ১৪ নভেম্বর বৃহস্পতিবার কয়েকজন হিন্দু
যুবক পারভেজ নামের এক মুসলমান ছেলেকে পরিকল্পিতভাবে জবাই করে হত্যা করে।
পরিকল্পিত বলছি, কারণ সঙ্গে করে তারা ছোরা নিয়েই এসেছিল। ব্যাডমিন্টন খেলার
আগেও পারভেজের সঙ্গে ঝগড়া হয়েছিল। বাবা সেলিম গাজী অভিযোগ করেন, ক্রিকেট
খেলা নিয়ে কিছুদিন আগে পীযূষ, শান্ত, শ্যামল, ধীমানসহ কয়েকজনের সঙ্গে তার
ছেলের হাতাহাতি হয়েছিল। ওই ঘটনা মাথায় রেখে বৃহস্পতিবার ব্যাডমিন্টন খেলার
সময় পরিকল্পিতভাবে পারভেজকে জবাই করে হত্যা করা হয়েছে। বাধা দিতে গেলে
শামীম গাজী ও জহিরুল ইসলাম নামে আরও দুজনকে কোপানো হয় যাদের অবস্থা
আশঙ্কাজনক। ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় হিন্দু পাড়ায় কিছু বাড়িঘর পোড়ানো হয়, তবে
কেউ হতাহত হয়নি।
এ ঘটনা নিয়ে পুড়ে যাওয়া একটি বাড়ির ছবি দিয়ে প্রথম আলোর প্রতিবেদন—‘খেলা
নিয়ে খুন, তারপর হিন্দুদের বাড়িঘরে আগুন’। শিরোনাম শুনে মনে হয়, খেলা নিয়ে
খুন করা কোনো অপরাধ নয় তবে স্বজন হারানো ক্ষুব্ধ জনতার রক্তপাতহীন
অগ্নিকাণ্ড বিরাট অপরাধ। প্রতিবেদনটি শুরু হয়েছে মর্মস্পর্শী আবেগ
দিয়ে—পুড়ে কয়লা হয়ে গেছে গলায় রশি বাঁধা দুটি গরু। ধান পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।
এখানে-সেখানে পড়ে আছে গৃহস্থালি নানা সামগ্রী—সব পোড়া। ঘরের আশপাশে থাকা
গাছের নারকেলগুলো পর্যন্ত পুড়ে গেছে। ভস্মীভূত ঘরগুলোর নানা জায়গা থেকে
(ঘটনার ২৭ ঘণ্টা পর) ধোঁয়া বেরোচ্ছে। এই চিত্র বরিশালের চরকাউয়ার কালীখোলা
গ্রামের পণ্ডিতবাড়ির। এক দিন আগেও যাদের বাড়িঘর ছিল, গতকাল শনিবার সেই
হিন্দুদের পাওয়া গেল ত্রাণের লাইনে।
তবে প্রথম আলোর এ উদ্দেশ্যমূলক একপেশে রিপোর্টটি বিরাট প্রশ্নের মুখে পড়েছে
খোদ সরকারের কট্টর সমর্থিত পত্রিকা কালের কণ্ঠের প্রতিবেদনে। ২১/১১/১৩ ইং
প্রকাশিত ‘বরিশালে মন্দির ও বাড়িতে আগুন দেয় ছাত্রলীগ কর্মীরা!’ শিরোনামে
কালের কণ্ঠের প্রতিবেদনে বলা হয়—নগরীর সরকারি ব্রজমোহন (বিএম) কলেজের
ফ্লাইট সার্জেন্ট ফজলুল হক (মুসলিম হল) হোস্টেলের অন্তত ৫০ জন শিক্ষার্থী
ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তারাই নৌপথে শহর থেকে ওই
গ্রামের পেছন দিয়ে গিয়ে আগুন দিয়েছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা নিশ্চিত করেছে।
ঘটনার সঙ্গে জড়িত রয়েছে—এমন বেশ কয়েকজনের নাম জানা গেছে।
হোস্টেলের এক শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, শুক্রবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে ওই
শিক্ষার্থীরা হোস্টেল ছাড়েন। ছাত্রলীগের অনুসারী শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে
ছিল শাকিল হাওলাদার, কেএম রফিক, জাকারিয়া, জিয়া, সজীব ও আরিফ। তারা সবাই
কলেজ শাখা ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি জড়িত। ছাত্রলীগের বিভিন্ন
সভা-সমাবেশে তাদের প্রথম সারিতে অংশ নিতে দেখা যায়। হিন্দুদের আক্রমণে নিহত
পারভেজ গাজীর মা পারভীন বেগম বুকফাটা আর্তনাদ নিয়ে বলেছেন, ‘পত্রিকা ও
টিভিতে অপনারা শুধু একতরফাভাবে আগুনে পোড়া বাড়িঘরের ছবি দেখাচ্ছেন; কিন্তু
আমার পারভেজকে যে মন্দিরের সামনে গাছের সঙ্গে বেঁধে ঝুলিয়ে এবং রাস্তার ওপর
ফেলে গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে, সেই রক্তের ছবি কি আপনাদের চোখে পড়ে না?
আমি আমার জায়গা-জমি সব বিক্রি করে হিন্দুদের বাড়িঘর পোড়ানোর ক্ষতিপূরণ দেব,
তবে আপনারা আমার পারভেজকে এনে দেন!’
এ ঘটনা নিয়ে পরস্পরবিরোধী দুটি মামলা হয়েছে। হিন্দুরা যে প্রশাসনকে
মুসলমানদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে, হিন্দুদের মামলার আসামি সংখ্যা দেখলে
স্পষ্ট হয়ে যায়। মুসলমানরা এক হত্যা মামলার জন্য আসামি করেছে ১৩ সন্ত্রাসী
হিন্দুকে। সেখানে হিন্দুরা মামলা করেছে দশ হাজার জনকে আসামি করে, আর এতে
ঘরছাড়া হয় এলাকার সব মুসলমান পুরুষ।
দ্বিতীয় ঘটনাটি আরও মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক। প্রথম ঘটনার তিন দিন পর
১৭/১১/১৩ রোববার বরিশালের গৌরনদীতে নয়ন বালা নামের একজন হিন্দু ছেলের
নেতৃত্বে আলমগীর সরদারের পরিবারের বড় মেয়ে হাসি (১৮), তানিয়া (১০) ও তার ৬
মাস বয়সী শিশুকন্যা মারিয়াসহ আবদুল হকের ছেলে মনিরকে (৭) জবাই করা হয়।
তানিয়া (১০) ঘটনাস্থলে নিহত হয় এবং বাকিদের অবস্থা সঙ্কটাপন্ন। কিন্তু এ
ঘটনা নিয়ে মিডিয়ায় নেই কোনো সংবাদ। দু-একটি অনলাইন মিডিয়া খবরটি দিয়েছে
বিকৃতভাবে। যদিও এ হত্যাকাণ্ড পরিকল্পিত, কিন্তু মিডিয়াগুলো হিন্দু
সন্ত্রাসী নয়ন বালাকে মাদকাসক্ত (প্রকৃতপক্ষে হত্যাকাণ্ডের সময় যাতে কোনো
দয়ামায়া না আসে এজন্য সে আগে মাদক সেবন করেছিল) বলে ঘটনার মোড় অন্যদিকে
প্রবাহিত করার চেষ্টা করে। শুধু তাই নয়, প্রশাসনের সব ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা
(বরিশাল-১ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট তালুকদার মো. ইউনুস, বরিশালের পুলিশ
সুপার মো. এহসান উল্লাহ, সহকারী পুলিশ সুপার অশোক নন্দী, সুদীপ্ত সরকার,
গৌরনদী থানার ওসি নাজমুল করিম) ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার
জন্য উঠেপড়ে লেগে যান। তবে নিহতের পিতা হিন্দু সন্ত্রাসী নয়ন বালা ছাড়াও
তার বাবা অমল বালা, চাচা দুলাল বালা, চাচি রুনু বালা, পুষ্প বালা, সুবর্ণ
বালাকে দোষী বলে উল্লেখ করলে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে
ওঠে।
খুবই প্রাসঙ্গিক কিছু প্রশ্ন—
১. জবাই করে পরিকল্পিত র্ববর হত্যাকাণ্ড বেশি অপরাধ নাকি স্বজন হারানো
ক্ষুব্ধ জনতার রক্তপাতহীন অগ্নিকাণ্ড বেশি অপরাধ? (আমি মোটেও অগ্নিকাণ্ডকে
সমর্থন করছি না। কিন্তু একটু ভাবুন যার সন্তানকে জবাই করা হয়েছে, যে
গ্রামের সন্তানকে জবাই করা হয়েছে তাদের ক্ষোভ আর অনুভূতির কথা একটু ভাবুন।
আদৌ কি ভালো-মন্দ বিবেচনা করার মতো অবস্থায় তারা ছিলেন?)
২. ইত্তেফাকসহ কয়েকটি মিডিয়া জবাইয়ের কথা বললেও প্রথম আলো কেন স্রেফ কুপিয়ে হত্যার কথা বলছে?
৩. নিহত পারভেজের লাশের ছবি না দিয়ে পুড়ে যাওয়া ঘরবাড়ির ছবি দেয়ার উদ্দেশ্য
কী? দুটি গরু হত্যার ঘটনা নিয়ে মর্মস্পর্শী মায়াকান্না, কিন্তু পারভেজের
নির্মম খুনকে কোনো ঘটনাই মনে করা হচ্ছে না কেন? সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের
একটি তরুণ প্রাণ কি পশুর চেয়েও মূল্যহীন?
৪. ধরুন পারভেজ নয়, কোনো এক গ্রামের হিন্দু ছেলে নিহত হয়েছে অপর এক গ্রামের
হিন্দু ছেলের হাতে। সেক্ষেত্রেও কি অনুরূপ প্রতিক্রিয়া হতো না? তখন কি
মিডিয়া ঘটনা এতটা ফোকাস করত নাকি এড়িয়ে যেত?
৫. নরসিংদীতে মেয়র লোকমান হত্যার পর আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগের নজিরবিহীন
তাণ্ডব, নৈরাজ্য ও রেলগাড়ি পোড়ানোর ঘটনায় প্রথম আলোর রিপোর্ট ছিল—শোকের
শহরে ক্ষোভের আগুন, যা অন্যায়ের প্রতি প্রচ্ছন্ন সমর্থন। তাহলে কি
শোকগ্রস্ত হয়ে ক্ষোভ জানানোর অধিকার শুধু আওয়ামী লীগের আছে? আর কারও নেই?
৬. সংঘাত উসকে দিয়ে, বিদেশিদের কাছে বাংলাদেশকে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার রাষ্ট্র প্রমাণ করে এসব মিডিয়া কাদের স্বার্থ রক্ষা করছে?
৭. প্রথম ঘটনায় উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপিয়ে যে মিডিয়া লিডিং স্টোরি ছাপিয়েছে সে মিডিয়া দ্বিতীয় বর্বর ঘটনাটিকে কেন আড়াল করেছে?
৮. এদেশে কি সংখ্যাগুরুদের কোনো অধিকার থাকতে নেই? ৯০ ভাগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা
নিয়েও কেন সংখ্যালঘু কর্তৃক নির্যাতিত হতে হবে? এমনকি নির্যাতিত হওয়ার পরও
কেন মিডিয়ার হলুদ সাংবাদিকতার কারণে উল্টো দোষী সাব্যস্ত হতে হবে? কেন থানা
পুলিশ কর্তৃক সংখ্যাগুরুদের হয়রানির শিকার হতে হবে?
৯. এ বর্বরতার শেষ কোথায়? সংখ্যাগুরু হওয়াই কি এদেশের মুসলমানদের অপরাধ?
১০. দেশের বিভিন্ন স্থানে বিরোধী দলের ওপর দোষ চাপাতে সংখ্যালঘু
সম্প্রদায়ের ওপর ছাত্রলীগ-যুবলীগের হামলা হাতেনাতে ধরা পড়লেও সেসব নিয়ে এসব
মিডিয়া নিশ্চুপ কেন?
প্রতিটি বিবেকবান মানুষকে একটু হৃদয় দিয়ে বিবেক দিয়ে চিন্তা করার উদাত্ত
আহ্বান জানাচ্ছি। আজ ভাবার সময় হয়েছে—সংখ্যালঘু নির্যাতনের নামে বাংলাদেশে
যা হচ্ছে তার পেছনের রহস্য কী। যেখানে সংখ্যাগুরু মুসলমানরা পুলিশি হয়রানি ও
মামলার ভয়ে এবং মিডিয়ার অপপ্রচারে ভাবমূর্তি নষ্টের ভয়ে নিজেরা উল্টো
সংখ্যালঘু কর্তৃক নির্যাতিত ও অপমানিত হয়েও নিশ্চুপ থাকে, সেখানে সংখ্যালঘু
নির্যাতনের সুযোগ কোথায়? এরপরও সংখ্যালঘু নির্যাতন হচ্ছে। এসব সংখ্যালঘু
সাজানো নাটকের শিকার হয়ে হলুদ মিডিয়ার নিউজ মেকারদের ইচ্ছের বলি হচ্ছে কিনা
সে বিষয়টিও ভাবতে হবে।