শীতের এই কুয়াশাচ্ছন্ন দিনে আপনাদের অনেকেরই হয়তো মন খারাপ, অনেকের মন
ভারাক্রান্ত হয়ে আছে চাপা কান্নায়। আবার অনেকে হয়তো বিজয়ের আনন্দে ফেটে
পড়তে চাইছেন। আমি নিতান্তই একজন অনুভূতিশূন্য ভাবলেশহীন মানুষ। তারপরও গত
কয়েকদিনের ঘটনায় আমার একটু একটু ভাব এসেছিলো। কি সেই ভাব- সে কথাটিই বলছি-
আগে
বলে নেই কেন আমি লজ্জা পাইনা। কারণ আমার লজ্জা শরম বা হায়া উধাও হয়ে
গিয়েছে। এটা হয়েছে আমার চেয়েও বড় বড় মানুষের বেহায়াপনা দেখে। দেশের নামকরা
কবি, অধ্যাপক, সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবীরা তাদের বিবেক এবং বোধ শক্তি পচাঁ
নর্দমার কাছে বন্ধক রেখে যখন বেহায়ার মতো ধেই ধেই করে নাচে- তখন আমাদের মতো
ক্ষুদ্র মানুষের জীবন ধারনের জন্য লজ্জা নামক অলংকারটি বড়ই বেমানান এবং
চরম মূল্যবান হয়ে পড়ে। এই দামী অলংকার নিয়ে লজ্জাহীন সমাজ চলাফেরা করা
শোভনীয় নয়।
আমাদের মিডিয়া জগতের মহান পুরুষেরা ইদানিং সিদ্ধান্ত
নিয়েছেন- নৈতিকতার কারণ অন্য কর্তৃক কৃত অনৈতিক বিষয় সমূহ প্রকাশ করা যাবে
না এবং মানবতার খাতিরে অন্য কর্তৃক কৃত অমানবিক বিষয় সমূহ প্রকাশ করা যাবে
না। তারপরও ২/১ টা মিডিয়া কিছু কিছু তামাসার খবর প্রকাশ করে ফেলে। এমনি
একটি ঘটনা দেখে আমার ভাব এসে গিয়েছিলো ক্ষনিকের তরে।
একটি টেলিভিশন
চ্যানেল কোন এক ভোট কেন্দ্রের দৃশ্য দেখাতে গিয়ে বললো- সেখানে কোন ভোটার
নেই। কিন্তু এই পর্যন্ত বললে বা দেখালে আমার কিছু হতো না। হঠাৎ করেই তারা
দেখালো ভোটকেন্দ্রের মাটে একটি মুরগী বিষ্ঠা ত্যাগ করছে। সেটির বিষ্ঠা
ত্যাগের পরপরই একটি মোরগ ছুটে এলো এবং জোর করে মুরগীটির সঙ্গে তার
প্রাকৃতিক কর্ম সম্পাদন করলো। এরপর ক্যামেরা তাক করা হলো ৬/৭ বছরের দুটি
গ্রাম্য বালকের ওপর। উভয়ে গলাগলি ধরে ভোটের মাটে এসেছিলো তামসা দেখার জন্য।
তাদের মধ্যে একজনের পরনে প্যান্ট ছিলো না। শীতের সকালে গায়ে সোয়েটার অথচ
উন্মুক্ত পশ্চাৎদেশ নিয়ে শিশুটি তার বন্ধুর সঙ্গে সাবলীনভাবে গলাগলি ধরে
হাটছিলো। দুষ্ট ক্যামেরাম্যান কয়েকবার তার উলঙ্গ পশ্চাৎদেশের দৃশ্যটি আমাকে
দেখতে বাধ্য করলো। এরপরের দৃশ্য আরো অবাক করা- একটি কুকুর অথবা কুকুরী
একাকী মাঠ দিয়ে হাটছিলো। সেটির পশ্চাৎদেশ অথবা লজ্জাস্থান দিয়ে পেটের
নাড়ীভূড়ির কিছু অংশ বের হয়েছিলো।
আমি সকালের নাস্তা খেয়ে টিভিতে
সারাদেশের ভোটের খবর দেখার সময় এসব দৃশ্যও দেখলাম। কেনো জানি বমি বমি ভাব
চলে এলো। আমি খুব অস্থির হয়ে পড়লাম, দুপুর একটা পর্যন্ত কোন কেন্দ্রেই
ভোটার নেই। ভালো লাগছিলো না। তারওপর আবার- কুকুরের পশ্চাৎদেশের বিভৎস
দৃশ্য। আমি জামা কাপড় পরে অফিসে আসার জন্য লিফটে উঠলাম। দেশের চলমান
আন্দোলন ও সহিংসতার জন্য অফিস প্রায়ই বন্ধ থাকে। তারপরও আমি যাই। একা একা
বসে বসে হা পিত্যেস করি। বাসায় এসব করা যায় না- স্ত্রী এসে বাধা দেয় । ৫ই
জানুয়ারী দুপুর বেলাও মনে হলো- যাই অফিসে গিয়ে একা একা হা পিত্যেস করে আসি।
টিভির
ঐসব দৃশ্য মন থেকে মুছে ফেলার জন্য আমি মনে মনে আমার মানসপটে একটি পবিত্র
মূখ কল্পনা করার চেষ্টা করলাম। কাকে বসাই সেই মানষপটে। এতো দেখি ভারী
মুশকিল- কলঙ্কহীন মুখ পাওয়াই যাচ্ছেনা কিংবা মনে আসছেনা। অনেক কসরতের পর
জলে ফোটা পদ্মের মতো অমলীন একটি পবিত্র মুখ আমার মানষপটে ভেসে এলো। তিনি
হলেন এ শতাব্দীর মহা পুরুষ বর্তমান প্রধান নির্বাচন কমিশনার জনাব কাজী রকিব
উদ্দিন। রকিব সাহেবের পবিত্র বদন হৃদয়ে ধারন করে টিভিতে দেখা অস্বস্তিকর
দৃশ্য ভুলে আমি বাসা থেকে বের হয়ে এলাম।
লিফট দিয়ে নামার সময় আমার
এক প্রতিবেশী আমাকে একটি কৌতুক শুনালো- বললো- শুনেন রনি সাহেব; একটি গল্প
শোনেন, এক ছেলে তার প্রতিপক্ষের হাতে আচ্ছামতো জুতাপেটা খেয়ে বংশের লোকজনের
নিকট সহানুভূতি পাবার জন্য বললো- অমুক বংশের ওমুক আমাকে জুতা দিয়ে পিটিয়ে
অসম্মান করেছে। এই কথা শুনে বংশের মুরুব্বীরা বললো- সাবধান, অসম্মান করেছে
এই কথা বলবি না। শুধু বল- জুতাপেটা করেছে। কারন আমাদের বংশের মান সম্মান
এতো বড় আর এতো কঠিন যে কিয়ামত পর্যন্ত জুতা মারলেও আমাদের অসম্মান হয় না।
ভদ্রলোক কৌতুকটি বলে হা হা করে হাসতে লাগলেন এবং আমিও তার সঙ্গে হাসলাম-
অনেকটা বেকুবের মতো- কিন্তু না বুঝেই।
ইদানিং যে আমার কি হয়েছে
বুঝতে পারি না। টিভিতে কিছু লোকের কথা, অঙ্গভঙ্গি, ম্যানম্যানে কন্ঠস্বরের
হুমকি ধামকীর প্যান-প্যানানী দেখলে মনে হয় ঐসব লোকের সারা শরীরে কেউ হয়তো
মান কচুর রস মেখে দিয়েছে। ওদের চটচটে- তৈলাক্ত টাকের বিভৎস রুপকথা বলার সময়
থু থু ছিটার দৃশ্য কিম্বা ঠোটের দুই প্রান্তে ফেনাযুক্ত থুথুর জঘন্য
উপস্থিতিতে মনে হয় এই বুঝি টেলিভিশনের পর্দা ফুটে তারা বেরিয়ে এলো এবং আমার
উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাদের দূর্গন্ধ গায়ে মাখিয়ে দিলো। এসব দৃশ্য রোজ রোজ
হররোজ দেখতে দেখতে আমি অনুভূতি শূন্য হয়ে পড়েছি। ফলে লজ্জা পাবো কিভাবে?
অফিসে এসে কিছু লিখার চেষ্টা করলাম। বাংলাদেশ প্রতিদিনে প্রতি শনিবার আমার
একটি ধারাবাহিক ঐতিহাসিক উপন্যাস ছাপা হচ্ছে। অনেক পরিশ্রম আর যত্ম-আত্মি
করে লিখি। ফলে প্রতিটি পর্বের জন্য তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে তা আবার পরিপাটি
করে সাজানোর জন্য সময় নিয়ে চিন্তা করতে হয়।
আগামী পর্বে অটোম্যান
সাম্রাজ্যের মিলিটারী নিয়ে কিছু একটা লিখতে হবে। ভারতের মুখল সম্রাট আকবর-
কনস্টান্টিনোপলে দূত পাঠিয়েছিলেন সেখানকার জেনিসারী বাহিনীর গঠন,
কার্যপ্রনালী এবং সফলতার বিষয়ে বিস্তারিত জানার জন্য। এসব নিয়ে দলিল পত্র
ঘাটতে ঘাটতে আমি পেয়ে গেলাম- পৃথিবীর মহামূল্যবান এক অছিয়ত নামা; একটি
রাজকীয় ফরমান।
অটোম্যান সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা সুলতান উসমান
মৃত্যুর পূর্বে তার পূত্র এবং সিংহাসনের উত্তরাধীকারী ওরহান এর নিকট একটি
পত্র লিখে যান। পত্রটি- বংশ পরম্পরায় সকল অটোম্যান সম্রাটদের নিকট-
সিংহাসনে অরোহনের পূর্বে হস্তান্তর করা হতো। পত্রের সেই চিরন্তন বানীগুলোকে
ধারন করে অটোম্যানরা প্রায় ৭০০ বছর ধরে দুনিয়ার সবচেয়ে বৃহত্তম
সাম্রাজ্যটি গৌরব এবং সম্মানের সঙ্গে শাসন করেছেন। পাঠকগণের জ্ঞাতার্থে
চিঠিটি তুলে ধরলাম-
প্রিয়পুত্র!
তোমার জীবনের যাবতীয়
গুরুত্বপূর্ন বিষয়ের ওপর সর্বদা ধর্মীয় বিষয়গুলোকে অধিকতর মর্যাদা প্রদান
করিও। মনে রাখবে ধর্মীয় নীতি নৈতিকতার সাহায্যেই তুমি কেবল একটি শক্তিশালী
নৈতিক রাষ্ট্র কাঠামো গড়ে তুলতে পারবে।
ধর্মীয় বিষয়াদি তদারকীর
দায়িত্ব কখনো গুনাগার, পাপী, দায়িত্বজ্ঞানহীন, অনভিজ্ঞ, ভিন্নমতের মানুষ
কিংবা- অলস ব্যক্তিদের ওপর অর্পন করবে না। এই ধরনের লোকজনকে ভুলেও রাষ্ট্র
ক্ষমতার কোন পদে বসাবে না। কারণ যে মানুষ তার সৃষ্টিকর্তা আল্লাহকে ভয় করে
না সেই মানুষ কখনো আল্লার বান্দাদেরকে সম্মান করতে জানেনা। একজন পাপী যদি
অনবরত পাপ করতে থাকে সে ক্ষেত্রে সে কখনোই কারো অনুগত হতে পারেনা। পন্ডিত
ব্যক্তিগণ, ধার্মিক মানুষজন, শিল্পী এবং সাহিত্যিকগণ হলেন রাষ্ট্রের
ভিত্তি। তাদের প্রতি সবসময় সম্মান, শ্রদ্ধা এবং দয়া প্রদর্শন করবে।
সব
সময় খুজেঁ খুজেঁ গুণী ব্যক্তিদেরকে বের করে তাদের সঙ্গে সম্পর্ক-স্থাপন
করবে এবং তাদেরকে অর্থবিত্ত দিয়ে নিজেকে সম্মানীত করার চেষ্টা করবে। এই সকল
লোকের মাধ্যমে তোমার রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় নীতিমালা সমূহ বাস্তবায়ন করবে।
হে পূত্র- তুমি আমার জীবন থেকে শিক্ষা নাও- এই জনপদে আমার নেতৃত্ব ছিলো
অতিশয় দূর্বল।
মহান আল্লাহর অনুগ্রহ নিয়ে আমি তোমাকে বর্তমানের
গৌরবময় স্থানে রেখে গেলাম- অথচ এই স্থানে পৌছানোর কোন যোগ্যতাই আমার ছিলো
না। তুমি আমার জীবন যাত্রা এবং কর্মপন্থা অবলম্বন করো, দ্বীনে মোহাম্মদীকে
রক্ষা করো এবং বিশ্বাসী মানুষ ও ফুলকে সুরক্ষা করো এবং ভালবাসো। মহান
আল্লাহর অধিকারের দিকে ভুলেও নজর দিবেনা এবং আল্লাহর অধিকারের প্রতি সম্মান
রাখবে এবং তার বান্দাদেরকে সম্মান করবে। আমি যেভাবে তোমাকে আদেশ ও উপদেশ
দিয়ে গেলাম তদ্রুপ তোমার পরবর্তী উত্তরাধীকারীকেও তুমি এই ওসিয়তগুলো পৌছে
দেবে।
প্রতিটি কর্ম সম্পাদনে তুমি সর্বোচ্চ যত্মশীলতার সঙ্গে
পরিশ্রম করবে, কখনো নিষ্ঠুর হবে না, প্রতিটি কর্মে স্বচ্ছতা এবং ন্যয়বিচার
নিশ্চিত করবে এবং সবশেষে ফলাফলের জন্য মহান আল্লার ওপর নির্ভর করবে। শত্রুর
আক্রমন, প্রতিহিংসা, নিষ্ঠুরতা আর চক্রান্ত থেকে তোমার জনগণকে রক্ষা করবে।
কখনো কারো সঙ্গে অসৌজন্যমূলক অসদাচরন করবেনা। জনগণকে সম্মান করবে এবং
তাদের স্বার্থ রক্ষা করবে