২০১৩ : বিভক্তি সংঘাত আর ধ্বংসের বছর

২০১৩ শেষ হয়েছে। বছরটি বাংলাদেশের জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকবে, কিন্তু কোনো সাফল্য কিংবা শুভ কোনো ঘটনার জন্য নয়। বরং এমন কিছু কারণের জন্য, যেগুলো জাতিকে শুধু বিভক্তই করেনি, সংঘাতের দিকেও ঠেলে নিয়ে গেছে। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে পুরো বছর ধরেই সংঘাত ছিল সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয়। এই সংঘাতে নারী, শিশু ও বৃদ্ধসহ কয়েকশ’ মানুষের মৃত্যু ঘটেছে। বছরের প্রথম থেকেই আওয়ামী লীগ সরকার ফ্যাসিস্ট কায়দায় দমন-নির্যাতন চালিয়েছে। এর শুরু হয়েছিল কথিত যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক নামের ট্রাইব্যুনালে চলমান মামলার কয়েকটি রায়কে কেন্দ্র করে। জামায়াতে ইসলামীর নেতা আবদুল কাদের মোল্লাকে ফাঁসির সাজা না দেয়ার প্রতিবাদে রাজধানীর শাহবাগ চত্বরে সমাবেশ ঘটানো হয়েছিল। প্রথমে গোপন থাকলেও এর সঙ্গে সরকারের সংশ্লিষ্টতার তথ্য প্রকাশিত হতে দেরি হয়নি। প্রতিক্রিয়ায় শাহবাগে সমবেতদের সংখ্যা লাখ থেকে হাজারের ঘরে নেমে এসেছিল। কিন্তু এরই মধ্যে শাহবাগিদের নির্দেশে সংসদে ট্রাইব্যুনালের আইন পরিবর্তন করা হয়েছে এবং তার ভিত্তিতে আপিলের মাধ্যমে কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে ফাঁসির রায় আদায় করেছে সরকার। হুটহাট করে সে রায় কার্যকরও করা হয়েছে গত ১২ ডিসেম্বর। শাহবাগিদের দেখিয়ে সরকার ট্রাইব্যুনালের বিচারপতিদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী সংসদে দাঁড়িয়ে বিচারপতিদের উদ্দেশে বলেছেন, শুধু আইন না দেখে তারা যেন জনগণের ভাষা বোঝার চেষ্টা করেন। অভিযোগ রয়েছে, মূলত সে কারণেই মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী থেকে আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ও মুহম্মদ কামারুজ্জামান পর্যন্ত জামায়াত নেতাদের বিরুদ্ধে ফাঁসির রায় দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল।
ইসলাম ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বিরুদ্ধে বিষোদ্গারের মাধ্যমেও ব্যাপকভাবে নিন্দিত হয়েছে শাহবাগিরা। মুসলমান মাত্রই এসব নাস্তিক-মুরতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়েছেন। নাস্তিক-মুরতাদ শাহবাগিদের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠতার সঙ্গে সোচ্চার হয়েছিল দৈনিক আমার দেশ। সরকারের সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতা থাকায় সাধারণ মুসলমানরা যখন ভেতরে ভেতরে গুমরে ছটফট করছিলেন তখনই দুর্দান্ত সাহসের সঙ্গে কলম ধরেছিলেন সম্পাদক মাহমুদুর রহমান। শাহবাগিরা তাকে হত্যার হুমকি দিয়েছে, কিন্তু মাহমুদুর রহমানকে নড়ানো যায়নি। তার সে প্রতিবাদী ভূমিকার সূত্র ধরেই হেফাজতে ইসলামের উত্থান ঘটেছিল, সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছিল নাস্তিক-মুরতাদবিরোধী আন্দোলন। প্রচণ্ড সে আন্দোলনের মুখে শাহবাগিরা পালিয়ে গেলেও সরকার উল্টো হেফাজতে ইসলামের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিয়েছিল। ৫ মে গভীর রাতে মতিঝিলে হেফাজতের শান্তিপূর্ণ সমাবেশে বিভিন্ন বাহিনী রীতিমত গণহত্যার অভিযান চালিয়েছে। তারও আগে ১১ এপ্রিল সরকার গ্রেফতার করেছিল মাহমুদুর রহমানকে। রিমান্ডে নিয়ে নিষ্ঠুর নির্যাতন চালানোর পাশাপাশি পুলিশ তার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলাও দায়ের করেছে—যেগুলোর মধ্যে এমনকি রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগও রয়েছে। সরকার একই সঙ্গে দৈনিক আমার দেশ-এর প্রকাশনাকেও বাধাগ্রস্ত করেছে। এখনও আমার দেশ-এর প্রেসে তালা ঝুলছে। ওদিকে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে চালানো সশস্ত্র অভিযান সম্পর্কে সরাসরি রিপোর্ট প্রচার করার কারণে সরকার দিগন্ত ও ইসলামিক টিভিকে নিষিদ্ধ করেছে। এভাবেই ২০১৩ সালেও সরকার গণমাধ্যমের টুঁটি টিপে ধরার নীতিকে এগিয়ে নিয়েছে।
ওদিকে রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও সরকার ফ্যাসিস্ট কর্মকাণ্ডকেই জোরদার করেছে। নিজেদের ইচ্ছা ও পরিকল্পনার ভিত্তিতে সংশোধিত সংবিধানকে অজুহাত বানিয়ে ক্ষমতাসীনরা একতরফা নির্বাচনের পথে পা বাড়িয়েছেন। বিরোধী দলের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন বিষয়ে একের পর এক ছাড় দিয়েছেন। বলেছেন, নির্বাচনকালীন সরকারকে নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ হতে হবে এবং প্রধানমন্ত্রীর পদে শেখ হাসিনা থাকতে পারবেন না। কিন্তু ক্ষমতাসীনরা বিরোধী দলের দাবি মানতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, গণচীন, ব্রিটেনসহ ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কমনওয়েলথ এবং জাতিসংঘ পর্যন্ত অনুরোধ জানিয়ে দেখেছে। অন্যদিকে ঘাড় বাঁকিয়ে রেখেছেন প্রধানমন্ত্রী। বলেছেন, ‘এক চুল’ও নড়বেন না তিনি। মূলত তার এই মনোভাবের কারণে সবশেষে ডিসেম্বরে ব্যর্থ হয়েছে জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোর প্রচেষ্টাও। মহাসচিব বান কি মুন এবং মার্কিন পররাষ্টষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরিও প্রধানমন্ত্রীকে টেলিফোন করেছেন। কিন্তু কারও অনুরোধ ও পরামর্শেই কান দেননি প্রধানমন্ত্রী। সে কারণেই সব দল নির্বাচনকে প্রত্যাখ্যান করেছে, এমনকি আওয়ামী মহাজোটের দ্বিতীয় প্রধান শরিক এরশাদের জাতীয় পার্টিও নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জবাবে সরকার এরশাদকে অঘোষিতভাবে গ্রেফতার করেছে, জাতীয় পার্টিকে নিয়ে সাজিয়েছে বিচিত্র নাটক। সব মিলিয়ে অবস্থা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যখন তিনশ’ আসনের সংসদে ১৫৪ জনই বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে গেছেন। বিষয়টি যে কোনো বিচারে লজ্জাকর এবং গণতন্ত্রের জন্য ধ্বংসাত্মক হলেও ক্ষমতাসীনদের মধ্যে পরিবর্তন ঘটেনি। সর্বশেষ উপলক্ষে বেগম খালেদা জিয়াকে অবরুদ্ধ করে, দেশজুড়ে যানবাহন চলাচল বন্ধ করিয়ে এবং গ্রেফতার ও দমন-নির্যাতনের অভিযান চালিয়ে সরকার ১৮ দলীয় জোটের ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ কর্মসূচিকে ভণ্ডুল করে ছেড়েছে। বছরের শেষ সপ্তাহে সাধারণ মানুষকে তাই প্রচণ্ড কষ্টের মধ্যে পড়তে হয়েছিল। ধরে নেয়া যায়, এ অবস্থা নতুন বছর ২০১৪ সালেও অব্যাহত থাকবে। কারণ, বিরোধী দলের প্রত্যাখ্যান এবং লাগাতার অবরোধের মধ্যেও ক্ষমতাসীনরা ৫ জানুয়ারি দশম সংসদের একতরফা নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে যাচ্ছেন। এর মধ্য দিয়ে সংসদ এবং সরকার গঠন করা সম্ভব হলেও রাজনৈতিক সঙ্কট ক্রমাগত মারাত্মক হতে থাকবে।
এভাবে সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনার ভিত্তিতেও বলা যায়, বাংলাদেশের জন্য ২০১৩ ছিল অত্যন্ত অশুভ একটি বছর। পদ্মা সেতুকেন্দ্রিক দুর্নীতির পাশাপাশি অন্য অনেক কারণেও সরকার ব্যাপকভাবে নিন্দিত হয়েছে, অর্থনীতির কোনো একটি খাতেই দেশ শুভ কিছু অর্জন করতে পারেনি। দাতারা সাহায্য বন্ধ করেছে, নতুন কোনো বিনিয়োগ হয়নি বললেই চলে। রানা প্লাজার ধস ও সেখানে হাজার শ্রমিকের মৃত্যু এবং একের পর এক গার্মেন্টে রহস্যজনক অগ্নিকাণ্ডের কারণে দেশের রফতানি আয়ের প্রধান খাত গার্মেন্টও ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এসে ঠেকেছে। একযোগে সমাজে বেড়েছে অপরাধ। ছিনতাই-ডাকাতি তো বটেই, হত্যাও এখন ডাল-ভাতের মতো সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, আওয়ামী লীগ সরকারের নীতি ও কার্যক্রমের পরিণতিতে ২০১৩ সালে বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়েছে বহুদূর। জাতি বিভক্ত হয়েছে ও পরস্পরের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে, সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছে, রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড পরিণত হয়েছে স্বাভাবিক বিষয়ে। স্বাধীনতা খুইয়ে ফেলেছে গণমাধ্যম এবং বিচার বিভাগও। কোনোদিকেই কোনো সম্ভাবনা নেই বলেই ২০১৪ সালকে নিয়ে মানুষ এখনই আশাবাদী হয়ে উঠতে পারছে না।