টেলিভিশনের খবরে কথাগুলো শুনে আমার মতো সবাই বিস্মিত হয়েছেন। পরিচিত অনেকে
ফোন করে তাদের বিস্ময়ের কথা বলেছেন। নিজেদের কানকেই তারা বিশ্বাস করতে
পারেননি। একজন ‘দায়িত্বশীল’ মন্ত্রী, একটি বৃহত্ রাজনৈতিক দলের সাধারণ
সম্পাদক এমন নির্জলা মিথ্যার বেসাতি করতে পারেন এটা কারোরই ধারণার মধ্যে
ছিল না। যে রকম অবলীলায় তিনি মিথ্যার কবিতা আবৃত্তি করেছেন তাতে তাকে
হিটলারের প্রচার সচিব গোয়েবলসের সার্থক উত্তরসূরি বলেই মনে হয়েছে।
‘এ ধরনের কাঁচা মিথ্যা কথা বলতে কি ওনার বিবেকে এতটুকু বাধল না?’ গত ২৯
ডিসেম্বর সন্ধ্যায় প্রেস ব্রিফিংয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও
এলজিআরডিমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের বক্তব্য টিভি সংবাদে শুনে পরিচিত
একজন ফোন করে এমন মন্তব্যই করলেন। তিনি বললেন, ‘আর যাই হোক, আমরা
রাজনীতিকদের কাছ থেকে মিথ্যাচার আশা করি না। আমাদের চোখের সামনে যা ঘটছে,
কেউ যদি তার উল্টোটা বলে আমাদেরকে বিভ্রান্ত করতে চায় সেটা কি ঠিক?’ তাকে
বললাম, ‘যারা অপরাপর সব মানুষকে বোকা, অন্ধ আর কালা মনে করে তারাই নির্মম
সত্যকে মাটিচাপা দিয়ে তার ওপর মিথ্যার সৌধ নির্মাণের পণ্ডশ্রম করে। তবে
নির্মম সত্যি হলো, সত্যকে কখনোই মাটিচাপা দিয়ে রাখা যায় না; যেমন আটকে রাখা
যায় না আগুনকে ছাইচাপা দিয়ে।’
বস্তুত, গত ২৯ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল
ইসলাম দলের সভানেত্রীর ধানমন্ডির কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি
চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া সম্পর্কে যেসব মন্তব্য করেছেন, তাকে উদ্ভট
বললেও কম বলা হয়। কোনো সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষ এমন সব কথা বলতে পারে তা
বিশ্বাস করা কঠিন। মানসিক ভারসাম্যহীন কিংবা অতিরিক্ত মাদক সেবনে মাতালরা
অনেক সময় আবোল-তাবোল বকে থাকে। বাস্তবতা পারিপার্শ্বিকতাকে বিস্মৃত হয়ে
তারা যা মনে আসে তাই বলে থাকে। কেউ বিশ্বাস করল কিনা বা আমলে নিল কিনা,
কিংবা মানুষ তার সম্পর্কে কী ধারণা পোষণ করল—এসব নিয়ে চিন্তা করার মতো
অবস্থায় ওই মাতাল বা পাগল তখন থাকে না। সুস্থ এবং স্বাভাবিক মানুষেরা কথা
বলার সময় বাস্তবতাকে স্মরণে রাখেন। অপরকে কুপোকাত করার জন্য বাক্যবাণের
আক্রমণ চালানোর সময়ও তারা এটা খেয়াল রাখেন যে, তার কথা যেন বাস্তবতা
বিবর্জিত বা মানুষের কাছে অবিশ্বাস্য না হয়। সৈয়দ আশরাফের সেদিনের
বক্তব্যের মধ্যে কেউ সুস্থতা ও স্বাভাবিকতার উপস্থিতি খুঁজে পেয়েছেন বলে
মনে হয় না।
সৈয়দ আশরাফ যখন বক্তব্য রাখছিলেন তখন তাকে বেশ বিব্রত মনে হচ্ছিল। একজন
রাজনৈতিক নেতা বক্তব্য রাখার সময় যে দৃঢ়তা মুখাবয়বে দেখা যায় তার মধ্যে
সেটা ছিল না। বরং তড়িঘড়ি কথা শেষ করে সটকে পড়ার একটা ভাব লক্ষ্য করা গেছে।
২৯ ডিসেম্বর দেশে, বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায় কী ঘটেছে তা কাউকে বলে দেয়ার
প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। কেননা, সব ঘটনাই দেশবাসীর সামনে ঘটেছে এবং এখনও
ঘটে চলেছে। তাছাড়া ইলেকট্রনিক সংবাদমাধ্যমের কল্যাণে কখন কোথায় কী ঘটছে
পরমুহূর্তেই মানুষ তা জানতে এবং দেখতে পাচ্ছে। ফলে ঘটনার সত্যাসত্য লুকানো
বা অতিরঞ্জিত করে প্রচারের কোনো সুযোগ এখন আর নেই।
১৮ দলের ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ কর্মসূচি বিএনপি চেয়ারপারসন ও জোটনেত্রী
বেগম খালেদা জিয়া ঘোষণা করেছিলেন ২৪ ডিসেম্বর মঙ্গলবার সন্ধ্যায়। তিনি
সেদিন দেশবাসীকে আহ্বান জানিয়েছিলেন ২৯ ডিসেম্বর জাতীয় পতাকা হাতে রাজধানী
ঢাকার নয়াপল্টনে সমবেত হওয়ার জন্য। বেগম জিয়ার সে আহ্বান যে জনমনে ব্যাপক
উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছিল তা বেশ বোঝা যাচ্ছিল। ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’
কর্মসূচি বাধাহীনভাবে অনুষ্ঠিত হতে পারলে যে তা দেশের ইতিহাসে একটি
উল্লেখযোগ্য সংযোজন ঘটাবে এটাও বলছিলেন সবাই। ফলে শাসক মহলে সৃষ্টি হয়
‘ত্রাহি-মধুসূদন’ অবস্থা। কী করে এ কর্মসূচি বানচাল করা যায় তার পরিকল্পনায়
মেতে ওঠে তারা। সারা দেশে ব্যাপক ধর-পাকড়, যানবাহন চলাচল বন্ধ, নয়াপল্টনে
বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়কে অবরুদ্ধ করা ইত্যাদির মাধ্যমে সরকার
কর্মসূচিটি বানচালের চেষ্টা করে। বেগম খালেদা জিয়া বলেছিলেন তিনি সেদিন
নয়াপল্টনে আসবেন। তার এ দৃঢ় সঙ্কল্প সরকারকে বাস্তবিকই ভীত-সন্ত্রস্ত করে
তোলে। তাই গুলশানে বিএনপি চেয়ারপার্সনের বাসভবনের চারদিকে আইন-শৃঙ্খলা
বাহিনী দিয়ে ঘিরে ফেলা হয়। বাড়ির সামনের রাস্তার দু’মাথায় বাঁশ দিয়ে
বেরিকেড বসানো হয়। ২৮ ডিসেম্বর রাতে সেখানে পাঁচটি বালুভর্তি ট্রাক এনে
প্রতিবন্ধকতাকে অধিকতর শক্তিশালী করা হয়। টেলিভিশনের পর্দায় যারা সরকারের
এসব আয়োজন এবং বিপুল সংখ্যক সশস্ত্র পুলিশ, র্যাব, বিজিবি-আর্মির উপস্থিতি
দেখেছেন, তারা বিস্মিত হয়েছেন এ ভেবে যে, একজন মানুষের পথচলা বন্ধ করতে
সরকার এত শক্তি নিয়োজিত করল! সরকারের এ বিপুল আয়োজন যে বেগম খালেদা জিয়াকে
রাস্তায় বের হতে না দেয়ার জন্য সেটা তো কাউকে বলে দিতে হয় না।
অথচ সৈয়দ আশরাফ বললেন যে, বেগম খালেদা জিয়া আসলে নয়াপল্টনে যেতে চাননি।
তিনি কর্মসূচির নামে নাটক করেছেন। সম্মানিত পাঠকদের সুবিধার্থে আমি এখানে
সৈয়দ আশরাফের বক্তব্যের কিছু অংশ তুলে ধরছি। তিনি বলেছেন—‘গণতান্ত্রিক
অভিযাত্রা কর্মসূচি এবং সে কর্মসূচিতে যাওয়ার নাম করে বিরোধী দলের নেতা
নাটক করেছেন। এটা তার ভাঁওতাবাজি। উনি কর্মসূচিতে যাবেন বলে হঠাত্ আসলেন।
ওনার সাজ-সজ্জা দেখে মনে হলো উনি কোনো পার্টিতে যাচ্ছেন। কথায় আছে না,
টুপি-পায়জামা পরে যুদ্ধে যাওয়া যায় না। ওনার কোনো ইচ্ছা ছিল না বিএনপির
পার্টি অফিসে যাবার। বরং তিনি বার বার তার দলের নেতাদের দিয়ে আইন-শৃঙ্খলা
বাহিনীর কাছে তার নিরাপত্তা জোরদার করার অনুরোধ করেছেন। এ কারণেই ওনার
নিরাপত্তা আরও বৃদ্ধি করা হয়েছে।’ সৈয়দ আশরাফ আরও বলেছেন—‘এ ধরনের নাটক
মাঝে মাঝে করলে অনেকে হয়তো আনন্দ পায়। আমি আশা করছি উনি দু’বারের
প্রধানমন্ত্রী হয়ে যা কিছু করবেন সিরিয়াসলি করবেন। সত্যিকার অর্থে
কর্মসূচিতে আসতে চাইলে উনি সকাল আটটায় উঠতেন। কারণ ওনার পল্টনের পার্টি
অফিসে আসার কথা ছিল সকাল ১০টার দিকে।’ (সূত্র : দৈনিক যুগান্তর, ৩০
ডিসেম্বর ২০১৩)
সৈয়দ আশরাফের বক্তব্য যে ‘শাক দিয়ে মাছ ঢাকার ব্যর্থ চেষ্টা সেটা বলার
অপেক্ষা রাখে না। বেগম খালেদা জিয়া আহূত ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ কর্মসূচিকে
ঠেকাতে তারা যে স্বৈরতান্ত্রিক পদ্ধতি প্রয়োগ করেছেন, ফ্যাসিবাদী কায়দার
আশ্রয় নিয়েছেন, তা এরই মধ্যে দেশ-বিদেশে তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
দেশবাসীর মধ্যে সৃষ্টি করেছে ব্যাপক ক্ষোভ। আর সে অপকর্মকে জায়েজ করার
জন্যই সৈয়দ সাহেব এখন ‘আম গাছের ডাব’ আর ‘জাম গাছের তাল’ জাতীয় কথাবার্তা
বলে মানুষকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়েছেন।
মার্চ ফর ডেমোক্রেসির জমায়েতে সকাল ১০টায় খালেদা জিয়ার আসার কথা তিনি কোথা
থেকে জানলেন, এটা একটা বড় প্রশ্ন। কেননা, বেগম খালেদা জিয়া কখন নয়াপল্টনে
যাবেন তার নির্দিষ্ট সময় বলা ছিল না। বলা হয়েছিল নেতা-কর্মী ও জনসাধারণ
দশটা থেকেই নয়াপল্টনে উপস্থিত হতে থাকবেন। বেগম জিয়া ‘যথাসময়ে’ সেখানে
উপস্থিত হবেন। কিন্তু সেদিন নয়াপল্টনের অবস্থা কেমন ছিল? এটা দেশবাসী যেমন
জানেন, সৈয়দ আশরাফ তেমনি জানেন। দেশবাসী জেনেছেন গণমাধ্যমের কল্যাণে আর
সৈয়দ সাহেব জানেন ওটা তারা নিজেরাই করেছেন বলে।
রাজনীতিতে যে নাটক হয় না তা নয়। মাঝে মাঝে ওরকম একাঙ্কিকা, খণ্ড নাটক,
ধারাবাহিক নাটক দেখা যায়। সৈয়দ সাহেবের নেত্রী এবং জাতীয় পার্টির
চেয়ারম্যান এরশাদ মিলে ওরকম বেশ কয়েকটি নাটক করেছেন। যার একটি এখনও চলছে।
তবে দীর্ঘ তিন দশকের রাজনৈতিক জীবনে বেগম খালেদা জিয়া কখনোই কোনো নাটক
করেননি। তিনি যা বলেছেন তা করেছেন, সিরিয়াসলি করেছেন। তিনি রাস্তায়
স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে গলা ফাটিয়ে রাতের আঁঁধারে সে স্বৈরাচারের সঙ্গে
কোলাকুলি করে পাতানো নির্বাচনে যাননি। বেগম খালেদা জিয়া রাজনীতির নামে
প্রতারণা, প্রবঞ্চনা, ভাঁওতাবাজিতে বিশ্বাস করেন না। তিনি বিশ্বাস করেন,
দেশ ও জনগণের জন্য রাজনীতি করলে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে কোনো ছল-চাতুরির
দরকার পড়ে না। কেননা, জনগণ প্রতারক-প্রবঞ্চকদের কখনোই বিশ্বাস করে না,
তাদের ওপর আস্থা রাখে না। হয়তো প্রতারণা-প্রবঞ্চনার ফাঁদে পড়ে তারা অনেক
সময় বিভ্রান্ত হয়। তবে, সে বিভ্রান্তির কুয়াশা কেটে গেলেই যখন
প্রতারক-প্রবঞ্চকের আসল চেহারাটা স্পষ্ট হয় তখন তার দিক থেকে তারা মুখ
ফিরিয়ে নেয়। এখন যেমন বাংলাদেশের জনগণ আওয়ামী লীগের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে
নিয়েছে।
বেগম খালেদা জিয়াকে তার বাসভবন থেকে সরকার যে বেরুতে দেয়নি, এ সত্যকে
ট্রাকভর্তি ভালু দিয়ে লুকানো যাবে না। মার্চ ফর ডেমোক্রেসি কর্মসূচি ঘোষণা
করার পর থেকেই সরকার ও সরকারি দল তা বানচাল করতে কোমর বেঁধে মাঠে নামে।
ওইদিন থেকেই বেগম খালেদা জিয়ার বাসভবনকে ঘিরে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ভিড় বেড়ে
ওঠে। ২৭ ডিসেম্বর বেগম খালেদা জিয়াকে তার ভ্রাতুষ্পুত্রের বিয়ের
অনুষ্ঠানেও যেতে দেয়া হয়নি। বাধা দেয়া হয়েছে গুলশানে তার রাজনৈতিক
কার্যালয়ে যেতে। আর ২৯ ডিসেম্বরের ঘটনা তো টিভি চ্যানেলগুলোর লাইভ প্রচারের
ফলে দেশবাসী স্বচক্ষেই দেখেছেন। পুলিশ, বিজিবি, র্যাব, আর্মির বাধার মুখে
বাড়ি থেকে বেরুতে না পেরে বিএনপি চেয়ারপারসন সাংবাদিকদের সামনে কী বলেছেন
তা সবাই শুনেছেন। দেশবাসী দেখেছেন, বাড়ি থেকে বেরুতে না দেয়ায়, নির্ধারিত
কর্মসূচিতে যেতে না দেয়ায় ক্ষুব্ধ বেগম জিয়া যা বলেছেন, তা জনমনে ব্যাপক
আলোড়ন তুলেছে। সরকারের ন্যক্কারজনক কর্মকাণ্ডকে তারা নিন্দা জানাচ্ছেন
তীব্র ভাষায়। সৈয়দ আশরাফরা কানে তুলো গুঁজে আছেন বলেই সেসব নিন্দা-ধিক্কার
শুনতে পাচ্ছে না।
বেগম খালেদা জিয়া বা তার পক্ষে কোনো নেতা বা কর্মকর্তা তার নিরাপত্তা
বৃদ্ধির জন্য সরকারের কাছে কিংবা আইন-শৃঙ্খলার দায়িত্বে থাকা কোনো
কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ করেছেন, এমন কথা কেউ শোনেনি। সৈয়দ আশরাফের মুখ
থেকেই দেশবাসী প্রথম শুনল ওটা। তবে বিষয়টি পরিষ্কার হওয়া দরকার। হাওয়াই
কথাবার্তা কোনো কাজের কথা নয়। যদি ওই ধরনের কোনো তথ্যপ্রমাণ আশরাফ সাহেবের
কাছে থেকে থাকে তাহলে অবিলম্বে তা জনসমক্ষে প্রকাশ করা উচিত। না হলে ধরে
নিতে হবে শুধু বিভ্রান্তি সৃষ্টি এবং নিজেদের অপকর্ম ধামাচাপা দেয়ার জন্যই
সৈয়দ আশরাফ ওই মিথ্যাটি প্রচার করেছেন।
সৈয়দ আশরাফ বলেছেন, ‘বিরোধী দল বিচ্ছিন্নতার কারণেই কর্মসূচি পালন করতে
পারছে না। আজ বিএনপির কোনো নেতাকেই রাস্তায় বের হতে দেখা যায়নি। এমনকি
খালেদা জিয়াকেও। বিএনপি ও খালেদা জিয়া মানুষকে নিয়ে আসতে ব্যর্থ হয়েছেন।’
আগেই বলেছি সৈয়দ আশরাফের কথাগুলো সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষের কথা বলে মেনে
নেয়ার মতো নয়। রাষ্ট্রশক্তিকে ব্যবহার করে সারা দেশে বিভীষিকাময় পরিস্থিতি
সৃষ্টি করে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে পায়ের নিচে পিষ্ট করে একদলীয়
স্বৈরশাসনের পরিবেশ সৃষ্টি করে তারা এখন বলছেন বিএনপি নেতাদেরকে রাস্তায়
দেখা যায়নি। রাস্তায় কেন, তারা তো এখন নিজেদের বাড়ি-ঘরেই থাকতে পারছেন না।
ঘরে ঘরে তল্লাশি চালিয়ে সৃষ্টি করা হয়েছে মহাত্রাস। পাশাপাশি সৈয়দ আশরাফ
সাহেবের দলের সন্ত্রাসীরা পুলিশের ছত্রছায়ায় চড়াও হচ্ছে বিরোধী দলের
নেতা-কর্মীদের ওপর। মার্চ ফর ডেমোক্রেসি কর্মসূচি ঘোষণার পর ঢাকা মহানগর
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া হুঙ্কার দিয়ে
বলল—২৯ ডিসেম্বর ঢাকার প্রবেশ মুখগুলোতে তারা অবস্থান নেবে। একটি মাছিও
নয়াপল্টনে ঢুকতে দেয়া হবে না। ২৯ ডিসেম্বর তারা লাঠি হাতে মিছিল করেছে
নগরীর সর্বত্র। হামলা করেছে জাতীয় প্রেস ক্লাব ও সুপ্রিমকোর্টে গণতন্ত্রের
দাবিতে উচ্চকিত সাংবাদিক-আইনজীবীদের ওপর। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তথ্য
উপদেষ্টার নেতৃত্বে যুবলীগ-ছাত্রলীগ সন্ত্রাসীরা জাতীয় প্রেস ক্লাবে যেভাবে
নারকীয় হামলা চালাল, তা দেখে আমি শিউরে উঠেছি। একজন প্রবীণ সাংবাদিকও যে
সন্ত্রাসী হামলায় নেতৃত্ব দিতে পারেন, তা আমার ধারণার বাইরে ছিল। আর
সুপ্রিমকোর্ট প্রাঙ্গণে একজন মহিলা আইনজীবীকে মাটিতে ফেলে লীগ সন্ত্রাসীরা
যেভাবে লাঠিপেটা করেছে, সে দৃশ্য দেখে মানুষ শিউরে উঠেছে। মানুষ মানুষকে
এভাবে পেটাতে পারে তা কারও ধারণা ছিল না। ওই দৃশ্য দেখে সবারই ২০০৬ সালের
২৮ অক্টোবরের লগি-বৈঠার সে নৃশংস ঘটনার কথা মনে পড়ে থাকবে।
রাষ্ট্রশক্তি ও পেশিশক্তির অপব্যবহার করে দেশে এক নজিরবিহীন ভয়ঙ্কর
পরিস্থিতি সৃষ্টি করে সৈয়দ আশরাফরা হয়তো তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলছেন। তারা হয়তো
ভাবছেন বিএনপিকে, বেগম খালেদা জিয়াকে বুঝি চিরদিনের জন্য আটকে দিতে
পেরেছেন। কিন্তু ক্ষমতার রঙিন চশমা যে তাদেরকে রূঢ় বাস্তবচিত্র দর্শন থেকে
বঞ্চিত রাখছে সেটা তারা হয়তো বুঝতে পারছে না।
তিনি রাস্তায় বিএনপি নেতাদের দেখতে পাননি বলেছেন। ঠিক আছে, পরিস্থিতি
স্বাভাবিক করুন। মানুষকে অবাধে চলতে দিন। নিপীড়ন, নির্যাতন, হত্যা বন্ধ
করুন। তারপর দেখুন কী হয়। গণজোয়ার কাকে বলে তা দেখতে পাবেন। বেগম খালেদা
জিয়ার পেছনে আজ গোটা জাতি ঐক্যবদ্ধ। তারা এ দুঃশাসন থেকে মুক্তি চায়।
প্রহসনের নির্বাচন বন্ধ করতে তারা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। নদীর মুখে দেয়া বাঁধ একবার
ভেঙে গেলে জোয়ারের প্রবল স্রোতে যেমন নগর-জনপদ ভাসিয়ে নিয়ে যায়। তেমনি
রাষ্ট্র ও পেশিশক্তির বাঁধ ভেঙে জনস্রোত যখন প্রবল বেগে ছুটতে শুরু করবে,
তখন সৈয়দ আশরাফদের ‘তখতে তাউস’ আর ক্ষমতা চিরস্থায়ীকরণ প্রকল্প তৃণ-কুটার
মতো ভেসে যাবে। বলাই বাহুল্য, সে সময় মিডিয়ার সামনে মিথ্যাচারের কোনো
সুযোগই তারা পাবেন না।