প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মদিনা সনদ বাস্তবায়ন করার ঘোষণা দিয়েছেন।
দৈনিক প্রথম আলোসহ (২২ মার্চ, ২০১৪) বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে এ খবর দেখে
অনেকেই মন্তব্য করেছেন, এটা শেখ হাসিনার আরেকটি চমক। এটা তার অন্তরের কথা
নয়, এটা নিরেট প্রতারণা। তাদের মতে, শেখ হাসিনার চমকের শেষ নেই। ডিজিটাল
বাংলাদেশের চমক মার খাওয়ার পর এবার তিনি মদিনা সনদ ফেরি করার ফন্দি আঁটছেন।
এ নিয়ে নিউইয়র্ক প্রবাসী কিছু বাংলাদেশীর সঙ্গে কথা বলার সময় আমার
আশান্বিত মন্তব্য ছিল, হয়তো মহান আল্লাহ শেখ হাসিনার ‘দিলে পরিবর্তন’
এনেছেন। এভাবে পরিবর্তনের কারণেই তো অমুসলিমরা মুসলিম হয়েছে। আর শেখ হাসিনা
তো জন্মগতভাবে মুসলিম। তাই তিনি মদিনা সনদ বাস্তবায়ন করার অনুপ্রেরণা পেলে
তা অবশ্যই আল্লাহর ‘খাস রহমত’ তার ওপর বর্ষিত হয়েছে বলে মনে করতে হবে।
কিন্তু নিউইয়র্কের বাংলাদেশীরা শেখ হাসিনার এ ঘোষণাকে নিরেট ভাঁওতাবাজি এবং
মদিনা সনদকে নিয়ে চরম প্রতারণামূলক তামাশা ও অবমাননা বলে মনে করেন। এ
প্রসঙ্গে তারা শেখ হাসিনার অন্যতম মোসাহেব মোহাম্মদ নাসিমের ফতোয়ার
সমালোচনা করেছেন। নাসিম বলেছেন, দক্ষিণ এশিয়াতে শেখ হাসিনার কোনো বিকল্প
নেই। তাদের মতে মন্ত্রিত্ব পেয়েও মোহাম্মদ নাসিম তোষামোদকারী হিসেবে যথাযথ
ভূমিকা পালন করতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছেন। তিনি শেখ হাসিনাকে খাটো করেছেন,
কারণ কেবল দক্ষিণ এশিয়াই নয়, শেখ হাসিনার বিকল্প সারা পৃথিবীতে কখনোই ছিল
না, বর্তমানেও নেই এবং ভবিষ্যতে যে এমন কেউ আসবেন, তা কেউ বলতে পারে না।
তাদের মতে, এমন ‘একই অঙ্গে এত রূপসম্পন্না’ ‘এমন বহুরূপী’ আর কখনও কোনো
দেশে না এলেই ভালো হয়, কারণ তা হলে শেখ হাসিনা বিশ্বে অনন্যা হিসেবেই থেকে
যাবেন।
তাদের অভিযোগ, শেখ হাসিনা কখন যে কী বলবেন আর কী করবেন, তা বোঝা মুশকিল।
তিনি পরস্পরবিরোধী এক আশ্চর্য চরিত্রের অধিকারী। প্রধানমন্ত্রী হয়েও তিনি
জনসম্মুখে কখনও হাসেন, কখনও কাঁদেন, কখনও গান গান। জঘন্য অপকর্ম করে তা
স্বীকার না করে সে দায়দায়িত্ব বিরোধী দলের ওপর চাপিয়ে দেন। বিরোধীদের
বিরুদ্ধে রুচিহীন ভদ্রতাহীন ভাষায় মন্তব্য করেন। এমন শব্দ ও ভাষা প্রয়োগ
করেন, যা একেবারে নিরেট পল্লীর ঝগড়াটে অশিক্ষিতার মুখেও কেউ কখনও শোনেনি।
অথচ শেখ হাসিনা অবলীলাক্রমে সভা-সমিতিতে সেগুলো প্রায় প্রতিনিয়তই বলে
বেড়ান। তার নিজের দলও চরম অন্যায় করেও পার পেয়ে যায়। তাদের নামে খুন,
ডাকাতিসহ সব ধরনের মামলাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা হিসেবে তুলে
নেয়া হয়। আর বিরোধী দলের বিরুদ্ধে দায়ের করা একই ধরনের মামলা কেবল অব্যাহতই
রাখা হয়নি, বরং নতুন নতুন মিথ্যা মামলা দায়ের করে বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের
কারারুদ্ধই করা হচ্ছে না, বরং তাদের উধাও করে অবলীলাক্রমে তা অস্বীকার করা
হয়। এ এক আজব চরিত্র। তিনি মুখে যা বলেন, বাস্তবে তার উল্টোটি করেন।
সুতরাং মদিনা সনদ বাস্তবায়নের কথা বলে শেখ হাসিনা হয়তো ভবিষ্যতে ইসলাম ও
মুসলিমবিরোধী চরম পন্থা আঁটছেন। তাকে বিশ্বাস করা কঠিন।
উদাহরণ হিসেবে তারা উল্লেখ করেন, তিনি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করছেন, তাদের
একজনকে ফাঁসিতে ঝুলিয়েছেন, আরও অনেককে ঝোলাতে পারেন। কিন্তু এই শেখ হাসিনাই
কাকাবাবু জ্যোতিবসুর পরামর্শে খুনি, সন্ত্রাসী, দেশদ্রোহী ও ভারতীয় চর
সন্তু লারমাদের একই ধরনের অপরাধের জন্য ফাঁসি না দিয়ে শান্তির নামে তাদের
হাতে বাংলাদেশের এক-দশমাংশ ভূমির মূল কর্তৃত্ব তুলে দিয়ে নোবেল পুরস্কার
বাগানোর চেষ্টায় লিপ্ত ছিলেন। দেশের ক্ষতি হলেও তার সে প্রত্যাশা পূরণ
হয়নি। আশাভঙ্গের এ প্রতিশোধ তিনি অমূলকভাবে অন্যভাবে নিচ্ছেন। নোবেল
পুরস্কার বিজয়ী ড. ইউনূসকে গত পাঁচ বছরে প্রতিহিংসা হিসেবে সাইজ করেছেন।
কারণ শেখ হাসিনার তোষামুদেরা বলেছেন, নোবেল কমিটি ভুল করে শেখ হাসিনার
পরিবর্তে ড. ইউনূসকে নোবেল পুরস্কার দিয়েছে। তার অন্যতম মোসাহেব মাহবুবে
আলম বলেছেন, ড. ইউনূসের নোবেল পুরস্কার পাওয়া উচিত হয়নি, বরং এটা শেখ
হাসিনা ও সন্তু লারমার পাওয়া উচিত ছিল।
নিউইয়র্ক প্রবাসী পর্যবেক্ষকরা গণতন্ত্র ও শাসনতন্ত্র নিয়ে শেখ হাসিনার
তেলেসমাতিকেও এক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে টেনেছেন। তাদের মতে, গণতন্ত্র ও
শাসনতন্ত্রের আলখেল্লা পরা শেখ হাসিনা সরকারের প্রথম শিকার ছিল সেনাবাহিনীর
৫৭ সেনা কর্মকর্তা। তারা নিহত হওয়ার পর তিনি বিরোধী দলের নেতার ওপর সে
দায়িত্ব চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছেন। তাদের হত্যাকাণ্ডকে হজম করার পর গত
পাঁচ বছরে বাংলাদেশে যা কিছু ঘটেছে, তার কাছে হিটলার, মুসোলিনি,
স্ট্যালিনের নির্মমতা কিছুই নয়। সাবেক একনায়করা সরাসরি মানুষের গণতান্ত্রিক
অধিকারকে রহিত করেছে। শেখ হাসিনা শাসনতন্ত্র ও গণতন্ত্রকে নিজের পকেটস্থ
করে মুখে গণতন্ত্র, কাজে স্বৈরতন্ত্র বাস্তবায়ন করছেন। এমন বৈপরীত্য,
প্রতারণা কিংবা ধোঁকাবাজি সারা বিশ্বে বিরল। সবকিছুকে তিনি তার নিজের মতো
করে ব্যাখ্যায়িত ও বাস্তবায়িত করছেন। জনগণের গণতান্ত্রিক বা শাসনতান্ত্রিক
অধিকারকে মুখে স্বীকার করে বাস্তবে সরাসরি অস্বীকার করছেন।
শেখ হাসিনার ঘোষণা : মদিনা সনদ অনুযায়ী দেশ চলবে। এমন ঘোষণাকে নিউইয়র্কের
প্রবাসীরা শেখ হাসিনার সর্বশেষ চমক, কিংবা নাটক অথবা নতুন ডিজিটাল
ভাঁওতাবাজি বলে বর্ণনা করেছেন। মদিনা সনদে একটা ইসলামী রাষ্ট্রে সব
ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় স্বাধীনতাসহ সব ধরনের সুযোগ-সুবিধার পাশাপাশি তাদের
দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কিত নীতিমালা রয়েছে। মদিনা সনদ মানেই ইসলামী
রাষ্ট্রব্যবস্থা। ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা চালু করার জন্য পুরোপুরি ইসলামী
নীতি-আদর্শে আন্তরিকভাবে বিশ্বাসী সত্ নেতৃত্ব এবং সে আদর্শ বাস্তবায়ন করার
মতো মানসিক দৃঢ়তা প্রয়োজন। শেখ হাসিনা কিসের ভিত্তিতে মদিনা সনদ অনুযায়ী
দেশ চালানোর ঘোষণা দিলেন, তা তাদের কাছে বিরাট প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়ে
দাঁড়িয়েছে।
মহানবী (সা.) বলেছেন, রোজ কিয়ামতের দিন তার উম্মতরা ১২টি দলে বিভক্ত হয়ে
পুনরুত্থিত হবে। মদিনা সনদ বাস্তবায়নের ঘোষণাকারী শেখ হাসিনার আশপাশে লোকজন
কোন দলের অন্তর্ভুক্ত হবেন, তা কেবল আল্লাহই ভালো বলতে পারেন। এ ১২টি দলের
মধ্যে কয়েকটির দুনিয়ার কাজকর্ম এবং আখিরাতে তাদের অবস্থা হবে নিম্নরূপ—
১. যারা জনসমাজে অশান্তি ও গোলযোগ সৃষ্টি করেছেন, তাদের বানরের আকারে হাশরের ময়দানে উত্থিত করা হবে।
২. যারা হারাম খাদ্য দ্বারা শরীরের বৃদ্ধিসাধন করেছে, তাদের শূকরের আকারে
হাশরের মাঠে উত্থিত করা হবে। তারা অন্ধকারে ইতস্তত ঘুরতে থাকবে।
৩. যে হাকিম বা সর্দার ন্যায় বিচার করেনি বরং অন্যায় হুকুম জারি করেছে,
তাদের অন্ধ অবস্থায় হাশরের মাঠে উত্থিত করা হবে। তারা অন্ধকারে ইতস্তত
ঘুরতে থাকবে।
৪. যে আলেমদের কাজে ও কথায় সঙ্গতি ছিল না, রোজ হাশরে তাদের মুখ হতে পুঁজ ও রক্ত পড়তে থাকবে এবং তারা নিজের জিহ্বা কামড়াবে।
৫. যারা মিথ্যা সাক্ষ্য দান করেছে, রোজ হাশরে তাদের শরীর আগুনে দগ্ধ করে উঠান হবে।
৬. যারা নিজের লোভ-লালসা ও কু-ইচ্ছা পরিপূর্ণ করতে জীবনকাল কাটিয়েছে, রোজ
হাশরে তাদের পদদ্বয়কে মাথার চুল দ্বারা কপালের ওপর কষে বেঁধে দেয়া হবে। তখন
তাদের শরীর থেকে অত্যধিক দুর্গন্ধ বের হবে।
৭. পরনিন্দাকারী, পরদোষ অন্বেষণকারী, দুর্নাম রটনাকারী ও চোগলখোরকে রোজ
হাশরে গন্ধক অথবা কেতরানের বস্ত্র পরিয়ে হাশর ময়দানে ওঠানো হবে।
প্রবাসীদের একজন ভালো মুসলমানের লক্ষণ বা বৈশিষ্ট্য কী কী তা ব্যাখ্যা করে
প্রশ্ন করেছেন শেখ হাসিনা কিংবা তার অনুসারীদের মধ্যে সেসব বৈশিষ্ট্য আছে
কী? মহানবী (সা.) মদিনা গমনের পর সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণকারী ১২ জন
মদিনাবাসীর উদ্দেশে যে বক্তব্য রেখেছিলেন তাতে তিনি একজন ভালো মুসলমানের
সাতটি বৈশিষ্ট্যর কথা উল্লেখ করেছিলেন। এগুলো হলো—সব বিশ্বাস এবং আনুগত্য
কেবল আল্লাহ তায়ালার জন্য (দুর্গার মতো কোনো দেবদেবীর প্রতি নয়), জীবনে
কখনও চুরি করবে না, ব্যভিচার করবে না, মানুষ হত্যা করবে না, কাউকে অপবাদ
দিবে না, গীবত করবে না এবং ভালো কাজের চর্চা করবে ও মন্দ থেকে বিরত থাকবে।
প্রবাসীদের পরামর্শ : শেখ হাসিনা ভেবে দেখুন মহানবী (সা.)-এর মদিনা সনদ
বাস্তবায়িত করার মতো মহানবীর বর্ণিত বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলি তার নিজের, তার
দলের, সরকারের, এমনকি প্রশাসনের লোকদের চরিত্রে আছে কিনা?
তাদের মতে, মহানবী (সা.)-এর মতো আদর্শবান নেতৃত্ব ও চরিত্র ছাড়া কেবল মুখে
মহানবীর সনদ বাস্তবায়নের ঘোষণা দেয়া চরম বেঈমানি, প্রতারণা ও ধোঁকাবাজি
ছাড়া কিছুই হবে না। দেশবাসী শেখ হাসিনার আচরণ ও অসত্য কথন, তার ভাষা ও শব্দ
প্রয়োগ, সর্বোপরি তার দুঃশাসনে অতিষ্ঠ। শেখ হাসিনা এবং তার সাঙ্গরা
সাফল্যের ও উত্তম শাসনের যতই কবিতা আওড়ান না কেন, তারা দেশবাসীর প্রত্যাশা ও
আশা-আকাঙ্ক্ষা থেকে অনেক দূরে সরে গেছেন। তিনি জনগণের মন আর কখনোই জয় করতে
পারবেন বলে মনে হয় না। তাই তার মুখে মদিনা সনদের কথা শুনে মানুষের মনে
সামান্যতম সহানুভূতি-সমর্থন জন্মায়নি।
তাদের অভিযোগ : শেখ হাসিনা গত পাঁচ বছরে যা করেছেন, তার সঙ্গে মদিনা সনদের
কানাকড়িরও মিল নেই এবং ভবিষ্যতেও যে থাকবে না, তা বলা অসঙ্গত হবে না।
সংবিধান থেকে আল্লাহর বাণী কেটে দিয়ে আবার মদিনা সনদ অনুযায়ী দেশ চলবে এমন
ঘোষণা দেয়া, মানুষের অধিকার অস্বীকার করে মানুষ খুন করে মদিনা সনদের
বাস্তবায়নের কথা বলা, এর সঙ্গে নির্মম তামাশা করার শামিল। সর্বোপরি তথাকথিত
ধর্মনিরপেক্ষতা ও মদিনা সনদ পাশাপাশি চলতে পারে না। শেখ হাসিনা ভেবেছেন,
বাংলাদেশের মানুষ মদিনা সনদের কথা শুনে তার সমর্থনে রাস্তায় নেমে পড়বে,
কিন্তু দেশবাসী উল্টা ভাবেন। তা বোঝেন শেখ হাসিনার পক্ষে মদিনা সনদ
বাস্তবায়ন কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তার চারপাশে স্বার্থবাজ চাটুকাররা ছাড়া
বাদবাকি দেশবাসী তার বক্তব্যকে নিরেট ভাঁওতাবাজি ও মিথ্যাচার ছাড়া আর কিছুই
মনে করেন না। শেখ হাসিনার প্রতি মানুষের আস্থাহীনতাই এর প্রধান কারণ। কারণ
তিনি মুখে যা বলেন, বাস্তবে তার উল্টোটাই করেন। যেমন তিনি বলেন, তিনি
মানুষকে মানুষের ভোটের অধিকার ফিরিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু ৫ জানুয়ারির ভুয়া ও
ভারত-প্রযোজিত নির্বাচন এবং সর্বশেষ উপজেলা নির্বাচন প্রমাণ করেছে তার কথা
আর বাস্তবতার মাঝখানে কেমন যোজন যোজন ফারাক। গণতন্ত্র ও সংবিধানকে তিনি তার
সুবিধা ও ইচ্ছেমতো ব্যবহার করছেন। তিনি ধর্মভিত্তিক বিরোধী দলকে মৌলবাদের
গাল দিয়ে নিজেই মদিনা সনদ অনুযায়ী দেশ চলবে এমন উক্তি করে মদিনা সনদের
অবমাননার পাশাপাশি এর নাম উচ্চারণ করে মুসলমানদের ধর্মানুভূতিকে ব্যবহার
করার অপচেষ্টা চালাচ্ছেন। অর্থাত্ তিনি ধর্মকে তার ব্যক্তিগত স্বার্থে
ব্যবহার করছেন।
ধর্মীয় বিশ্বাস নির্বিশেষ মানুষের মান-ইজ্জত সম্পদ রক্ষার এবং সবার অধিকার ও
নিরাপত্তা বিধান ছিল মদিনা সনদের মূল চেতনা। শেখ হাসিনার আমলে এগুলো
জঘন্যতমভাবে অস্বীকৃত হচ্ছে। মানুষের নিরাপত্তা বিধান যে শেখ হাসিনা
সরকারের দায়িত্ব, তা তিনি মনেই করেন না। মানুষ হত্যার দায়িত্ব তিনি নিজে না
নিয়ে বিরোধী দলকে অভিযুক্ত করেন। তাদের কারাগারে নিক্ষেপ করেন। মদিনা
সনদের ধ্বজাধারী শেখ হাসিনার কাছে হিন্দুরা হলো বলির পাঁঠা। হিন্দুদের ভোট
পাওয়া এবং বিরোধী দলকে ঘায়েল করার উদ্দেশ্যে তাদের ঘরবাড়ি দখল কিংবা সেগুলো
অগ্নিসংযোগ অথবা তাদের মন্দিরে হামলা চালানো হয়। এগুলো মদিনা সনদের
পরিপন্থী।
নিউইয়র্ক সিটির একটি মসজিদের জনৈক খতিব শেখ হাসিনার পক্ষে মদিনা সনদ
বাস্তবায়ন সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেন। তিনি শেখ হাসিনার কথা উদ্ধৃত করে
বলেন, ‘কোরআন ও সুন্নাহবিরোধী কোনো আইন পাস করা হবে না’ তার এ কথা
বিশ্বাসযোগ্য নয়। কারণ যদি তা-ই হয়, তবে সংবিধান থেকে ‘বিসমিল্লাহির
রাহমানির রাহিম’ তুলে দেয়া হলো কেন? সর্বোপরি বাংলাদেশে কোন কাজটি
কোরআন-সুন্নাহ অনুযায়ী হচ্ছে? মানুষ হত্যা, ঘুষ দেয়া-নেয়া, বেপর্দা,
ব্যভিচার, চুরি-ডাকাতি, অর্থ আত্মসাত্ এবং শেয়ারবাজার, হলমার্ক, সোনালী
ব্যাংক, পদ্মা সেতুসহ প্রায় সব প্রতিষ্ঠান ও প্রকল্প থেকে অর্থ সরিয়ে নেয়া
কিংবা কমিশন গ্রহণ, অন্যের ঘরবাড়ি-জমি-ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দখল কোনোটা
কোরআন-সুন্নাহ সমর্থন করে কি? এগুলো বন্ধ করতে শেখ হাসিনা কোনো উদ্যোগ না
নিয়ে বরং এ ধরনের অপকর্মের সঙ্গে জড়িতদের কেবল শাস্তিহীনই রাখছেন না, তাদের
পক্ষাবলম্বন করছেন।
খতিব বলেন, একই অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘ইসলামী আইনেও রয়েছে খুনির
শাস্তি শিরশ্ছেদ।’ অথচ এ হাসিনাই ফাঁসির আদেশপ্রাপ্ত খুনিদের ফাঁসি না
দিয়ে, এমনকি তাদের সামান্যতম শাস্তি না দিয়েই মাফ করে দিয়েছেন। খুনের এক
নম্বর আসামিকে হাইকোর্টের বিচারপতি করেছেন। দলীয় নেতা-ক্যাডারদের বিরুদ্ধে
খুনসহ বিভিন্ন অপরাধে বিচারাধীন সাড়ে সাত হাজারের বেশি মামলা তুলে নিয়েছেন।
গত পাঁচ বছরে হাজার হাজার মানুষ হত্যা, অপহরণ করে হত্যা, উধাও করে হত্যা,
পুলিশ হেফাজতে হত্যা, গুপ্ত হত্যা, বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় হত্যা ও অপরাধের
সঙ্গে জড়িত হাজার হাজার দলীয় খুনি-ক্যাডাররা ঘুরে বেড়ায়, পুলিশ তাদের
গ্রেফতার করে না, এমনকি তাদের বিরুদ্ধে মামলাও নেয়া হয় না।
অন্যদিকে মহানবী (সা.)-এর প্রতি কটাক্ষকারীর শাস্তি কোরআন, সুন্নাহ তথা
ইসলামী আইন মোতাবেক মৃত্যুদণ্ড হলেও তথাকথিত চেতনামঞ্চের সঙ্গে সরাসরি জড়িত
মহানবীর প্রতি কটাক্ষকারীদের কোরআন-সুন্নাহ মোতাবেক শাস্তি না দিয়ে তাদের
রক্ষা করা হয়। তাদেরই একজন নিহত হলে শেখ হাসিনা তাকে ‘শহীদ’ হিসেবে ঘোষণা
দিয়েছিলেন। এটা কি মহানবী (সা.)-এর প্রতি চরম অবমাননা তথা
কোরআন-সুন্নাহবিরোধী নয়?
জনৈক প্রবাসী সাংবাদিক বলেন, খুনির শাস্তি শিরশ্ছেদ হলে সাগর-রুনির
হত্যাকারীদের কেন ধরা হচ্ছে না? কেন তাদের বিচার হচ্ছে না? বরং তাদের
হত্যাকারীদের বিচারের দাবিতে সাংবাদিকদের আন্দোলন তুঙ্গে উঠলে জনৈক
সাংবাদিক নেতাকে উপদেষ্টার পদ প্রদানসহ তার সম্পাদিত পত্রিকা নতুন করে
মুদ্রণের ব্যবস্থা করে ওই আন্দোলন ভণ্ডুল করার ব্যবস্থা করে খুনিদের রক্ষা
করা হয়। শেখ হাসিনা সরকারের এমন নীতির সমালোচনা করে এ সাংবাদিকের
অভিযোগ—সরকারের ভূমিকাই প্রমাণ করে, সাগর-রুনি হত্যার পেছনে সরকারের
স্বার্থ জড়িত ছিল, এমনকি সরকারের হাত ছিল। তার মতে, হাজার হাজার খুনি ও
নানা ধরনের অপরাধীকে রাষ্ট্রীয় সম্পদ, প্রশাসন, এমনকি আদালতকে ব্যবহার করে
রক্ষা করা হচ্ছে, যেগুলো মদিনা সনদের সরাসরি পরিপন্থী। রাষ্ট্র মানুষের
নিরাপত্তা না দিয়ে খুনি-অপরাধীদের নিরাপত্তা দিচ্ছে। তাদের কোন কোন
ক্ষেত্রে পুরস্কৃত করা হচ্ছে।
নিউইয়র্কের হিলসাইডের একটি মাদরাসার শিক্ষক বলেন, ইসলামী অনুশাসনের অন্যতম
দিক হলো মহিলাদের পর্দা। এ ব্যাপারে পবিত্র হাদিস তো বটেই, পবিত্র কোরআন
শরিফে সরাসরি নির্দেশনা রয়েছে। অথচ সে পর্দাসহ অন্যান্য ইসলামী অনুশাসন
প্রতিষ্ঠা, চর্চা ও উত্সাহ প্রদানের সামান্যতম কোনো ভূমিকা শেখ হাসিনা
রেখেছেন এমন কোনো নজির নেই। এমনকি বাংলাদেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
থেকে বোরকা কিংবা হিজাব পরিহিতা শিক্ষার্থীদের প্রকাশ্যে অপমান করে
শ্রেণীকক্ষ এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বের করে দেয়ার পর শেখ হাসিনা সরকার
কিংবা তার কাছ থেকে সুবিধাপ্রাপ্ত একশ্রেণীর দরবারি আলেম-ওলামা ও
সংশ্লিষ্টদের শাস্তি প্রদানের ব্যবস্থা করা তো দূরের কথা, সামান্য
প্রতিবাদও করা হয়নি। সেই শেখ হাসিনার মুখে মদিনা সনদ বাস্তবায়নের ঘোষণা
নির্মম কৌতুক বলেই মনে হয়। তার মতে, এটা ধর্মকে রাজনৈতিক স্বার্থে ও
উদ্দেশ্যে ব্যবহারের নগ্ন উদাহরণ, যা জামায়াতে ইসলামীও কখনোই করেনি।
এখানে উল্লেখ্য, চুরি-ডাকাতি ইসলামে নিষিদ্ধ, অথচ বিগত পাঁচ বছরে শেখ
হাসিনার দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মী অবাধে চুরিচামারি করেছে। নির্বাচন
কমিশনে তাদের নিজ নামে চুরিচামারির মাধ্যমে সম্পদের পাহাড় গড়ার আংশিক হিসাব
দেয়া হলেও তাদের বেনামে কিংবা আত্মীয়-স্বজনের নামে করা সম্পদের কোনো হিসাব
নেই। এসব চোর-ডাকাতের অনেকেই এখন বিনা ভোটে নির্বাচিত সদস্য। এমন চুরির
সঙ্গে জড়িতদের শাস্তির ব্যবস্থা না করে লোকদেখানোভাবে চার-পাঁচজনকে সরকারি
নিয়ন্ত্রণাধীন দুর্নীতি কমিশনকে দিয়ে নাটক করা হচ্ছে। অন্যদিকে যাতে
চোর-ডাকাতদের চুরিচামারি জনগণ কোনোভাবেই জানতে না পারে, সে উদ্দেশ্যে শেখ
হাসিনার দলের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফ এসব চোরকে সম্মানিত ব্যক্তি হিসেবে
বর্ণনা করেছেন। যাতে জনগণের সামনে চোরদের চুরির আমলনামা সংক্ষিপ্ত আকারেও
আসতে না পারে, সেজন্য চোরদের নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সময় তাদের সম্পদের
বিবরণ প্রদানের শর্ত তুলে দেয়ার জন্য সৈয়দ আশরাফ আইন পাস করা হবে
জানিয়েছেন। অর্থাত্ চোরদের রক্ষা এবং অবাধে চুরি করাকে আইনত বৈধ করা হবে।
এমপি-মন্ত্রীসহ আমলা, বিচারপতি কিংবা সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের যদি
শাস্তিহীন রাখা হয়, তবে গ্রামের সাধারণ চোরের বিচার হবে কেন, এমন ধরনের
বিচার আদৌ গ্রহণযোগ্য হবে কি? চুরির শাস্তি হলো কমপক্ষে চোরের হাত কেটে
দেয়া। শেখ হাসিনা মদিনা সনদ অনুসরণ করে তার দলের চোরদের হাত কাটবেন কি? তার
দলের খুনিদের শিরশ্ছেদ করবেন কি? নবীবিরোধী ইসলামবিরোধী কথিত মুসলিমদের
কতল করবেন কি? এ ধরনের হাজারো প্রশ্ন শেখ হাসিনার মদিনা সনদ অনুসারে দেশ
পরিচালনার ঘোষণার পর প্রবাসের বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে। এখন দেখার সময় এসেছে,
শেখ হাসিনা তার ঘটনার প্রতি কতখানি আন্তরিক? নাকি এটা নিছক ভাঁওতা ও
প্রতারণা? শেখ হাসিনার কার্যক্রমই তা প্রমাণ করবে।
