৫ জানুয়ারির ভোটবিহীন নির্বাচনের পর এটা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল, প্রচলিত
নির্বাচন ব্যবস্থা পুরোপুরি অকার্যকর হয়ে পড়েছে। ক্ষমতার জোরে এখানে যা
খুশি তাই করা সম্ভব। সংসদের বেশিরভাগ আসনে ভোট ছাড়াই ‘নির্বাচিত’ সংসদ
সদস্যরা যে সরকার গঠন করেছেন তার বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এর মধ্যেই
উপজেলা নির্বাচনে যেভাবে ভোট কারচুপি, ব্যালট পেপার ও বাক্স ছিনতাই,
কেন্দ্র দখলের মহোত্সব শুরু হলো তাতে নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে ওঠা প্রশ্ন
গুরুত্ব না দিয়ে পারা যায় না। ফলে খোদ সরকারের ভেতর থেকেই নানা প্রস্তাব
আসা শুরু হয়েছে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন হিসেবে আইন অনুযায়ী উপজেলা নির্বাচন অরাজনৈতিক
হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে পুরোপুরি রাজনৈতিকভাবেই হতে দেখা যায়। রাজনৈতিক
দলগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থী ঘোষণা না করলেও সমর্থনের নামে যা করে তাতে
আর কিছু বাদ থাকে না। এক্ষেত্রে শাসক দল সব সময়ই কীভাবে এগিয়ে থাকে সেটা
সবাই জানে। তবে বিদ্রোহী প্রার্থীদের সামাল দেয়া কঠিন হয়ে ওঠায় এবার বেশ
মূল্য দিতে হয়েছে দলটিকে। তাই সেখান থেকেই স্থানীয় নির্বাচন ব্যবস্থার
পরিবর্তনের কথা উঠেছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রী ও শাসক দলের সাধারণ সম্পাদক
উপজেলা নির্বাচন দলীয়ভাবে করার কথা বলে বিতর্ক শুরু করতে না করতেই
অর্থমন্ত্রীও একথায় সায় দিয়েছেন। এরপর প্রধানমন্ত্রীপুত্র এবং তার তথ্য ও
প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টাও একই সুরে গলা মেলান। সর্বশেষ ২৭ মার্চ খোদ
প্রধানমন্ত্রীও আগামীতে সব নির্বাচনই দলীয়ভাবে করা উচিত বলে ঘোষণা দেন।
স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে দলীয় এক সমাবেশে তিনি নির্বাচনে অনিয়ম বন্ধে
ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন ব্যবহারের কথাও বলেন। তাহলে সব অনিয়ম বন্ধ হবে বলেও
তিনি মন্তব্য করেছেন।
আমাদের নেতা-নেত্রীরা রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকেও যে কথাবার্তার
গুরুত্ব ধরে রাখতে পারেন না সেটা কোনো নতুন কথা নয়। দলীয়ভাবে করলেই যদি
নির্বাচন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হয়ে যেত তবে প্রতিটি জাতীয় নির্বাচন নিয়ে এমন
ভয়াবহ পরিস্থিতির উদ্ভব হয় কেন? নির্বাচন দলীয় বা নির্দলীয় যেভাবেই হোক না
কেন, এর সুষ্ঠুতা, গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করে নির্বাচন পরিচালনাসহ আরও অনেক
কিছুর ওপর। সরকার, নির্বাচন কমিশন ও রাজনৈতিক দল—এই তিন শক্তির ওপরই
নির্বাচনের বিষয়টা পুরোপুরি নির্ভরশীল। সরকার যদি গণতান্ত্রিক না হয় তবে
আইনে যা-ই লেখা থাক না কেন, ক্ষমতার জোরে ইচ্ছামাফিক কাজ করা থেকে তাকে
কেউই ফিরিয়ে রাখতে পারবে না, তখন নির্বাচন কমিশনকেও ঠুঁটো জগন্নাথ হয়ে
থাকতে হয়। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হলেও নির্বাচন কমিশনের স্বাধীন ও
শক্তিশালী ভূমিকা অনেকাংশেই নির্ভর করে সরকারের ওপর। বিষয়টা আমরা হাড়ে হাড়ে
টের পাই বলেই নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রতি সমর্থন জোরালো হয়ে
ওঠে। এ অবস্থায় স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনের পাশাপাশি
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা তো নিয়মসিদ্ধই। কাজেই এ ব্যবস্থাকে
অপরিবর্তিত রেখে দলীয় বা নির্দলীয় যাই করা হোক, নির্বাচন সুষ্ঠু ও
গ্রহণযোগ্য হওয়া কঠিন। এছাড়া রাজনৈতিক দল যেখানে প্রার্থী ঠিক করবে সেখানে
দলের চরিত্রও অবহেলা করা যাবে না। দলে যদি গণতন্ত্র চর্চার সব পথ বন্ধ থাকে
তবে দলের কর্মকাণ্ডে, সে নির্বাচনই হোক আর সম্মেলনই হোক, সুষ্ঠু হবে এমনটা
আশা না করাই ভালো। ফলে দলাদলি, লবিং-গ্রুপিং, সন্ত্রাস, বিশৃঙ্খলা ঠেকানো
যাবে না। আর নির্বাচিত হলেই যেখানে ভাগ্য পাল্টানোর পথ খুলে যায়, সেখানে
মনোনয়ন বাণিজ্য কে ঠেকিয়ে রাখবে? এ অবস্থায় নির্বাচন কমিশনের ঘাড়ে বন্দুক
রেখে সরকারই যে পাখি শিকার করবে সেটাও বলার অপেক্ষা রাখে না।
এসবকে স্পর্শ না করেই শুধু ইলেকট্রনিক ভোটিংয়ে গেলেই যদি সব অনিয়ম দূর হয়ে
যায় তবে তো কথাই নেই। এটা তো মোটেই অজানা নয় যে কোনো মেশিনই আপনা থেকে চলে
না। তাকে পরিচালনা করতে হয়। ভোটিং মেশিনকে যেভাবে চালানো হবে ফল সেভাবেই
হবে। কেন্দ্র দখল করে দলীয় ক্যাডাররা যদি সবকিছু কব্জায় নেয় তবে কীভাবে ফল
নিরপেক্ষ হবে? এবারই তো দেখা গেছে প্রিসাইডিং অফিসারকে বেঁধে রেখে ব্যালট
বাক্স ভরা হয়েছে ভোট শুরুর আগেই।
অতএব, ডাল-পালায় শব্দ তুলে কোপ দিয়ে খুব বেশি লাভ হবে না। হাত দিতে হবে
গোড়ায়। বিষবৃক্ষ গোড়া থেকে উপড়ে না ফেললে যেমন লাভ নেই, তেমনি নির্বাচন
ব্যবস্থা তথা রাজনৈতিক ব্যবস্থার গোড়ায় হাত না দিয়ে সুফল পাওয়া যাবে না।
নইলে সবই ফাঁকিবাজি ছাড়া কিছু নয়।