বিজ্ঞাপিত পদ ১৭১। এর বিপরীতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল তৃতীয় ও চতুর্থ
শ্রেণীর পদে নিয়োগ দিয়েছিল ৩৫৪ জনকে। অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে স্বাস্থ্য
মন্ত্রণালয় ওই নিয়োগ বাতিল করে ২০১০ সালে। এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ২৮৭ জনের
রিটের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট সিদ্ধান্তটি অকার্যকর ঘোষণা করেন।
ওই
রায়ের পর রিটকারী ২৮৭ জনকে আদালতের নির্দেশে গত বছরের ২৭ নভেম্বর নিয়োগ
দেওয়া হয় বলে জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। বাকি ৬৭ জনকেও নিয়োগ দিতে
অনুমোদন নেওয়ার চেষ্টা চলছে। এই ৬৭ জনের নিয়োগ নিয়ে ‘বাণিজ্য’ শুরু হয়েছে
বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। হাসপাতালের পরিচালকও এমন অভিযোগ শোনার কথা
জানিয়েছেন।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, তৃতীয় শ্রেণীর নয়টি ও চতুর্থ শ্রেণীর
১৬২ পদে নিয়োগের জন্য ২০০৯ সালের ২৬ নভেম্বর পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়।
ওই বছরের ২৩ থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রার্থীদের মৌখিক পরীক্ষা হয়। তবে
নিয়োগের প্রক্রিয়া নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তৎকালীন
মহাপরিচালককে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এক প্রার্থী হাইকোর্টে রিট আবেদনও
করেন। কিন্তু তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই নিয়োগ কমিটি ৩৫৪ জনকে নিয়োগের সুপারিশ
করে এবং ৩১ ডিসেম্বর থেকে নিয়োগপত্র বিলি করা হয়। এই নিয়োগকে বিতর্কিত ও
অবৈধ আখ্যা দিয়ে প্রার্থী ও কর্মচারীদের আন্দোলন এবং নিয়োগে দুর্নীতি ও
অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় ২০১০ সালের ১৫ জানুয়ারি তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী আ ফ ম
রুহুল হকের বাসভবনে এক বৈঠকে নিয়োগ স্থগিত করা হয়। একই সঙ্গে মন্ত্রণালয়ের
যুগ্ম সচিবকে প্রধান করে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায়
তদন্ত কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে ২৯ এপ্রিল ওই নিয়োগ বাতিল করে মন্ত্রণালয়।
নিয়োগপ্রাপ্তরা
এর আগেই যোগদানপত্র জমা দেন। তবে তাঁরা কাজ করেননি, হাজিরা খাতায় সইও
করেননি। ২০১০ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি হাসপাতালের তৎকালীন পরিচালক ব্রিগেডিয়ার
জেনারেল বজলে কাদেরকে সেনাবাহিনীতে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়।
নিয়োগপ্রাপ্তদের যোগদানপত্র গ্রহণসংক্রান্ত কাগজে বজলে কাদেরের স্বাক্ষরের
নিচে দুটি তারিখ রয়েছে। এর একটি ২০১০ সালের ১ জানুয়ারি, অপরটি ১৪ এপ্রিল।
তিনি ৩ ফেব্রুয়ারি সেনাবাহিনীতে ফেরত যাওয়ায় ১৪ এপ্রিল তাঁর স্বাক্ষর করার
বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এ ছাড়া হাসপাতালের তৎকালীন উপপরিচালক
ফয়জুল্লাহর অবসরকালীন ছুটিতে যাওয়ার তারিখ ছিল ২০০৯ সালের ৩০ ডিসেম্বর।
কিন্তু তিনি ৩১ ডিসেম্বরও ওই নিয়োগের সাক্ষাৎকার বোর্ডের সদস্যসচিবের
দায়িত্ব পালন করেন। নিয়োগের সুপারিশেও তিনি স্বাক্ষর করেন।
নিয়োগ
বাতিলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ২৮৭ জন হাইকোর্টে আটটি রিট করেন। গত বছরের ৮
অক্টোবর হাইকোর্ট রায়ে ওই সিদ্ধান্ত আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত এবং এর
কার্যকারিতা নেই উল্লেখ করেন।
ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বিশ্বজিত রায়
প্রথম আলোকে বলেন, রায়ের কপি তিনি হাতে পাননি। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে
আরেকটি নতুন ভবন হয়েছে। সেখানে লোকবলের অভাব ছিল। তা পূর্ণ করতে হয়তো
কর্মচারী নিয়োগ বহাল করা হয়।
গত ১৭ ডিসেম্বর মন্ত্রণালয় হাইকোর্টের
রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করতে হাসপাতালের পরিচালক ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের
মহাপরিচালককে নির্দেশ দেয়। তবে কর্তৃপক্ষ আপিল করেনি। এদিকে নিয়োগ না পাওয়া
৬৭ জনের মধ্যে ১২ জন রিট করেছেন।
হাসপাতালে খোঁজ নিয়ে জানা যায়,
অবশিষ্ট ৬৭ জনকে নিয়োগ দিতে অনুমোদন পাওয়ার জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে দেনদরবার করছে। অভিযোগ উঠেছে, একে কেন্দ্র করে তৃতীয়
ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী ইউনিয়নের একাধিক নেতা ‘বাণিজ্য’ করেছেন।
চতুর্থ
শ্রেণীর কর্মচারী পদে চাকরিপ্রত্যাশী এক ব্যক্তি দাবি করেন, ২০০৯ সালে
নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার আগে কৃষিজমি বিক্রি করে তিনি আড়াই লাখ টাকা ঘুষ
দিয়েছিলেন। নিয়োগপত্রও পেয়েছিলেন। কিন্তু ওই নিয়োগ বাতিল হলেও তাঁর টাকা
ফেরত পাননি। এখন আবার চাকরি পাওয়ার জন্য কর্মচারী নেতাদের তিন দফায় ৬০
হাজার টাকা দিয়েছেন। কিন্তু এখনো চাকরি হয়নি। আরও ছয়জন একই অভিযোগ করেন।
চাকরি পেলে তাঁদের গত চার বছরের বকেয়া বেতন পাওয়ারও আশ্বাস দিয়েছেন নেতারা।
হাসপাতালের
চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি আবদুল খালেক বলেন,
নিয়োগ-বাণিজ্যের সঙ্গে ইউনিয়নের সাবেক শীর্ষ এক নেতা জড়িত। এর সঙ্গে
ইউনিয়নের কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারী সমিতির সাধারণ
সম্পাদক আনিছুর রহমান বলেন, চাকরির জন্য ঘুষ নেওয়ার সঙ্গে তৃতীয় শ্রেণীর
কর্মচারী সমিতির কোনো সম্পর্ক নেই।
হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার
জেনারেল মো. মোস্তাফিজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, এই নিয়োগকে পুঁজি করে
বাণিজ্য হচ্ছে—এমন অভিযোগ তিনিও শুনেছেন। তবে চাকরির জন্য কেউ যেন কাউকে
টাকা না দেয়। এ ব্যাপারে নোটিশ বোর্ডেও সতর্ক করে নোটিশ লাগানো হয়েছে। তিনি
বলেন, হাইকোর্টের আদেশ অনুযায়ী ২৮৭ জনের নিয়োগ সম্পন্ন হয়েছে। স্বাস্থ্য
মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পাওয়া গেলে বাকি ৬৭ জনকেও নিয়োগ করা হবে।
গত বৃহস্পতিবার হাসপাতালে পৌঁছানো মন্ত্রণালয়ের এক চিঠিতে রিট না করা ওই ৬৭ জনকে নিয়োগ না দিতে হাসপাতালকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তদন্ত
প্রতিবেদনে সুপারিশ: নিয়োগে অনিয়ম তদন্তে ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুগ্ম
সচিব কে বি এম ওমর ফারুক চৌধুরীকে প্রধান করে গঠিত তিন সদস্যের তদন্ত
কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই নিয়োগে সরকারি নীতিমালা অনুসারে কোটা পদ্ধতি
পালিত হয়নি। নির্ধারিত তারিখে অবসরকালীন ছুটিতে না গিয়ে হাসপাতালের তৎকালীন
উপপরিচালক মো. ফয়জুল্লাহর সাক্ষাৎকার বোর্ডের সদস্যসচিবের দায়িত্ব পালন
বিধিবহির্ভূত।
প্রতিবেদনে নিয়োগের প্রক্রিয়াটি বাতিল এবং বজলে কাদের,
ফয়জুল্লাহ, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব মো. জহুরুল
ইসলাম, তৎকালীন সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব শ্রীনিবাস
দেবনাথ ও ঢাকা মেডিকেলের প্রশাসনিক কর্মকর্তা আমির হোসেনের বিরুদ্ধে
ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়।