ক্রিকেটের লাল-সবুজের জার্সিতে সাহারার কলঙ্কের কালি আর কতদিন

সাম্প্রতিক কালে ভারতের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় গরিব মানুষের কষ্টার্জিত অর্থ চুরি করা ভারতের অন্যতম ব্যবসায়ী সুব্রত রায়ের মুখে ক্ষুব্ধ মনোজ নামের এক ব্যক্তির প্রকাশ্যে কালিমালেপনের ঘটনা। দোয়াতের কালি ছুড়ে মেরে চিত্কার করে মনোজ জানিয়েছিলেন, সুব্রত রায় একজন চোর।
সুব্রত যে আসলেই একজন চোর, তার প্রমাণ ভারত সরকারের সর্বোচ্চ ব্যাংক। এর আগে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের কষ্টার্জিত অর্থ সাহারা গ্রুপের অবৈধ গ্রহণ নিয়ে ২০০৮ সালে ভারতের রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া প্রশ্ন তুলে বলেছিল, ক্ষুদ্র আমানতকারীরা খুব স্বাভাবিক কারণেই অসংগঠিত এবং তারা ‘সাহারা গ্রুপ ও তাদের এজেন্টদের কাছে জিম্মি’। গরিব সঞ্চয়কারীদের ২০ হাজার কোটি রুপি আত্মসাতের মামলায় যার মালিক সুব্রতের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয় ওই সময়। সেই বিতর্কিত মানুষরূপী এক লোভীর অর্থবিত্তের আছর পড়ে আমাদের প্রাণপ্রিয় বাংলাদেশের ক্রিকেট দলের জার্সিতে। ওপরে ‘সাহারা’ ও নিচে ‘বাংলাদেশ’ বুকে নিয়ে খেলতে নামে আমাদের যে ক্রিকেট দলটি, মানুষরূপী কালপ্রিট সেই সুব্রত রায়ের স্থান হয়েছে বর্তমানে ভারতের সবচেয়ে ‘বিখ্যাত’ তিহার জেলে। অথচ সেই কলঙ্কের সাহারা নাম বুকে নিয়ে বৃহস্পতিবারও শেরেবাংলা ক্রিকেট স্টেডিয়ামে নেমেছিল দেশের ১৬ কোটি মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও বিনোদনের শেষ আশ্রয়স্থল বাংলার টাইগার মুশফিক-সাকিবেরা।
এই সাহারাপ্রধান সুব্রত ২০১২ সালে বাংলাদেশে এসেছিলেন। তখনই ক্রিকেট দলের ওপর তার প্রভাব বিস্তারের খায়েশ জাগে এবং বাংলাদেশের ক্রিকেট দলের জার্সিতে সাহারার নাম ওঠানোর বিষয়টি তিনি নিশ্চিত করে যান। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) কাছে আমাদের প্রশ্ন — কত কোটি টাকা পেয়েছে ক্রিকেট দল এক জালিয়াত প্রতারকের নামে নিজেকে পরিচিত করতে? বিসিবির কি সেই টাকার এতই অভাব ছিল? বাংলাদেশের এত নামিদামি প্রতিষ্ঠানগুলো কি এই গর্বের স্পন্সর হতে পারত না? সরকারকে পরিষ্কারভাবে বলতে চাই, ভারতের খেটেখাওয়া গরিব মানুষগুলোর ধিক্কার ও ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ মুখে কালি ছুড়ে মারার সেই সাহারার নাম মুছে ফেলা হোক বাংলাদেশের ক্রিকেট দলের জার্সি থেকে। যত টাকারই চুক্তি হোক না কেন তা অবিলম্বে বাতিল করা হোক। এমন বিতর্কিত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আমাদের দেশের গৌরব ক্রিকেট টিমের কোনো সম্পর্ক থাকতে পারে না। এ কালিমালেপন যতদিন বাংলাদেশের ক্রিকেট টিমের বুকে থাকবে, ততদিন খেলোয়াররা ভালো ফল থেকেও বঞ্চিত হতে পারে। পাকিস্তান কিংবা সাম্প্রতিক কালের একাধারে বাংলাদেশের পরাজয়ের পেছনে এই সাহারার নামও দায়ী হতে পারে।
এই বিকর্তিত সাহারা গ্রুপের কর্ণধার নাকি বাংলাদেশে আবাসন খাতে বিনিয়োগের জন্য সমঝোতা স্মারক সই করেছে সরকারের সঙ্গে। পুরো একটি নতুন ঢাকা গড়ে তোলার জন্য সাহারা গ্রুপের পক্ষ থেকে চাওয়া হচ্ছে ঢাকার আশপাশে অন্তত ১০০ একর থেকে এক লাখ একর জমি। বিনিয়োগের পরিমাণ ৮০ হাজার কোটি টাকা। (সূত্র : ‘প্রথম আলো’, ৬ মার্চ ২০১৪)। এটা পরিষ্কার যে বাংলাদেশে ব্যবসা করার আকাঙ্ক্ষা নিয়েই ক্রিকেট দলকে স্পন্সর করতে এগিয়ে এসেছে সাহারা গ্রুপ। শুধু জার্সি থেকেই নয়, আবাসন খাতকে ধ্বংসের হাত থেকে তথা সাহারার হাত থেকে রক্ষা করতে হবে। সরকারের কাছে দাবি জানাব — কোনোভাবেই যেন সাহারাকে আমাদের দেশের আবাসন খাতে ঢুকতে দেয়া না হয়।
বাংলাদেশে বিনিয়োগের প্রয়োজন আছে, তাই বলে গরিবের পেটে লাথি মারা কালপ্রিটের কাছে মাথানত করা নয়। এটা শুধু সরকারের নয়, পুরো দেশের ১৬ কোটি মানুষের ভালোবাসা জড়িয়ে থাকার বিষয়। শুধু বেশি অর্থ দিতে পারলেই যে কারও নাম আমাদের ক্রিকেট দলের বুকে ওঠানো যাবে, এমন চিন্তা থেকে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডকে বেরিয়ে আসতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে এটাও বলতে চাই, যারা দেশের ক্রিকেট টিমের জার্সিতে সাহারার নাম ওঠাতে কোন কিছুর বিনিময়ে সহায়তা করেছে, তাদেরও বিচার হোক। রাজনৈতিক বিভাজনের কারণে বাংলাদেশের শান্তিপ্রিয় মানুষ কেউ আওয়ামী লীগ, কেউ বিএনপি কিংবা অন্য দলের আদর্শের হতে পারে, কিন্তু জাতীয় সম্পদ ক্রিকেট টিমকে নিয়ে দেশের ১৬ কোটি মানুষ এক কাতারে। ঐক্যবদ্ধ এই সর্বশেষ প্লাটফর্মটি কোনোভাবেই ধ্বংস হোক, এটা আমরা চাই না। সেইসঙ্গে বাংলাদেশের তরুণদের বলব — আসুন, আমরা জাতীয় ক্রিকেট দলের গৌরবকে ধরে রাখতে এবং লাল-সবুজের জার্সিতে সাহারার কলঙ্কের চিহ্ন মুছে ফেলতে সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে বলি, বাংলাদেশের ক্রিকেট দলের লাল-সবুজের জার্সিতে কলঙ্কের কালিমাখা সাহারার নাম আর দেখতে চাই না।