রাজনীতিতে ধর্ম টেনে আনা কেন?

একটি মহল রাজনীতিতে ধর্ম একেবারেই পছন্দ করে না। তারা মনে করে, রাজনীতিতে ধর্ম টেনে আনা মানে রাজনীতির স্বার্থে ধর্মের অপব্যবহার করা। আর ধর্মের সঠিক ব্যবহার হলো তাদের মতে মুসলমানি নাম রাখা, বা জন্মসূত্রে মুসলমান হলেই যথেষ্ট, ইসলামী বিধিবিধানগুলো পালন না করলেও চলবে। বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ইসলামী বিধান একেবারেই পালন করা যাবে না। পালন করতে গেলেই ধর্মের অপব্যবহারকারী, উগ্রপন্থী, জঙ্গি বলে অপবাদ দেবে; সঙ্গে সঙ্গে ধর্মীয় রাজনীতি বন্ধের মাধ্যমে ইসলামী রাজনীতি বন্ধের আবদার করবে। তারা নিজেদের সেকুলার বলে পরিচয় দেয়। তারা হাতেগোনা কিছু মানুষ হওয়া সত্ত্বেও মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশে অধিকাংশ মানুষের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ধোঁকাবাজির আশ্রয় নিয়ে তারা দেশের সংবিধানে ইসলামবিরোধী সেকুলারিজম সংযোজন করতে সক্ষম হয়েছে। তাদের ধোঁকাবাজির একটি কৌশল হলো সেকুলারিজমের অর্থ ধর্মনিরপেক্ষতা করা। তারা বলে, সেকুলারিজম অর্থ ধর্মনিরপেক্ষতা। আর ধর্মনিরপেক্ষতার অর্থ তারা করে যার যার ধর্ম সে সে পালন করার স্বাধীনতা। যদিও ধর্মনিরপেক্ষতার দোহাই দিয়ে ইসলাম ধর্মের বিরোধিতার প্রমাণ দিয়েছে তারা বারবার।
সেকুলারিজমের অর্থ ধর্মনিরপেক্ষতা করার মাধ্যমে তারা জনগণের সঙ্গে জঘন্যতম ধোঁকাবাজি করে থাকে। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন অভিধানে সেকুলারিজমের যে অর্থ করা হয়েছে তা হলো ইহজাগতিক, ধর্মহীনতা, ধর্মবিরোধিতা এবং ইসলামবিরোধিতা। বাস্তবেও দেখা যায়, এই সেকুলারিজমের দোহাই দিয়ে সব সময় ইসলাম, ইসলামী আচার-অনুষ্ঠান, ইসলামী পোশাক, ইসলামী শিক্ষা ইত্যাদিকে বাধাগ্রস্ত করে থাকে সেকুলাররা। মুসলিম দেশে সর্বপ্রথম সেকুলারিজমকে আনুষ্ঠানিক রূপদান করে নাস্তিক কামাল আতাতুর্ক। সে ক্ষমতায় আরোহণ করেই একসময়ের সালতানাতে উসমানিয়ার রাজধানী তুরস্কে কোরআন শিক্ষা নিষিদ্ধ করে। হিজাব নিষিদ্ধ করে। মাইকে আজান দেয়া নিষিদ্ধ করে। আরবিতে আজান দেয়া নিষিদ্ধ করে। এমনকি আরবি বর্ণমালা পর্যন্ত নিষিদ্ধ করে দিয়ে সে রোমান অক্ষর চালু করে। ইসলামকে এভাবে স্তব্ধ করে দেয়ার সব আয়োজন করা হয়েছে শুধু সেকুলারিজমের দোহাই দিয়ে।
আর আমাদের দেশের সংবিধানে সেকুলারিজম যুক্ত করার পর থেকে কত পর্দাশীল নারীকে হয়রানি করা হয়েছে, আর কত মেয়েকে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে হিজাব বা পর্দা করতে নিষেধ করা হয়েছে, তা সবারই জানা আছে। ধর্মীয় বই পেলে জিহাদি বই বলে গ্রেফতার ও হয়রানি করা হচ্ছে। আদালতে টুপি মাথায় ঢুকলে আদালতের অসম্মান হচ্ছে বলে টুপি খুলতে বাধ্য করছেন খোদ বিচারক। জানাজার নামাজ পড়লে শহীদ মিনার অপবিত্র হয়ে যাচ্ছে বলার স্পর্ধা দেখাচ্ছে অনেকে। তাদের মতে, আবার অন্য ধর্মের পোশাক পরলে আদালতেরও অসম্মান হয় না, আবার অন্য ধর্মের আচার-অনুষ্ঠানেও শহীদ মিনার অপবিত্র হয়ে যায় না। আলেম-ওলামাকে হয়রানি করা হচ্ছে আর নামাজ-রোজা করলে বা দাড়ি-টুপি পরলে জঙ্গি অপবাদ দিচ্ছে। এসব কিছুই করা হচ্ছে সেকুলারিজম সংবিধানে যুক্ত করার পর থেকে। তার পরেও যারা বলে থাকে সেকুলারিজম অর্থ সব ধর্মের স্বাধীনতা, তারা নিকৃষ্টতম ধোঁকাবাজ। আর যারা তাদের কথা বিশ্বাস করে তারা শ্রেষ্ঠ বোকা।
‘রাজনীতিতে ধর্মকে টেনে আনা ঠিক নয়’ — সেকুলারদের এই দাবি কতটা সঠিক একটু দেখা যাক। ‘রাজনীতিতে ধর্মকে টেনে আনা ঠিক নয়’ — কথাটা সঠিক হতে পারে তখনই যখন ধর্মটা হবে কিছু পূজাসর্বস্ব বা কিছু অনুষ্ঠানসর্বস্ব। কিন্তু ইসলাম ধর্ম কোনো পূজাসর্বস্ব বা অনুষ্ঠানসর্বস্ব ধর্ম নয়। ইসলাম হচ্ছে, মানবজাতির জন্য আল্লাহ তায়ালার প্রেরিত জীবনবিধান। মানুষের জীবনের খুঁটিনাটি সব বিষয়েই ইসলাম দিকনির্দেশনা দিয়েছে। খাওয়া, পরা, ঘুমানো, ঘুম থেকে ওঠা, বিয়েশাদি, ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র পর্যন্ত জীবনের এমন কোনো দিক বাকি নেই, যেখানে ইসলাম দিকনির্দেশনা প্রদান করেনি।
তাহলে কেউ যদি বলে, সব বিষয়ে ধর্মকে টেনে আনা ঠিক নয় এবং নিশ্চিতভাবেই তারা সেটা ইসলাম সম্পর্কেই বলে থাকেন, কারণ অন্য কোনো ধর্ম বর্তমানে মানবজীবনের সব বিষয়ে দিকনির্দেশনা প্রদান করে না এবং অন্য ধর্মাবলম্বীরাও সব বিষয়ে তাদের ধর্মকে টেনে আনেন না, সুতরাং ইসলাম সম্পর্কেই কথাটি বলা হয়। তাহলে তার অর্থ হলো তাদের কথায় কিছু বিষয় থেকে ধর্মকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করতে হবে। কারণ আগেই বলেছি, ইসলাম সব বিষয়ে আগে থেকেই আছে। তা আবার নতুন করে টেনে আনার প্রয়োজন হয় না। যারা সব বিষয়ে ধর্ম মানতে চান না, তারা আসলে কিছু বিষয় থেকে ইসলামকে বিদায় করতে চান। কিছু বিষয় থেকে ইসলামকে বাদ দেয়ার অনুমতি যদি আল্লাহ তায়ালা না দেন তাহলে আমি আর আপনি কীভাবে কিছু বিষয় থেকে ধর্মকে বাদ দেব? তাহলে এবার দেখা যাক, কিছু বিষয়ে ইসলামকে বাদ দিয়ে শুধু নির্দিষ্ট কয়েকটি বিষয়ে ইসলাম পালন করার অনুমতি আল্লাহ তায়ালা দিয়েছেন কিনা। আল্লাহ তায়ালা বলেন : তবে কি তোমরা (আল্লাহর প্রেরিত) গ্রন্থটির কিয়দংশ বিশ্বাস কর এবং কিয়দংশ অবিশ্বাস কর? যারা এরূপ করে পার্থিব জীবনে দুর্গতি ছাড়া তাদের আর কোনোই পথ নেই। কিয়ামতের দিন তাদের কঠোরতম শাস্তির দিকে পৌঁছে দেয়া হবে। আল্লাহ তোমাদের কাজকর্ম সম্পর্কে বেখবর নন। সুরা বাকারা, ৮৫। আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন, হে ইমানদাররা! তোমরা পরিপূর্ণভাবে ইসলামের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাও এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। নিশ্চিত রূপে সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু (সুরা বাকারা, ২০৮)। অন্য আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, যেসব লোক আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, তদনুযায়ী ফয়সালা করে না, তারাই কাফের। সুরা মায়েদা, ৪৪।
উল্লিখিত আয়াতগুলো থেকে বোঝা যায়, কিছু বিষয়ে ইসলাম পালন করা আর কিছু বিষয়ে পালন না করার অনুমতি আল্লাহ তায়ালা মানুষকে দেননি। মানে সব বিষয়েই ইসলাম মেনে চলতে হবে। তাহলে রাজনীতিতে ইসলামকে টেনে আনার কারণে যারা আলেমসমাজকে দোষারোপ করছেন, তারা কি আসলে আল্লাহ তায়ালাকে দোষারোপ করলেন না? কারণ সব জায়গায় ইসলামকে আলেমসমাজ টেনে আনেনি। আল্লাহ তায়ালাই ইসলামকে মানবজীবনের সব বিষয়ে পালন করার হুকুম করেছেন। আর আলেমসমাজ আল্লাহর বাণী প্রচার করছেন মাত্র। কিন্তু অনেকেই স্পষ্ট করে বলে দেন, তারা সব বিষয়ে ইসলামকে টেনে আনা পছন্দ করেন না। তাহলে তো তার অর্থ দাঁড়ায়, তারা ইসলাম ধর্মই অপছন্দ করেন।
এতে তাদের ঈমানের কোনো ক্ষতি হলো কিনা ভেবে দেখা দরকার। ঈমান অমূল্য সম্পদ, তা যেন হেলায় নষ্ট না হয়। আমরা জানি, কেউ নামাজ ঠিকমতো পড়তে না পারলেও তার ঈমান যায় না, যদি সে নিজেকে নামাজ ঠিকমতো পড়তে না পারার জন্য আল্লাহ তায়ালার কাছে অপরাধী মনে করে। কিন্তু নামাজকে অস্বীকার করলে বা বিদ্রূপ করলে ঈমান চলে যায়। ঠিক একইভাবে সব জায়গায় ইসলাম মেনে চলার জন্য যেখানে আল্লাহ তায়ালা নির্দেশ দিয়েছেন, সেখানে কেউ যদি তা ঠিকমতো পালন করতে নাও পারে এবং এর জন্য নিজেকে আল্লাহ তায়ালার কাছে অপরাধী মনে করে, তাহলে তারও ঈমান যাবে না যদিও সে গুনাহগার হবে। কিন্তু যদি কেউ সব জায়গায় ইসলামকে টেনে আনার অপরাধে আলেমসমাজকে দোষারোপ করে যা প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তায়ালাকেই দোষারোপ করা, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে তার ঈমান চলে যায়। এই রোগটিতে অনেক মুসলমান আক্রান্ত। আরও দুঃখের বিষয় হচ্ছে, এটা যে ঈমান ধ্বংস করে দেওয়ার মতো একটি মারাত্মক রোগ, তাও অনেকে জানেন না। যার কারণে ইদানীং দেখা যায়, কথায় কথায় আলেমসমাজকে গালি দেওয়া হয়।
তারা সরাসরি ‘কোরআন মানি না’ তা বলতে সাহস করে না; বরং বলে, আলেমসমাজ নাকি কোরআনের ভুল ব্যাখ্যা করে। অথচ কোরআনের আসল ব্যাখ্যাটা কী, সেটাও তারা জানেন না। তারপরেও মুখস্থ করে রেখেছেন, আলেমসমাজ কোরআনের ভুল ব্যাখ্যা করে রাজনীতিতে ধর্ম টেনে আনছে। আমি আগেই বলেছি, রাজনীতিতে ধর্মকে আলেমসমাজ টেনে আনেনি। এনেছেন স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা। এটা আপনার অপছন্দ হলে তার অর্থ হবে ইসলাম ধর্মই আপনার অপছন্দ। আলেমসমাজের কাজ শুধু পৌঁছে দেওয়া।
সেকুলারদের অনেকে আবার নিজেদের ইসলামের প্রকৃত সেবক বলেও দাবি করেন। এমনকি যেসব আলেম-ওলামা কোরআন-হাদিসের জ্ঞানার্জনের জন্য পুরো জীবনটাই উত্সর্গ করেছেন, তারা নাকি কোরআন বোঝেন না, আর যেসব সেকুলার মাদরাসার ছাত্র-শিক্ষকদের হয়রানি করে, দাড়ি-টুপি পরলে জঙ্গি বলে, কোরআন পড়লে জিহাদি বই বলে গ্রেফতার করে, পর্দা খুলতে মেয়েদের বাধ্য করে, অর্থাত্ যারা ইসলাম আর মুসলমানদের চিরশত্রু, সেই তারাই নাকি ইসলামের সেবক। এর চেয়ে বড় রকমের কৌতুক আর কী হতে পারে। সাধারণ মুসলমানরা সেকুলারদের দ্বারা প্রতারিত হয়ে ঈমানহারা হলেও সেকুলারদের কিছু যায়-আসে না। এই বিষয়ে তাদেরই সতর্ক হতে হবে, যারা মনে করেন ঈমান অমূল্য সম্পদ। মুসলমান হিসেবেই দুনিয়াতে থাকতে হবে আর আখেরাতে আল্লাহর কাছে জবাব দিতে হবে।
যারা মনে করেন, ইসলামী রাজনীতি আর ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা শুধু সেসব দেশেই চলতে পারে, যেসব দেশে সবাই মুসলমান। আমাদের দেশের যেহেতু বিভিন্ন ধর্মের অনুসারীরা আছেন, তাই এখানে ইসলামী রাজনীতি আর ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা একেবারে উচিত নয়। তাদের উদ্দেশে সংক্ষেপে শুধু এতটুকু বলে রাখাই যথেষ্ট যে সেকুলাররা অমুসলিমদের যতটা নিরাপত্তা দেবে, ইসলাম অমুসলিমদের তার চেয়ে হাজার গুণ বেশি নিরাপত্তা দেবে। ইসলামের ইতিহাস এবং কোরআন-হাদিস তা-ই বলে।