প্রধানমন্ত্রী জাতীয় সংসদে যে ভাষায় যেভাবে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির পক্ষে
কথা বলেছেন তাতে এটা স্পষ্ট যে আবারও দাম বাড়ছে বিদ্যুতের। এর আগে দু’বছরে
পাঁচ পাঁচবার বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছিল। ফলে গ্রাহক পর্যায়ে ইউনিট প্রতি
বিদ্যুতের দাম ৩ দশমিক ৮৩ টাকা থেকে লাফিয়ে বেড়ে যায় ৫ দশমিক ৭৫ টাকারও
বেশি। অথচ সরকারকে ব্যক্তি মালিকানাধীন তেলভিত্তিক রেন্টাল কুইক রেন্টাল
বিদ্যুত্ কেন্দ্র থেকে বিদ্যুত্ কিনতে হয়েছে ইউনিট প্রতি ১০-১২ টাকায়।
অবশিষ্ট অর্থ ভর্তুকি দিতে হয়েছে। এজন্য গত পাঁচ বছরে ৩৫ হাজার কোটি টাকা
ভর্তুকি গুনতে হয়েছে। চলতি অর্থবছরেও বরাদ্দ রাখা হয়েছে ছয় হাজার কোটি
টাকা। এই ভর্তুকি কমানোর কথা বলেই দফায় দফায় বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে সরকার।
এবারে এর পিছু নিয়ে আসছে গ্যাসের দাম বৃদ্ধির প্রস্তাবও।
জানা গেছে, বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির প্রক্রিয়া ঠিকমতো শুরু না হতেই গ্যাসের
দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব উঠেছে। এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কাছে এর
মধ্যেই গ্যাস বিতরণকারী সংস্থাগুলো গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির প্রস্তাব জমা
দিয়েছে। একইভাবে বিদ্যুত্ বিতরণকারী সংস্থাগুলো থেকে বিদ্যুতের মূল্য
বৃদ্ধির প্রস্তাব পাওয়ার পর আগামী ৪-৬ মার্চ গণশুনানি হওয়ার কথা। তারপর
দুয়েক মাসের মধ্যে গ্যাস নিয়েও শুনানি হবে। সরকার পক্ষ প্রাকৃতিক গ্যাসকে
সম্পদের বদলে পণ্য হিসেবে দেখতে শুরু করার পর থেকেই এর মূল্য বৃদ্ধির
যুক্তি জোরালো হয়ে ওঠে। উত্পাদন খরচের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সমন্বয় করা।
সর্বশেষ ২০০৯ সালে গ্রাহক পর্যায়ে গ্যাসের দাম ৫০ টাকা করে অর্থাত্ ১১
শতাংশ হারে বাড়ানো হয়েছিল। এছাড়া ২০১১ সাল ২০ শতাংশ হারে সিএনজি গ্যাসের
মূল্য বৃদ্ধি করা হয়েছিল। অবশ্য ২০১২ সালে ৩৪ শতাংশ হারে গ্যাসের মূল্য
বৃদ্ধির প্রস্তাব জমা পড়লেও অবস্থা বিবেচনা করে তা স্থগিত থাকে। এবার সরকার
ক্ষমতাসীন হয়েই আগেভাগে বিদ্যুতের মতো গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধিরও পদক্ষেপ
নিতে যাচ্ছে, সেটা এখন পরিষ্কার।
সরকার জ্বালানি খাতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারলেও গ্যাস-বিদ্যুতের
মূল্য বৃদ্ধির ব্যাপারে খুবই আগ্রহী। নিজস্ব সক্ষমতা বাড়িয়ে গ্যাস উত্পাদন
বৃদ্ধির চাইতে বিদেশি কোম্পানির ওপর নির্ভরশীলতা যেমন বাড়ানো হচ্ছে তেমনি
বিদ্যুত্ উত্পাদনের ক্ষেত্রেও সরকারি ব্যবস্থাপনায় সাশ্রয়ী মূল্যের
বিদ্যুত্ উত্পাদন কেন্দ্রগুলোকে সচল ও নতুন বিদ্যুত্ কেন্দ্র চালু করার
বদলে বেসরকারি খাতের তেলভিত্তিক রেন্টাল কুইক রেন্টাল বিদ্যুত্ কেন্দ্র
নিয়েই বেশি উত্সাহ দেখা গেছে। দীর্ঘদিন ধরে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে অবহেলা
ও দুর্বল করে সঙ্কট বাড়িয়ে চাহিদা সৃষ্টির মাধ্যমে এখন মূল্যবৃদ্ধির
যুক্তি তুলে ধরা হচ্ছে। সরকারের এই ধরনের কারসাজির কারণে ২০০৯ সালে প্রতি
ইউনিট বিদ্যুত্ উত্পাদনে যেখানে খরচ হতো ২ দশমিক ৫০ টাকা, ২০১৪ তা এসে
পৌঁছেছে ৬ দশমিক ২২ টাকায়। তারপরও চাহিদামত বিদ্যুত্ সরবরাহে ব্যর্থতার
কারণে লোডশেডিং ভয়াবহ হয়ে ওঠায় দ্রুত বিদ্যুত্ উত্পাদনের কথা বলে
তেলভিত্তিক রেন্টাল কুইক রেন্টাল কেন্দ্র নির্মাণে নিজেদের লোকদেরই সুযোগ
করে দেয়া হয়। চরম দুর্নীতি ও লুটপাটের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত এসব কেন্দ্র থেকে
পাওয়া বিদ্যুতের দাম পড়েছে গড়ে ইউনিট প্রতি ৮ টাকা থেকে ১৫ টাকা পর্যন্ত।
এখন এর দায় চাপানো হচ্ছে গ্রাহক সাধারণের ওপর বিদ্যুতের দাম দফায় দফায়
বাড়ানোর মাধ্যমে।
অথচ, বিদ্যুত্ খাতে জ্বালানি তেল ও বিদ্যুত্ সরবরাহে অব্যবস্থাপনা, চুরি,
দুর্নীতি, লুটপাট বন্ধে সরকার কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। নিজেদের ঘনিষ্ঠ
লোকদের কুইক পকেট ভরার উদ্দেশ্যেই বিদ্যুত্ ব্যবসায় রেন্টাল কুইক রেন্টাল
ব্যবস্থা চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। সামগ্রিকভাবে চালু করার কথা বলা হলেও এখন এ
ব্যবস্থাই স্থায়ী করা হচ্ছে। এজন্য গা বাঁচানোর লক্ষ্যে ২০১০ সালে সংসদে
দায়মুক্তির কালো আইনও পাস করানো হয়েছে। তাছাড়া দেশের এখনও প্রায় ৫০ শতাংশ
মানুষকে বিদ্যুত্ বঞ্চিত রাখা হয়েছে, শহর ও গ্রামের গ্রাহকদের মধ্যে দামের
পার্থক্য করে বৈষম্য বাড়ানো হচ্ছে। অথচ বিদ্যুত্ পাওয়া সবার সাংবিধানিক
অধিকার। বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন বাংলাদেশে
বিদ্যুত্ নিয়েও বৈষম্য বাড়ানো হচ্ছে পরিকল্পিতভাবেই। বিদ্যুত্-গ্যাসের দাম
দফায় দফায় বৃদ্ধি করে ক্ষমতাসীনদের চুরি, দুর্নীতি, অদক্ষতা, প্রশাসনিক
অক্ষমতার দায়ভার চাপানো হচ্ছে জনসাধারণের ওপর। জনস্বার্থকে প্রাধান্য না
দিয়ে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থ উদ্ধারের এমন অযৌক্তিক ও অন্যায় পদক্ষেপ
কিছুতেই মেনে নেয়া যায় না। কারণ তা স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং
গণতান্ত্রিক অধিকার বিরোধী। মুখে এক কথা আর উল্টো কাজ করা এ সরকারের
পছন্দের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে সেটা পরিষ্কার।