এক চীনা জল্লাদের সাধনা ছিল এমন নিখুঁত কোপে মানুষের মাথা কাটা, যাতে
দণ্ডিত লোকটি টেরও না পায়। সাধনার এমনই তুঙ্গে তিনি পৌঁছলেন যে একদিন
খাঁড়ার এক কোপে একজনের মাথা কাটার পরও লোকটি নির্বিকার। কিছুক্ষণ অপেক্ষার
পর মানুষটি প্রশ্ন করে, ‘কই, কিছুই তো টের পাচ্ছি না।’ জবাবে গর্বিত
জল্লাদের মিহি হাসিমাখা উত্তর, ‘জনাব, মাথাটা একটু ঝাঁকান, টের পাবেন।’
বিনোদন, অনৈতিক বাণিজ্য, দুর্বৃত্ত রাজনীতি আর ক্ষমতাতৃষ্ণার খাঁড়ায় কখন
আমাদের নীতির মাথা কাটা পড়েছে, তা বুঝতে মাথাটা একটু ঝাঁকাতে হবে। কিন্তু
সেই সৎ সাহসের তৌফিক কি আমাদের হবে?
রাষ্ট্রের পতন হয় সশব্দে, কিন্তু
নীতির মৃত্যুতে ভেরি বাজে না। নিঃশব্দেই তার মৃত্যু হয়। হঠাৎ কোনো দিন কোনো
নিষ্পাপ শিশুকেই তখন চিৎকার করে বলতে হয়, ‘রাজা, তোমার পোশাক কোথায়?’
ইতিহাসে স্বর্ণযুগ চিহ্নিত থাকে, কিন্তু অন্ধকার যুগের সূচনা হয়ে যায়
অন্ধকারেই। আমরা এখন বিশ্বাস করি, রাজনীতিতে সবই সম্ভব। সংবিধান রক্ষার
একটি নির্বাচন হয়ে গেল, কিন্তু গণতন্ত্র রক্ষার নির্বাচনের কথা যেন ভুলেই
গেছে সরকার। এই বিস্মরণের জন্য দুঃখ নেই, অনুতাপ নেই। বরং সরকারি দলের
প্রতাপশালী একজন নেতাকে বলতে শুনি, ‘আন্দোলনের নামে নাশকতা করলে তাদের
হাত-পা কেটে দেওয়া হবে।’ অপরাধের শাস্তি হিসেবে হাত-পা কাটার শাস্তি সৌদি
আরবে আছে। সেই মধ্যযুগীয় আইনের অনুসারী কীভাবে হলেন প্রগতিশীলতার দাবিদার
একজন দলের নেতা? একাত্তর সালে পাকিস্তানি হানাদার আর এদেশীয় রাজাকাররা এ
রকম শাস্তি মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর বলবৎ করেছিল। আজ যখন সেসব অপরাধের বিচার
হচ্ছে, তখন মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দলের নেতার কণ্ঠে সেই হানাদারি
ভাষা শুনলে কি শহীদবেদিগুলো কেঁপে উঠবে না? নেতার কথাই দলের কথা বলে মানার
সুযোগ থাকত না, যদি
দেখা যেত দল থেকে তাঁর বক্তব্য অস্বীকার করা হয়েছে
এবং হুমকিদাতার মৌখিক বা সাংগঠনিক শাস্তি হয়েছে। হয়নি, হবে যে সেই আশাও
দুরাশামাত্র।
উপজেলা নির্বাচনের তৃতীয় দফায় সহিংসতা-ব্যালট ছিনতাইসহ সবই
হয়েছে, কিন্তু মাননীয় সিইসি মহাশয় অবকাশে আছেন। সেটি আবার জানাচ্ছেন
প্রধানমন্ত্রীর একজন গুরুত্বপূর্ণ উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম। তাতে কি সহিংসতার
বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দায় থেকে রেহাই পায় নির্বাচন কমিশন? এমন সিইসির
কাছে কীভাবে সাড়ে আট কোটি ভোটারের ভোট নিরাপদে গচ্ছিত রাখা সম্ভব?
রাজনীতি
থেকে নীতির বিদায়ের দালিলিক প্রমাণ হয়ে আছে নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া
সাংসদ প্রার্থীদের হলফনামা। অসৎ উপায়ে সম্পদ হাসিলের তথ্য এমনভাবে নিবেদিত
যে অস্বীকার করার উপায় নেই। তার পরও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও স্থানীয়
সরকারমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম মনোনয়নপত্রের সঙ্গে প্রার্থীদের হলফনামা
দেওয়ার বিধানের সমালোচনা করে বলেন, ‘এই হলফনামা এখন রাজনীতিবিদদের চরিত্র
হনননামায় পরিণত হয়েছে।’ রাজনীতিবিদদের সবার চরিত্র এক নয়। যাঁদের আয়-ব্যয়ে
পদ্মার এপার-ওপার ফারাক, তাঁদের হয়ে কেন সাফাই গাইবেন একজন শীর্ষ
রাজনীতিবিদ? অথচ ২০০৫ সালের ১৫ জুলাই তৎকালীন বিরোধী দলের নেতা শেখ হাসিনা
সংবাদ সম্মেলন করে দাবি করেন, ‘নির্বাচন কমিশনে আয়-ব্যয় ও সম্পদের মিথ্যা
তথ্য প্রদানকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।’ এখন তিনি তা
ভুলে গেছেন। পরিহাস এখানেই, দুর্নীতির ব্যথা যেখানে সর্বাঙ্গে, সেখানে
নীতিকথা যাত্রার বিবেকের মতো করুণ কাঁদুনির চেয়ে বেশি দাম পায় না।
আমাদের
দেশে কি রাজনীতিবিদ, কি প্রশাসক—কেউই স্বীয় অপকর্মের জন্য ক্ষমা চাওয়ার
কথা কল্পনাও করেন না। দুঃখপ্রকাশ ও ক্ষমা প্রার্থনা কেবল সাংবাদিকদের জন্যই
নির্ধারিত। ২০০৬ সালে বিএনপি জোটের একগুঁয়েমিতে দেশ দুই বছরের
অনির্বাচিতদের শাসনে পতিত হয়েছিল। তার জন্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা
জিয়া কিংবা তাঁর দল দুঃখপ্রকাশ করেনি। রানা প্লাজা ধসের দায় নেয়নি দায়ী বলে
প্রমাণিতদের কেউই। বরং হাজারো মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যুর হোতারা জামিন
পেয়ে যাচ্ছে। তাজরীন ফ্যাশনসের মালিকের নাকে তাঁর কারখানার শত শত শ্রমিকের
পোড়া মাংসের ঘ্রাণ লাগেনি। সরকারি তদন্ত প্রতিবেদনে সুস্পষ্টভাবে তাঁকেসহ
তাঁর প্রশাসনের কয়েকজনকে দায়ী করে বিচারের মুখোমুখি করার সুপারিশ করা হলেও
সরকার উদাস। পরিশেষে নিহত শ্রমিকদের স্বজনদের সঙ্গে নিশ্চিন্তপুরে
নৃবিজ্ঞানী নামের একদল কর্মীর আইনি লড়াই, মাঠের সংগ্রাম ও ত্যাগ-তিতিক্ষার
ফলে আদালতের নির্দেশে অভিযুক্ত মালিক দেলওয়ার হোসেনকে আটক করা হয়।
কত
উদাহরণ দেব। অনেক হতাশার মধ্যেও যে জাতীয় ক্রিকেট দল দেশকে এক প্রতীকে এক
আশায় উদ্বেলিত করতে পারে, তাদের জার্সির গায়ে লেখা থাকে ভারতের এমন
কোম্পানির লোগো, যার মালিক সম্প্রতি দুর্নীতির দায়ে আটক হয়েছেন। তাঁর
দ্বারা প্রতারিত মানুষেরা তাঁর মুখে কালি ছিটিয়ে মনের জ্বালা মিটিয়েছেন।
সেই কলঙ্কের কালি কি আমাদের ক্রিকেট দলের গায়েও এসে কিছুটা লাগেনি?
লোভের
কাছে আমরা কে না কাতর হই? নেপালের প্রধানমন্ত্রীর দুটো মুঠোফোন ছাড়া আর
কোনো সম্পদ নেই! ভক্তিতে গদগদ হয়ে বলি, আহা রে, কী মহান মানুষ! কিন্তু
স্বদেশে কোনো সত্যিকার মহান মানুষকে আমরা কদর করি না। রাজনীতিতে
সৎ-শুদ্ধাচারী মানুষেরা করুণার পাত্র হন। আর দুর্নীতিবাজ-গডফাদারদের স্বাগত
জানাতে তোরণের পর তোরণ নির্মিত হয়, স্কুলের ছাত্রদের দাঁড় করিয়ে রাজকীয়
সংবর্ধনা দেওয়া হয়, সোনার উপকরণ তাঁদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। এই দেওয়া আর
নেওয়ায় কারও লজ্জা হয় না। লজ্জায় কান কাটা যাওয়ার ঘটনা কেবল শহীদুল্লা
কায়সারের নাটক সংশপ্তক-এর রমজান নামক কাল্পনিক চরিত্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
আমাদের
গণজাগরণ হয়েছে, কিন্তু নীতির জাগরণের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
রাষ্ট্র-রাজনীতি-অর্থনীতি নিয়ে কত কথা হয়, বরাদ্দ হয় বিপুল গবেষণার তহবিল।
অথচ এই এক জবরজং সমাজ নিয়ে চলছি শত শত বছর; এর কোনো সংস্কার নেই। সংস্কারের
প্রয়োজনও কোথাও জোরেশোরে উচ্চারিত হয় না। অথচ সংস্কারহীন সমাজ দূষিত
বুড়িগঙ্গার মতো মরে যাচ্ছে।
মানুষে মানুষে সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার ফল
হিসেবে খুনোখুনি-সহিংসতা বাড়ছে। জেনেশুনে নিরপরাধ মানুষকে গুম করা বা
পেট্রল দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া এখন ডাল-ভাতের মতো ব্যাপার। সমাজের মূলে আছে
মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা ও বিশ্বাস। তাতে চিড় ধরেছে। এ অবস্থায়
সামাজিক সম্পর্কগুলো হয়ে পড়েছে বদ্ধ জালের মতো, মানুষ তাতে মুক্তির
আস্বাদনের চেয়ে অ-সুখ আর বন্দিত্বের স্বাদই বেশি পায়। তখনই সমাজ হয়ে ওঠে
যুদ্ধক্ষেত্রের মাইনফিল্ডের মতো। কখন-কোথায় কোন সম্পর্কে চাপ পড়লে তা
বিস্ফোরিত হবে, কেউ বলতে পারে না। কেবল কখনো কোনো রসু খাঁ, কখনো কোনো এরশাদ
শিকদারের নাম জানাজানি হলে মৌসুমি মাতম ওঠে। তারপর সবাই ভুলে যায়। ভুলিয়ে
দেওয়ার জন্য আছে হরেক রকম উৎসব। পণ্য, বিজ্ঞাপন যেভাবে চালায়, সেভাবেই চলে
আমাদের সমাজ। কোনো সমাজের পতন কেবল সেই সমাজের খারাপ লোকদের জন্যই ঘটে না,
পতন ঘটে যখন ‘ভালো’রাও খারাপকে খারাপ বলতে দ্বিধা করেন। সব সংকটের মূলে
রয়েছে এই নৈতিক সমস্যা।
ঘোলা জলে সব মাছ নিঃশ্বাস নিতে পারে না। ঘোলা
পানিতে ভেদা মাছ ভেসে ওঠে আর বড় মাছেরা আরও তলায় চলে যায়। অন্ধকার যুগে
অন্ধকারের শক্তি ভেসে ওঠে, আর শুভচেতনা তলিয়ে যায়। এত এত অগ্রগতির শেষে
আমরা এখন সেই দশায় এসে দাঁড়িয়েছি, যখন বাইবেলকথিত আদম আর ইভ গন্ধম খাওয়ার
পাপে অধঃপতিত। কিন্তু সেই আদি মানব-মানবীর সঙ্গে আমাদের তফাত এতটুকুই যে
তারা লজ্জিত হয়েছিলেন। দুর্ভাগ্য, আমাদের মনে হয় তা-ও নেই।