গত বৃহস্পতিবার এশিয়ান টিভির তৌহিদ শান্ত এবং তার স্ত্রী, বাংলানিউজ২৪ ডটকমের সাজেদা সুইটি শ্যামলী এলাকায় আনসার বাহিনীর কয়েকজন সদস্যের দ্বারা প্রহৃত হয়েছেন। সেখানে পিকেএসএফ অফিসে শান্তর ট্রেনিং চলছিল। রাতে একত্রে বাসায় যেতে স্ত্রী সুইটি আসেন এবং একপর্যায়ে ওই অফিসের নিচে দাঁড়িয়ে মোবাইলে নিউজ দিচ্ছিলেন নিজ অফিসে। তখন ডিউটিরত সাত-আটজন আনসার অশালীন কথা বলে তাকে উত্ত্যক্ত করে এবং তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়। এটা দেখে স্বামী তৌহিদ শান্ত সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে প্রতিবাদ জানিয়ে উল্টো গালির শিকার হন। এমনকি আনসারের লোকেরা তাকে অস্ত্র ছিনতাইকারী অপবাদ দিয়ে বন্দুক ও বুট দিয়ে মারধর করতে থাকে। গুলিভর্তি রাইফেল তাক করে সুইটিকে হত্যার হুমকি এবং ধাক্কা মেরে ফেলে দেয়া হয়। সাংবাদিক দম্পতির আর্তচিৎকারে লোকজন ছুটে আসতে দেখে এক আনসার ফাঁকা গুলি ছোড়ে। পরে অন্য সাংবাদিকেরা এসে এই দম্পতিকে হাসপাতালে নিয়ে যান। মামলা করতে গেলে পুলিশ তা নেয়নি। সাংবাদিকদের দাবির মুখে পরদিন মামলা নেয়া হয় অনিচ্ছা সত্ত্বেও।
দ্বিতীয় ঘটনাটি হলো, শনিবার কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে উপজেলা নির্বাচন কভার করছিলেন সাংবাদিকেরা। ১০৩টি ভোটকেন্দ্রের ৭৩টিই সরকারি দলের লোকজন দখল করে নেয়। ১৯ দলের প্রার্থীদের এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বের করে দিয়ে শুরু হয় জাল ভোট। সকাল ১০টায় অশ্বদিয়া প্রাইমারি স্কুল কেন্দ্রের সামনে রেলমন্ত্রী মুজিবুল হকের পিএ মোশাররফ মহড়া দিচ্ছিলেন কয়েক শ’ লোক নিয়ে। সাংবাদিকদের কেন্দ্রে প্রবেশে তিনি বাধা দেয়া ছাড়াও মন্ত্রীর পিএ পরিচয় দিয়ে তাদের পুলিশে দেয়ার হুমকি দেন। তখন ক্যাডাররা সাংবাদিকদের অশ্রাব্য গালিগালাজ ও হুমকির সাথে টানাহেঁচড়া করছিল। পত্রিকার রিপোর্ট মতে, ওই পিএ লাঠি আনতে বলেন সাংবাদিক পেটানোর জন্য। পরে ধাক্কা দিয়ে তাদের গাড়িতে তুলে দেয়া হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লোকজন নীরব দর্শকের ভূমিকায় ছিল। নয়া দিগন্তের খবর মোতাবেক, মন্ত্রীর ওই পিএর হুমকি দেয়ার ভাষা ছিলÑ ‘আর এক মিনিট কেন্দ্রে থাকলে তোদের লাশ পড়বে। সাংবাদিক মারলে কিছু হয় না। এ মুহূর্তে কুমিল্লা ছাড়বি। না হলে সবগুলোকে পুলিশে দেবো।’
প্রথম ঘটনায় দেখা যায়, মহান ঐতিহ্যের ধারক ‘আনসার’ (সেবক) কথাটির চরম অমর্যাদা ঘটেছে। একজন নারী সাংবাদিক এখন রাজধানীতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বেআইনি ও উচ্ছৃঙ্খল আচরণের শিকার হচ্ছেন। এটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা তো নয়ই, এক দিনে হঠাৎ এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি। সাংবাদিকদের ব্যাপারে সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রভাবশালী ও ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের অনেকের যে অবাঞ্ছিত কর্মকাণ্ড তার প্রভাবও এ জন্য দায়ী। দেখা গেছে, সাংবাদিক নির্যাতন, এমনকি তাদের হত্যা করলেও বিচার বা শাস্তি হয় না। তাহলে অপরাধী, দুর্নীতিবাজ, সন্ত্রাসী তো বটেই; অন্যরাও সাংবাদিকদের হেয় ও লাঞ্ছিত করতে উৎসাহ পাবে।
দ্বিতীয় ঘটনায় দেখা যাচ্ছে, স্বয়ং একজন মন্ত্রীর কর্মচারী প্রকাশ্যে সাংবাদিকদের গ্রেফতার ও হত্যার হুমকি দিচ্ছেন। এটা যে ক্ষমতাসীন দলের সাথে সম্পৃক্ত রাজনৈতিক সন্ত্রাস, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। উপজেলা নির্বাচনের প্রথম দফা থেকেই দলটির সশস্ত্র লোকজন বেপরোয়া তাণ্ডব সৃষ্টি করছে। তারা ভোটারদের বাধাদান, কেন্দ্র দখল, ভোট কারচুপি, হামলা ও মারধরসহ বিভিন্ন বেআইনি কাজ অবাধে করে চলেছে। এরই একটি নজির চৌদ্দগ্রামের ওই ঘটনা। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীও দায় এড়াতে পারেন না বলেই জনগণ মনে করে।
সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যার কোনো প্রতিকার না হওয়ায় সরকারের ইমেজ এমনিতেই ভূলুণ্ঠিত। এ প্রেক্ষাপটে সাংবাদিকদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং পেশাগত কাজের অনুকূল পরিবেশের নিশ্চয়তা দেয়ার গুরুদায়িত্ব সরকার এড়াতে পারে না কিছুতেই