আধুনিক মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক বিশেষজ্ঞ জুয়ান কোল মিশিগান
বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক। মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির
ওপর তার রয়েছে নিবিড় নজর। সেখানকার পরিস্থিতিকে তিনি পাশ্চাত্যের
অ্যাকাডেমিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলেও তাতে সার্বজনীন পেশাদারিত্ব নির্ভর
পর্যবেক্ষণের স্বাক্ষর পাওয়া যায়। সৌদি আরব, ইরান অথবা ব্রাদারহুডের
দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে যারা দেখবেন তারা হয়তো একমত হবেন না জুয়ান কোলের বিবেচনা
বিশ্লেষণ ও অনুসিদ্ধান্তের সাথে। এরপরও মধ্যপ্রাচ্যকে গভীরভাবে উপলব্ধি
করার জন্য আমরা দেশ-মহাদেশের পাঠকদের সামনে লেখাটি হুবহু উপস্থাপন করছি। এর
সাথে নয়া দিগন্তের সম্পাদকীয় নীতির কোনো সম্পর্ক নেই। লেখাটি অনুবাদ
করেছেন নয়া দিগন্তের সিনিয়র সাংবাদিক হাসান শরীফ
মুসলিম
ব্রাদারহুডকে সৌদি আরবের সন্ত্রাসী সংগঠন ঘোষণা ও কাতার থেকে সৌদি আরব,
কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনের রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহার মধ্যপ্রাচ্যে
বড় ধরনের ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যে কাতার
হলো ‘রেড প্রিন্স’। প্রাকৃতিক গ্যাস রফতানির মাধ্যমে কাতার কিংবদন্তিপ্রতিম
সম্পদের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও দেশটির পররাষ্ট্রনীতি জনপ্রিয়, মুসলিম
ব্রাদারহুডের কাছে বিশেষভাবে পছন্দীয় এবং মিসরের হোসনি মোবারকসহ
মধ্যপ্রাচ্যের সেকুলার একনায়কতান্ত্রিক স্বৈরশাসকদের কাছে অপছন্দনীয়।
তিউনিসিয়া, লিবিয়া, সিরিয়া ও মিসরের মতো স্থানে সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক
বিষয়ে মুসলিম ব্রাদারহুডের সাথে সম্পর্ককে ব্যবহার করেছে দেশটি। কাতারের
জনপ্রিয় আলজাজিরা আরবি সংবাদ চ্যানেলটি ওই অঞ্চলে ২০১১ সালের গণ-আন্দোলনে
উজ্জীবিত হয়েছিল।
সৌদি আরবের অশীতিপর যুবরাজেরা মিসরে মোবারকের পতনে
ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন। সৌদি আরবের সরকারি ধর্মীয় আদর্শ কট্টর ওয়াহাবি ধারার
হলেও সৌদি আরব রাষ্ট্রটি রাজনৈতিক ইসলামের চেয়ে প্রচলিত ব্যবস্থা ও
স্থিতিশীলতাই বেশি পছন্দ করে। এ কারণে সেকুলার নেতারা যতণ পর্যন্ত সাধারণ
মানুষকে ঠাণ্ডা রাখতে সহায়তা করতে পারেন সৌদি শাসকেরা ততণ পর্যন্ত তাদের
খুশি মনেই সমর্থন করেন। অধিকন্তু ওয়াহাবি ধারা মোটামুটি রাজনৈতিকভাবে
নিরুপদ্রববাদী, সৌদি আরবে এই মতাবলম্বীরা রাজতন্ত্রকে পূর্ণভাবে সমর্থন
করে।
মিসরে ২০১২ সালের ৩০ জুন থেকে ২০১৩ সালের ৩ জুলাই পর্যন্ত মতায়
থাকা মুসলিম ব্রাদারহুডকে আরবরা একটি রাজনৈতিক ধর্মবিশ্বাস মনে করে। তাদের
মতে, সংগঠনটি একটির পর একটি দেশের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণের চেষ্টায় নিয়োজিত একটি
গোপন বিপ্লবী সংস্থা, অনেকটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর হাঙ্গেরি ও
চেকোস্লোভাকিয়ার নিয়ন্ত্রণ নেয়া স্ট্যালিনপন্থীদের মতো। অর্থাৎ ম্যাকার্থি
আমলে আমেরিকান কট্টর ডানপন্থীরা কমিউনিজমকে যে দৃষ্টিতে দেখতেন, সৌদি
নেতৃত্বও বর্তমানে ব্রাদারহুডকে তেমনই বিবেচনা করছেন। আর তারা কাতারকে দেখে
ব্রাদারহুডের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে।
সৌদি আরবের আরেকটি বড় উদ্বেগের বিষয়
হলো খোমেনিবাদ বা শিয়া রাজনৈতিক ইসলাম তথা ইরানের রাষ্ট্রীয় মতবাদ। সৌদি
আরবের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১২ ভাগ শিয়া, তারা বাস করে রাষ্ট্রটির
পেট্রলিয়ামের ওপর। সৌদিরা মনে করেছে, বাহরাইনের সংখ্যাগরিষ্ঠ শিয়াদের
(বাস্তবে তা নয়) বিােভের পেছনে ইরানের হাত ছিল। এই ধারণার বশবর্তী হয়েই
দেশটি বাহরাইনের রাজতন্ত্রকে রা করার জন্য সেখানে সৈন্য পাঠিয়েছিল। ইরাকে
ইরানপন্থী শিয়ারা (তারাই সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ) মতায় যাওয়াতেও সৌদিরা
মর্মাহত হয়েছে। ইরানের সাথে বাশার আল-আসাদের গাঁটছড়া বাঁধা, লেবাননের
হিজবুল্লাহ ওই এলাকায় ইরানের হয়ে কাজ করার ঘটনাতেও সৌদিরা বিরক্ত হয়েছে।
ওয়াহাবি
নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্রের দৃষ্টিকোণ থেকে সন্দেহ হয় যে, মুসলিম ব্রাদারহুড ও
খোমেনিপন্থী শিয়াবাদ প্রায় একই রকমের। উভয়ই জনপ্রিয় আন্দোলন। উভয়ই
প্রজাতন্ত্রের কথা বলে এবং রাজতন্ত্রের প্রতি বৈরী। উভয়ই মধ্যপ্রাচ্যে
পরিবর্তনবিরোধী গোষ্ঠীর প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে। ফলে বাদশাহ
আবদুল্লাহর মনে হয়েছে, মিসরের মুসলিম ব্রাদারহুডের নেতা মুহাম্মাদ মুরসির
গত বছর ইরানের দিকে হাত প্রসারিত করা ছিল এই দুই ধরনের রাজনৈতিক ইসলাম যে
পরস্পরের সাথে মিলেমিশে কাজ করতে পারে সেটিরই নিশ্চিতকরণ।
ওবামা
প্রশাসনের প্রতি সৌদিরা ক্রুদ্ধ। যুক্তরাষ্ট্র মোবারকের পতনকে নীরবে মেনে
নিয়েছিল ও চূড়ান্ত পর্যায়ে আরব বসন্তকে অনুমোদন করেছিল। মিসরে মুসলিম
ব্রাদারহুড সরকারের সাথেও ওয়াশিংটন মানিয়ে নিয়েছিল। আর এখন ইরানের সাথে
সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে আমেরিকা।
গত বছরের এই সময়ে এই অঞ্চলের
গতিশীলতা ছিল কাতার, মুসলিম ব্রাদারহুড ও ইরানের সাথে। মিসরের দায়িত্ব
গ্রহণ করেছিল ব্রাদারহুড, লিবিয়ায় তারা ক্রমাগত শক্তিশালী হচ্ছিল।
তিউনিসিয়ায় মতায় ছিল ধর্মীয় মধ্যডানপন্থী একটি দল (যদিও দলটি মুসলিম
ব্রাদারহুডের সাথে সম্পর্কিত ছিল না)। কাতার ও আলজাজিরা ছিল ব্যাপকভাবে
প্রভাবশালী। একই সময়ে সিরিয়া ও হিজবুল্লাহর সাথে ইরানের মিত্রতার ফলে
হিজবুল্লাহকে সক্রিয় এবং লেবাননে সাদ হারিরি এবং সিরিয়ায় সুন্নি সালাফিদের
মতো মিত্রদের বিরুদ্ধে শক্তিশালী অবস্থানে রাখে। সৌদি আরব দৃশ্যত এক ধরনের
অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে।
তার পর মিসরে বিদ্রোহ (তামারুদ) আন্দোলনের মাধ্যমে
সামরিক বাহিনী গত ৩ জুলাই ক্ষমতা দখল করলে সৌদিরা দম ফেলার ফুরসরসত পায়।
সৌদি আরব, কুয়েত ও আরব আমিরাত পতনের মুখে থাকা মিসরের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল
করতে জেনারেল আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসিকে ২৪ বিলিয়ন ডলার সাহায্য দেয়, আরো
দেয়ার প্রতিশ্র“তিও থাকে সে সাথে। ডিসেম্বরে প্রাদেশিক সরকারের একটি
নিরাপত্তা ভবনে বোমা হামলার পর মিসরের সামরিক-নিয়োগকৃত সরকার মুসলিম
ব্রাদারহুডকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করে, যদিও এই ঘটনার পেছনে
ব্রাদারহুড জড়িত ছিল বলে প্রমাণ হয়নি।
মাত্র এক বছরের মধ্যে মুসলিম
ব্রাদারহুড মিসরের শাসন করার অবস্থান থেকে বিচ্যুত হয়ে নিষিদ্ধ সন্ত্রাসী
সংগঠনে পরিণত হয়েছে। এখন সৌদিরাও সংগঠনটিকে নিষিদ্ধ করার পথ অনুসরণ করেছে।
ব্রাদারহুডের সাথে এক সময় সম্পৃক্ত কিছু লোক সহিংসতায় জড়িত থাকলেও সংগঠনটির
নেতারা সেই ১৯৭০-এর দশকে তদানীন্তন মিসরীয় প্রেসিডেন্ট আনোয়ার আল সা’দাতের
সাথে দরকষাকষির সময় সহিংসতা ছেড়ে দেয় এবং মোটামুটিভাবে তাদের ওয়াদা পালন
করে চলেছেন। ফলে এখন আরব রাজনৈতিক ইসলামের একটি প্রধান ধরনকে স্রেফ
সন্ত্রাসবাদ হিসেবে ঘোষণা করা নিছকই ‘আরব ম্যাকার্থিজম’ (কিংবা আরব বুশবাদ।
কারণ ডব্লিউ বুশ এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গিই পছন্দ করতেন। আরব বিশ্বে
‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ ভাষাটি সরাসরি বুশের কাছ থেকেই নেয়া হয়েছে)।
সৌদি
আরব তার আদর্শিক প্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাদারহুডকে ধ্বংস করে দিতে বদ্ধপরিকর।
সে কারণে কাতারের ওপর চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে, সড়কপথে উপদ্বীপটিতে খাবার ও
অন্যান্য আমদানি বন্ধ করার হুমকি দেয়া হচ্ছে। বলা হচ্ছে, সৌদি আরব চায়
কাতার যেন দোহায় ব্র“কিংস ইনস্টিটিউশন ও র্যান্ড কোরের শাখা বন্ধ করে দেয়।
এটা কেবল আমেরিকানবাদবিরোধী নতুন সৌদি ধারণাই ফুটিয়ে তুলছে না বরং
প্রতিষ্ঠান দু’টির যেসব বিশেষজ্ঞ মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রতি ঝুঁকে রয়েছেন,
তাদের সরিয়ে দেয়ার পরিকল্পনা ও করা হচ্ছে।
সৌদি আরব ব্রাদারহুড এবং
ইরানপন্থী রাষ্ট্র ও আন্দোলনের বিশেষ কোনো বিকল্পকেও সমর্থন করছে না। এর
প্রতিক্রিয়া রাষ্ট্রসংক্রান্ত এবং দ্রুততার সাথে নেয়া সিদ্ধান্ত। জেনারেল
আল-সিসির মতো সেকুলার জাতীয়তাবাদীরা তাদের হয়ে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে।
তারা কেবল জনপ্রিয় রাজনৈতিক ইসলামের বিরুদ্ধে, সেটা ব্রাদারহুড হোক কিংবা
শিয়া ধর্মের হোক। (এই নীতি যে কতটা তালগোল পাকানো সেটা পরিষ্কার হয়ে গেছে
মিসরের সামরিক শাসকদের সিরিয়ার আল-আসাদের বাথ পার্টি সরকারের প্রতি সমর্থন
ব্যক্ত করার ঘটনায়। সৌদি আরব আসাদের বিরুদ্ধে, অথচ তাদের সমর্থিত মিসরের
শাসকেরা সিরিয়ার প্রতি বন্ধুপ্রতিম)। দামাসকাসের বাথ পার্টির প্রতি সৌদিরা
সমর্থন দিতে পারত (১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশকে দিয়েছিল), যদি তারা ইরানের সাথে
গাঁটছড়া না বাঁধত। এখন রিয়াদ চায় আল-আসাদের উৎখাত, তবে সিরিয়ার মুসলিম
ব্রাদারহুড এবং তার কাতারি বন্ধুদের নিয়ে এই উৎখাতের কাজ হোক, তা চায় না।
মুসলিম
ব্রাদারহুড কার্যকরভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে- তেমনটি আমার মনে হয় না। আমার
অনুমান, এমনকি এখনো অন্তত ২০ ভাগ মিসরীয় মোটামুটিভাবে সংগঠনটিকে সমর্থন
করে। ব্রাদারহুড সদস্যদের দুর্বৃত্ত হিসেবে চিহ্নিত করায় মিসর ও সৌদি আরবের
কঠোর পদেেপর ফলে সংগঠনটির কোনো কোনো শাখাকে স্বল্পমাত্রার গেরিলা যুদ্ধ বা
সন্ত্রাসবাদী সংগ্রামের দিকে ঠেলে দিতে পারে। আর তাতে করে ইরাকের মতো
পরিস্থিতির সৃষ্টি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
এখন এমন গুজবও রয়েছে যে সৌদি আরব
উপসাগরীয় সহযোগিতা সংস্থায় (জিসিসি) মিসরকে সদস্য করে নেবে এই ধারণায় যে এর
ফলে কায়রো সংগঠনটি থেকে বিপুল কৌশলগত সুবিধা পাবে। মিসর বিনিময়ে ইরান ও
শিয়া ইরাক এবং ব্রাদারহুডের হাত থেকে অত্যন্ত ধনী তবে খুবই দুর্বল জিসিসিকে
রা করবে।
মিসরের সংবাদপত্রে পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি সূত্রের বরাত
দিয়ে খবর প্রকাশিত হয়েছে যে আল-সিসি প্রেসিডেন্ট হলে তিনি উপসাগরীয়
দেশগুলো থেকে বিনিয়োগ ও সাহায্য হিসেবে ২৪০ বিলিয়ন ডলার আনতে পারবেন। কয়েক
বছর ধরে গ্যাসোলিনের উচ্চমূল্যের কারণে সৌদি আরবের ৮৬০ বিলিয়ন ডলার জমেছে
বলে ধারণা করা হচ্ছে। কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতও বিপুল অর্থ বাগিয়েছে।
পরিমাণটা হবে দেড় ট্রিলিয়ন মিসরীয় পাউন্ড। এ প্রোপটেই আল-সিসি এক সাাৎকারে
বলেছেন, অর্থনীতি ও অবকাঠামো খাতকে যথাযথ পথে নিয়ে যেতে সরকারের ট্রিলিয়ন
পাউন্ডের সরকারি বাজেট দরকার।
ইরাককে শিয়া পক্ষে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। দেশটি
অভিযোগ করছে, শিয়া সরকারকে দুর্বল রাখার ল্েয ইরাকে সুন্নি সন্ত্রাস
চালানো হচ্ছে, আর এর পেছনে সৌদি আরবের হাত রয়েছে। তুরস্ক যদিও সিরিয়া
প্রশ্নে সৌদিদের মিত্র, তবুও ব্রাদারহুডকে নিষিদ্ধ করতে রাজি নয়।
এ
কারণে সৌদি আরবের মহাপরিকল্পনা হলো, মিসরে ব্রাদারহুডবিরোধী জাতীয়তাবাদকে
সমর্থন করা, কাতারকে মিত্রহীন করা, বাশার-আল আসাদকে উৎখাত করা। এই
মহাপরিকল্পনা পুরোটা বাস্তবায়ন হলে সৌদি আরব এই অঞ্চল থেকে জনপ্রিয়
রাজনৈতিক ইসলামকে নির্মূল করতে পারবে। তবে সে প্রচেষ্টা ফলপ্রসূ হবে না
বলেই মনে হচ্ছে।