সবাই একমত হয়ে কোনো কাজ করতে বা না করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হওয়া বা সংকল্প করার
অবস্থাকে ধর্মঘট বলা হয়। দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত কাজ করা বন্ধ রাখা
ধর্মঘটের (strike) বৈশিষ্ট্য। যে বিষয় নিয়ে ধর্মঘট ডাকা হয় তার ওপর নির্ভর
করে এটা কতটা যৌক্তিক বা অযৌক্তিক। তবে ধর্মঘট সর্বদাই মানুষের কাছে
অগ্রহণযোগ্য একটি বিষয়। একটি দেশে সব সময় দুটি দল কিংবা পক্ষ-বিপক্ষের
কম-বেশি জনশক্তি রয়েছে, যার ফলে সবাই যে ধর্মঘটে সাড়া দেবে, বিষয়টি তেমন
নয়। এ রকম কর্মসূচির ফলে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রার বিঘ্ন ঘটে। এটি
জনভোগান্তির অন্যতম। একজন চিকিত্সকের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন জরুরি সেবা,
সততা, কর্তব্যবোধ এবং সেবা দেয়ার মানসিকতা।
শিক্ষা ও কর্মজীবনে বহুবার শুনেছি শিক্ষক ছাত্রকে জিজ্ঞেস করতেন, বড় হয়ে
তুমি কী হতে চাও? সে সহসা উত্তর দিত, ডাক্তার হতে চাই। সেই ডাক্তারদের কথাই
এ সময়ে বেশ আলোচিত। সব চিকিত্সক সম্পর্কে ঢালাওভাবে মন্তব্য করা উদ্দেশ্য
নয়। তবে অন্যায় যে করে এবং যে অন্যায়ের সহযোগিতা করে উভয়ে সমান অপরাধী। সেই
দৃষ্টিকোণ থেকে কোনো অন্যায় ও অযৌক্তিক দাবির ধর্মঘটকে যে বা যারা সমর্থন
করেন তারাও একই দোষে দোষী। মানুষ যখন নৈতিকতা হারাতে বসে, কিংবা হারিয়ে
ফেলে তখন তার দ্বারা অন্যায় হওয়াই স্বাভাবিক। যারা কোনো শর্ত ছাড়া সেবামূলক
শিক্ষা ও পেশাকে বেছে নিয়েছেন, তাদের কাছেই রোগীদের সেবা জিম্মি হয়ে আছে।
চিকিত্সক সম্প্রদায়ের আন্দোলন সারা দেশকে ভাবিয়ে তুলেছে। কারও ভুল
চিকিত্সায় যদি রোগী মারাত্মক কষ্ট পায়, মারা যায়, তার তো আইনগতভাবেই শাস্তি
পাওয়া উচিত। কারণ চিকিত্সার সংশ্লিষ্ট বিষয়ে যথাযথ দক্ষতা না নিয়ে রোগীকে
সেবা দিতে যাওয়াটা চরম ভুল। এ রকম ভুল করলে বা হতে থাকলে তার বিরুদ্ধে
দেশের প্রচলিত নিয়মেই ব্যবস্থা গ্রহণ করাটা তখন যে কারোর পক্ষ থেকেই নৈতিক
দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত। তেমনি রোগীর ভুলের কারণে অন্যায়ভাবে চিকিত্সককে
দায়ী করাটা সমান অপরাধ। রোগী ও চিকিত্সক দু’পক্ষেরই আইনের আশ্রয় নেয়ার
সুযোগ রয়েছে, তবে তা সততা, নিষ্ঠা ও প্রমাণের ভিত্তিতে হওয়া প্রয়োজন।
অন্যায়ভাবে কারো ওপর দোষ চাপানো জুলুমের অন্তর্ভুক্ত। মজলুম ব্যক্তির দোয়া
আল্লাহর কাছে দ্রুত পৌঁছে যায়। জুলুমকারীকে জালিম বলা হয়। মহান আল্লাহর
বাণী, ‘আল্লাহ তায়ালা কখনও জালিমদের পছন্দ করেন না।’ (সুরা-আশ শুরা : ৪০)
রোগীর প্রধান অভিভাবক হলেন চিকিত্সক। আর সে চিকিত্সকরা পুলিশের গ্রেফতারি
পরোয়ানা ফেরাতে কিংবা মামলা থেকে বাঁচতে বা নিজের দোষ ঢাকতে নামে-বেনামে,
কখনও চিকিত্সক সংগঠনের ব্যানারে ধর্মঘট কর্মসূচির ঘোষণা করেন। এর ফলে
রোগীরা আরও অসহায় হয়ে পড়েন। রোগীরা যথাসময়ে সেবা না পেলে তাদের
আত্মীয়-স্বজন চিকিত্সা প্রতিষ্ঠান বা চিকিত্সকদের প্রতি ক্ষিপ্ত হয়ে কখনও
কখনও ভাঙচুরসহ নানা ক্ষতিসাধন করে থাকে। এটা মোটেই ঠিক নয়। কারণ একজনের
অপরাধের কারণে অন্যরা সেবা থেকে বঞ্চিত হবে, তা মেনে নেয়ার মতো নয়। যে
অন্যায় করে বা যার ওপর অন্যায় করা হয়, তাদের শাস্তি পাওয়া দরকার। কিন্তু
ঢালাওভাবে একজনের অপরাধ বা ভুলের জন্য অন্যদের ওপর জুলুম করা মহা অন্যায়।
মসজিদ বা মন্দির থেকে জুতা চুরি হলে সে অন্যের জুতা নিয়ে বের হলে সেটা যেমন
অন্যায় (চুরি), তেমনি একজনের অপরাধের কারণে অন্যদের ওপর প্রতিশোধ নেয়াও
মহা অন্যায়। কখনও কখনও অর্থের মোহে পড়ে চিকিত্সা ক্ষেত্রে অতি অল্প দক্ষতা
নিয়ে চিকিত্সাসেবা করে থাকে যা অনুচিত। অপারেশনের বহু দিন পর রোগীর পেটে
কাঁচিসহ অন্যান্য সামগ্রী পাওয়া গেছে, এমন সংবাদ দেশবাসীর কাছে কোনো নতুন
বর্ণনা নয়। রোগীর কাছে না এসে দূর থেকে মোবাইল বা টেলিফোনের মাধ্যমেও
চিকিত্সকরা সেবা প্রদান করে থাকেন। এটা কতটা যৌক্তিক, এর উত্তর পাঠকের হাতে
ছেড়ে দিলাম।
অধিকাংশ সময় রাজনৈতিক দলগুলো ধর্মঘট ডেকে থাকে, কিন্তু ইদানীং ডাক্তারদের
ধর্মঘট চোখে পড়ার মতো। চিকিত্সক সম্প্রদায় ধর্মঘট ডাকতে শুরু করেছে, এ যেন
মহামারির মতো অবস্থা বিরাজ করছে। বিশেষভাবে চিকিত্সকদের ধর্মঘটের কারণে গত
২৭ মার্চ রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিত্সা না পেয়ে এক রোগীর মুত্যু
হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এর আগে গত বছর ৯ ডিসেম্বর একটি বেসরকারি ক্লিনিকে
(ডলফিন ক্লিনিক) পা-ভাঙা আরেক আওয়ামী লীগ নেতা ভর্তি হলে পায়ে অপারেশন
করার সময় তাহার মৃত্যু হলে নগরীতে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। এই অপ্রত্যাশিত
মৃত্যুর পর সংশ্লিষ্ট ডাক্তারসহ ওই ক্লিনিকের মালিক আওয়ামী লীগ নেতা ডা.
শিমুলের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। এই হত্যা মামলার জের ধরে ডা. শিমুলকে
কারাগারে পাঠানো হয়। গ্রেফতার চিকিত্সক ও ক্লিনিক মালিকের জামিন না হলে
জেলার ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অনির্দিষ্টকালের
জন্য ধর্মঘটের ডাক দেয়। একই সঙ্গে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ)
রাজশাহী শাখা ও স্বাধীনতা চিকিত্সক পরিষদ (স্বাচিপ) তাতে সমর্থন দেয়। ফলে
ধর্মঘটের প্রভাব সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। ওই অঞ্চলের রোগীরা ডাক্তারদের হাতে
জিম্মি হয়ে পড়ে। এমনিভাবে আরও অনেক ধর্মঘটের খবর শিরোনাম হয়েছে বিভিন্ন
দৈনিক পত্র-পত্রিকায়। ‘ডাক্তারদের ধর্মঘটে রোগীর মৃত্যু’ (ইত্তেফাক-২৯
মার্চ, ২০১৪)। ‘ছাত্রলীগের দু’গ্রুপের দ্বন্দ্বের জের রমেক হাসপাতালে
ইন্টার্নি ডাক্তারদের ধর্মঘট’ (আমার দেশ, ৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৩)। ‘রাজশাহীতে
দুর্ভোগ বাড়িয়ে চিকিত্সকদের ধর্মঘট স্থগিত’ (মানবজমীন, ৩০ মার্চ ২০১৪)।
‘ডাক্তারদের অবহেলায় রোগীর মৃত্যুর অভিযোগ’ (মানবজমিন, ২৫ মার্চ ২০১৪)।
‘ফরিদপুরে ইন্টার্নি ডাক্তারদের ধর্মঘট অব্যাহত’ (আজকের খবর, ৪ মার্চ
২০১৪)। ‘কুমিল্লা মেডিকেল কলেজে ধর্মঘট’ (মানবকণ্ঠ, ১২ মে ২০১৩)। ‘সিলেট
ওসমানী হাসপাতালে ডাক্তারদের ধর্মঘট’ (আমার হেল্থ, ৮ ডিসেম্বর ২০১৩)। ‘নর্থ
ইস্ট মেডিকেলে ভুল চিকিত্সায় রোগীর মৃত্যু, হামলা : ইন্টার্নি ডাক্তারদের
ধর্মঘট’ (সিলেট নিউজ, ৩ সেপ্টেম্বর ২০১৩)। ‘মৌলভীবাজারে ডাক্তার ধর্মঘট,
হাসপাতাল ছাড়ছেন রোগীরা’ (প্যারিস নিউজ ডটকম, ৫ ফেব্রুয়ারি ২০১২)।
‘চুয়াডাঙ্গায় ডাক্তারদের টানা ধর্মঘটে রোগীদের দুর্ভোগ’ (আজকের বাংলাদেশ,
২৯ ডিসেম্বর ২০১২)। ‘বরিশাল শেরেবাংলা চিকিত্সা মহাবিদ্যালয়—শেবাচিম
হাসপাতালে শিক্ষানবিশ ডাক্তারদের ধর্মঘট অব্যাহত : ৪৯ রোগীর মৃত্যু’
(ডিফারেন্ট নিউজ, ২৪ নভেম্বর ২০১২)। এভাবে বহু রিপোর্ট কালের সাক্ষী। তবে
ধর্মঘটে বিচ্ছিন্ন কর্মসূচি কখনো মঙ্গলজনক নয়।
ধর্মঘট আহ্বানকারীরা তাদের স্বার্থ হাসিলের জন্য ধর্মঘট ডাকে, কিন্তু
সাধারণ মানুষের স্বার্থ দেখার লোক খুবই কম। যে দেশে সরকার জনগণের বিরুদ্ধে
অবস্থান নিয়ে দলীয় কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে ধর্মঘট ডেকে সারা দেশের সঙ্গে
সড়ক, নৌ ও রেলযোগাযোগ বন্ধ করে দেয়, সরকার হরতালের আহ্বান করে, সে দেশে
ডাক্তাররা ধর্মঘট ডাকলে তেমন ক্ষতি হয় না, এটা ভেবেই হয়তো তারা জনদুর্ভোগ
কর্মসূচি ঘোষণা করে থাকেন। যে দেশে সরকার জনগণকে অধিকার থেকে বঞ্চিত করে,
সে দেশে অন্যরা জনস্বার্থ দেখবে, তা ভাবা দুষ্কর।
কিছু কিছু চিকিত্সক তার মহান পেশাকে বাণিজ্যে পরিণত করেছেন। চিকিত্সা পেশার
পাশাপাশি তিনি যেন গণক কিংবা জ্যোতিষ, রোগী দেখেই যেন লৌকিকভাবে সবকিছু
বলে যান আর ওষুধ লিখে দেন। অতিরিক্ত রোগীদের ভিড়ে ভিজিটের টাকার নেশায়
রোগীর কথা শোনার সময় নেই। রোগীদের দুর্বলতার সুযোগ কাজে লাগিয়ে রাতারাতি
আঙুল ফুলে কলাগাছ থেকে হাতি হওয়া শুরু করেছেন। আবার কেউ কেউ অকারণে রোগীর
স্বাস্থ্য পরীক্ষার নামে টাকা হাতিয়ে নেন। নিজ চেম্বার থেকে বেশি দামে ওষুধ
কিনতে বাধ্য করেন। ব্যক্তিগত হাসপাতালে রোগী ভর্তি করে অতিরিক্ত সিট ভাড়া
পাওয়ার আশায় রোগীকে রিলিজ দিতে বিলম্ব করেন। সরকারি ওষুধ টাকায় বিক্রি
করেন। মুমূর্ষু রোগীকে আইসিইউতে নিয়ে চিকিত্সার নামে কখনও কখনও মৃত
ব্যক্তিকে আটকে রেখে আত্মীয়-স্বজন থেকে জোর টাকা আদায় করে নেন। তাদের
কর্মকাণ্ডে সহমর্মিতার কোনো পরিচয় পাওয়া যায় না। কেউ বা সিনিয়র ডাক্তারদের
সঙ্গে থেকে কিছু মন্ত্র শিখে সামান্য ডিগ্রি নিয়ে গ্রামাঞ্চলে বিশাল
সাইনবোর্ড তুলে বড় ডাক্তার সেজে বসেন। এমন চরিত্রের চিকিত্সক ও সেবা
প্রতিষ্ঠানের পরিচয় জনসম্মুখে প্রকাশিত হওয়া খুবই জরুরি। এত কিছুর পরেও
চিকিত্সকদের প্রতি মানুষের আস্থা এখনও আছে। সেই আস্থার জায়গাটি তাদের ধরে
রাখা উচিত। অন্য কোনো ব্যক্তির কথার চেয়ে ডাক্তারদের কথার গুরুত্ব মানুষ
বেশি দিয়ে থাকে। সেজন্য তাদের আরো দায়িত্ববান হতে হবে।
চিকিত্সকদের ধর্মঘট দাবি আদায়ের হাতিয়ার হওয়া ঠিক নয়। ডাক্তাররা কোন পথে
চলছেন? ডাক্তারের ক্ষমতা প্রয়োগ করার ক্ষেত্রই কি একমাত্র রোগী? দুর্বলতা
ঢাকতেই কি ধর্মঘট? ধর্মঘট কী ধরনের সেবা? জনমনের এসব প্রশ্নের উত্তর কে
দেবে, সেই অভিভাবকের বড়ই প্রয়োজন। অথচ কথায় কথায় চিকিত্সকদের ধর্মঘট,
রোগীকে বন্দি করে আন্দোলন বা ধর্মঘটের ডাক দেয়া গুরুতর অপরাধ। ডাক্তারদের
ধর্মঘট কর্মসূচি ঘোষণার পেছনে কোনো স্থানীয় প্রভাবশালী নেতা, রাজনীতিবীদ,
গোষ্ঠী কিংবা দলীয় কোনো অনৈতিক প্রভাব আছে কিনা তা খতিয়ে দেখার প্রয়োজন আছে
বলে মনে হয়। তেমনিভাবে রোগীর নিজের ভুলকে লুকিয়ে ডাক্তারদের ওপর
অন্যায়ভাবে দোষ চাপানোর সংস্কৃতি যত দিনে পরিবর্তিত না হবে তত দিনে ভালো
কিছু আশা করা নিষ্ফল কামনামাত্র।