জন্মের পর থেকে ভারতীয় বামন ধাইয়ের দক্ষিণা জোগাতে বাংলাদেশকে অনেক
ভোগান্তি সইতে হয়েছে। ‘ত্রিশ বছর ধরে স্বাধীনতাকে খুঁজছি’ এবং তেতাল্লিশ
বছর পর স্বাধীনতার ‘শ্রাদ্ধশান্তির’ উদ্যোগ দেখছি। এর গুড়গুড় আওয়াজ শুরু
থেকেই শোনা গেছে।
লেন্দুপ
১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসে যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগ থেকেই ধাইয়ের কুমতলব এবং অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী ও ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা র-এর বানানো মুজিব বাহিনীর নেতাদের জোগালি সাজার কথা জানতে পেরে জেনারেল আতাউল গনি ওসমানী ও তার সিনিয়র অফিসারদের অনেকে সন্ত্রস্ত হয়ে ওঠেন। স্বাধীনতাকামী এসব অফিসারের ভেতর মেজর এমএ জলিলকে নয়া দেশের পয়লা রাজবন্দি বনতে হয়। পাকিস্তান আর্মির রেখে যাওয়া অস্ত্রপাতি ও গোলাবারুদ এবং উর্দুভাষী মুহাজিরদের শিল্প-কারখানা ও ব্যবসার মালসামানা ভারতে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে আপত্তি করা ছিল তার কসুর। যুদ্ধ শেষ হওয়ার ঠিক পরের দিনই তিনি এ নিয়ে ভারতীয় সেনা কর্তৃপক্ষ ও বাংলাদেশের অস্থায়ী প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি দেন। দুই সপ্তাহের ভেতর জলিল তার জবাব পান। ভারতীয় আর্মি তাকে বন্দি করে। এতে বাংলাদেশ সরকারও মৌন সম্মতি জোগায়। তাজউদ্দীনকে সরিয়ে শেখ মুজিবুর রহমান নিজে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরও তার পক্ষে জলিলকে আর্মিতে রাখা সম্ভব হয়নি।
দল ও আন্দোলনের জন্য সংখ্যালঘু ও ভারতপন্থীদের বাড়তি সমর্থন ও আর্থিক সাহায্যের জন্য ভারত সরকারের কাছে ধরনা দিলেও, মুজিব দিল্লির সেবাদাস হওয়ার মতন মানুষ ছিলেন না। মুসলিম রাজনৈতিক কালচারের ‘সুলতানি’ ধারার তাসিরে বড় হওয়া মুজিব মনে করেছিলেন, যেমন তেমন করে মসনদে বসলেও নিজের ইচ্ছামাফিক শাসন করতে কেউ তাকে বাধা দিতে পারবে না। দিল্লি তাকে তার নিজের খেলায় হারিয়ে দেয়। তার ওই বেবুঝ বেপরোয়া পানার চড়া মাশুল তিনি একাই শুধু দেননি, দেশ ও জাতিকেও দিতে হয়। ধাপে ধাপে বাড়ন্ত দিল্লির দক্ষিণার দাবি মেটাতে গিয়ে আমরা আমাদের জাতীয় অস্থিত্বকে লাটে ওঠাব কিনা, এখন এই বিষয়টা ভাবার সময় এসেছে। আর দেরি করলে পরে পস্তাব কিন্তু নাজাত পাব না।
ভারতীয় ও তাদের ঋক বেদের ভাষার বাংলাদেশী ‘অধৈর্য’দের পরে বানানো অতিকথায় আমরা যদি পুরোপুরি মজে গিয়ে না থাকি, তা হলে আমাদের জন্য একথা বোঝা ও মনে রাখা খুবই জরুরি যে, মুজিব ও জিয়াউর রহমান দু’জনই দেশকে দিল্লির অজগরদের নাগপাশ থেকে বের করে আনার জন্য সাধ্যমত চেষ্টা করেছেন। আমাদের বদ নসিব, তারা খুব একটা কামিয়াব হননি।
জন্মের পর বাংলাদেশ সম্পর্কে মুজিবভক্ত মশহুর বাংলাদেশী রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. রওনক জাহানের আক্ষেপ মেশানো রায় ছিল : ভূরাজনৈতিক অবস্থার দরুন এই দেশের নিয়তি হলো দিল্লির করদরাজ্য বনা। তাছাড়া মড়ার উপর খাঁড়ার ঘার মতন, দিল্লির শাসকরা নিজেদের নয়া দেশের একমাত্র পিভট বা চালকদণ্ড বানানোর জন্য ২৫-বছর মেয়াদি চুক্তি এবং জাতীয় পরিচয় প্রকৃতি ও রাষ্ট্রের দিকদর্শন ঠিকঠাক করে দিয়ে রচনা করা এক সাংবিধানিক স্রেইট জ্যাকেট পরিয়ে বেকায়দায় ফেলা জাতিকে আটকবন্দি করেন। তার ওপর আর্মিকে কার্যত অস্ত্রহীন এবং অর্থনীতিকে তলাছাড়া বানিয়ে দেশকে ঠুঁটো জগন্নাথ বানান। এসব সামাল দেয়ার পাশাপাশি দেশকে দিল্লির অজগরের নাগপাশ থেকে বের করে আনা ও নতুন করে সাজানো সহজ ছিল না। মুজিব কিংবা জিয়ার পক্ষে সম্ভব হয়নি। উভয়েই কমবেশি ‘পারা গেলে আগাই, বাধ্য হলে পিছাই’—এই কৌশলের বেড়াজাল থেকে নিজেদের বের করতে পারেননি। এদের কেউই দুশমনকে খেপানোর ঝুঁকি নিয়ে হলেও জাতির হিম্মতকে ব্যবহারের কোনো পদক্ষেপ নেননি। পরে যারা শাসন ক্ষমতা পান তারাও একই ধারা বজায় রাখেন। সম্ভবত তাদের বুঝবুদ্ধি মতন এমন ঝুঁকি নেয়ার পরিবেশ ও সুযোগ তখন ছিল না।
কারণ যাই থাকুক না কেন, দেশের পক্ষে দিল্লির অজগরের নাগপাশ থেকে বের হওয়া সম্ভব হয়নি। বরং আমাদের দেশীয় ‘অধৈর্য’দের সহায়তায় নিজেদের আধিপত্যকে দড় করার বাড়তি সময় ও সুযোগ তাদের দেয়া হয়। কাউকে দোষাদুষি না করে আজ এই সত্যকে স্বীকার করাই ভালো। দিল্লির শাসকরা যে তাদের নাগপাশকে দড় করার কাজে ওই সময় ও সুযোগ পুরো মাত্রায় ব্যবহার করে, এই বাস্তব সত্যকে অস্বীকার করা যাবে না। আপনাদের ঋকবেদের কুকুরের মুখোশধারী দেশীয় মহিলা-সন্ত্রাসী শরমার কথা মনে পড়ে? হুমকি-ধমকি দিয়ে স্বজাতির কাছ থেকে আর্য দখলদার ইন্দ্রের জন্য বশ্যতা ও নজরানা আদায় করা ছিল তার কাজ। যার জন্য স্বজাতির কাছে সে ‘ইন্দ্রের কুত্তি’ বলে ঘৃণিত হয়। যারা শরমার কাহিনী জানেন অথবা নুয়ামি ক্লাইনের শক ডকট্রিন পড়েছেন তাদের কাছে আমাদের প্রধানমন্ত্রী ও তার দিল্লির পৃষ্ঠপোষকদের বর্তমানের কটমটে শাসানির মধ্যেই রয়েছে উপরোক্ত বাস্তব সত্যের অনস্বীকার্য প্রমাণ।
খোদ মুজিবের ভাষার আমাদের ‘চাটার দল’কে পালার জন্য তাদের নিজেদের রাষ্ট্রীয় টাকা-পয়সা গচ্ছা দিতে হয়নি। এর জন্য বছরে সাত-আট বিলিয়ন ডলারের স্মাগ্লিংয়ের জমজমাট কারবারের মুনাফার সামান্য এক হিস্সা খরচ করাই যথেষ্ট। ব্রিটিশ বেনিয়াদের মতন তারাও কইয়ের তেলে কই ভাজা করে আসছেন।
বাংলাদেশ আর্মির কতেক বেঈমান ও বেবুঝ সেনানায়কের সহায়তায় বানানো পুতুল সরকার ও নির্বাচনী জুয়াচুরির বদৌলতে আমাদের প্রধানমন্ত্রীর রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের পর থেকে ধাপে ধাপে দেশকে এমন অবস্থায় নিয়ে আসা হয়েছে, যেখান থেকে জাতিকে উদ্ধার করতে হলে হয়তো পেট্রিয়টিক লড়ুয়াদের এগিয়ে আসতে হতে পারে। নতুবা দেশের সিকিমাইজেশন ঠেকানো যাবে না।
এসব বাস্তব সত্যকে অস্বীকার করার অর্থ হবে স্বজাতি হননে সহায়তা করার মতন জাতিদ্রোহ। পাতানো বিডিআর বিদ্রোহের পরিণতি শুধু আর্মিকে অধৈর্যদের কর্তৃত্বে নিয়ে আসা নয়, বিডিআরের বিকল্প বিজিবিকে দিয়ে ঝাঁঝরা বর্ডারকে আরও বেশি ঝাঁঝরা করার পাশাপাশি দরকারমত প্রধানমন্ত্রীর ফালতু রক্ষীবাহিনীর কাজ করান। শুধু তাকে তাড়ালেই এসব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ‘অধৈর্য’ উইপোকামুক্ত হবে না; যদি হয়ও-বা, আবার আক্রান্ত হবে না বলে নিশ্চিন্ত হওয়া যাবে না।
লড়াইয়ের বিষয়টা লড়ুকেরা দেখবেন। এটা নিয়ে আমাদের মতো অক্ষম তামাদিদের কথা না বলাই ভালো। তবে এর সঙ্গে আরেকটা কথা ভোলা ঠিক হবে না। দুশমনকে আপাতত হটাতে পারলেও, তারা উধাও হয়ে যাবে না, তাদের আধিপত্যবাদী খায়েশ ও চেষ্টা থামবে না। তাদের সঙ্গে টেক্কা দিয়েই আমাদের টিকে থাকতে হবে। ঘরে সিঁদ কাটার সব পথঘাট বন্ধ করতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। তাই বর্তমান কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি থাকার পরও এই সম্পর্কে এখন থেকেই চিন্তা-ভাবনা শুরু করতে হবে। প্রস্তুতি নিতে হবে; প্রো-অ্যাকটিভ হতে হবে।
আধিপত্যবাদকে ঠেকানোর ইতিহাসের শিক্ষা
যে কোনো আধিপত্যবাদকে ঠেকানোর দুটি ট্রাইড অ্যান্ড টেস্টেড গ্র্যান্ড স্ট্র্যাটেজি ইতিহাসে মিলে। এই দুই স্ট্র্যাটেজির পহেলাটা বলে, যুদ্ধ কিংবা বিপ্লবের মাধ্যমে নিজের ভূরাজনৈতিক পরিবেশ পাল্টাও। এর জন্য দরকার হয় সমাজের সামরিকীকরণ এবং তৈরি হওয়া লড়াকুদের ভূরাজনৈতিক পরিবেশ পাল্টানোর কাজে লাগানো। বাস্তবে এই স্ট্র্যাটেজি আক্রমণ ও বিজয় (জার্মানি ও জাপান : ১৯৩১ থেকে ১৯৪৫ সাল) থেকে শুরু করে, ওয়ার্ল্ড রিভলিউশন (সোভিয়েত ইউনিয়ন) এবং জনযুদ্ধকে উত্সাহিত করা (চীন ও কিউবা) ইত্যাদিসহ নানান রূপ নিতে পারে।
দুশমনের আকার-আয়তনের কথা বিবেচনা করে বাংলাদেশের জন্য জার্মানি কিংবা জাপানের মতন সরাসরি আক্রমণ ও বিজয়ের পথ ধরার কথা ভাবা না গেলেও, সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং চীন ও কিউবার কৌশলের মতন কৌশল নেয়ার পথে কোনো বড় রকমের বাধা দেখি না। বিদ্রোহী নর্থ-ইস্ট ও ইস্ট-সেন্ট্রেল ট্রাইবেল বেল্ট ছাড়াও ধূমায়িত দলিত ও শিখ অসন্তুষ্টির কথা মনে রাখলে, দিল্লির বিরুদ্ধে এই দুই স্ট্র্যাটেজি খুবই উপযুক্ত বিবেচিত হওয়ার কথা। অবশ্য এই কৌশল রপ্ত করার কথা গুরুত্বের সঙ্গে ভাবার আগে, আমাদের দুশমনের আক্রমণ ও নাশকতা ঠেকানোর মতো মজবুত জাতীয় ঐক্য গড়া এবং জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা চাই। তা না হলে আমরা আবার বিগত কয়েক বছরের তামাশার পুনরাবৃত্তিই শুধু করব না, নিজেদের ও সম্ভাব্য সহ-লড়াকুদেরও পথে বসাব। এই প্রসঙ্গে আরেকটা বিষয় মনে রাখতে হবে। এই দুশমনকে ঠেকাতে আশপাশের প্রায় সব দেশই চায়। এদের কারও সঙ্গে আমাদের এমন কোনো জাতিগত কিংবা রাষ্ট্রীয় স্বার্থের বিবাদ নেই যা তাদের সঙ্গে মিলে সম্মিলিত কিংবা সমন্বিত উদ্যোগের পথে বাদ সাধতে পারে। এমন মিলিত উদ্যোগ নিতে পারলে আমরা আরও সহজে দুশমনকে কাবু করতে পারি।
ইতিহাসে মেলা দুসরা স্ট্র্যাটেজির নির্দেশ হলো, দেশকে আর্থিকভাবে সবল ও শক্তিশালী বানাও। পহেলা স্ট্র্যাটেজির মতো এই স্ট্র্যাটেজির বাস্তব রূপও একাধিক হতে পারে। আর্থিক দিক দিয়ে আগুয়ান দেশগুলোর নয়া শিল্প প্রযুক্তির অনুকরণ (১৮৬৮ সাল থেকে ১৯৩০-এর দশক এবং আবার ১৯৪৯ থেকে শুরু করা জাপানের রাষ্ট্র নির্দেশিত শিল্পায়ন) এবং উন্নত শিল্প ব্যবস্থা ও আর্থিক শক্তিসম্পন্ন রাষ্ট্রের শিল্পজাত সামগ্রীর অসম প্রতিযোগিতার হাত থেকে নিজের উঠতি অর্থনীতিকে রেহাই দেয়ার জন্য উচ্চতর আমদানি শুল্কের রক্ষাব্যূহের ব্যবহার (আলেকজান্ডার হেমিল্টন ও জার্মান-আমেরিকান অর্থনীতিবিদ ফ্রেডারিক লিস্টের চিন্তাধারার আলোকে ১৯ শতক থেকে ২০ শতকের পহেলা দিক পর্যন্ত সময়ের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সেকেন্ড ওয়ার্ল্ড ওয়ারে পরাজিত জার্মানি ও মাও পরবর্তী চীন)।
বাস্তব রূপ যাই হোক না কেন, এই স্ট্র্যাটেজির জন্য দরকার হয় অর্থনীতির রাষ্ট্রীয় নির্দেশনা, বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্মিলিত সংস্থা এবং শিল্পঋণ বরাদ্দের ক্ষেত্রে কৌশলগত অগ্রাধিকার দেয়া। জাতীয়তাবাদী শিল্প উদ্যোক্তাতের মাধ্যমে খুব মন দিয়ে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এই স্ট্র্যাটেজি কার্যকর না করলে এর শেষ পরিণতি খারাপ হতে পারে। গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্ব এবং ঐতিহ্যিক কিংবা অপরাপর রাজনৈতিক এবং তামুদ্দনিক নীতিমালার জায়গায় আর্থিক উন্নয়নই সমাজের প্রধানতম আইনসম্মত লক্ষ্য ও অবয়বের স্বাভাবিক ভিত্তিতে পরিণত হয়ে যেতে পারে এবং দেশের সংহতি, সার্বভৌম উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং সার্বভৌমত্বকে কমজোর করে দেশকে গ্লোবালিস্ট ফাইন্যান্সসিয়াল এলিটদের ভাষার ‘ডেভেলপমেন্টাল স্টেট’ বানিয়ে দিতে পারে। হালের কানেকটিভিটি, গ্লোবালাইজেশন এবং ফ্রি-ট্রেডের মাহাত্ম্য প্রচারণার পেছনে লুকিয়ে থাকা এমন আধিপত্যবাদী ও ডেভেলপমেন্টাল স্টেটের চোরাগুপ্তা গর্ত সম্পর্কে সজাগ থাকাও দরকার। আমরা এরই মাঝে এই গর্তে অনেকটা ডুবে গেছি। তা শোধরানো দরকার। দিল্লির সঙ্গে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর করা ত্রিশটি অ্যাগ্রিমেন্ট ও ট্রিটির সব ক’টাকে প্রকাশ্যে যাচাই-বাছাই না করে এবং পার্লামেন্টের ফ্রি ভোটে অনুমতি ছাড়া না রাখার আশ্বাস জাতিকে দেয়া উচিত।
প্রথমে ঘর ঠিকঠাক করতে হবে
উপরে আলোচিত উভয় স্ট্র্যাটেজির বিভিন্ন রূপ থেকে বাছাই করা কৌশল কিংবা আমাদের বাস্তব অবস্থার আলোকে রচিত নয়া কৌশল যাই আমরা ঠিক করি না কেন, তা কার্যকর করার পাশাপাশি ঘরকেও আমাদের ঠিকঠাক করতে হবে। তাকে ভেতরের দিক থেকে মজবুত এবং বাইরের দিক থেকে সিঁদ কাটা প্রুফ বানাতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে দেশবাসীকে জাতীয় সার্বভৌম আশা-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়িত করার সংগ্রামের জন্য তৈরি করতে হবে।
এর জন্য অবশ্যই দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে। দিল্লির বাঘছালের সিংহাসনধারীর শিকারি কুকুর কিংবা ঘর পোড়ানো হনুমান বনার পথঘাট বন্ধ করতে হবে। সিভিক এডুকেশনের পাশাপাশি ‘অধৈর্য’ পঞ্চম বাহিনীর শিকড় খুঁড়ে তুলে ফেলা খুবই জরুরি। নিরুত্সাহিত করা ও বুঝবুদ্ধি দিয়ে থামানোর পাশাপাশি তাদের ভবিষ্যত্ ‘ব্রিডিং গ্রাউন্ড’ না রাখা আমাদের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা স্ট্র্যাটেজির অন্যতম লক্ষ্য হতে হবে। এই লক্ষ্যের কথা মনে রেখে দেশের শাসন ব্যবস্থা ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুন করে গড়তে হবে। জাতি ও রাষ্ট্রের নিরাপত্তার দায়-দায়িত্ব সবচেয়ে আগে, এই মহাসত্যকে অন্য কোনো বুজরুকি দিয়ে ধামাচাপা দেয়া যাবে না। এখন থেকেই জনমত তৈরি করতে হবে।
আমরা যেন ভুলে না যাই
এসব করতে গিয়ে দুটি মৌলিক সত্যকে খুবই গুরুত্বের সঙ্গে মনে রাখতে হবে। দেশবাসীর ঐক্য ছাড়া যেমন শক্ত সবল দেশ গড়া যাবে না, তেমনি জাতিরাষ্ট্রের জাতির স্বকীয়তাকে অস্বীকার কিংবা ধামাচাপা দিয়ে শক্ত সবল জাতিরাষ্ট্র গড়ার কথা চিন্তাও করা যাবে না।
আমাদের জাতিরাষ্ট্রের জাতি পরিচয় হলো মুসলিম। শুধু ভৌগোলিক এখতিয়ারের চৌহদ্দির দিক দিয়েই নয়, জাতি পরিচয়ের দিক দিয়েও বাংলাদেশ পূর্ব পাকিস্তানের উওরাধিকারী। জ্ঞানপাপী কিংবা জ্ঞানশূন্য ‘অধৈর্য’ ছাড়া আর কারও পক্ষে শত শত বছরের এক সভ্যতাভুক্ত জাতির ২৫ বছরের কম সময়ের ভেতর জাতিত্ব পাল্টানোর অসাধারণ তত্ত্ব বিলানো সম্ভব নয়। তার অনেক ভক্ত হয়তো জানেন না, দিল্লির পোষা ‘অধৈর্য’দের দ্বারা ‘বঙ্গবন্ধু’ ও ‘হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি’র খেতাব এবং ভাষাভিত্তিক জাতিতত্ত্ব, সেক্যুলারিজম ও সোশায়ালিজমের আর্দশিক রং-চং এবং লেনিন পিস প্রাইজের রোশনাই দিয়ে সাজানো সত্ত্বেও মুজিব আনকোরা মুসলিম জাতীয়তাবাদী ‘বাঙাল’ এবং এন্টি সোশিয়ালিস্ট ফ্রি মার্কেটিয়ার রয়ে যান। বস্তুত বাংলাদেশের মুসলমান জাতির আবাসিক পরিচয়রূপে সরকারি সব ইংরেজি পত্র-পুস্তিকায় মুজিব ্তুইবহমধষর্থ বা বাংলাভাষী না ব্যবহার করে ্তুইবহমধষবব্থ বা বাংলার বাসিন্দা কথাটা ব্যবহার করে গেছেন। এর উল্লেখ অন্যদের মধ্যে ড. রওনক জাহান করেছেন। মুজিব ও তার পরামর্শদাতারা বাঙালি বলতে যে মূলত পূর্ব পাকিস্তানি মুসলমানদের বুঝতেন, একথা আরও স্পষ্ট করে ব্যাখ্যা করেছেন তার অন্যতম পরামর্শদাতা প্রফেসর রেহমান সোবহান। বেঁচে থাকলে সবচেয়ে আগে মুজিব নিজেই এই নির্ভেজাল সত্যকে তুলে ধরতেন, এমনটা মনে করার আরও কারণ রয়েছে। দিল্লির বিরাগ-বিরোধিতা সত্ত্বেও পাকিস্তান থেকে দেশে ফেরার দিন থেকেই তিনি বাংলাদেশকে দুনিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম রাষ্ট্র বলতে এবং রুশ-ভারত ব্লকের বাইরের মুসলিম এবং পশ্চিমা দেশগুলো ও চীনের কাছে ভেড়ার জন্য চেষ্টাচরিত শুরু করেন এবং পরে বাংলাদেশকে ইসলামিক সিভিলাইজেশনের সম্মিলিত ‘আমরা’র প্রতিভূ ওআইসি’র সদস্য বানান। সন্দিহানরা মুজিবের কুটুম ও তার প্রশাসনের পয়লা কাতারের আমলা মুহাম্মদ আসাফদ্দৌলার বয়ানি শুনে কিংবা তখনকার ঢাকায় কর্মরত ভারতীয় ডেপুটি হাইকমিশনার জেএন দীক্ষিতের লেখা পড়ে নিজেরাই এর সত্যতা জানতে পারবেন। সঙ্গে সঙ্গে তারা আরও জানতে পারবেন, দিল্লির আধিপত্যবাদীরা বরাবর এই রংচংশূন্য আসল মুজিব সম্পর্কে সচেতন ছিলেন বলেই তারা তাদের পোষা অধৈর্য বা পঞ্চম বাহিনী দিয়ে তাকে রঙ-বেরঙের প্রলেপ দিয়ে ঢেকে আমাদের সাদাসিধা, দিশবুদ্ধিহারাদের বেদিশা, বিপথগামী করতে উঠেপড়ে লাগেন।
এসব অসাধারণ ছলাকলার কথা জেনে যাদের বিশ্বাস করতে কষ্ট হবে, তাদের দিল্লির শাসকদের ‘কূটকৌশলের বেদ’ কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র পড়া ও তাদের কালচারাল ডিএনএ, মন-মানসিকতা ও চালিয়াতি সম্পর্কে আরও জানা দরকার। বস্তুত, তাদের ধূর্ত কূটনীতি ও কূটকৌশলকে আমাদের সিভিক এডুকেশনের অংশ করা খুবই জরুরি। এর সঙ্গে আমাদের ভাষা ও ইতিহাস চুরির ইতিবৃত্তকেও এই পাঠ্য তালিকায় রাখা দরকার।
ভৌগোলিক এখতিয়ার ও জাতি পরিচয়ের দিক দিয়ে বাংলাদেশ পূর্ব পাকিস্তানের খাটি উত্তরাধিকারী—একথা শুনে কেউ যেন ভেবে না বসেন এগুলো মোহাম্মদ আলি জিন্নাহ কিংবা মুসলিম লীগের তৈরি। ভৌগোলিক দিক দিয়ে আজকের বাংলাদেশ মুসলিম লীগ গঠনের এক বছর আগে বানানো মুসলিমপ্রধান পূর্ব বাংলা ও আসাম প্রদেশের পূর্ব বাংলা অংশের সামান্য রদবদল করা রূপ। আর এদেশের মুসলিম জাতিত্বের অস্তিত্ব কম করে হলেও ১৩ শতকের শুরু থেকে। মুসলিম হুকুমতকালে বঙ্গ থেকে বাংলা পরিচিতির উদ্ভব ও ভৌগোলিক ব্যাপ্তি ঘটলেও মূল বঙ্গের এথনিক, লেঙ্গুস্টিক ও ইতিহাসের অভিজ্ঞতার ভিন্নতাজাত স্বকীয়তা মুছে যায়নি। অন্তত নব্য বাংলার বাড়তি অংশের গুপ্ত যুগ (চার থেকে সাত শতক) থেকে ব্রাহ্মণ্যবাদের আখড়া বনার পর থেকে এই ভিন্নতাবোধ আরও সবল হয়। পরে এক দিকে ব্রাহ্মণ্যবাদীদের হাতে নির্যাতিত-নিষ্পেষিত বঙ্গের সংখ্যাগুরু বোদ্ধ ধর্মীদের আহ্বান ও সহায়তায় প্রতিষ্ঠিত মুসলিম হুকুমতের অসাধারণ অর্থনৈতিক সাফল্য, অসংখ্য বৌদ্ধ ধর্মীর ইসলাম কবুল এবং বঙ্গে মুসলিম সংখ্যাগুরুত্ব প্রতিষ্ঠা, আরেক দিকে অপর অংশের ব্রাহ্মণ্যবাদীদের বৈষ্ণব মুভমেন্ট ও তার ব্রাহ্মণ নেতৃত্বের উদ্যোগে ১৬ শতকে মুসলিম শাসন উত্খাতকামী ‘হিন্দুধর্ম’রূপী জাতীয়তাবাদী ঐক্যজোট গঠন এবং ১৮ শতকের মাঝামাঝি সময় নদিয়ার মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের নেতৃত্বে সংগঠিত ‘হিন্দু’ নেতাদের উদ্যোগে ব্রিটিশ বেনিয়াদের দিয়ে সুবে বাংলার মুসলিম হুকুমতের উত্খাতের ভেতর দিয়ে এই দ্বিজাতি তত্ত্বের সংঘাত শুধু বহমান রয়নি, আরও বেশি শানিত হয়। ১৯ শতকের বেশিরভাগ সময়কাল জুড়ে তরিকা-ই-মুহাম্মদিয়ার পতাকাতলে স্বাধীনতা উদ্ধারের যে সশস্ত্র সংগ্রাম চলে তার বেশির ভাগ সংগঠক ও সৈনিক শুধু বঙ্গবাসী ছিলেন না, এই বঙ্গবাসী মুসলমানরাই উদ্যোগী হয়ে বিশ শতকের শুরুতে ঢাকায় মুসলিম লীগ গঠন করেন। আজকের বাংলাদেশ হওয়ার পরও এই ‘হিন্দু-মুসলিম’ দ্বিজাতিত্বই শুধু বহাল রয়েছে এমন নয়, মুসলিম জাতিত্বের ভেতর দিয়ে অন্তত দেড় হাজার বছরেরও বেশি পুরনো দীক্ষিতের ভাষার ‘বাঙাল ও ঘটির’ ঐতিহাসিক দ্বন্দ্ব-বিবাদের স্মৃতি ও ভিন্নতা বোধ জারি রয়েছে।
হিন্দুত্বের ‘আমরা’র বিপরীত ‘ওরা’ মুসলমান হলেও বাংলা কিংবা ভারতের হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা বরাবর মুসলিম জাতিত্বকে স্বীকার না করার কৌশল নেন। তাদের যুক্তি হলো মুসলিম শাসকদের জোর-জবরদস্তিতে ধর্ম পাল্টানো ‘হিন্দু’দের নিয়ে মুসলমান সমাজ গড়ে উঠেছে, তাই তারা জাতিগতভাবে ‘হিন্দু’। পণ্ডিত নেহেরুর বানোয়াট তথ্য মতে বাংলার ৯৮ ভাগ মুসলমান হলেন ধর্ম পাল্টানো ‘হিন্দু’; তাও আবার তার মতো আর্য রক্তধারী ব্রাহ্মণ নয়, অচ্ছ্যুত নমশূদ্রদের আওলাদ। ধর্ম ও সমাজ ছাড়লেও রক্ত ও মাটির সম্পর্ক ছাড়া যায় না, জার্মান বর্ণবাদীদের কাছ থেকে ধার করা এই আজব যুক্তির কথা বাদ দিলেও তাদের দাবির ঐতিহাসিক ভিত্তিহীনতা লুকানো থাকে না। মুসলমান হুকুমতের আগে বাংলা ব্রাহ্মণ্যবাদী হুকুমতে ছিল; কিন্তু প্রজাকুল ছিলেন বৌদ্ধধর্মী। এরাই ছিলেন মুসলিম হুকুমতের সহায়ক শক্তি এবং মুসলমান ও ‘হিন্দু’ উভয় সমাজের সংখ্যাস্ফীতির কারণ। ইংরেজ সোশিওলজিক্যাল হিস্টোরিয়ান জেইমস ওয়াইজ এবং হিন্দু ইতিহাসবিদ রমেশচন্দ্র মজুমদারের লেখা পড়লেই ভারতীয় আধিপত্যবাদীদের এই ‘ইতিহাস চুরি’র বহর আন্দাজ করতে কারও অসুবিধা হবে না।
লেন্দুপ
১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসে যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগ থেকেই ধাইয়ের কুমতলব এবং অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী ও ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা র-এর বানানো মুজিব বাহিনীর নেতাদের জোগালি সাজার কথা জানতে পেরে জেনারেল আতাউল গনি ওসমানী ও তার সিনিয়র অফিসারদের অনেকে সন্ত্রস্ত হয়ে ওঠেন। স্বাধীনতাকামী এসব অফিসারের ভেতর মেজর এমএ জলিলকে নয়া দেশের পয়লা রাজবন্দি বনতে হয়। পাকিস্তান আর্মির রেখে যাওয়া অস্ত্রপাতি ও গোলাবারুদ এবং উর্দুভাষী মুহাজিরদের শিল্প-কারখানা ও ব্যবসার মালসামানা ভারতে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে আপত্তি করা ছিল তার কসুর। যুদ্ধ শেষ হওয়ার ঠিক পরের দিনই তিনি এ নিয়ে ভারতীয় সেনা কর্তৃপক্ষ ও বাংলাদেশের অস্থায়ী প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি দেন। দুই সপ্তাহের ভেতর জলিল তার জবাব পান। ভারতীয় আর্মি তাকে বন্দি করে। এতে বাংলাদেশ সরকারও মৌন সম্মতি জোগায়। তাজউদ্দীনকে সরিয়ে শেখ মুজিবুর রহমান নিজে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরও তার পক্ষে জলিলকে আর্মিতে রাখা সম্ভব হয়নি।
দল ও আন্দোলনের জন্য সংখ্যালঘু ও ভারতপন্থীদের বাড়তি সমর্থন ও আর্থিক সাহায্যের জন্য ভারত সরকারের কাছে ধরনা দিলেও, মুজিব দিল্লির সেবাদাস হওয়ার মতন মানুষ ছিলেন না। মুসলিম রাজনৈতিক কালচারের ‘সুলতানি’ ধারার তাসিরে বড় হওয়া মুজিব মনে করেছিলেন, যেমন তেমন করে মসনদে বসলেও নিজের ইচ্ছামাফিক শাসন করতে কেউ তাকে বাধা দিতে পারবে না। দিল্লি তাকে তার নিজের খেলায় হারিয়ে দেয়। তার ওই বেবুঝ বেপরোয়া পানার চড়া মাশুল তিনি একাই শুধু দেননি, দেশ ও জাতিকেও দিতে হয়। ধাপে ধাপে বাড়ন্ত দিল্লির দক্ষিণার দাবি মেটাতে গিয়ে আমরা আমাদের জাতীয় অস্থিত্বকে লাটে ওঠাব কিনা, এখন এই বিষয়টা ভাবার সময় এসেছে। আর দেরি করলে পরে পস্তাব কিন্তু নাজাত পাব না।
ভারতীয় ও তাদের ঋক বেদের ভাষার বাংলাদেশী ‘অধৈর্য’দের পরে বানানো অতিকথায় আমরা যদি পুরোপুরি মজে গিয়ে না থাকি, তা হলে আমাদের জন্য একথা বোঝা ও মনে রাখা খুবই জরুরি যে, মুজিব ও জিয়াউর রহমান দু’জনই দেশকে দিল্লির অজগরদের নাগপাশ থেকে বের করে আনার জন্য সাধ্যমত চেষ্টা করেছেন। আমাদের বদ নসিব, তারা খুব একটা কামিয়াব হননি।
জন্মের পর বাংলাদেশ সম্পর্কে মুজিবভক্ত মশহুর বাংলাদেশী রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. রওনক জাহানের আক্ষেপ মেশানো রায় ছিল : ভূরাজনৈতিক অবস্থার দরুন এই দেশের নিয়তি হলো দিল্লির করদরাজ্য বনা। তাছাড়া মড়ার উপর খাঁড়ার ঘার মতন, দিল্লির শাসকরা নিজেদের নয়া দেশের একমাত্র পিভট বা চালকদণ্ড বানানোর জন্য ২৫-বছর মেয়াদি চুক্তি এবং জাতীয় পরিচয় প্রকৃতি ও রাষ্ট্রের দিকদর্শন ঠিকঠাক করে দিয়ে রচনা করা এক সাংবিধানিক স্রেইট জ্যাকেট পরিয়ে বেকায়দায় ফেলা জাতিকে আটকবন্দি করেন। তার ওপর আর্মিকে কার্যত অস্ত্রহীন এবং অর্থনীতিকে তলাছাড়া বানিয়ে দেশকে ঠুঁটো জগন্নাথ বানান। এসব সামাল দেয়ার পাশাপাশি দেশকে দিল্লির অজগরের নাগপাশ থেকে বের করে আনা ও নতুন করে সাজানো সহজ ছিল না। মুজিব কিংবা জিয়ার পক্ষে সম্ভব হয়নি। উভয়েই কমবেশি ‘পারা গেলে আগাই, বাধ্য হলে পিছাই’—এই কৌশলের বেড়াজাল থেকে নিজেদের বের করতে পারেননি। এদের কেউই দুশমনকে খেপানোর ঝুঁকি নিয়ে হলেও জাতির হিম্মতকে ব্যবহারের কোনো পদক্ষেপ নেননি। পরে যারা শাসন ক্ষমতা পান তারাও একই ধারা বজায় রাখেন। সম্ভবত তাদের বুঝবুদ্ধি মতন এমন ঝুঁকি নেয়ার পরিবেশ ও সুযোগ তখন ছিল না।
কারণ যাই থাকুক না কেন, দেশের পক্ষে দিল্লির অজগরের নাগপাশ থেকে বের হওয়া সম্ভব হয়নি। বরং আমাদের দেশীয় ‘অধৈর্য’দের সহায়তায় নিজেদের আধিপত্যকে দড় করার বাড়তি সময় ও সুযোগ তাদের দেয়া হয়। কাউকে দোষাদুষি না করে আজ এই সত্যকে স্বীকার করাই ভালো। দিল্লির শাসকরা যে তাদের নাগপাশকে দড় করার কাজে ওই সময় ও সুযোগ পুরো মাত্রায় ব্যবহার করে, এই বাস্তব সত্যকে অস্বীকার করা যাবে না। আপনাদের ঋকবেদের কুকুরের মুখোশধারী দেশীয় মহিলা-সন্ত্রাসী শরমার কথা মনে পড়ে? হুমকি-ধমকি দিয়ে স্বজাতির কাছ থেকে আর্য দখলদার ইন্দ্রের জন্য বশ্যতা ও নজরানা আদায় করা ছিল তার কাজ। যার জন্য স্বজাতির কাছে সে ‘ইন্দ্রের কুত্তি’ বলে ঘৃণিত হয়। যারা শরমার কাহিনী জানেন অথবা নুয়ামি ক্লাইনের শক ডকট্রিন পড়েছেন তাদের কাছে আমাদের প্রধানমন্ত্রী ও তার দিল্লির পৃষ্ঠপোষকদের বর্তমানের কটমটে শাসানির মধ্যেই রয়েছে উপরোক্ত বাস্তব সত্যের অনস্বীকার্য প্রমাণ।
খোদ মুজিবের ভাষার আমাদের ‘চাটার দল’কে পালার জন্য তাদের নিজেদের রাষ্ট্রীয় টাকা-পয়সা গচ্ছা দিতে হয়নি। এর জন্য বছরে সাত-আট বিলিয়ন ডলারের স্মাগ্লিংয়ের জমজমাট কারবারের মুনাফার সামান্য এক হিস্সা খরচ করাই যথেষ্ট। ব্রিটিশ বেনিয়াদের মতন তারাও কইয়ের তেলে কই ভাজা করে আসছেন।
বাংলাদেশ আর্মির কতেক বেঈমান ও বেবুঝ সেনানায়কের সহায়তায় বানানো পুতুল সরকার ও নির্বাচনী জুয়াচুরির বদৌলতে আমাদের প্রধানমন্ত্রীর রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের পর থেকে ধাপে ধাপে দেশকে এমন অবস্থায় নিয়ে আসা হয়েছে, যেখান থেকে জাতিকে উদ্ধার করতে হলে হয়তো পেট্রিয়টিক লড়ুয়াদের এগিয়ে আসতে হতে পারে। নতুবা দেশের সিকিমাইজেশন ঠেকানো যাবে না।
এসব বাস্তব সত্যকে অস্বীকার করার অর্থ হবে স্বজাতি হননে সহায়তা করার মতন জাতিদ্রোহ। পাতানো বিডিআর বিদ্রোহের পরিণতি শুধু আর্মিকে অধৈর্যদের কর্তৃত্বে নিয়ে আসা নয়, বিডিআরের বিকল্প বিজিবিকে দিয়ে ঝাঁঝরা বর্ডারকে আরও বেশি ঝাঁঝরা করার পাশাপাশি দরকারমত প্রধানমন্ত্রীর ফালতু রক্ষীবাহিনীর কাজ করান। শুধু তাকে তাড়ালেই এসব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ‘অধৈর্য’ উইপোকামুক্ত হবে না; যদি হয়ও-বা, আবার আক্রান্ত হবে না বলে নিশ্চিন্ত হওয়া যাবে না।
লড়াইয়ের বিষয়টা লড়ুকেরা দেখবেন। এটা নিয়ে আমাদের মতো অক্ষম তামাদিদের কথা না বলাই ভালো। তবে এর সঙ্গে আরেকটা কথা ভোলা ঠিক হবে না। দুশমনকে আপাতত হটাতে পারলেও, তারা উধাও হয়ে যাবে না, তাদের আধিপত্যবাদী খায়েশ ও চেষ্টা থামবে না। তাদের সঙ্গে টেক্কা দিয়েই আমাদের টিকে থাকতে হবে। ঘরে সিঁদ কাটার সব পথঘাট বন্ধ করতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। তাই বর্তমান কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি থাকার পরও এই সম্পর্কে এখন থেকেই চিন্তা-ভাবনা শুরু করতে হবে। প্রস্তুতি নিতে হবে; প্রো-অ্যাকটিভ হতে হবে।
আধিপত্যবাদকে ঠেকানোর ইতিহাসের শিক্ষা
যে কোনো আধিপত্যবাদকে ঠেকানোর দুটি ট্রাইড অ্যান্ড টেস্টেড গ্র্যান্ড স্ট্র্যাটেজি ইতিহাসে মিলে। এই দুই স্ট্র্যাটেজির পহেলাটা বলে, যুদ্ধ কিংবা বিপ্লবের মাধ্যমে নিজের ভূরাজনৈতিক পরিবেশ পাল্টাও। এর জন্য দরকার হয় সমাজের সামরিকীকরণ এবং তৈরি হওয়া লড়াকুদের ভূরাজনৈতিক পরিবেশ পাল্টানোর কাজে লাগানো। বাস্তবে এই স্ট্র্যাটেজি আক্রমণ ও বিজয় (জার্মানি ও জাপান : ১৯৩১ থেকে ১৯৪৫ সাল) থেকে শুরু করে, ওয়ার্ল্ড রিভলিউশন (সোভিয়েত ইউনিয়ন) এবং জনযুদ্ধকে উত্সাহিত করা (চীন ও কিউবা) ইত্যাদিসহ নানান রূপ নিতে পারে।
দুশমনের আকার-আয়তনের কথা বিবেচনা করে বাংলাদেশের জন্য জার্মানি কিংবা জাপানের মতন সরাসরি আক্রমণ ও বিজয়ের পথ ধরার কথা ভাবা না গেলেও, সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং চীন ও কিউবার কৌশলের মতন কৌশল নেয়ার পথে কোনো বড় রকমের বাধা দেখি না। বিদ্রোহী নর্থ-ইস্ট ও ইস্ট-সেন্ট্রেল ট্রাইবেল বেল্ট ছাড়াও ধূমায়িত দলিত ও শিখ অসন্তুষ্টির কথা মনে রাখলে, দিল্লির বিরুদ্ধে এই দুই স্ট্র্যাটেজি খুবই উপযুক্ত বিবেচিত হওয়ার কথা। অবশ্য এই কৌশল রপ্ত করার কথা গুরুত্বের সঙ্গে ভাবার আগে, আমাদের দুশমনের আক্রমণ ও নাশকতা ঠেকানোর মতো মজবুত জাতীয় ঐক্য গড়া এবং জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা চাই। তা না হলে আমরা আবার বিগত কয়েক বছরের তামাশার পুনরাবৃত্তিই শুধু করব না, নিজেদের ও সম্ভাব্য সহ-লড়াকুদেরও পথে বসাব। এই প্রসঙ্গে আরেকটা বিষয় মনে রাখতে হবে। এই দুশমনকে ঠেকাতে আশপাশের প্রায় সব দেশই চায়। এদের কারও সঙ্গে আমাদের এমন কোনো জাতিগত কিংবা রাষ্ট্রীয় স্বার্থের বিবাদ নেই যা তাদের সঙ্গে মিলে সম্মিলিত কিংবা সমন্বিত উদ্যোগের পথে বাদ সাধতে পারে। এমন মিলিত উদ্যোগ নিতে পারলে আমরা আরও সহজে দুশমনকে কাবু করতে পারি।
ইতিহাসে মেলা দুসরা স্ট্র্যাটেজির নির্দেশ হলো, দেশকে আর্থিকভাবে সবল ও শক্তিশালী বানাও। পহেলা স্ট্র্যাটেজির মতো এই স্ট্র্যাটেজির বাস্তব রূপও একাধিক হতে পারে। আর্থিক দিক দিয়ে আগুয়ান দেশগুলোর নয়া শিল্প প্রযুক্তির অনুকরণ (১৮৬৮ সাল থেকে ১৯৩০-এর দশক এবং আবার ১৯৪৯ থেকে শুরু করা জাপানের রাষ্ট্র নির্দেশিত শিল্পায়ন) এবং উন্নত শিল্প ব্যবস্থা ও আর্থিক শক্তিসম্পন্ন রাষ্ট্রের শিল্পজাত সামগ্রীর অসম প্রতিযোগিতার হাত থেকে নিজের উঠতি অর্থনীতিকে রেহাই দেয়ার জন্য উচ্চতর আমদানি শুল্কের রক্ষাব্যূহের ব্যবহার (আলেকজান্ডার হেমিল্টন ও জার্মান-আমেরিকান অর্থনীতিবিদ ফ্রেডারিক লিস্টের চিন্তাধারার আলোকে ১৯ শতক থেকে ২০ শতকের পহেলা দিক পর্যন্ত সময়ের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সেকেন্ড ওয়ার্ল্ড ওয়ারে পরাজিত জার্মানি ও মাও পরবর্তী চীন)।
বাস্তব রূপ যাই হোক না কেন, এই স্ট্র্যাটেজির জন্য দরকার হয় অর্থনীতির রাষ্ট্রীয় নির্দেশনা, বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্মিলিত সংস্থা এবং শিল্পঋণ বরাদ্দের ক্ষেত্রে কৌশলগত অগ্রাধিকার দেয়া। জাতীয়তাবাদী শিল্প উদ্যোক্তাতের মাধ্যমে খুব মন দিয়ে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এই স্ট্র্যাটেজি কার্যকর না করলে এর শেষ পরিণতি খারাপ হতে পারে। গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্ব এবং ঐতিহ্যিক কিংবা অপরাপর রাজনৈতিক এবং তামুদ্দনিক নীতিমালার জায়গায় আর্থিক উন্নয়নই সমাজের প্রধানতম আইনসম্মত লক্ষ্য ও অবয়বের স্বাভাবিক ভিত্তিতে পরিণত হয়ে যেতে পারে এবং দেশের সংহতি, সার্বভৌম উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং সার্বভৌমত্বকে কমজোর করে দেশকে গ্লোবালিস্ট ফাইন্যান্সসিয়াল এলিটদের ভাষার ‘ডেভেলপমেন্টাল স্টেট’ বানিয়ে দিতে পারে। হালের কানেকটিভিটি, গ্লোবালাইজেশন এবং ফ্রি-ট্রেডের মাহাত্ম্য প্রচারণার পেছনে লুকিয়ে থাকা এমন আধিপত্যবাদী ও ডেভেলপমেন্টাল স্টেটের চোরাগুপ্তা গর্ত সম্পর্কে সজাগ থাকাও দরকার। আমরা এরই মাঝে এই গর্তে অনেকটা ডুবে গেছি। তা শোধরানো দরকার। দিল্লির সঙ্গে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর করা ত্রিশটি অ্যাগ্রিমেন্ট ও ট্রিটির সব ক’টাকে প্রকাশ্যে যাচাই-বাছাই না করে এবং পার্লামেন্টের ফ্রি ভোটে অনুমতি ছাড়া না রাখার আশ্বাস জাতিকে দেয়া উচিত।
প্রথমে ঘর ঠিকঠাক করতে হবে
উপরে আলোচিত উভয় স্ট্র্যাটেজির বিভিন্ন রূপ থেকে বাছাই করা কৌশল কিংবা আমাদের বাস্তব অবস্থার আলোকে রচিত নয়া কৌশল যাই আমরা ঠিক করি না কেন, তা কার্যকর করার পাশাপাশি ঘরকেও আমাদের ঠিকঠাক করতে হবে। তাকে ভেতরের দিক থেকে মজবুত এবং বাইরের দিক থেকে সিঁদ কাটা প্রুফ বানাতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে দেশবাসীকে জাতীয় সার্বভৌম আশা-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়িত করার সংগ্রামের জন্য তৈরি করতে হবে।
এর জন্য অবশ্যই দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে। দিল্লির বাঘছালের সিংহাসনধারীর শিকারি কুকুর কিংবা ঘর পোড়ানো হনুমান বনার পথঘাট বন্ধ করতে হবে। সিভিক এডুকেশনের পাশাপাশি ‘অধৈর্য’ পঞ্চম বাহিনীর শিকড় খুঁড়ে তুলে ফেলা খুবই জরুরি। নিরুত্সাহিত করা ও বুঝবুদ্ধি দিয়ে থামানোর পাশাপাশি তাদের ভবিষ্যত্ ‘ব্রিডিং গ্রাউন্ড’ না রাখা আমাদের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা স্ট্র্যাটেজির অন্যতম লক্ষ্য হতে হবে। এই লক্ষ্যের কথা মনে রেখে দেশের শাসন ব্যবস্থা ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুন করে গড়তে হবে। জাতি ও রাষ্ট্রের নিরাপত্তার দায়-দায়িত্ব সবচেয়ে আগে, এই মহাসত্যকে অন্য কোনো বুজরুকি দিয়ে ধামাচাপা দেয়া যাবে না। এখন থেকেই জনমত তৈরি করতে হবে।
আমরা যেন ভুলে না যাই
এসব করতে গিয়ে দুটি মৌলিক সত্যকে খুবই গুরুত্বের সঙ্গে মনে রাখতে হবে। দেশবাসীর ঐক্য ছাড়া যেমন শক্ত সবল দেশ গড়া যাবে না, তেমনি জাতিরাষ্ট্রের জাতির স্বকীয়তাকে অস্বীকার কিংবা ধামাচাপা দিয়ে শক্ত সবল জাতিরাষ্ট্র গড়ার কথা চিন্তাও করা যাবে না।
আমাদের জাতিরাষ্ট্রের জাতি পরিচয় হলো মুসলিম। শুধু ভৌগোলিক এখতিয়ারের চৌহদ্দির দিক দিয়েই নয়, জাতি পরিচয়ের দিক দিয়েও বাংলাদেশ পূর্ব পাকিস্তানের উওরাধিকারী। জ্ঞানপাপী কিংবা জ্ঞানশূন্য ‘অধৈর্য’ ছাড়া আর কারও পক্ষে শত শত বছরের এক সভ্যতাভুক্ত জাতির ২৫ বছরের কম সময়ের ভেতর জাতিত্ব পাল্টানোর অসাধারণ তত্ত্ব বিলানো সম্ভব নয়। তার অনেক ভক্ত হয়তো জানেন না, দিল্লির পোষা ‘অধৈর্য’দের দ্বারা ‘বঙ্গবন্ধু’ ও ‘হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি’র খেতাব এবং ভাষাভিত্তিক জাতিতত্ত্ব, সেক্যুলারিজম ও সোশায়ালিজমের আর্দশিক রং-চং এবং লেনিন পিস প্রাইজের রোশনাই দিয়ে সাজানো সত্ত্বেও মুজিব আনকোরা মুসলিম জাতীয়তাবাদী ‘বাঙাল’ এবং এন্টি সোশিয়ালিস্ট ফ্রি মার্কেটিয়ার রয়ে যান। বস্তুত বাংলাদেশের মুসলমান জাতির আবাসিক পরিচয়রূপে সরকারি সব ইংরেজি পত্র-পুস্তিকায় মুজিব ্তুইবহমধষর্থ বা বাংলাভাষী না ব্যবহার করে ্তুইবহমধষবব্থ বা বাংলার বাসিন্দা কথাটা ব্যবহার করে গেছেন। এর উল্লেখ অন্যদের মধ্যে ড. রওনক জাহান করেছেন। মুজিব ও তার পরামর্শদাতারা বাঙালি বলতে যে মূলত পূর্ব পাকিস্তানি মুসলমানদের বুঝতেন, একথা আরও স্পষ্ট করে ব্যাখ্যা করেছেন তার অন্যতম পরামর্শদাতা প্রফেসর রেহমান সোবহান। বেঁচে থাকলে সবচেয়ে আগে মুজিব নিজেই এই নির্ভেজাল সত্যকে তুলে ধরতেন, এমনটা মনে করার আরও কারণ রয়েছে। দিল্লির বিরাগ-বিরোধিতা সত্ত্বেও পাকিস্তান থেকে দেশে ফেরার দিন থেকেই তিনি বাংলাদেশকে দুনিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম রাষ্ট্র বলতে এবং রুশ-ভারত ব্লকের বাইরের মুসলিম এবং পশ্চিমা দেশগুলো ও চীনের কাছে ভেড়ার জন্য চেষ্টাচরিত শুরু করেন এবং পরে বাংলাদেশকে ইসলামিক সিভিলাইজেশনের সম্মিলিত ‘আমরা’র প্রতিভূ ওআইসি’র সদস্য বানান। সন্দিহানরা মুজিবের কুটুম ও তার প্রশাসনের পয়লা কাতারের আমলা মুহাম্মদ আসাফদ্দৌলার বয়ানি শুনে কিংবা তখনকার ঢাকায় কর্মরত ভারতীয় ডেপুটি হাইকমিশনার জেএন দীক্ষিতের লেখা পড়ে নিজেরাই এর সত্যতা জানতে পারবেন। সঙ্গে সঙ্গে তারা আরও জানতে পারবেন, দিল্লির আধিপত্যবাদীরা বরাবর এই রংচংশূন্য আসল মুজিব সম্পর্কে সচেতন ছিলেন বলেই তারা তাদের পোষা অধৈর্য বা পঞ্চম বাহিনী দিয়ে তাকে রঙ-বেরঙের প্রলেপ দিয়ে ঢেকে আমাদের সাদাসিধা, দিশবুদ্ধিহারাদের বেদিশা, বিপথগামী করতে উঠেপড়ে লাগেন।
এসব অসাধারণ ছলাকলার কথা জেনে যাদের বিশ্বাস করতে কষ্ট হবে, তাদের দিল্লির শাসকদের ‘কূটকৌশলের বেদ’ কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র পড়া ও তাদের কালচারাল ডিএনএ, মন-মানসিকতা ও চালিয়াতি সম্পর্কে আরও জানা দরকার। বস্তুত, তাদের ধূর্ত কূটনীতি ও কূটকৌশলকে আমাদের সিভিক এডুকেশনের অংশ করা খুবই জরুরি। এর সঙ্গে আমাদের ভাষা ও ইতিহাস চুরির ইতিবৃত্তকেও এই পাঠ্য তালিকায় রাখা দরকার।
ভৌগোলিক এখতিয়ার ও জাতি পরিচয়ের দিক দিয়ে বাংলাদেশ পূর্ব পাকিস্তানের খাটি উত্তরাধিকারী—একথা শুনে কেউ যেন ভেবে না বসেন এগুলো মোহাম্মদ আলি জিন্নাহ কিংবা মুসলিম লীগের তৈরি। ভৌগোলিক দিক দিয়ে আজকের বাংলাদেশ মুসলিম লীগ গঠনের এক বছর আগে বানানো মুসলিমপ্রধান পূর্ব বাংলা ও আসাম প্রদেশের পূর্ব বাংলা অংশের সামান্য রদবদল করা রূপ। আর এদেশের মুসলিম জাতিত্বের অস্তিত্ব কম করে হলেও ১৩ শতকের শুরু থেকে। মুসলিম হুকুমতকালে বঙ্গ থেকে বাংলা পরিচিতির উদ্ভব ও ভৌগোলিক ব্যাপ্তি ঘটলেও মূল বঙ্গের এথনিক, লেঙ্গুস্টিক ও ইতিহাসের অভিজ্ঞতার ভিন্নতাজাত স্বকীয়তা মুছে যায়নি। অন্তত নব্য বাংলার বাড়তি অংশের গুপ্ত যুগ (চার থেকে সাত শতক) থেকে ব্রাহ্মণ্যবাদের আখড়া বনার পর থেকে এই ভিন্নতাবোধ আরও সবল হয়। পরে এক দিকে ব্রাহ্মণ্যবাদীদের হাতে নির্যাতিত-নিষ্পেষিত বঙ্গের সংখ্যাগুরু বোদ্ধ ধর্মীদের আহ্বান ও সহায়তায় প্রতিষ্ঠিত মুসলিম হুকুমতের অসাধারণ অর্থনৈতিক সাফল্য, অসংখ্য বৌদ্ধ ধর্মীর ইসলাম কবুল এবং বঙ্গে মুসলিম সংখ্যাগুরুত্ব প্রতিষ্ঠা, আরেক দিকে অপর অংশের ব্রাহ্মণ্যবাদীদের বৈষ্ণব মুভমেন্ট ও তার ব্রাহ্মণ নেতৃত্বের উদ্যোগে ১৬ শতকে মুসলিম শাসন উত্খাতকামী ‘হিন্দুধর্ম’রূপী জাতীয়তাবাদী ঐক্যজোট গঠন এবং ১৮ শতকের মাঝামাঝি সময় নদিয়ার মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের নেতৃত্বে সংগঠিত ‘হিন্দু’ নেতাদের উদ্যোগে ব্রিটিশ বেনিয়াদের দিয়ে সুবে বাংলার মুসলিম হুকুমতের উত্খাতের ভেতর দিয়ে এই দ্বিজাতি তত্ত্বের সংঘাত শুধু বহমান রয়নি, আরও বেশি শানিত হয়। ১৯ শতকের বেশিরভাগ সময়কাল জুড়ে তরিকা-ই-মুহাম্মদিয়ার পতাকাতলে স্বাধীনতা উদ্ধারের যে সশস্ত্র সংগ্রাম চলে তার বেশির ভাগ সংগঠক ও সৈনিক শুধু বঙ্গবাসী ছিলেন না, এই বঙ্গবাসী মুসলমানরাই উদ্যোগী হয়ে বিশ শতকের শুরুতে ঢাকায় মুসলিম লীগ গঠন করেন। আজকের বাংলাদেশ হওয়ার পরও এই ‘হিন্দু-মুসলিম’ দ্বিজাতিত্বই শুধু বহাল রয়েছে এমন নয়, মুসলিম জাতিত্বের ভেতর দিয়ে অন্তত দেড় হাজার বছরেরও বেশি পুরনো দীক্ষিতের ভাষার ‘বাঙাল ও ঘটির’ ঐতিহাসিক দ্বন্দ্ব-বিবাদের স্মৃতি ও ভিন্নতা বোধ জারি রয়েছে।
হিন্দুত্বের ‘আমরা’র বিপরীত ‘ওরা’ মুসলমান হলেও বাংলা কিংবা ভারতের হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা বরাবর মুসলিম জাতিত্বকে স্বীকার না করার কৌশল নেন। তাদের যুক্তি হলো মুসলিম শাসকদের জোর-জবরদস্তিতে ধর্ম পাল্টানো ‘হিন্দু’দের নিয়ে মুসলমান সমাজ গড়ে উঠেছে, তাই তারা জাতিগতভাবে ‘হিন্দু’। পণ্ডিত নেহেরুর বানোয়াট তথ্য মতে বাংলার ৯৮ ভাগ মুসলমান হলেন ধর্ম পাল্টানো ‘হিন্দু’; তাও আবার তার মতো আর্য রক্তধারী ব্রাহ্মণ নয়, অচ্ছ্যুত নমশূদ্রদের আওলাদ। ধর্ম ও সমাজ ছাড়লেও রক্ত ও মাটির সম্পর্ক ছাড়া যায় না, জার্মান বর্ণবাদীদের কাছ থেকে ধার করা এই আজব যুক্তির কথা বাদ দিলেও তাদের দাবির ঐতিহাসিক ভিত্তিহীনতা লুকানো থাকে না। মুসলমান হুকুমতের আগে বাংলা ব্রাহ্মণ্যবাদী হুকুমতে ছিল; কিন্তু প্রজাকুল ছিলেন বৌদ্ধধর্মী। এরাই ছিলেন মুসলিম হুকুমতের সহায়ক শক্তি এবং মুসলমান ও ‘হিন্দু’ উভয় সমাজের সংখ্যাস্ফীতির কারণ। ইংরেজ সোশিওলজিক্যাল হিস্টোরিয়ান জেইমস ওয়াইজ এবং হিন্দু ইতিহাসবিদ রমেশচন্দ্র মজুমদারের লেখা পড়লেই ভারতীয় আধিপত্যবাদীদের এই ‘ইতিহাস চুরি’র বহর আন্দাজ করতে কারও অসুবিধা হবে না।