কারা শত্রুপক্ষ এবং কী তাদের এজেন্ডা?
ইসলাম কোনো কালেই শত্রুমুক্ত ছিল না। নির্মূলকামী শত্রুপক্ষ যেমন নবীজী (সা.)-এর যুগে ছিল, তেমনি তাঁর আগে এবং পরেও ছিল। সে শত্রুপক্ষটি বাংলাদেশে উনিশশ’ সাতচল্লিশে যেমন ছিল, তেমনি একাত্তরেও ছিল এবং আজও আছে। বরং বাংলাদেশ তো তাদের হাতেই আজ অধিকৃত। একাত্তরে তাদের নাশকতা ছিল বিশাল। ইসলামের শত্রু তো তারাই যারা শরিয়তের প্রতিষ্ঠা ও ইসলামের বিজয় রুখতে চায়। যারা শক্তিহানি ঘটায় মুসলিম রাষ্ট্রের এবং যারা নির্মূল চায় ইসলামপন্থীদের। ইসলাম ও মুসলমানের বিরুদ্ধে নাশকতায় যুগে যুগে এরাই মিত্রতা গড়েছে চিহ্নিত কাফের শক্তির সঙ্গে। ইসলামের এ শত্রুপক্ষটি যে ইসলাম ও ইসলামপন্থীদের নির্মূল মনে মনে কামনা করে বা তাদের কর্মকে কথা ও লেখার মধ্যে সীমিত রাখে, তা নয়। ইসলাম ও ইসলামপন্থীদের নির্মূলে তারা সব ধরনের সামর্থের বিনিয়োগও করে। মুসলিম রাষ্ট্রের বিভক্তি ও বিধ্বংসে তারা যুদ্ধেও নামে। সেসব যুদ্ধে তারা সর্বজাতের কাফের, মুশরিক, ফাসেক ও নাস্তিকদের সঙ্গে কোয়ালিশনও গড়ে। সে কোয়ালিশনটি যেমন নবীর যুগে ছিল, তেমনি সাতচল্লিশে এবং একাত্তরেও ছিল। এবং আজও রয়েছে।
ইসলাম ও মুসলমানের এরূপ শত্রু হওয়ার জন্য ইহুদি, খ্রিস্টান, মূর্তি পুজারি হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। সেটি মুসলমানের পুত্র, পীরের পুত্র, আলেমের পুত্র এমনকি নবীর পুত্রও হতে পারে। হজরত নুহ (আ.)-এর মতো মহান নবীর পুত্রও শত্রু শিবিরে যোগ দিয়েছিল। সে শত্রুতা নিয়ে সে পিতার আহ্বানকে অবজ্ঞা করেছিল এবং প্লাবনে ডুবে মরেছিল। বিরোধী শিবিরে যোগ দিয়েছিল হজরত লুত (আ.)-এর স্ত্রী। এসব শত্রুকে চিনতে হবে তাদের বংশ পরিচয় বা পিতার পরিচয় থেকে নয়, বরং তাদের রাজনীতিতে ইসলামবিনাশী এজেন্ডা থেকে। মানব সৃষ্টিকে জাহান্নামে নেয়ার শয়তানি প্রচেষ্টা চলছে প্রথম দিন থেকেই। শুরুতেই শয়তান ঘিরে ধরেছিল হজরত আদম (আ.)-কে। নবী করিম (সা.)-এর মতো সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষটি যখন ইসলামের দাওয়াত নিয়ে ময়দানে নামেন, তার নির্মূলেও সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিল তত্কালীন আরব জগতের সব শত্রুশক্তি। আজও সেরূপ কোয়ালিশন কাজ করছে আফগানিস্তান, মিসর, সিরিয়াসহ প্রতিটি মুসলিম দেশে। একাত্তরের আগে ও পরে এবং আজ বাংলাদেশের বুকে সংঘটিত ইসলামবিরোধী জোটের বীভত্স অপরাধগুলো বুঝতে হলে মানব ইতিহাসের এ ঘটনাগুলোকে অবশ্যই সামনে রাখতে হবে। কারণ প্রতি যুগে শত্রু শক্তি ভিন্ন নামে ও ভিন্ন পরিচয়ে ময়দানে নামলেও তাদের চেতনা ও এজেন্ডাটি অভিন্ন। আজকের বাঙালি জাহেলিয়াত আর নবীজী (সা.)-এর যুগের আরব জাহেলিয়াতের মধ্যে পার্থক্য তাই অতি সামান্যই। মানব সমাজে একই রূপ রোগজীবাণু যেমন বার বার একই রূপ রোগ নিয়ে ফিরে আসে শয়তানের সৃষ্ট নৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যাধিগুলোও; তেমনি সমাজ ও রাষ্ট্রে বার বার একই ধরনের বিপর্যয় নিয়ে আসে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তায়ালা তাই ইতিহাসের এরূপ বহু ঘটনাকে বার বার তুলে ধরেছেন।
মুসলিম নামধারী বা ইসলামের লেবাসধারী হওয়াতেই চিহ্নিত শত্রুশক্তি ইসলামের মিত্র হয় না। হজরত ইমাম হোসেনকে যারা হত্যা করেছিল এবং তার লাশের ওপর দিয়ে যারা ঘোড়া দাবড়িয়েছিল তারা কেউ মূর্তিপূজারি ছিল না। কিন্তু ইসলাম ও মুসলিম স্বার্থের বিরুদ্ধে নাশকতায় তাদের এজেন্ডা বহু কাফেরের চাইতেও জঘন্য ছিল। আজও যারা বাংলাদেশের বুকে ইসলামপন্থীদের নির্মূলে নেমেছে, একাত্তরে যারা হাজার হাজার ইসলামপন্থীকে হত্যা করেছে এবং এখনও যারা ফাঁসিতে ঝুলাচ্ছে তাদের বেশিরভাগ হিন্দু, খ্রিস্টান, ইহুদি বা কাফের পুত্র নয়। তাদের অনেকে নামাজ পড়ে, রোজা রাখে এবং হজ-ওমরা করে। পীরের দরবারে হাজিরাও দেয়। একাত্তরে ইসলামের এমন শত্রুদের সংখ্যা ছিল বিপুল। একপাল নেকড়ের মতো বহু ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত পাকিস্তানকে তারা ঘিরে ধরেছিল, সেটি ১৯৪৭ সাল থেকেই। পাকিস্তানে কোনো কালেই শেখ মুজিব ও শেখ হাসিনার বাকশালী বর্বরতা প্রতিষ্ঠা পায় না। ৯ মাসের যুদ্ধ বাদে ২৩ বছরে সবচেযে বড় রক্তপাত ঘটেছিল ১৯৫১ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে। তখন পুলিশের গুলিতে ৩ জন নিহত হয়েছিল। দেশটির মূল অপরাধ, এটি ছিল তত্কালীন বিশ্বে সর্ববৃহত্ মুসলিম রাষ্ট্র। শত্রু শক্তির কাছে এটি কি কম অপরাধ? এ অপরাধে তুরস্কের ওসমানিয়া খেলাফত বাঁচেনি। তাছাড়া আরেক অপরাধ, দেশটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ইসলামের নামে। বসবাসের নিরাপদ স্থান দিয়েছিল দক্ষিণ এশিয়ার মুসলমানদের এবং দেশটির সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিক ছিল বাঙালি মুসলমান। শয়তান ও তার পক্ষের শক্তি কি চায়, মুসলমানরা একটি নিরাপদ দুর্গ পাক এবং বেড়ে উঠুক বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ শক্তিরূপে? তারা তো চায়, মুসলমান ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে বিশ্বের দ্বারে দ্বারে ঘুরুক, কাপড়ের অভাবে মাছ ধরা জাল পরুক, উচ্ছিষ্টের খোঁজে কুকুর-শৃগালের সঙ্গে লড়াই করুক, আর ভারতের সীমান্তে লাশ হয়ে কাঁটাতারে ঝুলুক। মুসলমানদের তেমন একটি অবস্থায় ফেলতে পারলেই তো ইসলামের শত্রুদের মহাআনন্দ। শেখ মুজিবকে দিয়ে ভারত তো সে উদ্দেশ্যই সাধন করেছিল। শত্রুপক্ষ এভাবেই একাত্তরে ও তার পরে ১৯৪৭ সালে ভারত ভাঙার শাস্তি দিয়ে মজা পেতে চেয়েছিল। আজও সে শাস্তি দেয়ার পর্ব শেষ হয়নি।
রাজনীতি ষড়যন্ত্রের
শেখ মুজিবের এজেন্ডা কোনো কালেই দেশগড়া, গণতন্ত্র বা দেশবাসীর কল্যাণ ছিল না। স্বৈরাচারের প্রতিষ্ঠা, দেশ ধ্বংস, দেশের শিক্ষা-সংস্কৃতি ও অর্থনীতি ধ্বংস নিয়ে ছিল তার বাহাদুরি। মুজিবের রাজনীতির মূল হাতিয়ারটি ছিল ষড়যন্ত্র এবং সেটি ভারতকে সঙ্গে নিয়ে ও ভারতের স্বার্থে। মুজিবের রাজনীতি থেকে পাকিস্তান যেমন লাভবান হয়নি, বাংলাদেশও কিছু পায়নি। তার হাত দিয়ে পাকিস্তান পেয়েছে একাত্তরের পরাজয় ও দেশের বিভক্তি। আর বাংলাদেশ পেয়েছে দুর্ভিক্ষ, সীমাহীন দুর্নীতি ও তলাহীন ভিক্ষার ঝুলির বিশ্বজোড়া অপমান। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে মুজিবের বিজয়টি ছিল পাকিস্তানের ইতিহাসে এক ধ্বংসাত্মক দুর্যোগ। হাজার হাজার মানুষ সে রাজনৈতিক সুনামিতে লাশ হয়েছিল। খণ্ডিত হয়েছিল সর্ববৃহত্ এ মুসলিম রাষ্ট্রটির মানচিত্র। মুজিব সেদিন মুসলমানদের পরাজয় বাড়িয়ে প্রচুর আনন্দ, বিজয় ও উত্সবের খোরাক জুগিয়েছিলেন ইসলামের দুশমনদের। দিল্লির শাসক সম্প্রদায় আজও তা নিয়ে প্রতি বছর প্রচণ্ড উত্সব করে। নিজেদের অর্জন মনে করে প্রচণ্ড অহঙ্কারও করে।
ষাটের দশকে মুজিব যখন কারাগারে তখন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ছিলেন মিসেস আমেনা বেগম। মুজিবের ঘাড়ে তখন আগরতলা মামলা। সে মামলাকে সেদিন মুজিব-বিরোধী ষড়যন্ত্র বললেও খোদ আওয়ামী লীগাররাও আজ সেটিকে মিথ্যা বলেন না। বরং ভারতের চর রূপে পাকিস্তান ভাঙার কাজে মুজিবের সে সংশ্লিষ্টতা নিয়ে তারা আজ গর্ব করেন। সেটিকে সাহসিকতাও বলেন। মুজিবের সেই দুর্দিনে আওয়ামী লীগের ৬ দফার আন্দোলনকে সে সময় জিন্দা রাখার ক্ষেত্রে আমেনা বেগমের অবদান ছিল অনেক। কারণ, ৬ দফা পেশের কারণে তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানের ১৭ জেলার মধ্যে ১৪ জেলার আওয়ামী লীগ প্রধানই তখন দল ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। তারা পিডিএমপন্থী (পাকিস্তান ডেমোক্র্যাটিক মুভমেন্ট) আরেক আওয়ামী লীগের জন্ম দিয়েছিলেন। সে দলে ছিলেন আওয়ামী লীগের অখণ্ড পাকিস্তানপন্থী প্রবীণ নেতারা। পরে তাদের বেশিরভাগ নেতাকর্মী নূরুল আমীনের নেতৃত্বে পাকিস্তান ডেমোক্র্যাটিক পার্টিতে (পিডিপি) শামিল হয়ে যান। রাজনীতির আকাশে তখন ঘন কালো মেঘ। মুজিবের রাজনীতি ভয়ানক সংঘাতের দিকে যাচ্ছে দেখে মিসেস আমেনা বেগম মুজিবকে বলেছিলেন, আপনি যে রক্তাক্ত যুদ্ধের পথে দেশকে নিয়ে যাচ্ছেন তাতে তো বিপুল সংখ্যক মানুষের প্রাণনাশ হবে। কিন্তু মিসেস আমেনা বেগমের সে সাবধানবাণী মুজিবের কাছে গুরুত্ব পায়নি। সেনাবাহিনী রাজনৈতিক ছাড় দিতে হয়তো রাজি হবে, কিন্তু দেশের বিভক্তিকে যে বিনাযুদ্ধে মেনে নেবে না সেটি কোনো চিন্তাশীল মানুষের কাছে অজানা থাকার কথা নয়। সেটি জানতেন আমেনা বেগমও। কারণ কোনো দেশের সেনাবাহিনীই নিজ দেশের বিভক্তিকে বিনাযুদ্ধে মেনে নেয় না। তাছাড়া পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষায় প্রতিটি সেপাই যেখানে কোরআন শরীফ ছুঁয়ে কসম খেয়ে থাকে—তাদের থেকে সেরূপ গাদ্দারি কীরূপে আশা করা যায়? মুজিবের রাজনীতিতে নিরীহ মানুষদের রক্তদান ছিল মামুলি বিষয়। তিনি তার রাজনীতির নৌকাটি বেয়েছেন জনগণের রক্তের ওপর দিয়ে। মিসেস আমেনা বেগম এরপর আর আওয়ামী লীগে থাকেননি। মুজিবের রক্ত ঝরানোর সে রাজনীতির বিরুদ্ধে তিনি তার মনের ক্ষোভটি পরে প্রকাশ করেছিলেন পত্রিকায় দেয়া সাক্ষাত্কারে।
জোসেফ স্টালিন সোভিয়েত রাশিয়ায় লাখ লাখ মানুষকে হত্যা করেছিলেন। বহু লক্ষ মানুষের প্রাণনাশ ঘটেছিল হিটলারের হাতে। চীনে বিপুল সংখ্যক মানুষের প্রাণনাশ ঘটেছিল মাও সে তুঙয়ের হাতে। হত্যাকারী এসব শাসক সবাই ছিল স্বৈরাচারী। প্রতি দেশে স্বৈরাচারীদের এটিই নীতি। তেমনি বাংলাদেশে হাজার হাজার মানুষের জীবননাশ ঘটেছিল শেখ মুজিবের হাতে। মুজিবের সাড়ে ৩ বছরের শাসনে লাশ হয়েছে প্রায় ৪০ হাজার মানুষ। তার আমলে এক সপ্তাহ বা এক মাসে যত মানুষ পুলিশ বা রক্ষিবাহিনীর হাতে লাশ হয়েছে, যুদ্ধকালীন ৯ মাস ছাড়া পাকিস্তানের ২৩ বছরেও তত মানুষ নিহত হয়নি। এমন একজন রাজনীতিক যে শুধু তার শাসনামলের তেহাত্তরে, চুয়াত্তরে বা পঁচাত্তরে অপরাধী ছিলেন তা নয়, ভয়ানক অপরাধী ছিলেন সত্তর, একাত্তরেও। এমনকি তার আগেও। পাকিস্তান সরকারের হাতে কোনো কালেই র্যাব ছিল না, রক্ষীবাহিনীও ছিল না। মিছিল রোধে রাস্তায় বড়জোর পুলিশ নামত। কিন্তু বাংলাদেশে এখন যৌথ বাহিনী নামে।
লুকানো হয়েছে ইতিহাস
বাংলাদেশে শিক্ষার নামে প্রচণ্ড কুশিক্ষা দেয়া হচ্ছে এবং সেটি বেশি ইতিহাস চর্চায়। সেটি করা হয়েছে শেখ মুজিবের মতো একজন গণবিরোধী শাসককে মহামান্য করতে। একাত্তরের প্রকৃত সত্যকে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে গোপন করা হয়েছে। একাত্তরের চেতনা ও স্বাধীনতা যুদ্ধের নামে যে প্রচণ্ড মিথ্যাচারকে প্রতিষ্ঠা দেয়া হয়েছে তার ভিত্তিতেই কে শত্রু আর কে বন্ধু সেটিও কৃত্রিমভাবে ছাত্রদের মগজে বদ্ধমূল করা হয়েছে। সে মিথ্যার ভিত্তিতেই ইসলামপন্থীদের ফাঁসিতে চড়ানোর ষড়যন্ত্র হচ্ছে। আবদুল কাদের মোল্লার মতো একজন নিরীহ ও নির্দোষ মানুষ তো সে মিথ্যাচারেরই শিকার। সরকারি খরচে হাজার হাজার ছাত্রছাত্রীকে শাহবাগে খাড়া করা হয়েছে, তাদের দিয়ে আবদুল কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবিও উঠানো হয়েছে। আর আদালতকে দিয়ে সে দাবি বাস্তবায়নও করানো হয়েছে। একাত্তরের অপরাধ ও প্রকৃত অপরাধীদের নিয়ে তাদের মাথাব্যথা নেই। তাদের এজেন্ডা একাত্তরকে অজুহাত বানিয়ে ইসলামের পক্ষের শক্তিকে নির্মূল করা।
বাকশালীরা প্রতি কথায় একাত্তরের যুদ্ধ ও মুি্ক্তযুদ্ধের চেতনার কথা বলে। কিন্তু কী সে মুক্তিযুদ্ধ এবং কী সে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা? এ নিয়ে ইসলামপন্থীরা খামোশ। কিন্তু সে কৌশলটিতে হিকমত নেই। ঈমানদারের দায়িত্ব তো সত্যকে সর্বসামর্থ্য দিয়ে প্রকাশ করা। তথা সত্যের পক্ষে সাক্ষ্য দেয়া। একাত্তরকে ঘিরেও তো বহু সত্য ঘটনা রয়েছে। সে সত্য প্রকাশ না পেলে তো মিথ্যাই সত্যকে ঢেকে ফেলবে। একাত্তরকে ঘিরে তো সেটিই ঘটেছে। তাই একাত্তর নিয়ে প্রকৃত সত্যকে প্রবলভাবে তুলে ধরাটি ঈমানদারের দায়িত্ব। বাকশালীদের লুকানো ইতিহাস নতুন প্রজন্মকে জানাতে হবে। যা আজ মুক্তিযুদ্ধ বা স্বাধীনতার যুদ্ধ রূপে মর্যাদা পাচ্ছে সেটি ছিল পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্নতার যুদ্ধ। ভারতের কাশ্মীর, আসাম, নাগাল্যান্ড, মণিপুর, মিজোরামে তেমন একটি বিচ্ছিন্নতার যুদ্ধ চলছে বিগত ৬০ বছর ধরে। সে যুদ্ধে এখনও বিজয় আসেনি। ফলে যারা সে বিচ্ছিন্নতার সঙ্গে লিপ্ত তারা মুক্তিযোদ্ধার মর্যাদা পায়নি। তাদের যুদ্ধ স্বাধীনতার যুদ্ধ রূপেও চিত্রিত হয়নি। বরং যারা সে যুদ্ধটি প্রাণপণে লড়ছে এবং অনেকে প্রাণও দিচ্ছে, তারা চিত্রিত হচ্ছে সন্ত্রাসী ও ভারতের সংহতির দুশমন রূপে। সেটি যেমন ভারতের কাছে, তেমনি বাংলাদেশের বাকশালীদের কাছেও। স্বাধীনতাকামী সে যোদ্ধাদের মধ্য থেকে যারা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিল, হাসিনা সরকার তাদের সন্ত্রাসী আখ্যায়িত করে ভারতের হাতে তুলে দিচ্ছে। কথা হলো, বাঙালির একাত্তরের বিচ্ছিন্নতার যুদ্ধ থেকে কাশ্মীর, আসাম, নাগাল্যান্ড, মণিপুর, মিজোরামের যুদ্ধগুলোর পার্থক্য কোথায়? তাদের কাছে যদি নিজেদের পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্নতার চেতনাটি একাত্তরের চেতনা রূপে পূজনীয় হয়, তবে তাদের সে চেতনাটি বাকশালীদের কাছে মর্যাদা পায় না কেন? তাদের বিচ্ছিন্নতার যুদ্ধের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে ভারতের সেনাবাহিনী। ভারতীয় সেনাবাহিনীর সঙ্গে সহযোগিতা করছে হাসিনা সরকার। হাসিনা ও তার সহযোগীরা যে ভারতকে সাহায্য করছেন সেটি তাদের নিজেদের দেশ নয়। একাত্তরের চেতনার বুলি যে কতটা নীতিশূন্য ও ভণ্ডামিপূর্ণ, সেটি কি এরপরও বুঝতে বাকি থাকে?
বাংলাদেশীদের ঘাড়ে এখন বাকশালী ফ্যাসিজমের মহাবিপদ। সেটির শুরু ২০১৩ সালে বা ২০০৮ সালে নয়। একাত্তরেও নয়। শুরু হয়েছিল ১৯৪৭ থেকেই। বাকশালীদের মূল অপরাধও তো সেই আমল থেকেই। তাদের আজকের অপরাধের চেয়ে পুরনো সে অপরাধগুলো কি কম গুরুতর? সে অপরাধীদের সঙ্গে তুলে ধরতে হবে ভারতের কুকর্মগুলোও। নইলে সাধারণ মানুষের দৃষ্টির অগোচরে থেকে যাবে বাঙালি মুসলমান ও ইসলামের বিরুদ্ধে এ জঘন্য শত্রু ও তার মিত্রদের নাশকতার ভয়ঙ্কর চিত্র। সে কাজটি দ্রুত না হলে আরও বহু নিরীহ মানুষকে এ মিথ্যুকদের হাতে ফাঁসিতে ঝুলতে হবে। শুধু তাই নয়, জীবননাশের পাশাপাশি অবিরাম চলতে থাকবে ইসলামপন্থীদের চরিত্রনাশও।
ইসলাম কোনো কালেই শত্রুমুক্ত ছিল না। নির্মূলকামী শত্রুপক্ষ যেমন নবীজী (সা.)-এর যুগে ছিল, তেমনি তাঁর আগে এবং পরেও ছিল। সে শত্রুপক্ষটি বাংলাদেশে উনিশশ’ সাতচল্লিশে যেমন ছিল, তেমনি একাত্তরেও ছিল এবং আজও আছে। বরং বাংলাদেশ তো তাদের হাতেই আজ অধিকৃত। একাত্তরে তাদের নাশকতা ছিল বিশাল। ইসলামের শত্রু তো তারাই যারা শরিয়তের প্রতিষ্ঠা ও ইসলামের বিজয় রুখতে চায়। যারা শক্তিহানি ঘটায় মুসলিম রাষ্ট্রের এবং যারা নির্মূল চায় ইসলামপন্থীদের। ইসলাম ও মুসলমানের বিরুদ্ধে নাশকতায় যুগে যুগে এরাই মিত্রতা গড়েছে চিহ্নিত কাফের শক্তির সঙ্গে। ইসলামের এ শত্রুপক্ষটি যে ইসলাম ও ইসলামপন্থীদের নির্মূল মনে মনে কামনা করে বা তাদের কর্মকে কথা ও লেখার মধ্যে সীমিত রাখে, তা নয়। ইসলাম ও ইসলামপন্থীদের নির্মূলে তারা সব ধরনের সামর্থের বিনিয়োগও করে। মুসলিম রাষ্ট্রের বিভক্তি ও বিধ্বংসে তারা যুদ্ধেও নামে। সেসব যুদ্ধে তারা সর্বজাতের কাফের, মুশরিক, ফাসেক ও নাস্তিকদের সঙ্গে কোয়ালিশনও গড়ে। সে কোয়ালিশনটি যেমন নবীর যুগে ছিল, তেমনি সাতচল্লিশে এবং একাত্তরেও ছিল। এবং আজও রয়েছে।
ইসলাম ও মুসলমানের এরূপ শত্রু হওয়ার জন্য ইহুদি, খ্রিস্টান, মূর্তি পুজারি হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। সেটি মুসলমানের পুত্র, পীরের পুত্র, আলেমের পুত্র এমনকি নবীর পুত্রও হতে পারে। হজরত নুহ (আ.)-এর মতো মহান নবীর পুত্রও শত্রু শিবিরে যোগ দিয়েছিল। সে শত্রুতা নিয়ে সে পিতার আহ্বানকে অবজ্ঞা করেছিল এবং প্লাবনে ডুবে মরেছিল। বিরোধী শিবিরে যোগ দিয়েছিল হজরত লুত (আ.)-এর স্ত্রী। এসব শত্রুকে চিনতে হবে তাদের বংশ পরিচয় বা পিতার পরিচয় থেকে নয়, বরং তাদের রাজনীতিতে ইসলামবিনাশী এজেন্ডা থেকে। মানব সৃষ্টিকে জাহান্নামে নেয়ার শয়তানি প্রচেষ্টা চলছে প্রথম দিন থেকেই। শুরুতেই শয়তান ঘিরে ধরেছিল হজরত আদম (আ.)-কে। নবী করিম (সা.)-এর মতো সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষটি যখন ইসলামের দাওয়াত নিয়ে ময়দানে নামেন, তার নির্মূলেও সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিল তত্কালীন আরব জগতের সব শত্রুশক্তি। আজও সেরূপ কোয়ালিশন কাজ করছে আফগানিস্তান, মিসর, সিরিয়াসহ প্রতিটি মুসলিম দেশে। একাত্তরের আগে ও পরে এবং আজ বাংলাদেশের বুকে সংঘটিত ইসলামবিরোধী জোটের বীভত্স অপরাধগুলো বুঝতে হলে মানব ইতিহাসের এ ঘটনাগুলোকে অবশ্যই সামনে রাখতে হবে। কারণ প্রতি যুগে শত্রু শক্তি ভিন্ন নামে ও ভিন্ন পরিচয়ে ময়দানে নামলেও তাদের চেতনা ও এজেন্ডাটি অভিন্ন। আজকের বাঙালি জাহেলিয়াত আর নবীজী (সা.)-এর যুগের আরব জাহেলিয়াতের মধ্যে পার্থক্য তাই অতি সামান্যই। মানব সমাজে একই রূপ রোগজীবাণু যেমন বার বার একই রূপ রোগ নিয়ে ফিরে আসে শয়তানের সৃষ্ট নৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যাধিগুলোও; তেমনি সমাজ ও রাষ্ট্রে বার বার একই ধরনের বিপর্যয় নিয়ে আসে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তায়ালা তাই ইতিহাসের এরূপ বহু ঘটনাকে বার বার তুলে ধরেছেন।
মুসলিম নামধারী বা ইসলামের লেবাসধারী হওয়াতেই চিহ্নিত শত্রুশক্তি ইসলামের মিত্র হয় না। হজরত ইমাম হোসেনকে যারা হত্যা করেছিল এবং তার লাশের ওপর দিয়ে যারা ঘোড়া দাবড়িয়েছিল তারা কেউ মূর্তিপূজারি ছিল না। কিন্তু ইসলাম ও মুসলিম স্বার্থের বিরুদ্ধে নাশকতায় তাদের এজেন্ডা বহু কাফেরের চাইতেও জঘন্য ছিল। আজও যারা বাংলাদেশের বুকে ইসলামপন্থীদের নির্মূলে নেমেছে, একাত্তরে যারা হাজার হাজার ইসলামপন্থীকে হত্যা করেছে এবং এখনও যারা ফাঁসিতে ঝুলাচ্ছে তাদের বেশিরভাগ হিন্দু, খ্রিস্টান, ইহুদি বা কাফের পুত্র নয়। তাদের অনেকে নামাজ পড়ে, রোজা রাখে এবং হজ-ওমরা করে। পীরের দরবারে হাজিরাও দেয়। একাত্তরে ইসলামের এমন শত্রুদের সংখ্যা ছিল বিপুল। একপাল নেকড়ের মতো বহু ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত পাকিস্তানকে তারা ঘিরে ধরেছিল, সেটি ১৯৪৭ সাল থেকেই। পাকিস্তানে কোনো কালেই শেখ মুজিব ও শেখ হাসিনার বাকশালী বর্বরতা প্রতিষ্ঠা পায় না। ৯ মাসের যুদ্ধ বাদে ২৩ বছরে সবচেযে বড় রক্তপাত ঘটেছিল ১৯৫১ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে। তখন পুলিশের গুলিতে ৩ জন নিহত হয়েছিল। দেশটির মূল অপরাধ, এটি ছিল তত্কালীন বিশ্বে সর্ববৃহত্ মুসলিম রাষ্ট্র। শত্রু শক্তির কাছে এটি কি কম অপরাধ? এ অপরাধে তুরস্কের ওসমানিয়া খেলাফত বাঁচেনি। তাছাড়া আরেক অপরাধ, দেশটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ইসলামের নামে। বসবাসের নিরাপদ স্থান দিয়েছিল দক্ষিণ এশিয়ার মুসলমানদের এবং দেশটির সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিক ছিল বাঙালি মুসলমান। শয়তান ও তার পক্ষের শক্তি কি চায়, মুসলমানরা একটি নিরাপদ দুর্গ পাক এবং বেড়ে উঠুক বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ শক্তিরূপে? তারা তো চায়, মুসলমান ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে বিশ্বের দ্বারে দ্বারে ঘুরুক, কাপড়ের অভাবে মাছ ধরা জাল পরুক, উচ্ছিষ্টের খোঁজে কুকুর-শৃগালের সঙ্গে লড়াই করুক, আর ভারতের সীমান্তে লাশ হয়ে কাঁটাতারে ঝুলুক। মুসলমানদের তেমন একটি অবস্থায় ফেলতে পারলেই তো ইসলামের শত্রুদের মহাআনন্দ। শেখ মুজিবকে দিয়ে ভারত তো সে উদ্দেশ্যই সাধন করেছিল। শত্রুপক্ষ এভাবেই একাত্তরে ও তার পরে ১৯৪৭ সালে ভারত ভাঙার শাস্তি দিয়ে মজা পেতে চেয়েছিল। আজও সে শাস্তি দেয়ার পর্ব শেষ হয়নি।
রাজনীতি ষড়যন্ত্রের
শেখ মুজিবের এজেন্ডা কোনো কালেই দেশগড়া, গণতন্ত্র বা দেশবাসীর কল্যাণ ছিল না। স্বৈরাচারের প্রতিষ্ঠা, দেশ ধ্বংস, দেশের শিক্ষা-সংস্কৃতি ও অর্থনীতি ধ্বংস নিয়ে ছিল তার বাহাদুরি। মুজিবের রাজনীতির মূল হাতিয়ারটি ছিল ষড়যন্ত্র এবং সেটি ভারতকে সঙ্গে নিয়ে ও ভারতের স্বার্থে। মুজিবের রাজনীতি থেকে পাকিস্তান যেমন লাভবান হয়নি, বাংলাদেশও কিছু পায়নি। তার হাত দিয়ে পাকিস্তান পেয়েছে একাত্তরের পরাজয় ও দেশের বিভক্তি। আর বাংলাদেশ পেয়েছে দুর্ভিক্ষ, সীমাহীন দুর্নীতি ও তলাহীন ভিক্ষার ঝুলির বিশ্বজোড়া অপমান। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে মুজিবের বিজয়টি ছিল পাকিস্তানের ইতিহাসে এক ধ্বংসাত্মক দুর্যোগ। হাজার হাজার মানুষ সে রাজনৈতিক সুনামিতে লাশ হয়েছিল। খণ্ডিত হয়েছিল সর্ববৃহত্ এ মুসলিম রাষ্ট্রটির মানচিত্র। মুজিব সেদিন মুসলমানদের পরাজয় বাড়িয়ে প্রচুর আনন্দ, বিজয় ও উত্সবের খোরাক জুগিয়েছিলেন ইসলামের দুশমনদের। দিল্লির শাসক সম্প্রদায় আজও তা নিয়ে প্রতি বছর প্রচণ্ড উত্সব করে। নিজেদের অর্জন মনে করে প্রচণ্ড অহঙ্কারও করে।
ষাটের দশকে মুজিব যখন কারাগারে তখন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ছিলেন মিসেস আমেনা বেগম। মুজিবের ঘাড়ে তখন আগরতলা মামলা। সে মামলাকে সেদিন মুজিব-বিরোধী ষড়যন্ত্র বললেও খোদ আওয়ামী লীগাররাও আজ সেটিকে মিথ্যা বলেন না। বরং ভারতের চর রূপে পাকিস্তান ভাঙার কাজে মুজিবের সে সংশ্লিষ্টতা নিয়ে তারা আজ গর্ব করেন। সেটিকে সাহসিকতাও বলেন। মুজিবের সেই দুর্দিনে আওয়ামী লীগের ৬ দফার আন্দোলনকে সে সময় জিন্দা রাখার ক্ষেত্রে আমেনা বেগমের অবদান ছিল অনেক। কারণ, ৬ দফা পেশের কারণে তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানের ১৭ জেলার মধ্যে ১৪ জেলার আওয়ামী লীগ প্রধানই তখন দল ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। তারা পিডিএমপন্থী (পাকিস্তান ডেমোক্র্যাটিক মুভমেন্ট) আরেক আওয়ামী লীগের জন্ম দিয়েছিলেন। সে দলে ছিলেন আওয়ামী লীগের অখণ্ড পাকিস্তানপন্থী প্রবীণ নেতারা। পরে তাদের বেশিরভাগ নেতাকর্মী নূরুল আমীনের নেতৃত্বে পাকিস্তান ডেমোক্র্যাটিক পার্টিতে (পিডিপি) শামিল হয়ে যান। রাজনীতির আকাশে তখন ঘন কালো মেঘ। মুজিবের রাজনীতি ভয়ানক সংঘাতের দিকে যাচ্ছে দেখে মিসেস আমেনা বেগম মুজিবকে বলেছিলেন, আপনি যে রক্তাক্ত যুদ্ধের পথে দেশকে নিয়ে যাচ্ছেন তাতে তো বিপুল সংখ্যক মানুষের প্রাণনাশ হবে। কিন্তু মিসেস আমেনা বেগমের সে সাবধানবাণী মুজিবের কাছে গুরুত্ব পায়নি। সেনাবাহিনী রাজনৈতিক ছাড় দিতে হয়তো রাজি হবে, কিন্তু দেশের বিভক্তিকে যে বিনাযুদ্ধে মেনে নেবে না সেটি কোনো চিন্তাশীল মানুষের কাছে অজানা থাকার কথা নয়। সেটি জানতেন আমেনা বেগমও। কারণ কোনো দেশের সেনাবাহিনীই নিজ দেশের বিভক্তিকে বিনাযুদ্ধে মেনে নেয় না। তাছাড়া পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষায় প্রতিটি সেপাই যেখানে কোরআন শরীফ ছুঁয়ে কসম খেয়ে থাকে—তাদের থেকে সেরূপ গাদ্দারি কীরূপে আশা করা যায়? মুজিবের রাজনীতিতে নিরীহ মানুষদের রক্তদান ছিল মামুলি বিষয়। তিনি তার রাজনীতির নৌকাটি বেয়েছেন জনগণের রক্তের ওপর দিয়ে। মিসেস আমেনা বেগম এরপর আর আওয়ামী লীগে থাকেননি। মুজিবের রক্ত ঝরানোর সে রাজনীতির বিরুদ্ধে তিনি তার মনের ক্ষোভটি পরে প্রকাশ করেছিলেন পত্রিকায় দেয়া সাক্ষাত্কারে।
জোসেফ স্টালিন সোভিয়েত রাশিয়ায় লাখ লাখ মানুষকে হত্যা করেছিলেন। বহু লক্ষ মানুষের প্রাণনাশ ঘটেছিল হিটলারের হাতে। চীনে বিপুল সংখ্যক মানুষের প্রাণনাশ ঘটেছিল মাও সে তুঙয়ের হাতে। হত্যাকারী এসব শাসক সবাই ছিল স্বৈরাচারী। প্রতি দেশে স্বৈরাচারীদের এটিই নীতি। তেমনি বাংলাদেশে হাজার হাজার মানুষের জীবননাশ ঘটেছিল শেখ মুজিবের হাতে। মুজিবের সাড়ে ৩ বছরের শাসনে লাশ হয়েছে প্রায় ৪০ হাজার মানুষ। তার আমলে এক সপ্তাহ বা এক মাসে যত মানুষ পুলিশ বা রক্ষিবাহিনীর হাতে লাশ হয়েছে, যুদ্ধকালীন ৯ মাস ছাড়া পাকিস্তানের ২৩ বছরেও তত মানুষ নিহত হয়নি। এমন একজন রাজনীতিক যে শুধু তার শাসনামলের তেহাত্তরে, চুয়াত্তরে বা পঁচাত্তরে অপরাধী ছিলেন তা নয়, ভয়ানক অপরাধী ছিলেন সত্তর, একাত্তরেও। এমনকি তার আগেও। পাকিস্তান সরকারের হাতে কোনো কালেই র্যাব ছিল না, রক্ষীবাহিনীও ছিল না। মিছিল রোধে রাস্তায় বড়জোর পুলিশ নামত। কিন্তু বাংলাদেশে এখন যৌথ বাহিনী নামে।
লুকানো হয়েছে ইতিহাস
বাংলাদেশে শিক্ষার নামে প্রচণ্ড কুশিক্ষা দেয়া হচ্ছে এবং সেটি বেশি ইতিহাস চর্চায়। সেটি করা হয়েছে শেখ মুজিবের মতো একজন গণবিরোধী শাসককে মহামান্য করতে। একাত্তরের প্রকৃত সত্যকে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে গোপন করা হয়েছে। একাত্তরের চেতনা ও স্বাধীনতা যুদ্ধের নামে যে প্রচণ্ড মিথ্যাচারকে প্রতিষ্ঠা দেয়া হয়েছে তার ভিত্তিতেই কে শত্রু আর কে বন্ধু সেটিও কৃত্রিমভাবে ছাত্রদের মগজে বদ্ধমূল করা হয়েছে। সে মিথ্যার ভিত্তিতেই ইসলামপন্থীদের ফাঁসিতে চড়ানোর ষড়যন্ত্র হচ্ছে। আবদুল কাদের মোল্লার মতো একজন নিরীহ ও নির্দোষ মানুষ তো সে মিথ্যাচারেরই শিকার। সরকারি খরচে হাজার হাজার ছাত্রছাত্রীকে শাহবাগে খাড়া করা হয়েছে, তাদের দিয়ে আবদুল কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবিও উঠানো হয়েছে। আর আদালতকে দিয়ে সে দাবি বাস্তবায়নও করানো হয়েছে। একাত্তরের অপরাধ ও প্রকৃত অপরাধীদের নিয়ে তাদের মাথাব্যথা নেই। তাদের এজেন্ডা একাত্তরকে অজুহাত বানিয়ে ইসলামের পক্ষের শক্তিকে নির্মূল করা।
বাকশালীরা প্রতি কথায় একাত্তরের যুদ্ধ ও মুি্ক্তযুদ্ধের চেতনার কথা বলে। কিন্তু কী সে মুক্তিযুদ্ধ এবং কী সে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা? এ নিয়ে ইসলামপন্থীরা খামোশ। কিন্তু সে কৌশলটিতে হিকমত নেই। ঈমানদারের দায়িত্ব তো সত্যকে সর্বসামর্থ্য দিয়ে প্রকাশ করা। তথা সত্যের পক্ষে সাক্ষ্য দেয়া। একাত্তরকে ঘিরেও তো বহু সত্য ঘটনা রয়েছে। সে সত্য প্রকাশ না পেলে তো মিথ্যাই সত্যকে ঢেকে ফেলবে। একাত্তরকে ঘিরে তো সেটিই ঘটেছে। তাই একাত্তর নিয়ে প্রকৃত সত্যকে প্রবলভাবে তুলে ধরাটি ঈমানদারের দায়িত্ব। বাকশালীদের লুকানো ইতিহাস নতুন প্রজন্মকে জানাতে হবে। যা আজ মুক্তিযুদ্ধ বা স্বাধীনতার যুদ্ধ রূপে মর্যাদা পাচ্ছে সেটি ছিল পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্নতার যুদ্ধ। ভারতের কাশ্মীর, আসাম, নাগাল্যান্ড, মণিপুর, মিজোরামে তেমন একটি বিচ্ছিন্নতার যুদ্ধ চলছে বিগত ৬০ বছর ধরে। সে যুদ্ধে এখনও বিজয় আসেনি। ফলে যারা সে বিচ্ছিন্নতার সঙ্গে লিপ্ত তারা মুক্তিযোদ্ধার মর্যাদা পায়নি। তাদের যুদ্ধ স্বাধীনতার যুদ্ধ রূপেও চিত্রিত হয়নি। বরং যারা সে যুদ্ধটি প্রাণপণে লড়ছে এবং অনেকে প্রাণও দিচ্ছে, তারা চিত্রিত হচ্ছে সন্ত্রাসী ও ভারতের সংহতির দুশমন রূপে। সেটি যেমন ভারতের কাছে, তেমনি বাংলাদেশের বাকশালীদের কাছেও। স্বাধীনতাকামী সে যোদ্ধাদের মধ্য থেকে যারা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিল, হাসিনা সরকার তাদের সন্ত্রাসী আখ্যায়িত করে ভারতের হাতে তুলে দিচ্ছে। কথা হলো, বাঙালির একাত্তরের বিচ্ছিন্নতার যুদ্ধ থেকে কাশ্মীর, আসাম, নাগাল্যান্ড, মণিপুর, মিজোরামের যুদ্ধগুলোর পার্থক্য কোথায়? তাদের কাছে যদি নিজেদের পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্নতার চেতনাটি একাত্তরের চেতনা রূপে পূজনীয় হয়, তবে তাদের সে চেতনাটি বাকশালীদের কাছে মর্যাদা পায় না কেন? তাদের বিচ্ছিন্নতার যুদ্ধের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে ভারতের সেনাবাহিনী। ভারতীয় সেনাবাহিনীর সঙ্গে সহযোগিতা করছে হাসিনা সরকার। হাসিনা ও তার সহযোগীরা যে ভারতকে সাহায্য করছেন সেটি তাদের নিজেদের দেশ নয়। একাত্তরের চেতনার বুলি যে কতটা নীতিশূন্য ও ভণ্ডামিপূর্ণ, সেটি কি এরপরও বুঝতে বাকি থাকে?
বাংলাদেশীদের ঘাড়ে এখন বাকশালী ফ্যাসিজমের মহাবিপদ। সেটির শুরু ২০১৩ সালে বা ২০০৮ সালে নয়। একাত্তরেও নয়। শুরু হয়েছিল ১৯৪৭ থেকেই। বাকশালীদের মূল অপরাধও তো সেই আমল থেকেই। তাদের আজকের অপরাধের চেয়ে পুরনো সে অপরাধগুলো কি কম গুরুতর? সে অপরাধীদের সঙ্গে তুলে ধরতে হবে ভারতের কুকর্মগুলোও। নইলে সাধারণ মানুষের দৃষ্টির অগোচরে থেকে যাবে বাঙালি মুসলমান ও ইসলামের বিরুদ্ধে এ জঘন্য শত্রু ও তার মিত্রদের নাশকতার ভয়ঙ্কর চিত্র। সে কাজটি দ্রুত না হলে আরও বহু নিরীহ মানুষকে এ মিথ্যুকদের হাতে ফাঁসিতে ঝুলতে হবে। শুধু তাই নয়, জীবননাশের পাশাপাশি অবিরাম চলতে থাকবে ইসলামপন্থীদের চরিত্রনাশও।
No comments:
Post a Comment