উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ : গাঁজার নৌকা পাহাড় দিয়ে যায়

গাঁজাখোররা ইচ্ছা করলে পানির বদলে নৌকা পাহাড় দিয়েও চালিয়ে নিতে পারেন। ‘জোর যার মুলুক তার’ রীতিতে যখন ক্ষমতাসীনরা দেশ পরিচালনায় বেপরোয়া হয়ে ওঠেন তখন দেশ আর দেশের মতো না থেকে কবি শামসুর রাহমানের মতে, ‘উদ্ভট উটের পিঠে চলে দেশ।’ মরহুম ওই বরেণ্য ব্যক্তিদ্বয় বেঁচে থাকলে দেশের চালচিত্র দেখে এখন কী লিখতেন তা আমার পক্ষে যেমন বলাবাহুল্য, তেমনি দুঃসাধ্যও বটে। তবে সাংবাদিক স্টালিন সরকার কিছুদিন আগে দৈনিক ইনকিলাব পত্রিকায় ‘গাঁজার নৌকা পাহাড় দিয়ে যায়’ শিরোনামে লাল রঙের ছয় কলামজুড়ে লিড নিউজ প্রকাশ করে অনেকটাই আমাকে দেনার জালে আবদ্ধ করেছেন। আমি মনে করি, শ্রদ্ধেয় সহকর্মী স্টালিন সরকার ভাই নিঃসন্দেহে দেশবাসীকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন দেশের ক্লান্তিকালে এরকম একটি সাহিত্যিক ও দুঃসাহসিক খবরের শিরোনাম করে।
আজ বাস্তবিকপক্ষেই বাংলাদেশের জনগণ ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছেন। গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচন ইস্যুকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট রাজনৈতিক সঙ্কটে বর্তমানে দেশের সবশ্রেণীর মানুষ চরম অনিশ্চয়তায় ভুগছেন। সামনে দেশের অবস্থা কী হবে তা কেউ একদিকে যেমন জানেন না, অন্যদিকে তেমনি জাতির ভবিষ্যত্ আন্দাজ করতেও দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে। সংঘাত-সংঘর্ষ, পুলিশের গুলি এবং প্রার্থীবিহীন পাতানো নির্বাচন বাতিলের দাবির আন্দোলনে গণমানুষ বড়ই সোচ্চার ছিল। দেশের মালিক জনগণের দাবিকে কোনো প্রকার তোয়াক্কা না করে এরই মধ্যে মহাজোট তাদের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নির্বাচন সম্পন্ন করে সরকার গঠন করেছে। আর সরকারের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কর্মের বিরুদ্ধে আর গণদাবির লক্ষ্যে আন্দোলনকারীদের ওপর ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতার খড়গে নিত্যদিন মানুষের প্রাণহানি ঘটায় বেড়েই চলেছে রাজপথে লাশের মিছিল।
বিরোধীদলীয়দের আন্দোলনের হাওয়ায় পাতানো গত ৫ জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের আগে রাজধানী ঢাকা থেকে সাতক্ষীরার মতো অধিকাংশ এলাকা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। জনপ্রতিরোধের ভয়ে ওই সময় দেশের ২১টি জেলার ডিসি, এসপিকে পুলিশের প্রহরায় ঢাকায় আসতে হয়েছে। ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিতে নিরাপত্তার অভাবে দেশের নির্বাচন পর্যবেক্ষকরা ভোটের দিন পর্যবেক্ষণে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। একই কারণে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠেয় ভোটে পর্যবেক্ষক না পাঠানোর সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেয়।
আরপিও ভঙ্গ করে সমঝোতার মাধ্যমে ১৫৩টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছে জনপ্রতিনিধি। ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীদের গণরোষের ভয়ে নির্বাচনী এলাকায় যেতে নানামুখী বাধার সম্মুখীন হতেও হয়েছে। যারা প্রার্থী হয়েছেন তাদের অনেকেই আকাশপথে হেলিকপ্টারে গিয়েও মনোনয়নপত্র দাখিল করার ঘটনা ঘটেছে।
একতরফা যাত্রীবিহীন নির্বাচনী ট্রেন পরিচালনার দায়ে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এরই মধ্যে বাংলাদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে। সরকারের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা পুলিশ প্রহরায় চলাফেরা করতে ভয় পাচ্ছেন। এ অবস্থায় রোমের শাসক নিরোর বাঁশি বাজানোর মতো প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিব উদ্দিন আহমদ নির্বাচন সম্পন্ন করে ক্ষমতার কারিসমা দেখিয়েছেন। তার সপষ্ট বক্তব্য ছিল, ‘নির্বাচন করতেই হবে।’
৫ জানুয়ারির অনুষ্ঠেয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশে ভয়াবহ অবস্থা বিরাজ করে। নির্বাচন প্রতিহতের বিরোধী দলের অবরোধে অংশ নিয়ে সারাদেশ কার্যত অচল করে দেয়া হয়েছে। আন্দোলনরত বিক্ষুব্ধ মানুষকে ঠেকাতে র্যাব-পুলিশ-বিজিবি’র ওপর ভরসা করতে না পারায় নির্বাচনে দেশপ্রেমী সেনাবাহিনীকে মাঠে নামায় সরকার।
গত বছরের ১৯ ডিসেম্বর লালমনিরহাটে সাবেক প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী মোতাহার হোসেনের সমাবেশস্থলে অর্ধশত মোটরসাইকেল পুড়িয়ে দেয় বিক্ষুব্ধ জনতা। বিক্ষুব্ধ জনতাকে গ্রেফতার করতে মাঠে নেমেছে যৌথ বাহিনী। যৌথ বাহিনীর ভয়ে লালমনিরহাট জেলার পাটগ্রামের কয়েকটি গ্রাম পুরুষশূন্য হয়। নীলফামারীতে সরকারদলীয় এমপি বিশিষ্ট অভিনেতা আসাদুজ্জামান নূরের সফরসঙ্গী ছাত্রলীগ-যুবলীগের সঙ্গে অবরোধকারী ও স্থানীয় বিক্ষুব্ধ জনতার সংঘর্ষে ৫ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। ওই ঘটনার পর মারমুখী সরকার যৌথ বাহিনী নামিয়ে গণহারে গ্রেফতার করে। এতে করে কয়েকটি গ্রাম তখন পুরুযষশূন্য হয়। এমনকি পুলিশের ভয়ে পলাতক থাকায় স্থানীয় দু’তিনটি মসজিদে আজান পর্যন্ত দেয়ার লোক ছিল না। আবার যেসব মসজিদে আজান দেয়া হয় গ্রামের পুরুষরা পলাতক থাকায় সে সব মসজিদে জুমার নামাজ পড়ার লোক ছিল না। (গত ফেব্রুয়ারি-মার্চে একই অবস্থা হয়েছিল গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে)। সাতক্ষীরায় প্রশাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে বলে খোদ সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরাও অকপটে স্বীকার করেছেন। সেখানে যৌথ বাহিনী অভিযান চালিয়ে অবরোধকারী এবং বিক্ষুব্ধ জনতাকে গণহারে গ্রেফতার করে। যৌথ বাহিনীর এ অভিযানে স্থানীয় ছাত্রলীগ ও যুবলীগের ক্যাডারদের সঙ্গে রাখারও অভিযোগ ওঠে। এমনকি যৌথ বাহিনীর অভিযানের সময়ও সেখানে বিক্ষুব্ধ জনতা আওয়ামী লীগের একজন নেতাকে কুপিয়ে হত্যা করেছে।
অন্যদিকে পাতানো নির্বাচন বর্জন করায় বলতে গেলে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান সাবেক প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে পাকিস্তানি কায়দায় আটক করা হয়েছে। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় ২৫ মার্চ কালো রাতে শেখ মুজিবুর রহমানকে যেভাবে গ্রেফতার করে করাচি নিয়ে যাওয়া হয়, ঠিক একই কায়দায় বারিধারার বাসা থেকে পল্লীবন্ধুখ্যাত এরশাদকে আটক করে সিএমএইচে নিয়ে যাওয়া হয়। এরশাদ বলছেন আমি সুস্থ; অথচ সরকার বলছে অসুস্থ। এ যেন মাসীর চেয়ে পিসীর দরদ বেশি।
এরশাদকে বন্দি রেখে জাতীয় পার্টিকে নির্বাচনে নেয়ার জন্য নানা ধরনের ছলচাতুরি করা হয় মহাজোটের পক্ষ থেকে। এমন খবর সচেতন মহল থেকে চারদিকে চাউর হয়। আমরা মনে করি, নির্বাচনে যাওয়া না যাওয়া মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার। অথচ হিটলারি কায়দায় জাতীয় পার্টিকে নির্বাচনে অংশ নিতে বাধ্য করা হয়েছে। প্রবীণ সাংবাদিক এবিএম মূসা নির্বাচনের আগে গণমাধ্যমে জানিয়েছেন, ‘বর্তমান সরকার কার্যত ঢাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে। ঢাকা থেকে সারাদেশ বিচ্ছিন্ন। এ সরকারের আমলেই আমরা সাতক্ষীরা স্বাধীন করেছি। মোঘল সম্রাটদের মতো শেখ হাসিনার সরকার শুধু রাজধানীর নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে। এ সরকারকে বলা উচিত গণপ্রজাতন্ত্রী ঢাকা সরকার।’
সরকারের নির্লিপ্ততা এবং নির্বাচন কমিশনের গোঁয়ার্তুমিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে কৃষক-শ্রমিক-জনতা পার্টির সভাপতি বঙ্গবীর আবদুল কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তম গণমাধ্যমে জানিয়েছেন, ‘সরকার দেউলিয়া হয়ে গেছে। তাদের কারণে দেশের সব রীতি-নীতি আজ বিশ্ব দরবারে নতজানু হয়ে পড়ছে। দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব আজ হুমকির মুখে। সাবেক প্রেসিডেন্ট এইচএম এরশাদকে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে আটক রাখার সমালোচনা করে তিনি জানান, এতে সেনাবাহিনীরও বদনাম হচ্ছে। রক্তের মাধ্যমে বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে। যে কোনো জিনিসের জন্ম রক্ত ছাড়া হয় না। রক্তই গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে ভূমিকা রাখবে।’
বিকল্পধারার সভাপতি সাবেক প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী গণমাধ্যমে জানান, ১৫৩ আসনে জনগণের ভোট দেয়ার অধিকার নেই। এটি কোন ধরনের নির্বাচন? এ ধরনের নির্বাচন মানুষ চায় না। জনগণের ভোট ছাড়া জনপ্রতিনিধি হয় কেমন করে? তিনি আরও জানান, সরকার বিরোধী দলকে সংলাপের টোপ দিয়েছে। বিরোধী দল এই টোপ গ্রহণ করবে না।
বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য সাবেক এমপি আলহাজ সুলতান মাহমুদ বাবু গণমাধ্যমে জানিয়েছেন, কিসের সংলাপ? গণহারে বিএনপির নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হচ্ছে। পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয় বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এরপর তো আর সরকারের মুখে ‘সংলাপ’ মানায় না।
গণফোরাম সভাপতি বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. কামাল হোসেনও নির্বাচন বয়কট করে আন্দোলন করছেন। তিনি গণমাধ্যমে জানান, ‘সরকার সংবিধানকে কেটেহেঁচড়ে খোঁড়া করে আবার সংবিধানের দোহাই দিয়ে আওয়ামী লীগ নির্বাচনের কথা বলে। তিনি আরও জানান, আওয়ামী লীগের অধীনে নির্বাচনে যাওয়ার কোনো প্রশ্নই আসে না। তাই ওই একতরফার যাত্রীবিহীন নির্বাচনী ট্রেনটিকে থামাতে বলেছি।’
তত্কালীন ১৮দলীয় জোটের (বর্তমান ১৯দলীয়) অন্যতম নেতা জাগপা সভাপতি শফিউল আলম প্রধান বলেছেন, ‘দিল্লির কৃতদাস আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে সমঝোতার কোনো আলোচনা হবে না। ফয়সালা হবে রাজপথে।’ সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক ও সুজনের সাধারণ সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার সিইসির প্রতি প্রশ্ন রেখেছেন, এ ধরনের নির্বাচনে সেনাবাহিনী কেন?
বাংলাদেশের নির্বাচনী ইস্যুকে কেন্দ্র করে ঘটমান ভয়ঙ্কর অবস্থায় দেশের মানুষের পাশাপাশি গোটা বিশ্ব উদ্বিগ্ন। জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারানকোর দৌড়ঝাপ বিশ্ববাসী দেখেছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থাসহ দেশের মানবাধিকার সংস্থাগুলো বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন। বর্তমানের অবস্থাকে ’৭১-এর গণহত্যার সঙ্গে তুলনা করেছে। বিশ্বের প্রভাবশালী মিডিয়াগুলোতে বাংলাদেশের সংঘাতময় অবস্থা তুলে ধরে নিউজ হচ্ছে নিত্যদিন। কেউ বলছেন গৃহযুদ্ধের কবলে দেশ, কেউ লিখছেন বাংলাদেশ জ্বলছে, কেউ লিখছেন বাংলাদেশের প্রশাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে ইত্যাদি। বিদেশিদের এসব আশঙ্কা-আতঙ্কের প্রতিও খেয়াল নেই নির্বাচন কমিশনের।
সরকারের আজ্ঞাবহ নির্বাচন কমিশন পণমতো তারা নির্বাচন করেই ছেড়েছে। গত ২০ ডিসেম্বর নির্বাচন কমিশনে নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিযে বৈঠক হয়। আগের দিন এ বৈঠক হওয়ার কথা থাকলেও নিরাপত্তাজনিত কারণে অনেক জেলায় কর্মরত ডিসি-এসপি আসতে পারবেন না বলে জানিয়ে দেয়ায় বৈঠক একদিন পেছানো হয়। এ বৈঠকেও দেশের ২১ জেলার ডিসি-এসপি পুলিশ প্রহরায় ঢাকায় আসেন। বৈঠকে ডিসি এসপিরা তাদের জেলাগুলোর জনবিক্ষোভ ও নৈরাজ্যকর অবস্থা তুলে ধরেন। এমনকি একাধিক ডিসি নৈরাজ্যকর এ অবস্থায় নির্বাচন করা কঠিন হবে বলেও জানান।
তারপরও সিইসি কাজী রকিব উদ্দিন আহমদ গণমাধ্যমে জানান, দেশে নির্বাচনের অনুকূল পরিবেশ রয়েছে। যেসব জেলায় পরিস্থিতি খারাপ ছিল সেগুলোতে পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। সরকারের এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য এই সিইসি দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীকে মাঠে নামানোর জন্য অস্থির হয়ে পড়েন।
জাতীয় পত্রিকার প্রকাশিত খবরে জানা গেছে, নির্বাচন বাতিলের দাবিতে অবরোধের কারণে কক্সবাজার, ফেনী, লক্ষ্মীপুর, গাইবান্ধা, নোয়াখালী, রংপুর, চট্টগ্রাম, কুড়িগ্রাম, রাজশাহী, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, পাবনাসহ কয়েকটি জেলায় ভয়াবহ অবস্থা দেখা দেয়। নির্বাচন প্রতিহতের দাবির অবরোধ কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে বিক্ষুব্ধ জনতা কার্যত প্রশাসনব্যবস্থাকে ভেঙে দেয়। অনেক জায়গায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে বিক্ষুব্ধ জনতাকে সমঝোতায় চলতে হয়েছে। ২০ ডিসেম্বর সিরাজগঞ্জ-রাজশাহী সড়কে জনতার প্রতিরোধে র্যাবকে পিছু হটতে হয়েছে। দেশের সাধারণ মানুষের এ মারমুখী অবস্থা এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অবস্থান বুঝতে পেরে সরকারের নীতিনির্ধারকরা গলার স্বর নিচু করেন। প্রকাশ্যে নির্বাচন করব, নির্বাচন কেউ ঠেকাতে পারবে না ইত্যাদি বলা হলেও বিরোধী দলের সঙ্গে সংলাপের মাধ্যমে সমঝোতার কথা বলছেন। ভেতরে ভেতরে বিরোধী দল যাতে সংলাপে আসে সে চেষ্টা করছে। সে জন্যই মন্ত্রী হাসানুল হক ইনু যখন বলেন, ৫ বছরের জন্য নির্বাচন হচ্ছে। ২০১৯ সালের একাদশ নির্বাচনের জন্য বিরোধী দল সংলাপ করতে পারে। তখন আরেক মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ইনুর বক্তব্যের প্রতিবাদ করে বলেছেন, ইনু আওয়ামী লীগের কেউ নন। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর পরই নির্বাচনের জন্য আলোচনা হতে পারে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও একই কথা বলেছেন। কিন্তু বিরোধী দল সরকারের এসব বক্তব্যকে বিভ্রান্তিকর বলে অভিহিত করেছে।
নির্বাচনের আগমুহূর্তে সরকারের জুলুম-নির্যাতন চারদিকে চলে। সরকারের সংলাপের প্রস্তাব মানুষকে ধরে হাত-পা বেঁধে পানিতে ফেলে দিয়ে সাঁতরানোর নির্দেশ দেয়ার মতো ঘটনা। হাত-পা বাঁধা অবস্থায় কেউ যেমন পানিতে সাঁতরাতে পারে না, তেমনি নির্বাচন ইসু্যুতে সরকারের সঙ্গে কোনো সংলাপ হতে পারে না। এমন মন্তব্য আসে সচেতন ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণ মহল থেকে।
কোনো কথাই যেন নির্বাচন কমিশনের কর্তাব্যক্তিদের কানে পৌঁছেনি। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পর্যবেক্ষকদের না আসা সম্পর্কে সিইসি ২০ ডিসেম্বর গণমাধ্যমকর্মীদের বলেছেন, নির্বাচন পর্যবেক্ষণে কে আসবে কে আসবে না, সেটা তাদের ব্যাপার। তবে যারা পর্যবেক্ষণ করবেন তাদের নিরাপত্তা দেয়া হবে। দেশের জনগণকে অভয় দিচ্ছি আপনারা নির্বিঘ্নে ভোট দেবেন। সিইসির এই কথায় কি জনগণের আস্থা ছিল? ভোটের সময় সিইসি ভোটারদের নিরাপত্তা দেবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন কিন্তু এখন কি তিনি নিরাপত্তা দিতে পারছেন? নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর প্রশাসনের নির্বাহী ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের হাতে থাকার কথা। কিন্তু তফসিল ঘোষণার পর প্রায় ১১০ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছে।
ওইসব প্রাণহানির মধ্যে পুলিশের গুলিতে মারা গেছে প্রায় অর্ধেক। সিইসি কি এই দায় এড়াতে পারবেন? বিরোধী দলের অবরোধের কারণে সপ্তাহে ৬ দিন ঢাকা থেকে সারাদেশ বিচ্ছিন্ন থাকার ঘটনা ঘটে। কয়েকটি জেলায় যৌথ বাহিনী নামিয়েও বিক্ষুব্ধ মানুষকে শান্ত করা যাচ্ছিল না। বিরোধী দল হুঙ্কার দিয়েছিল, যে কোনোভাবেই হোক নির্বাচন ঠেকিয়ে দেয়া হবে। এ অবস্থায় তিনি ভোটার ছাড়াই নির্বাচনের মাধ্যমে জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করবেন? এমন প্রশ্ন ওঠে।
ভোটার ছাড়া ভোট আর পানি ছাড়া নৌকা কি কল্পনা করা যায়? অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নির্বাচন কমিশন যেন উদ্ভট উটের পিঠে চড়েছে। সিইসির কথা শুনে হেদায়েত হোসেন মোরশেদের সেই প্রবন্ধ গাঁজার নৌকা পাহাড় দিয়ে যায়-এর কথা মনে পড়ছে।
সিইসি জনাব মোরশেদের সেই ‘গাঁজার নৌকা পাহাড় দিয়ে যায়’-এর মতো ভোটারবিহীন নির্বাচন করেই ছেড়েছেন। তবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী কাজী জাফর আহমদ গণমাধ্যমে বলেছেন, ‘প্রার্থীবিহীন আর ভোটারবিহীন এ নির্বাচন ইতিহাসে পাগলের সংসদ হিসেবে পরিচিতি পাবে।’
পাতানো নির্বাচন থেকে সরকার সরে না আসায় বিশ্বদরবারে বাংলাদেশ কার্যত বন্ধুহীন হয়ে পড়ছে। মুখ থুবড়ে পড়েছে দেশের অর্থনীতি। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় শিল্প-বাণিজ্যের ত্রাহি অবস্থা। ব্যবসায়ী এবং অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা এ অবস্থা চলতে থাকলে দেশের অর্থনীতি ভেঙে পড়বে। ব্যবসায়ী শিল্পপতিরা পথে বসবে। বিদেশিরা আগেভাগেই জানিয়ে দিয়েছিল পাতানো নির্বাচন হলে কোনো পর্যবেক্ষক পাঠানো হবে না। দেশের বুদ্ধিজীবী, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, পেশাজীবীরা বলছিল সরকার যদি পাতানো নির্বাচন থেকে সরে না আসে এবং বিরোধী দল যদি আবরোধ-হরতাল কর্মসূচি অব্যাহত রাখে তাহলে আফ্রিকার দেশগুলোর মতো বাংলাদেশের অবস্থা হতে পারে। কারণ জাতিসংঘ সরকারের একগুঁয়েমিতে বিরক্ত এবং আশাহত। এসব হক কথা সাফ কথা চারদিক থেকে বলাবলি হলেও সরকার একতরফার নির্বাচন সমাপ্ত করে শাসনকাজে আসীন হয়েছে, যা গণতান্ত্রিক স্বাধীন দেশের জন্য একান্তই লজ্জার বিষয়।