রাজনীতি যদি রাজনীতির ময়দানে দাঁড়িয়ে খোলাখুলি করা না যায়, তখন বেজায়গায় তা
প্রকাশ পাবেই। খেলার মাঠ নাকি সে রকম এক বেজায়গা। প্রশ্নটা তাই এখন
দাঁড়িয়েছে, খেলার সঙ্গে রাজনীতি যদি মেশেই, তাহলে কোন ধরনের রাজনীতি মেশানো
শ্রেয়? এশিয়া কাপে ভারত-পাকিস্তানের ক্রিকেটযুদ্ধে পাকিস্তানের নামে
জয়ধ্বনি দেওয়ায় মীরাটে পড়তে আসা কাশ্মীরের ৬৭ জন ছাত্রকে বিশ্ববিদ্যালয়
কর্তৃপক্ষ মাতৃভূমি কাশ্মীরে পাঠিয়ে দিয়েছে। তাঁদের নামে রাষ্ট্রদ্রোহ
মামলা সমালোচনার মুখে সরানো হয়েছে বটে, কিন্তু তাদের রাজনৈতিক আনুগত্য নিয়ে
সংশয় কাটেনি। পাকিস্তানি ক্রিকেট তারকা আফ্রিদির ভক্ত হওয়ার বিরুদ্ধে
ভারতে কোনো আইন না থাকায় এ যাত্রা তাঁদের অপরাধী সাব্যস্ত করা গেল না।
কিন্তু সনাতন ভারতীয় মন আহত হয়েছে। হিন্দু-মুসলমানের দূরত্বও বেড়েছে।
কাশ্মীরিদের
অনেকেই ভারতকে দখলদার মনে করেন। স্বাধীনতাকামী কাশ্মীরি হিসেবে তাঁরা নাহয়
ভারতের পরাজয়েখুশি হলেন কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের শত্রু পাকিস্তানকে কীভাবে
বাংলাদেশি কেউ সমর্থন করতে পারে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এই সমর্থনের কতটা
খেলার নৈপুণ্যের জন্য আর কতটা ভারতবিরোধিতার জন্য, তা পরিমাপ করা কঠিন।
হয়তো ক্রিকেট-পাকিস্তানের সমর্থকদের মনে এর সবই কাজ করেছে। কিন্তু এমন
সমর্থন-ভালোবাসা রাজনৈতিক সমাজেও ফাটল বাড়ায়। খেলা তাই শুধু খেলা নয়, তা
জাতীয়তাবাদের কোমল অস্ত্র এবং অস্ত্রটি অতীব ধারালো।
খেলার সঙ্গে
রাজনীতির মিশেলের ইতিহাস অতি দীর্ঘ। ব্রিটিশ আমলে ফুটবল ও ক্রিকেটে
ব্রিটিশদের পরাজিত করতে পারলে পরাধীন মন সুখী হতো। রাজনৈতিক পরাজয়ের শোধ
হিসেবে দেখা হতো খেলার জয়কে। ব্রিটিশরাও ক্রিকেটকে ভারতবর্ষে এনেছিল
ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রতি ভক্তি বাড়াতে। ভারতীয় সমাজমনস্তত্ত্ববিদ আশীষ
নন্দীর মতে, ক্রিকেটের আম্পায়ারের একচ্ছত্র ক্ষমতা ভারতীয় মনে ব্রিটিশ
আম্পায়ারের ক্ষমতার প্রতীক হিসেবে ধরা দিয়েছিল। ক্রিকেটের মাধ্যমে
ভারতীয়দের ডিসিপ্লিন তথা শৃঙ্খলা ও আনুগত্যে দীক্ষিত করতে চেয়েছিলেন
শাসকেরা।
ছোটবেলায় ক্রিকেটের আম্পায়ার তথা বিচারককে ব্রিটিশ আম্পায়ার
তথা সাম্রাজ্যের সঙ্গে আমিও গুলিয়ে ফেলতাম। আইরিশ ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের
জাতীয়তাবাদী সংগ্রামের হাতিয়ার হয়ে উঠেছিল ক্রিকেট। অধিপতি সাদাদের যদি
অধীন কৃষ্ণাঙ্গরা খেলায় পরাজিত করতে পারে, তাহলে বাস্তবেও তাদের হারানো
সম্ভব—এমন আত্মবিশ্বাসের বয়নে খেলার অবদান ছিল। কলকাতা বা মুম্বাইতে দেশীয়
ক্রিকেট দল ব্রিটিশদের হারালে জাতীয়তাবাদের জোশ বাড়ত। অখণ্ড বাংলায়
সাম্প্রদায়িক মৌসুমে মুসলিম মোহামেডানের সঙ্গে হিন্দু দলের ফুটবল লিগ হয়ে
উঠেছিল দুই সম্প্রদায়ের শ্রেষ্ঠত্বের যুদ্ধ। সুতরাং খেলার সঙ্গে রাজনীতি না
মেশানোর আহ্বান যতই সুন্দর হোক, কম লোকই তা মনে রাখে।
এই পরিপ্রেক্ষিতে
দাঁড়িয়ে অনেকে মনে করেন, রাষ্ট্রীয় আনুগত্য মানে জাতীয় ক্রিকেট দলের প্রতি
নিঃশর্ত সমর্থন। এভাবে জাতীয় ক্রীড়া দলের পক্ষে থাকা না থাকা দিয়েই
রাজনৈতিক আনুগত্যের অম্ল-পরীক্ষা (অ্যাসিড টেস্ট) হয়। স্টেডিয়ামের
গ্যালারির আচরণ থেকে ঘাপটি মারা ‘দেশদ্রোহী’দের তাঁরা চিনে ফেলতে চান।
কোনো
দেশের জাতীয় ক্রিকেট দল যখন সে দেশের পতাকা, জাতীয় সংগীত বহন করে, তখন সেই
দলের জয়-পরাজয় খোদ রাষ্ট্রেরই জয়-পরাজয় বলে ভাবার সুযোগ আসে। তখন সেই
রাষ্ট্রের অসন্তুষ্ট বা নিপীড়িত জাতিগোষ্ঠী যদি জাতীয় দলকে সরকারের প্রতিভূ
মনে করে সমর্থন করতে ব্যর্থ হয়, তখন কি তাদের ‘বেইমান’ বলা হবে? খেলার
দলকে জাতীয় ভাবা হলে তা এমন নৈতিক ও রাজনৈতিক জটিলতা সৃষ্টি করবেই।
এই
বিপদের আলামত বাংলাদেশেও দেখা গেছে। এশিয়া কাপের ফাইনালে এবার খেলল
পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা। তার আগে খেলা হয় ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে। দুই
খেলাতেই পাকিস্তান ও ভারতীয় দলের হয়ে জয়ধ্বনি দিতে দেখা গেছে বাংলাদেশি
গ্যালারিতে। এক কাশ্মীরি নেতা যেমন বলেছেন, তাঁরা সর্বাবস্থায় ভারতীয় দলের
পরাজয় দেখতে চান। বাংলাদেশে এ রকম ক্রিকেটামোদীর সংখ্যা অনেক, যাঁরা
সর্বাবস্থায় পাকিস্তানের দুর্দশা দেখতে পছন্দ করেন। আরেক দল আছে, ভারতের
পরাজয়ে তাদের আহত অহং সুখ পায়। এ দুই পক্ষের বড় অংশই আবার সর্বাবস্থায়
বাংলাদেশের জয়েজয়ী বোধ করে। আরেকটি পক্ষ আছে, গ্যালারিতে যাদের ব্যানারে
লেখা ছিল: যে জন বঙ্গেতে জন্মি হয় ভারতীয়/ পাকিস্তানি সে জন কাহার জন্ম
নির্ণয় না জানি।
বাংলাদেশে ভারত ও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে শক্তিশালী জনমত
রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি গণহত্যার পর বাংলাদেশিদের মনে পাকিস্তানের
শুদ্ধ-সুন্দর ভাবমূর্তি আঁকা অসম্ভব। অন্যদিকে পানি-বঞ্চনা, সীমান্ত
হত্যাসহ অজস্র রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণে অনেক বাংলাদেশিই ভারতের ব্যাপারে
অসন্তুষ্ট ও ভীত। নির্বাচন নিয়ে হুজ্জতে এই বিরোধিতা আরও বেড়েছে।
রাজনীতিতে এক পক্ষ অপর পক্ষকে ভারতের বা পাকিস্তানের ‘তল্পিবাহক’ মনে করে।
তাহলে দাঁড়াল কী? কোন দল কোন দেশের মিত্র, তাই দিয়ে দলের চরিত্র বিচার
হচ্ছে। যে বাংলাদেশের বন্ধু ভারত আর যে বাংলাদেশের বন্ধু পাকিস্তান, সেই
দুই বাংলাদেশ এক হতেই পারছে না। এক রাজনৈতিক মেরুর বাংলাদেশের সঙ্গে অন্য
মেরুর বাংলাদেশের কুস্তিকর্ম মনে পড়ায় সেই দুই ছাগলের কথা: লড়তে লড়তে
পাহাড়ের ঢাল দিয়ে খাদের দিকে তলাচ্ছে যে সেই হুঁশ নেই, তখনো তারা পরস্পরকে
গুঁতাতে ব্যস্ত।
স্বাধীন বাংলাদেশে যাঁরা পাকিস্তানি পতাকা ওড়ান বা
গায়ে-মুখে পাকিস্তানের পতাকা আঁকেন, ঘৃণার তাপে তাঁদের হুঁশ ফিরবার নয়। ওই
কাশ্মীরি ছাত্রদের দেশদ্রোহী বলার বিপক্ষে এক ভারতীয় দ্য হিন্দু পত্রিকায়
চিঠি লিখে সুন্দর উত্তর দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, ‘পাকিস্তানকে সমর্থনের জন্য
ওই ছাত্রদের দেশদ্রোহী বলা হবে বুমেরাং। এতে করে তারা আমাদের থেকে আরও
বিচ্ছিন্নই হয়ে যাবে। বরং...আমাদের উচিত তাদের মূলধারায় সম্পৃক্ত করায় কাজ
করা, তাদের মন জয় করা।’
উগ্র জাতীয়তাবাদ এক দুধারী তলোয়ার। তা যেমন
প্রতিপক্ষকে কাটে, তেমনি স্বদেশিকেও আহত করে। পাকিস্তান দলকে যাঁরা
নির্লজ্জভাবে সমর্থন করেছেন, তাঁরা নৈতিক ভুল করেছেন। ভারতমনা মনোভাবের
সমালোচনায় তাঁরা ভারতের শত্রুকে বন্ধু মনে করেন যদি, তবে তাঁদের ভুল
ভাঙানোর দায়িত্ব প্রকৃত দেশপ্রেমিকেরই। একধরনের ভাইরাস আছে, যা আঘাত পেলে
আরও শক্তিশালী হয়। যারা নিজ দেশের হালচালে ত্যক্তবিরক্ত, যারা নিজ
রাষ্ট্রের দ্বারা অবাঞ্ছিত বোধ করে, আরও আঘাতে তারা আরও দূরেই চলে যাবে এবং
শক্তিশালী হবে।
জাতীয়তাবাদী রাজনীতির এক পিঠে যদি থাকে দেশগর্ব, অন্য
পিঠে থাকে অপর জাতির প্রতি ঘৃণা। ঘৃণা যখন রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রধান রসায়ন
হয়, তখন শত্রুর শত্রু আমার বন্ধু—নিয়ম জয়ী হয়। তখনই দেখা যায় ভারতের
বিপরীতে পাকিস্তানকে বা পাকিস্তানের বিপরীতে ভারতকে সমর্থন করতে; কী খেলায়
আর কী রাজনীতিতে। একে বলা যায় ট্রান্সফারড অ্যাগ্রেশন বা স্থানান্তরিত
ক্রোধ। অর্থাৎ পাকিস্তানকে পছন্দ করি না বলে ভারত আমার প্রিয়, কিংবা ভারত
চাই না বলে পাকিস্তানই ভালো। কবি জীবনানন্দ দাশ লিখেছিলেন, অভাবে স্বভাব
নষ্ট না হলে এ জীবন হতো একতিল অধিক বিভোর। হয়তো রক্তপাত, শোষণ-বঞ্চনা আর
আধিপত্যের অভিজ্ঞতা না থাকলে আমরা খেলাকে হয়তো খেলা হিসেবে নিতে পারতাম।
কিন্তু চলতি সময়ে অযৌক্তিকভাবে হলেও খেলার সঙ্গে রাজনীতি মিশবেই। একে বুঝতে
হবে। তাহলে দেখব, রাজনৈতিক যুদ্ধ স্তিমিত হলেও তলে তলে সাংস্কৃতিক যুদ্ধ
চলছে। ক্রিকেট যে হারে সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠেছে, সেই হারে তার ভেতরেও ঢুকে
পড়ছে আত্মপরিচয়ের অন্তর্দ্বন্দ্ব। ক্রিকেট যে হারে মধ্যবিত্তীয়
জাতীয়তাবাদের হাতিয়ার হবে, সেই হারে তার ভেতরে দুই জাতীয়তাবাদের পাঞ্জা
লড়াই চলবে। তাই পাকিস্তান ক্রিকেট দলকে সমর্থন করার মনোভাবের তলায় কোন
রাজনৈতিক ব্যাকরণ কেন দানা বাঁধছে, তা ভাবা দরকার। এটা রোগ নয়, নয় রোগের
প্রকাশ। এর গোড়াটা খুঁজতে হবে রাজনৈতিক বাস্তবতার গভীরে।
হুঁশ ফিরলে
দেখা যাবে, প্রতিটি জাতীয় দলই কোনো না কোনো কোম্পানির বিজ্ঞাপনী হাতিয়ার।
রাষ্ট্রগুলো তাদের পুঁজিরই পাহারাদার। আমাদের আবেগ তাদের ব্যবসার পালে
হাওয়ামাত্র। এ রকম অবস্থাতেই বনের বাঘ শেষ হয়, আর বড় হয়ে ওঠে মনের বাঘ।