আটকের পর টাকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়ার ঘটনায় ১০১ জন পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে
অভিযোগ আনা হয়েছে। পুলিশ সুপার থেকে কনস্টেবল পর্যন্ত, এমনকি রাষ্ট্রপতি
পদক (পিপিএম) পাওয়া কর্মকর্তাও এই তালিকায় আছেন।
আটকের পর এই
কর্মকর্তারা ২২৬ জনকে ছেড়ে দেওয়ার বিনিময়ে এক কোটি ৩৫ লাখ টাকা উৎকোচ
নিয়েছেন। আসামিভেদে ঘুষের পরিমাণ দুই হাজার থেকে সর্বোচ্চ সাত লাখ টাকা।
দেশের সাত বিভাগের ১৯ জেলায় এ ঘটনাগুলো ঘটেছে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়
থেকে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো একটি নথি থেকে
এসব তথ্য জানা গেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ১৮ মার্চ ‘প্রধানমন্ত্রীর
নির্দেশনা অনুযায়ী’ অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে মন্ত্রণালয়কে
জানাতে পুলিশের মহাপরিদর্শককে (আইজিপি) নির্দেশ দিয়েছে।
জানতে চাইলে
স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান গত সোমবার প্রথম আলোকে বলেন,
‘প্রতিবেদনটা আমরা পেয়েছি। আমরা এসব অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয়
ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছি।’ তিনি বলেন, কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নন। আইন
অমান্য করলে যে শাস্তি হওয়ার কথা, তাঁদেরও তাই হবে। যেসব এলাকায় টাকা
লেনদেনের ঘটনা বেশি হয়েছে, সেসব এলাকা তিনি নিজে পরিদর্শনে যাবেন বলে
জানান।
‘বিভিন্ন জেলায় পুলিশ/আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কর্তৃক
গ্রেপ্তারের পর অর্থের বিনিময়ে গ্রেপ্তারকৃতদের ছেড়ে দেয়া প্রসঙ্গে বিশেষ
প্রতিবেদন’-এর সঙ্গে দেওয়া চিঠিতে বলা হয়েছে, ২২৬ জনকে গ্রেপ্তারের পর
অর্থের বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়ার সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেছে। এর জন্য দায়ী
ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তাবে প্রধানমন্ত্রী অনুমোদন
দিয়েছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, কিছু পুলিশ সদস্যের এই ধরনের কর্মকাণ্ডে
সরকারের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
প্রতিবেদনে দেখা যায়,
আটকের পর অর্থের বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়া ব্যক্তিদের বেশির ভাগ জামায়াত-বিএনপির
নেতা-কর্মী। ছেড়ে দেওয়ার তালিকায় আওয়ামী লীগের সমর্থক, ব্যবসায়ী, মাদকসেবী,
চোরাকারবারি, প্রেমিকযুগল, মোটরসাইকেল আরোহীরাও রয়েছেন। গত সংসদ
নির্বাচনের আগে-পরে এসব ঘটনা ঘটে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, টাকা
লেনদেন-প্রক্রিয়ায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুলিশ সরাসরি জড়িত ছিল। তবে বেশির
ভাগ ক্ষেত্রে দালাল বা মধ্যস্থতাকারী, পুলিশের সোর্স, জনপ্রতিনিধি, স্থানীয়
রাজনৈতিক নেতা ও অসাধু সাংবাদিকেরা জড়িত ছিলেন।
প্রতিবেদনে টাকা
লেনদেনের সঙ্গে জড়িত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের নাম, পদবি ও
কর্মস্থল, টাকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া ব্যক্তিদের নাম-ঠিকানা ও দলীয় পদ-পরিচয়,
লেনদেনে মধ্যস্থতাকারীর নাম-পরিচয়সহ কার কাছ থেকে কত টাকা নেওয়া হয়েছে,
সেসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
কিছু ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া
গ্রেপ্তারের ভয় দেখিয়ে থানা বা অন্য জায়গায় এনে টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়া
হয়েছে। এ ক্ষেত্রে হত্যা, নাশকতা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, মদ, জুয়া, চোরাচালান
ইত্যাদি মামলায় অজ্ঞাতনামা আসামির তালিকায় যুক্ত করার ভয় দেখানো হয়েছে।
কাউকে কাউকে প্রাথমিকভাবে দাগি সন্ত্রাসী, জামায়াত-বিএনপির নাশকতাকারী
হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা করা হয়েছে। কাঙ্ক্ষিত অর্থ পাওয়ার পর নিরীহ
ব্যক্তিদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে অথবা সুনির্দিষ্ট মামলায় আটক না দেখিয়ে দুর্বল
ধারায় (৫৪ ধারা) আটক দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
প্রতিবেদনে
বলা হয়েছে, টাকা চেয়ে না পেয়ে অনেককে আদালতে চালান দেওয়া হয়েছে এবং
পরবর্তী সময়ে তাঁদের জামিন হলে অন্য মামলায় জেলগেট থেকে আবার আটক করা
হয়েছে। এভাবে উৎকোচ না দেওয়া পর্যন্ত তাঁদের হয়রানি করা হয়েছে।
এই
প্রতিবেদন অনুযায়ী যেসব জেলায় এসব ঘটনা ঘটেছে সেগুলো হলো: লালমনিরহাট,
গাইবান্ধা, দিনাজপুর, যশোর, নড়াইল, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, সাতক্ষীরা, মাগুরা,
মেহেরপুর, বাগেরহাট, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, গাজীপুর, মানিকগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ,
জামালপুর, রাজবাড়ী ও গোপালগঞ্জ।
এর মধ্যে মেহেরপুরে সবচেয়ে বেশি
‘আটক-বাণিজ্য’ হয়েছে। ওই জেলায় গত নভেম্বর-জানুয়ারি মাসে প্রায় ৮০ জনকে
আটকের পর ছেড়ে দেওয়া হয়। এতে ৩১ লাখ ৪৭ হাজার টাকা লেনদেন হয়েছে বলে
প্রতিবেদনে বলা হয়। এর জন্য প্রতিবেদনে খোদ পুলিশ সুপার নাহিদুল ইসলামসহ
কনস্টেবল জিল্লু (ডিবি), গাংনী থানার ওসি (ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) মাছুদুল
আলমকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। প্রতিবেদনের তথ্যমতে, ২৮টি লেনদেনই পুলিশ
সুপারের নির্দেশে করেছেন কনস্টেবল জিল্লু।
জানতে চাইলে পুলিশ সুপার
নাহিদুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা সবচেয়ে বেশি আসামি আটক করি। তাই
আমাদের নামে অভিযোগ বেশি। আমি জানি, আমাদের নামে কারা এমন অভিযোগ করছে।’
টাকা নেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করে তিনি জানান, এটা স্পর্শকাতর জেলা। এখানে
স্থানীয় জনগণকে কিছু বলা যায় না। বললেই এক হয়ে পুলিশের বিরুদ্ধে নামে।
কনস্টেবল
জিল্লু বলেন, ‘এসবই মাদক ব্যবসায়ীদের ষড়যন্ত্র। মাদক বেচাকেনা এখানে
নিত্যনৈমিত্তিক বিষয়। আমি সাধারণ কনস্টেবল, যা করি, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের
নির্দেশে করি।’
প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত ১৬ ডিসেম্বর দুপুরে মেহেরপুর
শহরের বাসস্ট্যান্ড পাড়া থেকে মেহেরপুরের জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত আমিরের মেয়ে
উম্মে সালমা, জামায়াতের মহিলা কর্মী সেলিনা খাতুনসহ পাঁচ কর্মীকে
গ্রেপ্তার করা হয়। এক লাখ টাকা নিয়ে সালমা এবং ৫০ হাজার টাকা করে নিয়ে
বাকিদের ছেড়ে দেওয়া হয়। টাকা লেনদেনের পর পুলিশ সুপারের নির্দেশে তাঁদের
ছেড়ে দেয় সদর থানার পুলিশ।
জানতে চাইলে সেলিনা খাতুন প্রথম আলোকে বলেন,
‘আমাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছিল দুপুরে, রাত ১২টায় ছেড়ে দেওয়া হয়। পুলিশ
সুপারকে আমি ৫০ হাজার টাকা দিয়েছি। অন্যরাও তাই।’ তিনি বলেন, ‘মেহেরপুরে
এমন ঘটনা অহরহ। গ্রেপ্তার করো, টাকা লও, ছাড়ো—এটা এলাকার সবাই জানে।’
এই মেহেরপুরেই গত ২৬ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের কর্মী সদরুল ও বিএনপির কর্মী
মুরাদকে আটক করা হয়েছিল। দুজনই গরু ব্যবসায়ী। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে,
সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া তাঁদের আটক করা হয়। মুরাদের কাছ থেকে ২০ হাজার আর
সদরুলের কাছ থেকে ২৫ হাজার টাকা নিয়ে তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়।
জানতে
চাইলে সদরুল ও মুরাদ প্রথম আলোকে বলেন, পুলিশের গাড়ি এসে রাস্তা থেকে
সদরুলকে ধরে নিয়ে যায়। তাঁকে ছাড়াতে গেলে মুরাদকেও আটক করা হয়। মুরাদ ২০
হাজার ও সদরুল ১৩ হাজার টাকা দেওয়ার পর তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়। কনস্টেবল
জিল্লুকে টাকা দিয়েছেন বলে জানান তাঁরা। তাঁরা বলেন, ‘বুঝলামই না, কেন
আমাদের আটক করা হলো।’ সদরুলকে এর আগেও তিনবার আটক করা হয়েছিল বলে জানান
তিনি।
প্রতিবেদনে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গোপালগঞ্জের ইকরাম খন্দকারসহ
নয়জনকে ট্রাক ছিনতাইয়ের অভিযোগে গত অক্টোবর মাসে আটক করা হয়। পরে
গোপালগঞ্জের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ডিবি) মতিয়ার রহমান সাত লাখ টাকার
বিনিময়ে তাঁদের ছেড়ে দেন।
জানতে চাইলে ইকরাম খন্দকার গতকাল প্রথম আলোকে
বলেন, যে নয়জনের নামে মামলা দেওয়া হয়েছে, তাঁরা সবাই চাল ব্যবসায়ী। কেন
তাঁদের নামে মামলা দেওয়া হয়েছিল—জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি চাতালে কাজ
করি। আমার ভাতিজা ১৩৮ বস্তা চাল নিয়ে বিক্রি করতে আমার কাছে এসেছিল। আমি
যাদের কাছে ওই চাল বিক্রি করেছি, তাদেরসহ আমাদের আসামি করা হয়েছে। তবে এর
মধ্যে কয়েকজনকে থানায় নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। কয়েকজনকে আদালতে নেওয়া
হয়েছিল।’ তিনি বলেন, ‘আমি চাতালে কাজ করি। আমার তো এত টাকা নেই। তবে
শুনেছি, অন্যরা টাকা দিয়ে ছাড়া পেয়েছেন।’
পুলিশ কর্মকর্তা মতিয়ার রহমান
টাকা নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে প্রথম আলোকে বলেন, ‘এসব আসামির বিরুদ্ধে
মামলা হয়েছে। তাঁদের গ্রেপ্তার করে চালান দিয়েছি। তাঁরা আদালত থেকে বের
হয়েছেন। তাঁদের ছাড়ার তথ্য ঠিক নয়।’
নারায়ণগঞ্জের একরামুল কবির মামুন ও সুরমা সেলিম আটকের পর পুলিশকে ৫০ হাজার টাকা দিয়ে ছাড়া পেয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
একরামুল
কবির আটক হওয়ার কথা প্রথম আলোর কাছে স্বীকার করেন। তবে টাকা দিয়ে ছাড়া
পেয়েছেন কি না—জানতে চাইলে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে সুরমা সেলিম
বলেন, ‘টাকা ছাড়া আবার পুলিশ কাউকে ছাড়ে নাকি?’
প্রতিবেদনে টাকা নেওয়ার
জন্য নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানার ওসি আক্তার হোসেনকে অভিযুক্ত করা হয়। ছয়
বছর ধরে তিনি নারায়ণগঞ্জ জেলায় কর্মরত আছেন। রাষ্ট্রপতি পদক পাওয়া এই
কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আরও দুটি ঘটনায় দুই লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ আছে।
জানতে
চাইলে ওসি আক্তার হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি কারও কাছ থেকে টাকাপয়সা
নিইনি। এ পেশায় আমার সুনাম রয়েছে। আমার বিরুদ্ধে পত্রিকায় লিখলে কিছু
যায়-আসে না। আমি এ ধরনের কাউকে আটক করিনি।’
নির্বাচনসামগ্রী পুড়িয়ে
দেওয়ার অভিযোগে দিনাজপুরের খানসামা উপজেলা বিএনপির সদস্য মোকসেদুল ইসলামকে
আটক করা হয় গত ২৬ জানুয়ারি। পরে খানসামা থানার ওসি কৃষ্ণ কুমার ৭০ হাজার
টাকা নিয়ে তাঁকে ছেড়ে দেন। এর মধ্যে মধ্যস্থতাকারী খানসামা আওয়ামী লীগের
ধর্মবিষয়ক সম্পাদককে দেওয়া হয় ২০ হাজার টাকা।
জানতে চাইলে মোকসেদুল ইসলাম প্রথম আলোর কাছে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
আর
পুলিশ কর্মকর্তা কৃষ্ণ কুমার সরকার বলেন, মোকসেদুলকে আটক করা হয়নি,
জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আনা হয়েছিল। সঙ্গে সঙ্গেই তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তাঁর
নামে কোনো মামলাই হয়নি। কেন টাকা নেব?’
এ বিষয়ে পুলিশের মহাপরিদর্শক
হাসান মাহমুদ খন্দকার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি পাওয়ার কথা নিশ্চিত
করেন। তবে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন না দেখে তিনি কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি।
জানতে
চাইলে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান প্রথম আলোকে
বলেন, ‘আমরা অনেক দিন ধরেই পুলিশের গ্রেপ্তার-বাণিজ্যের কথা বলে আসছি।
আমাদের কাছে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট অভিযোগও রয়েছে। পুলিশের এ ধরনের কাজ তাদের
সক্ষমতা ও সততাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।’ তিনি বলেন, এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ
প্রতিবেদন। এসব অভিযুক্ত কর্মকর্তার যেন শাস্তি দেওয়া হয়, তা নিশ্চিত করা
উচিত।