কিল অ্যান্ড রুল

একসময় সাম্রাজ্যবাদীদের নীতি ছিল ‘Divide and Rule’ অর্থাত্ বিচ্ছিন্ন করে শাসন করো। যুগে যুগে সাম্রাজ্যবাদীরা এই নীতিকে ধারণ করে বিভিন্ন জাতির মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টি করে তাদের শাসন করেছে। তাদের সর্বস্ব লুটেপুটে খেয়েছে। এই নীতি এখনও বলবত্ আছে। বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক দলের অনৈক্য, ধর্মীয় গোষ্ঠীর বিভাজন ও বর্ণবৈষ্যম্যের পেছনে সাম্রাজ্যবাদীরা লেগে থাকে সব সময়। সর্বদাই তারা ফুয়েল দিয়ে বিভিন্ন দেশের জাতিগত ঐক্যে ফাটল ধরানোর কাজে ব্যস্ত থাকে। মানুষকে শতধা বিভক্ত করার পর শুরু হয় সাম্রাজ্যবাদীদের আসল খেলা। তারা তাদের স্বার্থ উদ্ধারে নেমে পড়ে। এরপর বিভক্ত জনগণকে শাসন ও শোষণ করে তাদের মতো করে।
‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’—এই নীতির সঙ্গে এখন আরেকটি নীতিও যুক্ত হয়েছে। সেটি হচ্ছে, ‘Kill and Rule’ তথা ‘হত্যা করে শাসন করো।’ সাম্রাজ্যবাদীরা গোটা বিশ্বে এখন এই নীতিই হরদম অনুসরণ করছে। কোনো ধরনের নৈতিকতা, মানবতাবোধ ও মানবাধিকারকে তারা তোয়াক্কা করছে না। সবচেয়ে দুঃখের বিষয় হচ্ছে, যারা মানবাধিকার, গণতন্ত্র ও অসাম্প্রদায়িক বিশ্ব গড়ার কথা মুখে লাউড স্পিকার লাগিয়ে সব সময় বলেন, তারাই আবার বিরোধী মতকে দমন করার জন্য হত্যাযজ্ঞে মেতে ওঠেন অবলীলায়!
মিসরের ঘটনাই ধরা যাক। মিসরের ইতিহাসে সর্বপ্রথম গণতান্ত্রিক সরকারকে হটিয়ে দেশটির সেনাবাহিনী অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে নেয়। জেনারেল আবদুল ফাত্তাহ সিসির নেতৃত্বে মিসরে এরই মধ্যে কয়েক দফা গণহত্যা চালানো হয়েছে। ব্রাদারহুডের নেতৃত্বে দেশটির অধিকাংশ জনগণ রাস্তায় বিক্ষোভে ফেটে পড়লে তারা দফায় দফায় যত্যাযজ্ঞ চালিয়ে রক্তের বন্যা বইয়ে দেয় সেখানে। এরই মধ্যে পাঁচ হাজারের অধিক মুরসি সমর্থক নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। অগণিত মানুষ আহত হয়েছেন। মিসরের সামরিক বাহিনী রাজপথে অবস্থানরত শান্তিপূর্ণ জনগণের ওপর যে পৈশাচিকভাবে ক্র্যাকডাউন চালায়, তা এক কথায় জঘন্য। নারী ও শিশুরাও বাদ যায়নি তাদের আক্রমণ থেকে। আল্লাহর ঘর মসজিদকেও তারা পরোয়া করেনি। রাবা আল আদাবিয়া মসজিদ জ্বালিয়ে দিয়েছে যৌথ বাহিনী। রাস্তায় মুরসি সমর্থকদের লাশ আগুনে পুড়তে দেখা গেছে। কায়রোর আরেক মসজিদ থেকে ২৫০ জনের আগুনে পোড়া লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। স্পেনের খ্রিস্টানরা যেভাবে পহেলা এপ্রিল মুসলিমদের মসজিদে জড়ো করে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করেছিল, ঠিক সেভাবেই মিসরীয় যৌথবাহিনী গণতন্ত্র ও শান্তির পক্ষের নারী-পুরুষদের মসজিদে আটক করে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করেছে! এর চেয়ে জঘন্য দৃশ্য আর কী হতে পারে? ব্রাদারহুডের নেতা বেলতাগির ১৭ বছরের কিশোরী মেয়েও যুক্ত হয়েছেন লাশের মিছিলে। মুরসির সমর্থকরা এই হত্যাযজ্ঞের প্রতিবাদে গত শুক্রবার জুমা নামাজ বাদ বিক্ষোভ মিছিলের আয়োজন করলে সেখানেও যৌথবাহিনী হামলা চালিয়ে শত শত প্রতিবাদী জনতাকে হত্যা করে। সভ্যতার চারণভূমি মিসর এখন ভাসছে রক্তের বন্যায়।
কিন্তু কেন এই হত্যাযজ্ঞ? এই হত্যাযজ্ঞ হচ্ছে সেক্যুলার রাষ্ট্র কায়েম করার জন্য। সেক্যুলাররা যে বড় অসাম্প্রদায়িক! অসাম্প্রদায়িকতা প্রতিষ্ঠা করতে গোটা মিসরকেও যদি লাল দরিয়া বানাতে হয় তাতেও তারা প্রস্তুত! জনগণকে হত্যা করে হলেও শাসন করতে যে হবে তাদেরই। ইসলামপন্থীরা দেশ চালাবে কেন? মিসরের যৌথবাহিনী তাই ঝাঁপিয়ে পড়ল ইসলামের পক্ষের শক্তির ওপর। আর তাতে সায় দিল গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের ফেরিওয়ালা আমেরিকা। আমেরিকার তো ইসরাইলকে রক্ষা করতে হবে। এ কারণে যেভাবে হোক মিসরকে কব্জায় রাখতে হবে। মুরসির সরকার দিয়ে হয়তো সেই স্বার্থ হাসিল হবে না। তাই মুরসির সরকারকে উত্খাতে তারা অর্থ-শক্তি ব্যয় করতে পারে। আমেরিকার এই ভূমিকা আশ্চর্যের কিছু নয়। কিন্তু সৌদি আরব যে অবস্থান গ্রহণ করেছে, তাকে আমরা কী বলব? সামরিক ক্যু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সৌদি সরকার মিসরের অবৈধ সেনা সরকারকে স্বাগত জানিয়ে কোটি কোটি ডলার অনুদানের ঘোষণা দিয়ে ইসলাম ও মুসলমানের সঙ্গে কি গাদ্দারি করেনি? মুরসি যখন প্রেসিডেন্ট হয়ে জনগণের কাতারে গিয়ে নামাজের ইমামতি করা শুরু করেছেন তখনই আলখেল্লাওয়ালা ওইসব ভণ্ড বাদশা ইমেজ সঙ্কটে পড়েন। মুখে দাড়ি, মাথায় টুপি ও গায়ে জোব্বা-কোর্তা লাগিয়েও যেসব বাদশাহরা কখনও জনগণের কাতারে এসে ইমামতি করতে পারেননি, তারা তখন প্যান্ট-শার্ট পরিহিত হাফেজে কোরআন প্রেসিডেন্ট মুরসির নামাজের ইমামতির দৃশ্যকে মেনে নিতে পারেননি। একজন মুরসি যখন নিজেই তারাবিহর নামাজে ইমামতি করেন, কৃষকদের মাঝে গিয়ে সুখ-দুঃখের কথা শোনেন, অনাড়ম্বর জীবন-যাপন করেন, মধ্যপ্রাচ্যের নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন তখন তো তাদের হৃত্কম্পন শুরু হওয়ারই কথা। এ কারণেই মিসরের ইখওয়ানি ভাইদের ওরা সন্ত্রাসী বলে আখ্যা দিয়ে সন্ত্রাসীদের মোকাবিলায় সেনা সরকারের পাশে দাঁড়ানোর জন্য আরব রাষ্ট্রগুলোকে আহ্বান জানায়। সত্যিই ধিক্কার জানানোর ভাষাও হারিয়ে ফেলেছি আমরা। হাজার হাজার নিরস্ত্র জনতাকে পাখির মতো গুলি করে যারা মারছে তারা সন্ত্রাসী নয়; আর যারা নিরীহ কায়দায় বুলেট-বোমার আঘাতে মারা যাচ্ছেন, তারা হয়ে গেলেন সন্ত্রাসী! সত্যিই অবাক হতে হয়।
এভাবেই চলছে গোটা বিশ্ব। সারা দুনিয়া এখন নরকে পরিণত হয়েছে। যেখানেই সত্যের পক্ষের মানুষ সেখানেই চলছে নির্মম গণহত্যা। সত্যের পক্ষে কাউকে দাঁড়াতে দেয়া হবে না। যুগ যুগ ধরে আরব বিশ্বের লেবাসধারী শাসকরা হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে টিকে ছিল। সাদ্দাম হোসেন লাখ লাখ গণতন্ত্রকামী জনতাকে হত্যা করেছিল। কর্নেল গাদ্দাফিও শাসন করেছিলেন বন্দুকের নল দিয়ে। ফেরাউনের বংশধর হোসনি মোবারক, বেন আলিরাও ওই একই পথে শোষণ করেছেন জনসাধারণকে। কত মায়ের বুক তারা খালি করেছেন তার কোনো ইয়ত্তা নেই। অবশেষে এলো আরব বসন্ত। আরব বসন্ত তছনছ করে দিল জালেমশাহিদের গদিগুলোকে। যুগ যুগ ধরে জালেম শাসকদের ধারাবাহিক অত্যাচারে এতদিন যারা অতিষ্ঠ ছিল, তারা জেগে উঠে হটিয়ে দিল ওদের। গণজোয়ারে ভেসে গেলেন আরবের জালেম শাসকরা। যাদের পতন হয়নি তাদেরও ভয় ঢুকে গেল অন্তরে। কখন না আবার মিসর, তিউনিসিয়ার বাতাস গায় লাগে। শুরু হলো ষড়যন্ত্র। নিজেদের গদি টিকিয়ে রাখতে মুসলমানদের চিরশত্রু ইহুদিদের সঙ্গে হাত মিলাতেও ওরা কুণ্ঠাবোধ করল না। গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত একটি সরকারকে হটাতে ওরা তাই বেছে নিল গণহত্যার পথ।
‘কিল অ্যান্ড রুল’—এটাই এখন জালেম শাসকদের নীতি। ইরাক, আফগানিস্তান, মিয়ানমারের আরাকান, ফিলিস্তিন, কাশ্মীর, সিরিয়া এই নীতিতেই ছারখার হয়ে যাচ্ছে। আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশও এই নীতির বাইরে নেই। এখানে এখন বিরোধী মত সহ্য হওয়ার নয়। গত ফেব্রুয়ারি-মার্চে শতাধিক লাশ পড়েছে রাজপথে। একদিনে ৬০ জনকে হত্যা করেছে সরকারি বাহিনী। স্বাধীনতার পর এত মানুষ সরকারি বাহিনীর হাতে মারা যায়নি। ইসলামপন্থীরা মিছিল-মিটিং করলেই পুলিশ গুলি ছুড়ছে। গত ৫ মে গভীর রাতে শাপলা চত্বরে যৌথবাহিনী ঘুমিয়ে পড়া নিরীহ মুসল্লিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। হেফাজতের পক্ষ থেকে প্রায় আড়াই হাজার লোক নিহত হওয়ার দাবি করা হচ্ছে; যদিও সরকার ওই রাতে কোনো ধরনের হতাহতের কথা অস্বীকার করছে।
এ কথা এখন নির্দ্বিধায় বলা যায়, বিশ্বব্যাপী ইসলামপন্থীরাই এখন প্রধান টার্গেট। যারাই ইসলামী মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার কথা বলবেন, তাদের যে কোনো ছুতায়-নাতায় খতম করা হবে। ইসলামপন্থীদের হত্যা করলে মানবাধিকার ক্ষুণ্ন হয় না, বরং তাদের খতম করতে পারলে অসাম্প্রদায়িকতা, সেক্যুলারিজম প্রতিষ্ঠা পায়। ইসলামপন্থীদের গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নিলেও কোনো আপত্তি নেই। কেননা ওরা যে ইসলামপন্থী, ওদের যে গণতান্ত্রিক অধিকার থাকতে নেই! পশ্চিমাদের বিশ্বস্ততা অর্জনের পথও এই একটি। আর তা হচ্ছে, ইসলাম ও ইসলামপন্থীদের যত পার খতম করো!