ইচ্ছাপূর্বক গণতন্ত্রকামী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতা, প্রতিশ্রুতি
ভঙ্গ আর গণতান্ত্রিক সরকারবিরোধী গোষ্ঠীর সঙ্গে সহযোগিতা—এ-ই হলো আমেরিকার
প্রশাসন নীতি। এ নীতির কারণে বিশ্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে নৈরাজ্যের এমন এক
ক্ষেত্র, যেখানে নিষ্ঠুর পশুবল উল্লাস করছে আর বিনষ্ট করছে বিশ্বশান্তি;
সেই সঙ্গে সৃষ্টি করছে অস্থিরতা। আমেরিকার প্রশাসন শান্তির নাম করে
ভয়ঙ্করতম যাবতীয় যুদ্ধের বিশাল প্রস্তুতি চলছে মুসলিমবিশ্বের ওপর।
আন্তর্জাতিক নীতিবোধ এমন অধঃপাতে গেছে যে, সারাদুনিয়া বিভীষিকার চোখে
দেখছে, কীভাবে চলছে মুসলমান রাষ্ট্রের ওপর নির্মম নির্যাতন এবং শহরে শহরে
অসামরিক বাসিন্দাদের ওপর আর অসহায়-উদ্বাস্তুদের ওপর বিমান থেকে ক্রমাগত
বোমাবর্ষণ। আন্তর্জাতিক দৃশ্যপটে ঝড়-ঝঞ্ঝা ঘনিয়ে আসছে, বিষাদের কালো ছায়া
ঘোরতরভাবে নেমে আসছে মুসলিমবিশ্বের ওপর। আমেরিকার এজেন্ট সারাবিশ্বে ঘুরে
বেড়াচ্ছে শুধু মুসলিমবিশ্বে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির উদ্দেশে। বিশ্বের
শান্তিকামী মুসলমানরা আজ যে কোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি চিন্তিত।
কে না জানে বর্তমান বিশ্বের ক্ষমতাধর রাষ্ট্র আমেরিকা; যারা নিজেকে মনে করে
বিশ্বের মোড়ল। বিশ্বের যে কোনো দেশের গণতন্ত্র ধ্বংসের ক্ষেত্রে আমেরিকার
ভূমিকা আজ দিবালোকের মতো সত্য। অথচ নিজ দেশে চলছে গণতন্ত্রের নামে চাপা
উত্তেজনা।
গণতন্ত্রের প্রতিশ্রুতি দিয়ে চালিয়েছে তারা নিরস্ত্র মানুষের ওপর নির্মম
হত্যাযজ্ঞ; করেছে মানুষের জীবন বিপন্ন। সেই সঙ্গে জোগান দিচ্ছে রাষ্ট্রীয়
সন্ত্রাসের। কোনো দেশে সত্যিকার গণতন্ত্র সৃষ্টি হোক, শান্তি আর
স্থিতিশীলতা আসুক, এটা আমেরিকা মনে-প্রাণে কখনোই চায় না। কারণ তারা চায়
অন্য রাষ্ট্রের ওপর নিজেদের আধিপত্য বিস্তার।
গণতন্ত্রের নামে নামমাত্র সরকার দিয়ে আজ তারা গণতন্ত্র হটিয়ে ইরাক, লিবিয়া
আর আফগানিস্তান শাসন করছে নিজেদের পছন্দের প্রশাসন দিয়ে। এসবই করছে শুধু
নিজেদের একক ক্ষমতাবলে। কোনো দেশের বৈধ সরকার দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাক, এটা
আমেরিকার পছন্দ নয়। শুধু তা-ই নয়, সে দেশের অর্থননৈতিক স্থিতিশীলতা
দীর্ঘস্থায়ী থাক, এটাও আমেরিকা প্রশাসনের নীতির বাইরে।
আর এ স্থিতিশীলতা ধ্বংসের জন্য হেন কাজ নেই, যা তারা করতে পারে না। সেজন্যই
কোনো দেশের সরকারপ্রধানকে উত্খাত করতে বা হত্যা করতে আমেরিকার প্রশাসন
বিন্দুমাত্র দ্বিধা করে না। আর এর পেছনে যে জিনিসটি কাজ করে, তা হলো
আমেরিকার প্রশাসন। এ প্রশাসন যখন মনে করে সংশ্লিষ্ট দেশ বা রাষ্ট্রপ্রধান
তাদের অনুকূলে নয়, তাহলে আর রক্ষা নেই।
একটু লক্ষ্য করলেই আমরা বুঝতে পারব, ক্ষমতাচ্যুত লিবিয়ার মুয়াম্মার
গাদ্দাফির সরকারের কথা। সেই সঙ্গে মনে পড়ে আরও গভীরভাবে ইরাকের সরকারপ্রধান
বিশাল শক্তিধর পর্বতসমান মানুষ, যিনি আল্লাহকে ছাড়া কাউকে ভয় করতেন না,
সেই প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের কথা। যিনি সবসময় আমেরিকার প্রশাসনকে
হুঙ্কার দিয়ে কথা বলতেন, যে কোনো অন্যায় আর অনিয়মের বিরুদ্ধে ছিলেন
সদাসোচ্চার। অথচ কী নিষ্ঠুর ও নির্মমভাবে তাদের হত্যা করা হয়েছে, তা
বিশ্ববাসী হতবাক হয়ে দেখেছে। সেদিনের কথা মনে করে আজও মানুষ চোখের পানি
ফেলে অঝরে কান্না করে। তারা উভয়ই ছিলেন ইসলামের জন্য এক শক্তি; ইসলামের
প্রাণ—সেই সঙ্গে গোটা মুসলিম জাহানের গর্ব। ইতিহাসের সে কলঙ্কজনক হত্যাযজ্ঞ
ছিল নির্মম-নিষ্ঠুর, অবিবেচক ও অমানবিক একটি হত্যাকাণ্ড—যা কোনোদিন
বিশ্বের গণতন্ত্রকামী মানুষ মেনে নিতে পারেনি। আর ভবিষ্যতেও এ ধরনের
নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞ মানুষ মেনে নিতে পারবে না। যদিও প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম
হোসেনকে নির্মমভাবে আহত করার পর বিচারের নামে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলিয়ে হত্যা
নিশ্চিত করে শত্রুপক্ষ। ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনকে যতটুকু মনে
পড়ে, তার চেয়ে বেশি মনে পড়ে তার অসীম বীরত্ব। যিনি মৃত্যুদণ্ডের আসামি হয়েও
বীরের মতো ফাঁসির মঞ্চে হেঁটে গিয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছেন। কামনা
করেননি, শত্রুপক্ষের কাছে কোনো প্রাণভিক্ষা। হাসিমুখে বরণ করে নিয়েছেন
মৃত্যুকে।
জেনেছি, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধেও আমেরিকার প্রশাসন ছিল পাকিস্তানের
পক্ষে, আর আমাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করেছে পাকিস্তানি
প্রশিক্ষিত সোনাবাহিনীকে। যুদ্ধে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে হারিয়ে বাংলাদেশ
বিজয় ছিনিয়ে নেবে, এটি মার্কিন প্রশাসনের চিন্তার বাইরে ছিল। আর এ বিষয়কে
তারা মোটেই ভালো চোখে দেখেনি।
এই আমেরিকার প্রশাসন বিভিন্ন গণতন্ত্রকামী দেশে মারাত্মকভাবে যুদ্ধ বাধিয়ে
দেয়। দীর্ঘ সময়জুড়ে চলে সেই যুদ্ধ। চলে নির্বিচারে মানুষ হত্যা আর ধ্বংস হয়
সে দেশের শিক্ষা-সংস্কৃতি; ধ্বংস হয় বহু জনপদের। আর সেই সঙ্গে বিলুপ্তি
ঘটে বহু রক্তে অর্জিত গণতন্ত্রের। আমেরিকার প্রশাসন তখন ধ্বংসপ্রায় সে
দেশের ক্ষুধাতুর মানুষের জন্য লোকদেখানো খাদ্যদ্রব্য, ওষুধপথ্য পাঠায় আর
শর্তযুক্ত উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকে। আর এসবই আমেরিকা প্রশাসনের
প্রি-প্ল্যানে হয়ে থাকে। এ যেন বিশ্ববাসীর জন্য হুঙ্কার। বিশেষ করে
শান্তিপ্রিয় ইসলামী রাষ্ট্রের জন্য হুমকিস্বরূপ। সর্বশেষ উদারহণ হিসেবে
আজকের আফগানিস্তান। কয়েক দশক ধরে সেখানে চলছে মুসলমানদের ওপর নির্মম
হত্যাযজ্ঞ; যা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না বিবেকবান মানুষের পক্ষে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আজ পর্যন্ত যতগুলো দেশে যুদ্ধ হয়েছে তার সবগুলোর
জন্যই পরোক্ষ কিংবা প্রত্যক্ষভাবে কোনো না কোনোভাবে আমেরিকার প্রশাসনই
জড়িত। এটি বিশ্ববাসীর কাছে খুবই পরিষ্কার। তাদের হীন উদ্দেশ্য চরিতার্থের
জন্য ধ্বংস হয়েছে দেশের চলমান গণতন্ত্র, আর দেশে দেশে চালিয়েছে অগণিত বোমা
হামলা। এসব বোমা বর্ষণের কারণে ঘটেছে নিরীহ শিশুসহ বহু মানুষের মৃত্যু। আহত
আর পঙ্গুত্ব বরণ করতে হয়েছে অসংখ্য মানুষকে। সেই সঙ্গে বিনষ্ট হয়েছে বহু
সম্পদ। বোমার তেজস্ক্রিয়তায় মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে পরিবেশের। এর প্রভাব গিয়ে
পড়েছে মানবশিশুর ওপর। এত কিছুর পরও মার্কিন মুল্লুকের প্রশাসন সম্পূর্ণ
নির্বিকার। অথচ বিশ্ববাসীর কাছে তারা নিজেদের গণতন্ত্রের রাজপুত্র বলে মাথা
উঁচু করে কথা বলে। আমরা তখন লজ্জিত হই; ব্যথিত হই।
ইসরাইল কর্তৃক ঘুমন্ত ফিলিস্তিনবাসীর ওপর চলে নির্বিচারে গুলিবর্ষণ, চলে
বোমা বর্ষণসহ রকেট হামলা। আর এসবই হয় আমেরিকা প্রশাসনের প্রত্যক্ষ ইন্ধনে।
যদিও তারা শান্তির পক্ষে নির্বিকার।
পৃথিবীর কে না জানে বিশ্বের এক সময়ের আরেক ক্ষমতাধর সোভিয়েত ইউনিয়ন কিংবা
রাশিয়া-আমেরিকার মধ্যে শীতল লড়াইয়ের কথা—যা চলেছিল প্রায় বিশ বছর পর্যন্ত।
আমেরিকা রাশিয়াকে দুর্বল করার জন্য বহু অস্ত্র-গোলাবারুদ দিয়ে ব্যবহার করে
আজকের আফগানিস্তানকে। গড়ে তোলে তালেবান মুজাহিদ বাহিনী। আর সেই আফগানিস্তান
আজ তাদের কাছে মৌলবাদী, তালেবানি, সাম্প্রদায়িক যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি
সন্ত্রাসী রাষ্ট্র। অথচ এই আফগান তালেবান গোষ্ঠী সৃষ্টির পেছনে আমেরিকান
প্রশাসনই জড়িত। কিন্তু আজ তারা সময়-অসময়ে নিরীহ আফগান মুসলমান ভাইদের ওপর
নির্মম নিষ্ঠুরতার সঙ্গে হত্যাযজ্ঞ চালায়। সেখানে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা নেই
বললেই চলে। এ আমেরিকার প্রশাসনই সেদিন উসকে দিয়েছিল পাকিস্তানকে
বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তি সংগ্রামের পর
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করার পর প্রথম স্বীকৃতি
দেয় প্রতিবেশী দেশ ভারত আর দেরিতে হলেও স্বীকৃতি দেয় আমেরিকা প্রশাসন। খুশি
হতে পারেনি সেদিনের আমেরিকা প্রশাসন পাকিস্তানের নির্মম পরাজয়ে। কারণ
আমেরিকা প্রশাসন কখনোই মনে করেনি, নিরস্ত্র বাংলাদেশের জনগণের কাছে
পাকিস্তানের মতো প্রশিক্ষিত সশস্ত্র ও আধুনিক শিক্ষিত সেনাবাহিনী হেরে যেতে
পারে। আর এ যুদ্ধে আমেরিকা বহু মূল্যের অস্ত্র ও অন্যান্য সামরিক
গোলাবারুদসহ সামুদ্রিক নৌযান দিয়ে সহায়তা করে তত্কালীন পাকিস্তান
সেনাবাহিনীকে।
আমেরিকা প্রশাসনের এ যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলার পেছনে যে মূলমন্ত্র কাজ করে, তা হলো
আমেরিকার অস্ত্র বিক্রি। কারণ তারা মানববিধ্বংসী অস্ত্র তৈরিসহ প্রচুর
অস্ত্র উত্পাদন করে থাকে। আর এ বিপুল পরিমাণ অস্ত্র তৈরির জন্য যে কৌশল কাজ
করে, তা হলো বিশ্বে যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলা। তবেই বিক্রি হবে তৈরিকৃত অস্ত্র,
আসবে প্রচুর অর্থ এবং তা ব্যয় করবে তথাকথিত জঙ্গি দমনের নামে মুসলমান
রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে। আর এজন্যই পৃথিবীর শান্তিপ্রিয় রাষ্ট্রে তারা দীর্ঘ
সময় যুদ্ধ বাধিয়ে রাখে, যাতে তারা প্রচুর পরিমাণ অস্ত্র বিক্রি করতে পারে।
যুদ্ধ যত বেশিদিন চলবে, অস্ত্র বিক্রি তত বেশি হবে। বিপুল পরিমাণ অর্থ দিয়ে
তৈরি হবে শক্তিশালী অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। তবেই তারা পরিগণিত হবে আরও
ক্ষমতাধর এবং বৃহত্ পরাশক্তি রাষ্ট্রে। এই উদ্দেশে আমেরিকা প্রশাসন সবকিছু
করতে বদ্ধপরিকর।
যুদ্ধ আমেরিকা প্রশাসনের কাছে একটি খেলা। আর এ খেলার প্রকৃত উদ্দেশ্যই
হচ্ছে মুসলিম রাষ্ট্রের মধ্যে বৈরী পরিবেশ তৈরি করে রাখা আর তাদের মধ্যে
যুদ্ধ বাধিয়ে দিয়ে একটি অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করে তোলা। সেই সঙ্গে
রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টির পাশাপাশি শান্তি বিনষ্ট করা। এতে মুসলিম
রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে দেখা দেবে চরম বৈরী ভাব; সৃষ্টি হবে তুমুল বিরোধ।
আর তখনই এসব সুযোগ সুন্দরভাবে ব্যবহার করতে চায় মধ্যস্থতার মাধ্যমে আমেরিকা
প্রশাসন। করে মোড়লগিরি; কারণ বেশিরভাগ তেল ও খনিজ সম্পদের প্রাচুর্য রয়েছে
এ মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর মধ্যেই। আল্লাহর দান এ সম্পদই যেন মুসলিম সমাজের
শান্তি বিনষ্টের মূল কারণ। এ প্রাচুর্যময় সম্পদ দখলের জন্যই আমেরিকা
প্রশাসনের এত রণকৌশল, এত কিছু...।