আদর্শচ্যুত সমাজের হালচাল পরিবর্তন দরকার

একটা সময় ছিল যখন বাংলাদেশীয় সমাজ প্রতিষ্ঠিত ছিল তার নিজস্ব সংস্কৃতি, আধ্যাত্মিক চিন্তাধারা ও মূল্যবোধ শিক্ষার ওপর। শিক্ষা প্রভাবান্বিত হতো তার চিরাচরিত রীতিনীতি দ্বারা। সমাজে বাংলাদেশীয় সমাজ ছিল আদর্শ সমাজ। যুগে যুগে বিভিন্ন দেশ থেকে পর্যটকরা এদেশে এসেছেন, দেশে গিয়ে যেসয ভ্রমণ বৃত্তান্ত তারা লিখেছেন তাতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রশংসিত হয়েছে আমাদের সমাজ জীবনের অবস্থান। তখন ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে বিদ্যাচর্চা, সত্যনিষ্ঠা, সততা, মূল্যবোধ ও চারিত্রিক দৃঢ়তা ছিল অতি উচ্চমানের, যা পর্যটকদের দৃষ্টি এড়ায়নি। তারই প্রতিফলন হয়েছে তাদের ভ্রমণ বিবরণগুলোতে।
সেই পর্বতসম উঁচু অবস্থান থেকে কোথায় বাংলাদেশীয় সমাজ বর্তমানে এসে দাঁড়িয়েছে তার খানিকটা স্বরূপ বিশ্লেষণ করাই এ প্রবন্ধের উদ্দেশ্য। পরাধীন বাংলাদেশে বিভিন্ন সংস্কারমূলক কাজের পেছনে ইংরেজ শাসকদের সাম্রাজ্যবাদী মনোভাব যে প্রচ্ছন্ন ছিল, তার একটা জ্বলন্ত নজির হচ্ছে বাংলাদেশে তাদের নতুন শিক্ষানীতি চালুর প্রভাষক লর্ড মেকলের ব্রিটিশ পার্লামেন্টে প্রদত্ত বক্তৃতা। তিনি কী বলেছিলেন তাহলে শুনুন—‘আমি উপমহাদেশের আনাচে-কানাচে পরিভ্রমণ করেছি। কোথাও কোনো চোর দেখিনি। পাইনি কোনো মিথ্যাবাদী। দেশটি এত সমৃদ্ধ, দেশবাসীর মূল্যবোধ এত উঁচু, জনগণ এত প্রতিভাশালী যে এ দেশকে বশীভূত করতে হলে এ দেশের আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক মেরুদণ্ডে আঘাত হানতে হবে। তার জন্য প্রয়োজন তাদের শিক্ষা ব্যবস্থা ও সংস্কৃতির আমূল পরিবর্তন ঘটানো। যদি বাংলাদেশের মনে এ ধারণা পুষ্ট করা যায় যে, যা কিছু বিদেশি ও ইংরেজি তার সবকিছুই তাদের থেকে উন্নততর, তখনই তারা তাদের আত্মসম্মান ও নিজস্ব সংস্কৃতির ওপর আস্থা হারিয়ে সত্যিকারের পরাধীন জাতিতে পরিণত হবে এবং আমরাও যথাযথভাবে তাদের ওপর আমাদের শাসন কায়েম করতে সমর্থ হবো।’
ইংরেজ শাসকশ্রেণী তার এই বক্তৃতায় প্রভাবান্বিত হয়ে গেল। চালু হয়ে গেল ইংরেজিসহ নতুন শিক্ষা ব্যবস্থা। এ ব্যাপারে সমর্থনও জুটে গেল তখনকার কিছুসংখ্যক অঞ্চলের বিদগ্ধ সমাজ সংস্কারকের। অচিরেই এ অঞ্চলের যুব সমাজ উদগ্রীব হয়ে উঠল ইংরেজি শেখার নেশায়। আস্তে আস্তে তাদের মনে এ ধারণা জন্মাল যে, ইংরেজি শিক্ষা ছাড়া প্রকৃত জ্ঞানলাভ অসম্ভব। জন্ম নিল দাসত্বের মনোভাব। মত্ত হলো পশ্চাত্য জীবনদর্শন ও ঘোরতর ভোগবাদী জীবন নেশায়। তারা হারাতে থাকল নিজেদের ভাষা, শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা ও আকর্ষণ। ইংরেজ শাসকগোষ্ঠীও তাই চেয়েছিল।
স্বাধীনতা প্রাপ্তির পর আশা করা হয়েছিল, দেশ আবার স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত হবে। পাশ্চাত্য জীবনধারার দাসত্ব থেকে মুক্তি পাবে। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, নিজেদের শাসনের দীর্ঘদিন পরও আত্মশক্তি উদঘাটিত করার কোনো প্রচেষ্টা তো করলই না বরং সেই জীবনধারাই সমগ্র জাতিতে বিশেষভাবে বিস্তৃত হলো। তাতে ইন্ধন জোগাল বিশ্বায়ন। ভোগবাদী পাশ্চাত্য সংস্কৃতির অনকুরণ করতে গিয়ে বাংলাদেশীয় সমাজে ব্যক্তিস্বার্থ ও উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণই হয়ে উঠল জীবনের একমাত্র ব্রত। বিসর্জিত হলো শাশ্বত এদেশীয় মূল্যবোধ। বাইরে আধ্যাত্মিকতার বুলি আওড়ালেও অন্তরে অন্তরে আছে ধনকুবের হওয়ার উদগ্র বাসনা। জীবনকে ভোগ করার তীব্র বাসনায় শুরু হলো সমাজে ও ব্যক্তিগত জীবনে বাণিজ্যিক ঐশ্বর্য, আর্থিক নিরাপত্তা, ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি লাভের প্রতিযোগিতা। জীবনের সাফল্য বিচার হচ্ছে এখন ইংরেজিতে যাকে বলে ইন টার্মস অব ডলার—ব্যক্তির গুণবৈশিষ্ট্যে নয়। বিত্ত হতে যে চিত্ত বড়, এ সত্য আজ উপেক্ষিত। ‘নিড’ অর্থাত্ প্রয়োজনে বাংলাদেশ সমাজ আজ আর তৃপ্ত নয়, আচ্ছন্ন করে ফেলেছে ‘গ্রিড’ অর্থাত্ লোভ যা থেকে জন্ম নিয়েছে দুর্নীতি, যার বিচরণ সর্বত্র, সর্বক্ষেত্রে মুক্ত বিহঙ্গের মতো। সেই দুর্নীতির অশ্বগতি আজ যেন দুর্দমনীয়। ফলে পুরো সিস্টেমটা হয়ে পড়েছে দুর্বল। আর সিস্টেম দুর্বল হওয়ায় দুর্নীতিও হয়ে উঠেছে অপ্রতিরোধ্য। শুষে নিচ্ছে সমাজের শেষ রক্তবিন্দু। মূল্যবোধ বিবর্জিত, ভ্রষ্টাচার ও ব্যভিচারপ্রধান এ সমাজ এখন অবক্ষয়ের সম্মুখীন, দিশেহারা ও আত্মিক সঙ্কটগ্রস্ত। সেজন্যই সমাজে দেখা দিয়েছে অস্থিরতা, মানসিক যন্ত্রণা ও নৈতিক অন্ধকারাচ্ছন্নতা। যখন কোনো জনগোষ্ঠী যুক্তিযুক্ত ও ন্যায়সঙ্গত উপায়ে নিজেদের দাবি-দাওয়া আদায়ে অসমর্থ এবং নেই তাদের মানসিকতাও, তখনই তারা লক্ষ্যসিদ্ধির জন্য যুক্তিহীন উগ্র সন্ত্রাসের আশ্রয় নিয়ে থাকে। বোধ করি সেজন্যই বাংলাদেশ সমাজের একাংশ সন্ত্রাসবাদী হিংসায় উন্মত্ত হয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে সন্ত্রাস ছড়িয়ে দিচ্ছে। কোনো আদর্শ নেই তাদের সামনে।
এই আকুইজিটিভ সমাজ আজ কী অবস্থায় দাঁড়িয়ে, স্বল্প পরিসরে তারও কিছুটা তুলে ধরেছি। অভিধান ছাড়া অপরাধ বলে কোনো কিছুই আর নেই এ সমাজে। যে দেশে যে শিক্ষক একদিন মাতা-পিতার সমান আসনে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন, আজ পরীক্ষা হলে অসদুপায় অবলম্বন করার চেষ্টায় বাধা দিলে বিদ্যার্থী সে শিক্ষককে ছুরিকাঘাত করতে দ্বিধাবোধ করে না। বিদ্যালয়-মহাবিদ্যালয়ে ছাত্র দ্বারা শিক্ষক নিগৃহীত হওয়ার ঘটনা আকছার ঘটছে। যে সমাজে একদিন নারীরা মাতৃরূপে সংস্থিতা ছিলেন, আজ তাদের শ্লীলতাহানি ও ধর্ষণ ঘটে চলেছে অবিরত— ধর্ষণকারী নির্ভয়ে জামিন নিয়ে রাজপথে প্রকাশ্যে ঘুরেও বেড়াচ্ছে। ব্রিটিশদের কাছ থেকে প্রাপ্ত শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, অফিসার হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু ক’জন ‘মানুষ’ হচ্ছে? তা যদি হতো তাহলে দেশে থাকত না দুর্নীতি ও ব্যভিচার—থাকত না কিছু সংখ্যক বিদ্যালয়প্রধানের লজ্জা ও বিবেকের মাথা খেয়ে শিশুদের বঞ্চিত করে তাদের মধ্যাহ্ন ভোজনের টাকা আত্মসাত্ করার মানসিকতা। দেশে একশ্রেণীর অসাধু, মধ্যমেধার লোভী ও মধুমেহ রোগের মতো সেঁটে বসা দুর্নীতিগ্রস্ত নেতা দেশবাসীকে অন্ধকারে রেখে দেশে-বিদেশে কালো ধনের পাহাড় বানাচ্ছেন, চলমান সিস্টেম ভঙ্গ করে ও দেশের স্বার্থকে এমনকি জাতীয় নিরাপত্তাকে তুড়ি মেরে জনপ্রতিনিধিরা একটার পর একটা ‘স্ক্যাম’ করে যাচ্ছেন—প্রিন্ট ও টেলিভিশন মিডিয়া রসেবশে ফলাও করে দেশবাসীর অবগতির জন্য সেগুলো পরিবেশনও করছে, কিন্তু পরিণামে কী হচ্ছে তা অস্পষ্ট ও আমাদের অজানা। তাদের আশ্রয়ে-প্রশ্রয়ে সৃষ্টি হয়েছে সাইকোফ্যানট কালচার, যার আদর্শ material prosperity at any cosঃ—টাকার বিনিময়ে দেয়া হচ্ছে সরকারি পদে নিযুক্তি। সেটা হচ্ছে দালাল ও নিয়োগকারীদের যোগসাজশে। যোগ্যতার বিচার সেখানে গৌণ, প্রার্থীর আর্থিক যোগ্যতাই মান্যতা পাচ্ছে।
অফিস-আদালতে টাকার বান্ডিলে সব কাজ হয়ে যাচ্ছে, তা না হলে ফাইল পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগীর মতো মাসের পর মাস পড়ে থাকবে একই টেবিলে। টাকা না ছাড়লে উপর্জিত ‘এরিয়ার’-এর টাকা বন্ধমুক্ত হবে না অফিস ও ট্রেজারি থেকে। মাসের পর মাস, বছরের পর বছর চলে গেলেও আপনার পেনশনের কোনো সুরাহা হবে না। বিদ্যালয় অথবা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান অথবা উন্নয়নমূলক প্রকল্পের জন্য সরকারি বরাদ্দ অর্থের একাংশ সংশ্লিষ্ট অধিকারীদের দফতরে জমা না দিলে ইউটিলাইজেশন সার্টিফিকেট মেলে না। কোথায় গেল সেই মূল্যবোধ ও সততা? বাংলাদেশী পরম্পরা আধুনিকতার দ্বন্দ্বে, ভোগবাদী আধুনিকতা গ্ল্যামারই অগ্রাধিকার পাচ্ছে এ সমাজে। যে দেশে মায়ের অসুস্থতার খবর পেয়ে ছেলে নিজের জীবন বিপন্ন করে দুর্দান্ত পদ্মা নদী সাঁতার দিয়ে এসেছিল মায়ের সেবার জন্য, সেদেশে আজ পরমাণু পরিবারের উচ্চশিক্ষিত ছেলেমেয়েরা বৃদ্ধ মা-বাবাকে একাকীত্বে ফেলে অথবা বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দায়-দায়িত্ব ঝেড়ে ফেলে প্রবাসী হচ্ছে। ভোগবাদী পশ্চাত্য ম্যানরিজমেরই নগ্ন অনুকরণ। যে দেশে বিবাহবিচ্ছেদ ছিল নিন্দনীয়, আজ তা সর্বজনস্বীকৃত। পাশ্চাত্য মরালিটির প্রভাব এমনভাবে সমাজে আত্মীয়কৃত হয়েছে যে, জাতীয় মহিলা কমিশনের চেয়ারপারসন নির্দ্বিধায় বলে ফেলেন—‘সেক্সি বিশ্লেষণটি মেয়েদের এক ধরনের সৌন্দর্য জ্ঞাপন করে।’ তবে কি যৌনতার নিরিখে যাচাই হচ্ছে আধুনিকতা? এই তো সমাজের ফেস!
উন্নয়নশীল সমাজে আধুনিকতা স্বাগত, কিন্তু প্রাচীন গৌরবময় এদেশীয় সংস্কৃতি, সংহতি, মূল্যবোধ ও স্বাতন্ত্র্যের বিলুপ্তি ঘটিয়ে এ জাতীয় ‘Westoxication’ কখনোই অভিপ্রেত নয়। জাতির মৌলিকত্ব ও বৈশিষ্ট্য হারিয়ে জগত্ সভায় শ্রেষ্ঠ আসন কখনও লাভ করা যাবে না।