বাংলাদেশ সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের বার্ষিক মানবাধিকার প্রতিবেদনে বলা
হয়েছে, নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ থাকলেও তাদের
লাগাম টেনে ধরতে মাঝে মাঝে ব্যর্থ হয় সরকার। প্রতিবেদনে বলা হয়,
স্বেচ্ছাচারী গ্রেফতার, অনলাইনে মতামত প্রকাশ নিয়ন্ত্রণ, দুর্বল কর্মপরিবেশ
এবং শ্রমিক অধিকার দেশের সবচেয়ে বড় মানবাধিকার সমস্যা।
বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে। এটি ৩৮তম বার্ষিক প্রতিবেদন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, স্বেচ্ছাচারী আটকাদেশ, দুর্বল বিচারব্যবস্থা, বিচারের আগে দীর্ঘ সময় আটকে রাখার মতো মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটছে। এতে বলা হয়, সরকার নাগরিকদের ব্যক্তিগত অধিকার হরণ করে। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সহিংসতা এবং সরকারি কর্মকর্তাদের দুর্নীতি একটি গুরুতর সমস্যা হিসেবে বিরাজ করছে।
বাংলাদেশ সংক্রান্ত ৪২ পৃষ্ঠার ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, নিরাপত্তা রক্ষাকারীরা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যেসব নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে তার সমন্বিত তদন্ত ও বিচারের পদক্ষেপ নেয়নি সরকার। নিরাপত্তা রক্ষাকারীদের হাতে কত মানুষ নিহত হয়েছে তার কোনো পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হয়নি। সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা শূন্য সহনশীলতা ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধে প্রতিশ্রুতি দিলেও তা কার্যকর হয়নি।
২০১৩ সালের প্রথম ৯ মাসে র্যাবসহ নিরাপত্তা রক্ষাকারীদের হাতে নিহত হয়েছে কমপক্ষে ১৪৬ জন। ঘেরাও, গ্রেফতার ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অপারেশন চালানোর সময়ও মারা গেছে মানুষ। সরকার যথারীতি এগুলোকে ‘ক্রসফায়ার’ ‘বন্দুকযুদ্ধ’ ‘এনকাউন্টার কিলিং’ বলে বর্ণনা করেছে। এক্ষেত্রে ২০১২ সালে নিহতের সংখ্যা ছিল ৭০।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২৪ ফেব্রুয়ারি দেশজুড়ে হরতাল চলাকালে মানিকগঞ্জের সিংগাইরে পুলিশ প্রকাশ্যে গুলি ছোড়ে বিক্ষোভকারীদের ওপর। এতে নিহত হন ৫ জন। তবে নিহতরা কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য ছিলেন না। তারা হরতালেও অংশ নেননি। নিহতরা হলেন কৃষক আলমগীর হোসেন, ব্যবসায়ী নাসির আহমেদ, নাজিমুদ্দিন মোল্লা ও শাহ আলম।
জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ১৮৯ জন। এর মধ্যে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে সহিংসতা হয়েছে ১৩৫ বার এবং এতে নিহত হয়েছেন ১৫ জন।
বিএনপিতে ৭৫ বার সহিংসতায় মারা গেছে ৬ জন। ২০১২ সালের ডিসেম্বরে হত্যা করা হয় বিশ্বজিত্ দাসকে। এ ঘটনায় জড়িত ৮ জনের বিরুদ্ধে আদালত মৃত্যুদণ্ডের শাস্তি ঘোষণা করেন। ১৩ জনকে দেন যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বছরজুড়েই অব্যাহত ছিল গুম, অপহরণ। এজন্য দায়ী করা হয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলোকে। এর মধ্যে রয়েছে র্যাব ও সিআইডি। জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নিরাপত্তা বাহিনী হাতে গুম হয়েছেন ১৪ জন।
২৫ জানুয়ারি কুষ্টিয়ার কুমারখালি থেকে ন্যাশনাল কমিউনিস্ট পার্টির নেতা মোহাম্মদ আলী মোহাব্বতকে অপহরণ করে র্যাব। তার পরিবারের সদস্যরা বলেছেন তারপর থেকে তিনি কোথায় আছেন তারা তা জানে না। বছর শেষ হয়ে গেলেও তার কোনো হদিস মেলেনি।
গত ১৫ মে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের সাক্ষী সুখরঞ্জন বালি দ্য নিউ এজ পত্রিকাকে বলেন, ২০১২ সালে ওই আদালত থেকে তাকে সাদা পোশাকের পুলিশ অপহরণ করে। এ বিষয়ে প্রত্যক্ষদর্শী রয়েছে। কোনো তদন্তও হয়নি। তবুও প্রসিকিউশন তাকে অপহরণের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। সুখরঞ্জন দাবি করেছেন, তাকে সীমান্ত পেরিয়ে অবৈধ উপায়ে ভারতে পাঠিয়ে দেয়ার আগে কয়েক সপ্তাহ রাখা হয় নিরাপত্তা হেফাজতে। বছর শেষেও তিনি কলকাতার জেলে বন্দি ছিলেন।
নির্যাতন, অমানবিক, অপমানজনক আচরণ শাস্তি সংবিধানে ও আইনে রহিত করা আছে। কিন্তু র্যাবসহ নিরাপত্তা বাহিনী শারীরিক নির্যাতন করে। নিরাপত্তা বাহিনী হুমকি দেয়, প্রহার করে ও বৈদ্যুতিক শক দেয়।
প্রতিবেদনে জেলখানার চিত্র তুলে ধরা হয়। বলা হয়, জেলখানাগুলোর অবস্থা ভয়াবহ। এতে আসামিতে ঠাসাঠাসি। পর্যাপ্ত সুবিধা নেই। পয়ঃনিষ্কাশনের অভাব রয়েছে।
মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের মতে, এর ফলে নিরাপত্তা হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। জেলখানায় অতিরিক্ত আসামি রাখায় তাদের ঘুমাতে হয় শিফট করে। নেই পর্যাপ্ত টয়লেট।
খেয়ালখুশি মতো আটক করা প্রসঙ্গে বলা হয়, সংবিধানে খেয়ালখুশি মতো আটক বা গ্রেফতার করা নিষিদ্ধ রয়েছে। তবে কেউ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত সন্দেহ হলে তাকে বা তাদের ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশ বা গ্রেফতারি পরোয়ানা ছাড়াই আটকের অনুমতি আছে আইনে।
১১ মার্চ পুলিশ ঘেরাও করে বিএনপির কেন্দ্রীয় অফিস। বিএনপির অফিস থেকে দলের ১৫০ জন কর্মকর্তাকে গ্রেফতার করে। পুলিশ দাবি করে, তারা বিএনপি অফিসের ভিতরে পেয়েছে হাতবোমা, বোমা তৈরির সরঞ্জাম। তবে বিএনপির দাবি, পুলিশের এমন কথা ভিত্তিহীন। তারা একথা বলে তাদের অফিসে ঘেরাও দেয়ার বিষয়টিকে বৈধতা দেয়ার চেষ্টা করছে।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বিরুদ্ধে ৯২টি অপরাধ বিষয়ক অভিযোগ আনা হয়। তাকে আটক রাখা হয় ৯১ দিন। ৪ নভেম্বর বিএনপির স্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্য এমকে আনোয়ার, রফিকুল ইসলাম মিয়া, মওদুদ আহমদ, আবদুল আওয়াল মিন্টু ও শিমুল বিশ্বাসকে গ্রেফতার করে। অভিযোগে বলা হয়, তারা রাজনৈতিক বিক্ষেভে সহিংসতা উস্কে দেয়ার জন্য দায়ী।
প্রতিবেদনে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে বলা হয়, মুক্ত মত প্রকাশ ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার প্রতি সম্মান দেখাতে মাঝে মাঝেই ব্যর্থ হয়েছে সরকার। মুক্ত মত প্রকাশের ক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। হয়রানি ও প্রতিশোধ নেয়ার আতঙ্কে কিছু সাংবাদিক সরকারের সমালোচনা করার ক্ষেত্রে সেলফ সেন্সরশিপ করে। সংবিধানের সমালোচনা রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল। এ অপরাধের শাস্তি তিন বছর থেকে যাবজ্জীবন জেল। বছরজুড়ে এ আইনে আদালত কাউকে শাস্তি দেয়নি।
সাংবাদিকদের ওপর শারীরিক হামলা, হয়রানি ও ভীতি প্রদর্শন করেছে পুলিশ। অধিকার-এর মতে, কোনো সাংবাদিক ২০১৩ সালে নিহত না হলেও জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ১৪৪ সাংবাদিকের ওপর হামলা হয়েছে, না হয় তাদের হুমকি দেয়া হয়েছে।
আইন ও সালিস কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে নিহত হয়েছেন দুই সাংবাদিক। ৩৯ জনের ওপর হামলা করা হয়েছে। রাজনৈতিক দল, সরকারি কর্মকর্তারা হামলা অথবা হুমকি দিয়েছেন ২৩৪ জনকে।
২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে খুন করা হয় সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনিকে। এ ঘটনায় ২০১৩ সালেও কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি। ১৪ ফেব্রুয়ারি সরকার বিরোধী দল সমর্থিত দৈনিক আমার দেশ, দিনকাল, সংগ্রাম, দিগন্ত টেলিভিশন ও ইসলামিক টেলিভিশনকে আওয়ামী লীগ সম্পর্কিত ইভেন্ট কভার করার ক্ষেত্রে নিষিদ্ধ করে।
৬ মে মতিঝিলে হেফাজতে ইসলামীর সমাবেশ সরাসরি সম্প্রচার করায় দিগন্ত টেলিভিশন ও ইসলামিক টেলিভিশন বন্ধ করে দেয় সরকার। এ দুটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা আগে থেকে এ মর্মে নোটিস পাওয়ার কথা অস্বীকার করেন।
১৯ অক্টোবর পুলিশ ঢাকায় সব সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করে। কিন্তু ২৫ অক্টোবর বিএনপিকে সমাবেশ করার অনুমতি দেয়। এ আইনে কোথাও চারজনের বেশি মানুষের সমাবেশ নিষিদ্ধ করা হয়।
আইন ও সালিস কেন্দ্রের তথ্য মতে, জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে কর্তৃপক্ষ এই বিধান ব্যবহার করে ১০৫ বার। পুলিশ ও ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা সভা-সমাবেশ ভণ্ডুলে অংশ নেয়।
৫ মে হেফাজতে সমাবেশ ঘিরে নিহতের সংখ্যা নিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও আলজারিরার প্রতিবেদন বলে নিহত হয়েছেন কমপক্ষে ৫০ জন। জুনে অধিকার তার রিপোর্টে বলে, দুদিনের ওই সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ৬১ জন। ওই প্রতিবেদনে সরকারের দুর্নীতি ও স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে বলে বলা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, আইন অনুযায়ী দুর্নীতির দায়ে সরকারি কর্মকর্তারাও শাস্তির যোগ্য। কিন্তু সরকার এক্ষেত্রে কার্যকরভাবে আইন প্রয়োগ করেনি। ২০১৩ সালের দুর্নীতি নিয়ে রিপোর্ট করেছে মানবাধিকার গ্রুপগুলো, মিডিয়া, দুর্নীতি দমন কমিশন ও অন্যান্য কিছু সংস্থা। যেসব কর্মকর্তা দুর্নীতিতে জড়িত হয়েছেন তারা দায়মুক্তির সুযোগ পেয়েছে।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করার সরকারি প্রতিষ্ঠান হলো দুদক। ২০১০ সালের বিশ্বব্যাংকের এক রিপোর্ট অনুযায়ী, সরকার দুদকের কাজকে খর্ব করে থাকে এবং তারা দুর্নীতির বিচারকে বাধাগ্রস্ত করে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকার বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ের চেয়ে কম দুর্নীতির মামলা করেছে। পাশাপাশি সরকারি কমিশন হাজার হাজার মামলা প্রত্যাহার করার জন্য দুদককে সুপারিশ করেছে। সুশীল সমাজের অনেকে বলেন, সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে গুরুত্ব দিচ্ছে না। উল্টো রাজনৈতিক মামলা পরিচালনায় ব্যবহার করছে দুদককে। টিআইবি বলেছে, দুদকের কর্মকাণ্ডে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে এ প্রতিষ্ঠানকে ঠুটো জগন্নাথে পরিণত করেছে।
পদ্ম সেতুর বহুল আলোচিত দুর্নীতিও স্থান প্রায় প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়, ৩১ জানুয়ারি পদ্মা সেতু প্রকল্প থেকে ৯৬০০ কোটি টাকার ঋণ আবেদন প্রত্যাহার করে নেয় বিশ্ব ব্যাংক। বিশ্ব ব্যাংকের বৈদেশিক বিশেষজ্ঞ প্যানেলের সমালোচনার পর সরকার এ সিদ্ধান্ত নেয়। সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনে দুদকের ব্যর্থতার জন্য ওই প্যানেল তীব্র সমালোচনা করে।
বিশেষজ্ঞ ওই প্যানেল বিশ্বাস করেন তাদের হাতে সৈয়দ আবুল হোসেনের বিরুদ্ধে দুর্নীতিতে জড়িত থাকার যথেষ্ট তথ্যপ্রমাণ আছে। ১৯ সেপ্টেম্বর কানাডার একটি আদালত সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরীকে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযুক্ত করে। বলা হয়, তিনিও পদ্মা সেতু দুর্নীতিতে জড়িত।
বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে। এটি ৩৮তম বার্ষিক প্রতিবেদন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, স্বেচ্ছাচারী আটকাদেশ, দুর্বল বিচারব্যবস্থা, বিচারের আগে দীর্ঘ সময় আটকে রাখার মতো মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটছে। এতে বলা হয়, সরকার নাগরিকদের ব্যক্তিগত অধিকার হরণ করে। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সহিংসতা এবং সরকারি কর্মকর্তাদের দুর্নীতি একটি গুরুতর সমস্যা হিসেবে বিরাজ করছে।
বাংলাদেশ সংক্রান্ত ৪২ পৃষ্ঠার ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, নিরাপত্তা রক্ষাকারীরা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যেসব নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে তার সমন্বিত তদন্ত ও বিচারের পদক্ষেপ নেয়নি সরকার। নিরাপত্তা রক্ষাকারীদের হাতে কত মানুষ নিহত হয়েছে তার কোনো পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হয়নি। সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা শূন্য সহনশীলতা ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধে প্রতিশ্রুতি দিলেও তা কার্যকর হয়নি।
২০১৩ সালের প্রথম ৯ মাসে র্যাবসহ নিরাপত্তা রক্ষাকারীদের হাতে নিহত হয়েছে কমপক্ষে ১৪৬ জন। ঘেরাও, গ্রেফতার ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অপারেশন চালানোর সময়ও মারা গেছে মানুষ। সরকার যথারীতি এগুলোকে ‘ক্রসফায়ার’ ‘বন্দুকযুদ্ধ’ ‘এনকাউন্টার কিলিং’ বলে বর্ণনা করেছে। এক্ষেত্রে ২০১২ সালে নিহতের সংখ্যা ছিল ৭০।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২৪ ফেব্রুয়ারি দেশজুড়ে হরতাল চলাকালে মানিকগঞ্জের সিংগাইরে পুলিশ প্রকাশ্যে গুলি ছোড়ে বিক্ষোভকারীদের ওপর। এতে নিহত হন ৫ জন। তবে নিহতরা কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য ছিলেন না। তারা হরতালেও অংশ নেননি। নিহতরা হলেন কৃষক আলমগীর হোসেন, ব্যবসায়ী নাসির আহমেদ, নাজিমুদ্দিন মোল্লা ও শাহ আলম।
জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ১৮৯ জন। এর মধ্যে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে সহিংসতা হয়েছে ১৩৫ বার এবং এতে নিহত হয়েছেন ১৫ জন।
বিএনপিতে ৭৫ বার সহিংসতায় মারা গেছে ৬ জন। ২০১২ সালের ডিসেম্বরে হত্যা করা হয় বিশ্বজিত্ দাসকে। এ ঘটনায় জড়িত ৮ জনের বিরুদ্ধে আদালত মৃত্যুদণ্ডের শাস্তি ঘোষণা করেন। ১৩ জনকে দেন যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বছরজুড়েই অব্যাহত ছিল গুম, অপহরণ। এজন্য দায়ী করা হয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলোকে। এর মধ্যে রয়েছে র্যাব ও সিআইডি। জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নিরাপত্তা বাহিনী হাতে গুম হয়েছেন ১৪ জন।
২৫ জানুয়ারি কুষ্টিয়ার কুমারখালি থেকে ন্যাশনাল কমিউনিস্ট পার্টির নেতা মোহাম্মদ আলী মোহাব্বতকে অপহরণ করে র্যাব। তার পরিবারের সদস্যরা বলেছেন তারপর থেকে তিনি কোথায় আছেন তারা তা জানে না। বছর শেষ হয়ে গেলেও তার কোনো হদিস মেলেনি।
গত ১৫ মে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের সাক্ষী সুখরঞ্জন বালি দ্য নিউ এজ পত্রিকাকে বলেন, ২০১২ সালে ওই আদালত থেকে তাকে সাদা পোশাকের পুলিশ অপহরণ করে। এ বিষয়ে প্রত্যক্ষদর্শী রয়েছে। কোনো তদন্তও হয়নি। তবুও প্রসিকিউশন তাকে অপহরণের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। সুখরঞ্জন দাবি করেছেন, তাকে সীমান্ত পেরিয়ে অবৈধ উপায়ে ভারতে পাঠিয়ে দেয়ার আগে কয়েক সপ্তাহ রাখা হয় নিরাপত্তা হেফাজতে। বছর শেষেও তিনি কলকাতার জেলে বন্দি ছিলেন।
নির্যাতন, অমানবিক, অপমানজনক আচরণ শাস্তি সংবিধানে ও আইনে রহিত করা আছে। কিন্তু র্যাবসহ নিরাপত্তা বাহিনী শারীরিক নির্যাতন করে। নিরাপত্তা বাহিনী হুমকি দেয়, প্রহার করে ও বৈদ্যুতিক শক দেয়।
প্রতিবেদনে জেলখানার চিত্র তুলে ধরা হয়। বলা হয়, জেলখানাগুলোর অবস্থা ভয়াবহ। এতে আসামিতে ঠাসাঠাসি। পর্যাপ্ত সুবিধা নেই। পয়ঃনিষ্কাশনের অভাব রয়েছে।
মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের মতে, এর ফলে নিরাপত্তা হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। জেলখানায় অতিরিক্ত আসামি রাখায় তাদের ঘুমাতে হয় শিফট করে। নেই পর্যাপ্ত টয়লেট।
খেয়ালখুশি মতো আটক করা প্রসঙ্গে বলা হয়, সংবিধানে খেয়ালখুশি মতো আটক বা গ্রেফতার করা নিষিদ্ধ রয়েছে। তবে কেউ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত সন্দেহ হলে তাকে বা তাদের ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশ বা গ্রেফতারি পরোয়ানা ছাড়াই আটকের অনুমতি আছে আইনে।
১১ মার্চ পুলিশ ঘেরাও করে বিএনপির কেন্দ্রীয় অফিস। বিএনপির অফিস থেকে দলের ১৫০ জন কর্মকর্তাকে গ্রেফতার করে। পুলিশ দাবি করে, তারা বিএনপি অফিসের ভিতরে পেয়েছে হাতবোমা, বোমা তৈরির সরঞ্জাম। তবে বিএনপির দাবি, পুলিশের এমন কথা ভিত্তিহীন। তারা একথা বলে তাদের অফিসে ঘেরাও দেয়ার বিষয়টিকে বৈধতা দেয়ার চেষ্টা করছে।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বিরুদ্ধে ৯২টি অপরাধ বিষয়ক অভিযোগ আনা হয়। তাকে আটক রাখা হয় ৯১ দিন। ৪ নভেম্বর বিএনপির স্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্য এমকে আনোয়ার, রফিকুল ইসলাম মিয়া, মওদুদ আহমদ, আবদুল আওয়াল মিন্টু ও শিমুল বিশ্বাসকে গ্রেফতার করে। অভিযোগে বলা হয়, তারা রাজনৈতিক বিক্ষেভে সহিংসতা উস্কে দেয়ার জন্য দায়ী।
প্রতিবেদনে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে বলা হয়, মুক্ত মত প্রকাশ ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার প্রতি সম্মান দেখাতে মাঝে মাঝেই ব্যর্থ হয়েছে সরকার। মুক্ত মত প্রকাশের ক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। হয়রানি ও প্রতিশোধ নেয়ার আতঙ্কে কিছু সাংবাদিক সরকারের সমালোচনা করার ক্ষেত্রে সেলফ সেন্সরশিপ করে। সংবিধানের সমালোচনা রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল। এ অপরাধের শাস্তি তিন বছর থেকে যাবজ্জীবন জেল। বছরজুড়ে এ আইনে আদালত কাউকে শাস্তি দেয়নি।
সাংবাদিকদের ওপর শারীরিক হামলা, হয়রানি ও ভীতি প্রদর্শন করেছে পুলিশ। অধিকার-এর মতে, কোনো সাংবাদিক ২০১৩ সালে নিহত না হলেও জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ১৪৪ সাংবাদিকের ওপর হামলা হয়েছে, না হয় তাদের হুমকি দেয়া হয়েছে।
আইন ও সালিস কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে নিহত হয়েছেন দুই সাংবাদিক। ৩৯ জনের ওপর হামলা করা হয়েছে। রাজনৈতিক দল, সরকারি কর্মকর্তারা হামলা অথবা হুমকি দিয়েছেন ২৩৪ জনকে।
২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে খুন করা হয় সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনিকে। এ ঘটনায় ২০১৩ সালেও কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি। ১৪ ফেব্রুয়ারি সরকার বিরোধী দল সমর্থিত দৈনিক আমার দেশ, দিনকাল, সংগ্রাম, দিগন্ত টেলিভিশন ও ইসলামিক টেলিভিশনকে আওয়ামী লীগ সম্পর্কিত ইভেন্ট কভার করার ক্ষেত্রে নিষিদ্ধ করে।
৬ মে মতিঝিলে হেফাজতে ইসলামীর সমাবেশ সরাসরি সম্প্রচার করায় দিগন্ত টেলিভিশন ও ইসলামিক টেলিভিশন বন্ধ করে দেয় সরকার। এ দুটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা আগে থেকে এ মর্মে নোটিস পাওয়ার কথা অস্বীকার করেন।
১৯ অক্টোবর পুলিশ ঢাকায় সব সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করে। কিন্তু ২৫ অক্টোবর বিএনপিকে সমাবেশ করার অনুমতি দেয়। এ আইনে কোথাও চারজনের বেশি মানুষের সমাবেশ নিষিদ্ধ করা হয়।
আইন ও সালিস কেন্দ্রের তথ্য মতে, জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে কর্তৃপক্ষ এই বিধান ব্যবহার করে ১০৫ বার। পুলিশ ও ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা সভা-সমাবেশ ভণ্ডুলে অংশ নেয়।
৫ মে হেফাজতে সমাবেশ ঘিরে নিহতের সংখ্যা নিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও আলজারিরার প্রতিবেদন বলে নিহত হয়েছেন কমপক্ষে ৫০ জন। জুনে অধিকার তার রিপোর্টে বলে, দুদিনের ওই সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ৬১ জন। ওই প্রতিবেদনে সরকারের দুর্নীতি ও স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে বলে বলা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, আইন অনুযায়ী দুর্নীতির দায়ে সরকারি কর্মকর্তারাও শাস্তির যোগ্য। কিন্তু সরকার এক্ষেত্রে কার্যকরভাবে আইন প্রয়োগ করেনি। ২০১৩ সালের দুর্নীতি নিয়ে রিপোর্ট করেছে মানবাধিকার গ্রুপগুলো, মিডিয়া, দুর্নীতি দমন কমিশন ও অন্যান্য কিছু সংস্থা। যেসব কর্মকর্তা দুর্নীতিতে জড়িত হয়েছেন তারা দায়মুক্তির সুযোগ পেয়েছে।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করার সরকারি প্রতিষ্ঠান হলো দুদক। ২০১০ সালের বিশ্বব্যাংকের এক রিপোর্ট অনুযায়ী, সরকার দুদকের কাজকে খর্ব করে থাকে এবং তারা দুর্নীতির বিচারকে বাধাগ্রস্ত করে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকার বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ের চেয়ে কম দুর্নীতির মামলা করেছে। পাশাপাশি সরকারি কমিশন হাজার হাজার মামলা প্রত্যাহার করার জন্য দুদককে সুপারিশ করেছে। সুশীল সমাজের অনেকে বলেন, সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে গুরুত্ব দিচ্ছে না। উল্টো রাজনৈতিক মামলা পরিচালনায় ব্যবহার করছে দুদককে। টিআইবি বলেছে, দুদকের কর্মকাণ্ডে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে এ প্রতিষ্ঠানকে ঠুটো জগন্নাথে পরিণত করেছে।
পদ্ম সেতুর বহুল আলোচিত দুর্নীতিও স্থান প্রায় প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়, ৩১ জানুয়ারি পদ্মা সেতু প্রকল্প থেকে ৯৬০০ কোটি টাকার ঋণ আবেদন প্রত্যাহার করে নেয় বিশ্ব ব্যাংক। বিশ্ব ব্যাংকের বৈদেশিক বিশেষজ্ঞ প্যানেলের সমালোচনার পর সরকার এ সিদ্ধান্ত নেয়। সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনে দুদকের ব্যর্থতার জন্য ওই প্যানেল তীব্র সমালোচনা করে।
বিশেষজ্ঞ ওই প্যানেল বিশ্বাস করেন তাদের হাতে সৈয়দ আবুল হোসেনের বিরুদ্ধে দুর্নীতিতে জড়িত থাকার যথেষ্ট তথ্যপ্রমাণ আছে। ১৯ সেপ্টেম্বর কানাডার একটি আদালত সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরীকে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযুক্ত করে। বলা হয়, তিনিও পদ্মা সেতু দুর্নীতিতে জড়িত।
No comments:
Post a Comment