প্রবাসীদের মধ্যে আত্মীয়-স্বজনদের প্রেমের চেয়ে দেশপ্রেম কোনো অংশেই কম নয়।
বিদেশে থেকেও প্রবাসীরা দেশের খবরাখবর রাখতে চেষ্টা করেন। দেশের যেসব খবর
পাওয়া যায় তাতে দেশের অবস্থা তেমন ভালো নয়, এটা সবাই স্বীকার করেন।
মারামারি-কাটাকাটির খবর আসছে প্রতিদিন। হয়তো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে মারামারি
হচ্ছে, নয়তো বিরোধী দলকে হয়রানি করছে সরকারি দল। আবার কখনও দেখা যায়,
সরকারি দলের ছাত্র সংগঠনের কর্মীরা পুলিশের সামনেই বিরোধী দলের মিছিলে গুলি
করছে। আবার কখনও সরকারবিরোধী মিছিলে যোগ দেয়ার কারণে রাতের আঁধারে ঘরে
ঢুকে কাউকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে পুলিশ বা র্যাব।
আরমান ভাই সব কিছুতেই একটু মজা করার চেষ্টা করেন। দেশের কোনো খারাপ খবর শুনলেই আরমান ভাই বলে উঠেন ঝয় বাংলা, ঝ-এর ওপর জোর দিয়ে। তাকে বললাম, আপনি জয় বাংলা না বলে ঝয় বাংলা কেন বলেন? তিনি বললেন, ওরা যদি বাংলাদেশ না বলে শুধু বাংলা বলতে পারে, তাহলে আমি জয় বাংলা না বলে ঝয় বাংলা বলতে পারব না কেন? বললাম, ওরা জয় বাংলা বলে সেটা আপনার পছন্দ না হলে আপনি জয় বাংলাদেশ বলুন, অথবা বাংলাদেশ জিন্দাবাদ বলুন। আরমান ভাই বললেন, বাংলাদেশ জিন্দাবাদ বললে যেমন ওরা আমাকে রাজাকার বলবে, সেরকম জয় বাংলাদেশ বললেও ওরা আমাকে রাজাকার বলবে। তাদের কাছে আমি শুধু তখনই সাধু হতে পারব যখন বলব ঝয় বাংলা, অর্থাত্ জয় বাংলা।
আরমান ভাইকে বললাম, আচ্ছা আপনি ঝয় বাংলা বলবেন ঠিক আছে, কিন্তু আরেকটু আস্তে বলা যায় না? আপনি যেভাবে জোর গলায় বলেন তাতে পাশে যারা থাকে তারা তো আতঙ্কিত বোধ করে। আরমান ভাই বললেন, এটা বাস্তবতার প্রতিফলন। বললাম কীভাবে? বললেন, আপনি একটু খেয়াল করলেই দেখবেন যে, যেখানে লগি-বৈঠা দিয়ে মানুষ মারা হয়েছে সেখানেও আক্রমণকারী জয় বাংলার লোক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা গুলি করেছে তারাও জয় বাংলার লোক, হেফাজতের ওপর যারা আক্রমণ করেছে, তারাও জয় বাংলার লোক—তার মানে যেখানে জয় বাংলা সেখানেই আতঙ্ক। তাই আমিও যখন ঝয় বাংলা বলি তখনও পাশে যারা আছে তারা একটু আতঙ্কিত হবে এটাই স্বাভাবিক।
জয় বাংলা? নাকি বাংলাদেশ জিন্দাবাদ? বাংলাদেশী নাকি বাঙালি? এ নিয়ে তর্ক চলছে যুগের পর যুগ ধরে। যেনতেন তর্ক নয়, রীতিমত মারামারি-কাটাকাটি হচ্ছে। বলতে গেলে পুরো দেশ এখন এই দুই শিবিরে বিভক্ত হয়ে গেছে। স্বাধীনতার ৪২ বছর পরেও বাংলাদেশী নাকি বাঙালি তা নিয়ে তর্ক করা এবং এ নিয়ে মারামারিতে লিপ্ত হওয়া সত্যিই দুঃখজনক। বাংলাদেশী নাকি বাঙালি এই বিতর্কে জাতিকে বিভক্ত করে রাখার মধ্যে দেশ ও জাতির কোনো মঙ্গল হতে পারে না, বরং এর দ্বারা দেশ ও জাতির মধ্যে বিভক্তি ফুটে উঠছে প্রকটভাবে এবং ক্ষতি হচ্ছে পুরো দেশ ও জাতির। আর এর দ্বারা দেশের শত্রুরা লাভবান হচ্ছে। ‘ভাগ কর আর শাসন কর’—ইংরেজদের এই নীতির বীজ তারা আমাদের ভেতর ঢুকিয়ে দিয়ে গেছে। তারা যাওয়ার সময় যাদের হাতে ক্ষমতা দিয়ে গেছে সেই ভারতীয়রা এখন সেই বীজে পানি আর সার দিয়ে যাচ্ছে আমাদের জাতি হিসেবে দুর্বল করে রাখার উদ্দেশ্যে। আর সেই ফাঁদে পা দিয়ে আমাদের রাজনীতিকরা জাতিকে বিভক্ত করে রাখার কাজটি করেই যাচ্ছে কেউ জেনে আর কেউ না জেনে। কেউ জয় বাংলা আর কেউ বাংলাদেশ জিন্দাবাদের পক্ষে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছে।
দু’পক্ষই কিছু যুক্তি পেশ করে থাকে। যারা জয় বাংলার পক্ষে, তারা বলেন যে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়েও আমরা জয় বাংলা স্লোগান দিয়েছি। আর আমরা তো বাঙালি জাতি, বাঙালি হিসেবে আমাদের একটা আলাদা পরিচয় আছে। আমাদের একটা আলাদা সংস্কৃতি আছে। বাঙালি হিসেবে আমরা বিশ্ব দরবারে নিজেদের পরিচয় দিতে আনন্দ বোধ করি। অন্য পক্ষ বলছে, বাঙালি বললে এতে পশ্চিমবঙ্গের মানুষদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তারা আমাদের বাংলাদেশের নাগরিক নয়। আর তাদের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করার জন্য আমরা স্বাধীনতা যুদ্ধ করিনি। আমরা যুদ্ধের মাধ্যমে যে ভূখণ্ডের স্বাধীনতা অর্জন করেছি তার নাম বাংলাদেশ, বাংলা নয়। বাংলা আমাদের ভাষার নাম।
এই তর্কের মধ্যে স্পষ্ট ফুটে উঠছে যে আমরা আমাদের জাতিসত্তার পরিচয় সঙ্কটে ভুগছি। এটা একটা জাতির জন্য লজ্জাজনক এবং দুঃখজনক। এ নিয়ে প্রচুর লেখালেখি হয়েছে। অনেক তথ্য ও তত্ত্বনির্ভর আলোচনাও দেখেছি। অত জ্ঞান আমার নেই। আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানে যা মনে হয়েছে তা হলো, আমরা চাইলেই এই সঙ্কট কাটিয়ে উঠতে পারি এবং পারা উচিত। তবে এর জন্য প্রয়োজন আন্তরিকতা। আমাদের মধ্যে আবার আন্তরিকতার বড়ই অভাব। আন্তরিকতার অভাবে সন্ত্রাস বন্ধ করা যাচ্ছে না। আন্তরিকতার অভাবে দুর্নীতি বন্ধ করা যাছে না। আন্তরিকতার অভাবে প্রচুর সম্পদ থাকা সত্ত্বেও নাগরিক জীবনের মান উন্নয়ন করা যাচ্ছে না। আন্তরিকতার অভাবে ক্ষমতাশালীদের দেশের সম্পদ চুরি বন্ধ করা যাচ্ছে না। আন্তরিকতার অভাবে দেশে শান্তি ফিরিয়ে আনা যাচ্ছে না। তাই মনে হচ্ছে আন্তরিকতার অভাবে বাংলাদেশী নাকি বাঙালি এই তর্কেরও সহজেই মীমাংসা হবে না। ব্যক্তিগতভাবেও অনেক সময় এসব কথা ওঠে। বন্ধুদের আড্ডায়ও মাঝে মাঝে এসব বিষয়ে কথাবার্তা হয়। আর রাজনৈতিক আলাপ-আলোচনায় প্রায় সময় এই বিষয়টি উঠে আসে। দেখা যায় অনেকেই আমাদের জাতীয় পরিচয় কী হওয়া উচিত তা নিয়ে দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ভোগেন। তাদের উদ্দেশেই এই লেখার অবতারণা।
কোনো জাতির পরিচয় কখনও ভাষাভিত্তিক, কখনও ধর্মভিত্তিক আবার কখনও ভূখণ্ডভিত্তিক হতে পারে। যেমন ভাষার ভিত্তিতে আমরা বাঙালি জাতি, ভূখণ্ডের ভিত্তিতে আমরা বাংলাদেশী, আর ধর্মের ভিত্তিতে সারা বিশ্বের মুসলমানরা মুসলিম জাতি, সারা বিশ্বের হিন্দুরা হিন্দু জাতি আর সারা বিশ্বের বৌদ্ধরা বৌদ্ধ জাতি। আমাদের এই বাংলাদেশ যুদ্ধের মাধ্যমে লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে স্বাধীন হয়েছে। এখানে মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও অন্যান্য ধর্মের অধিবাসীদের সহাবস্থান এখানে রয়েছে। তাই আমরা ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদ গ্রহণ করে নিজেদের মুসলিম জাতি বললে সব বাংলাদেশীকে এতে অন্তর্ভুক্ত করা যায় না। যেমন হিন্দু-বৌদ্ধরা তো মুসলমান নয়, তবে বাংলাদেশী। আবার ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ গ্রহণ করে বাঙালি জাতি বললে ভারতের কিছু মানুষ, যাদের ভাষা বাংলা, তারাও এতে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। যেমন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সুচিত্রা সেন, মান্না দে, সত্যজিত্ রায়, মমতা ব্যানার্জি, জিত, কোয়েল মল্লিক, দেব। ওরাও বাঙালি, তবে বাংলাদেশী নন। বাকি আছে ভূখণ্ডভিত্তিক জাতীয়তাবাদ। এই পরিচয়ে আমরা বাংলাদেশী। ভাষা-ধর্ম নির্বিশেষে যারাই বাংলাদেশের নাগরিক তাদের সবাইকে এই পরিচয়ে অন্তর্ভুক্ত করা যায়। তাই ভূখণ্ডভিত্তিক জাতীয়তা গ্রহণ করে আমাদের বাংলাদেশী হিসেবে পরিচয় দেয়া সবচেয়ে বেশি যুক্তিযুক্ত। মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, মগ, চাকমা, মুরং ইত্যাদি যে কোনো ধর্মের অনুসারী বা যে কোনো ভাষার ব্যবহারকারীই হোক না কেন; সবাই আমরা বাংলাদেশী। তবে কখনও কখনও প্রয়োজনে ভাষাভিত্তিক বা ধর্মভিত্তিক জাতীয়তার পরিচয় উল্লেখ করা যেতে পারে।
আমাদের প্রিয় ভাষার নাম বাংলা, আর আমাদের প্রিয় দেশের নাম বাংলাদেশ। জয় বাংলা অথবা বাংলাদেশ জিন্দাবাদ এই স্লোগানের মাধ্যমে আমরা সবাই আমাদের প্রিয় বাংলাদেশের দীর্ঘায়ু কামনা করে থাকি। জয় বাংলা বললে বাংলা ভাষার দীর্ঘায়ু কামনা করা হয়। এতে বাংলাদেশের দীর্ঘায়ু কামনা করার কথা বোঝা যায় না। কারণ আমাদের দেশের নাম বাংলাদেশ আর আমাদের ভাষার নাম বাংলা। জয় বাংলা বললে ভারতের বাংলা ভাষা ব্যবহারকারীরা এতে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাওয়ার কারণে জয় বাংলা ত্যাগ করে বাংলাদেশ জিন্দাবাদ অথবা জয় বাংলাদেশ বলা উচিত। আমরা বাংলা ভাষাকেও ভালোবাসি। এই ভাষার দীর্ঘায়ু কামনা করে জয় বাংলা বলা যেতে পারে। তবে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের দীর্ঘায়ু কামনা করতে জয় বাংলা একেবারেই যথেষ্ট নয়। এর জন্য বাংলাদেশ জিন্দাবাদ অথবা জয় বাংলাদেশ বলতে হবে।
বছর দুয়েক আগে ভারতের ওয়েস্ট বেঙ্গলের নাম পরিবর্তন করে বাংলা রাখার পক্ষে একটি মত পাওয়া গিয়েছিল। এখন সম্ভবত পশ্চিমবঙ্গ রাখা হয়েছে (নাকি পশ্চিম বাংলা রাখা হয়েছে জানি না)। কখনও যদি সেটার নাম আবার পরিবর্তন করে বাংলা রাখা হয়, তাহলে এদেশের জয় বাংলাওয়ালারা কী করবেন? তখন তো জয় বাংলা বললে ভারতীয় বাংলাই বোঝা যাবে। তখন তারা কি জয় বাংলা স্লোগান পাল্টাবেন? নাকি সেই ভারতীয় বাংলার দীর্ঘায়ু কামনা করতেই তারা তখন জয় বাংলা বলবেন? আমাদের প্রাণপ্রিয় এই বাংলাদেশকে আমরা অত্যন্ত ভালোবাসি। সবাই এই দাবি করেন। সব দলই দেশপ্রেমের কথা বলে। দেশপ্রেম যদি সত্যিই থাকে, তাহলে এদেশের দীর্ঘায়ু কামনা করতে সব দলের স্লোগান একই রকম হওয়া উচিত। এতে জাতির মধ্যে একতা সৃষ্টি হবে। আমাদের দেশের দীর্ঘায়ু কামনা করতে আমাদের এমন স্লোগান দেয়া উচিত যাতে অন্য কোনো দেশের প্রতি বা তাদের কোনো অঙ্গরাজ্যের প্রতি সামান্যতম ইঙ্গিতও সেই স্লোগানে না থাকে। সেটা হতে পারে বাংলাদেশ জিন্দাবাদ অথবা জয় বাংলাদেশ।
আরমান ভাই সব কিছুতেই একটু মজা করার চেষ্টা করেন। দেশের কোনো খারাপ খবর শুনলেই আরমান ভাই বলে উঠেন ঝয় বাংলা, ঝ-এর ওপর জোর দিয়ে। তাকে বললাম, আপনি জয় বাংলা না বলে ঝয় বাংলা কেন বলেন? তিনি বললেন, ওরা যদি বাংলাদেশ না বলে শুধু বাংলা বলতে পারে, তাহলে আমি জয় বাংলা না বলে ঝয় বাংলা বলতে পারব না কেন? বললাম, ওরা জয় বাংলা বলে সেটা আপনার পছন্দ না হলে আপনি জয় বাংলাদেশ বলুন, অথবা বাংলাদেশ জিন্দাবাদ বলুন। আরমান ভাই বললেন, বাংলাদেশ জিন্দাবাদ বললে যেমন ওরা আমাকে রাজাকার বলবে, সেরকম জয় বাংলাদেশ বললেও ওরা আমাকে রাজাকার বলবে। তাদের কাছে আমি শুধু তখনই সাধু হতে পারব যখন বলব ঝয় বাংলা, অর্থাত্ জয় বাংলা।
আরমান ভাইকে বললাম, আচ্ছা আপনি ঝয় বাংলা বলবেন ঠিক আছে, কিন্তু আরেকটু আস্তে বলা যায় না? আপনি যেভাবে জোর গলায় বলেন তাতে পাশে যারা থাকে তারা তো আতঙ্কিত বোধ করে। আরমান ভাই বললেন, এটা বাস্তবতার প্রতিফলন। বললাম কীভাবে? বললেন, আপনি একটু খেয়াল করলেই দেখবেন যে, যেখানে লগি-বৈঠা দিয়ে মানুষ মারা হয়েছে সেখানেও আক্রমণকারী জয় বাংলার লোক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা গুলি করেছে তারাও জয় বাংলার লোক, হেফাজতের ওপর যারা আক্রমণ করেছে, তারাও জয় বাংলার লোক—তার মানে যেখানে জয় বাংলা সেখানেই আতঙ্ক। তাই আমিও যখন ঝয় বাংলা বলি তখনও পাশে যারা আছে তারা একটু আতঙ্কিত হবে এটাই স্বাভাবিক।
জয় বাংলা? নাকি বাংলাদেশ জিন্দাবাদ? বাংলাদেশী নাকি বাঙালি? এ নিয়ে তর্ক চলছে যুগের পর যুগ ধরে। যেনতেন তর্ক নয়, রীতিমত মারামারি-কাটাকাটি হচ্ছে। বলতে গেলে পুরো দেশ এখন এই দুই শিবিরে বিভক্ত হয়ে গেছে। স্বাধীনতার ৪২ বছর পরেও বাংলাদেশী নাকি বাঙালি তা নিয়ে তর্ক করা এবং এ নিয়ে মারামারিতে লিপ্ত হওয়া সত্যিই দুঃখজনক। বাংলাদেশী নাকি বাঙালি এই বিতর্কে জাতিকে বিভক্ত করে রাখার মধ্যে দেশ ও জাতির কোনো মঙ্গল হতে পারে না, বরং এর দ্বারা দেশ ও জাতির মধ্যে বিভক্তি ফুটে উঠছে প্রকটভাবে এবং ক্ষতি হচ্ছে পুরো দেশ ও জাতির। আর এর দ্বারা দেশের শত্রুরা লাভবান হচ্ছে। ‘ভাগ কর আর শাসন কর’—ইংরেজদের এই নীতির বীজ তারা আমাদের ভেতর ঢুকিয়ে দিয়ে গেছে। তারা যাওয়ার সময় যাদের হাতে ক্ষমতা দিয়ে গেছে সেই ভারতীয়রা এখন সেই বীজে পানি আর সার দিয়ে যাচ্ছে আমাদের জাতি হিসেবে দুর্বল করে রাখার উদ্দেশ্যে। আর সেই ফাঁদে পা দিয়ে আমাদের রাজনীতিকরা জাতিকে বিভক্ত করে রাখার কাজটি করেই যাচ্ছে কেউ জেনে আর কেউ না জেনে। কেউ জয় বাংলা আর কেউ বাংলাদেশ জিন্দাবাদের পক্ষে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছে।
দু’পক্ষই কিছু যুক্তি পেশ করে থাকে। যারা জয় বাংলার পক্ষে, তারা বলেন যে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়েও আমরা জয় বাংলা স্লোগান দিয়েছি। আর আমরা তো বাঙালি জাতি, বাঙালি হিসেবে আমাদের একটা আলাদা পরিচয় আছে। আমাদের একটা আলাদা সংস্কৃতি আছে। বাঙালি হিসেবে আমরা বিশ্ব দরবারে নিজেদের পরিচয় দিতে আনন্দ বোধ করি। অন্য পক্ষ বলছে, বাঙালি বললে এতে পশ্চিমবঙ্গের মানুষদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তারা আমাদের বাংলাদেশের নাগরিক নয়। আর তাদের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করার জন্য আমরা স্বাধীনতা যুদ্ধ করিনি। আমরা যুদ্ধের মাধ্যমে যে ভূখণ্ডের স্বাধীনতা অর্জন করেছি তার নাম বাংলাদেশ, বাংলা নয়। বাংলা আমাদের ভাষার নাম।
এই তর্কের মধ্যে স্পষ্ট ফুটে উঠছে যে আমরা আমাদের জাতিসত্তার পরিচয় সঙ্কটে ভুগছি। এটা একটা জাতির জন্য লজ্জাজনক এবং দুঃখজনক। এ নিয়ে প্রচুর লেখালেখি হয়েছে। অনেক তথ্য ও তত্ত্বনির্ভর আলোচনাও দেখেছি। অত জ্ঞান আমার নেই। আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানে যা মনে হয়েছে তা হলো, আমরা চাইলেই এই সঙ্কট কাটিয়ে উঠতে পারি এবং পারা উচিত। তবে এর জন্য প্রয়োজন আন্তরিকতা। আমাদের মধ্যে আবার আন্তরিকতার বড়ই অভাব। আন্তরিকতার অভাবে সন্ত্রাস বন্ধ করা যাচ্ছে না। আন্তরিকতার অভাবে দুর্নীতি বন্ধ করা যাছে না। আন্তরিকতার অভাবে প্রচুর সম্পদ থাকা সত্ত্বেও নাগরিক জীবনের মান উন্নয়ন করা যাচ্ছে না। আন্তরিকতার অভাবে ক্ষমতাশালীদের দেশের সম্পদ চুরি বন্ধ করা যাচ্ছে না। আন্তরিকতার অভাবে দেশে শান্তি ফিরিয়ে আনা যাচ্ছে না। তাই মনে হচ্ছে আন্তরিকতার অভাবে বাংলাদেশী নাকি বাঙালি এই তর্কেরও সহজেই মীমাংসা হবে না। ব্যক্তিগতভাবেও অনেক সময় এসব কথা ওঠে। বন্ধুদের আড্ডায়ও মাঝে মাঝে এসব বিষয়ে কথাবার্তা হয়। আর রাজনৈতিক আলাপ-আলোচনায় প্রায় সময় এই বিষয়টি উঠে আসে। দেখা যায় অনেকেই আমাদের জাতীয় পরিচয় কী হওয়া উচিত তা নিয়ে দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ভোগেন। তাদের উদ্দেশেই এই লেখার অবতারণা।
কোনো জাতির পরিচয় কখনও ভাষাভিত্তিক, কখনও ধর্মভিত্তিক আবার কখনও ভূখণ্ডভিত্তিক হতে পারে। যেমন ভাষার ভিত্তিতে আমরা বাঙালি জাতি, ভূখণ্ডের ভিত্তিতে আমরা বাংলাদেশী, আর ধর্মের ভিত্তিতে সারা বিশ্বের মুসলমানরা মুসলিম জাতি, সারা বিশ্বের হিন্দুরা হিন্দু জাতি আর সারা বিশ্বের বৌদ্ধরা বৌদ্ধ জাতি। আমাদের এই বাংলাদেশ যুদ্ধের মাধ্যমে লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে স্বাধীন হয়েছে। এখানে মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও অন্যান্য ধর্মের অধিবাসীদের সহাবস্থান এখানে রয়েছে। তাই আমরা ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদ গ্রহণ করে নিজেদের মুসলিম জাতি বললে সব বাংলাদেশীকে এতে অন্তর্ভুক্ত করা যায় না। যেমন হিন্দু-বৌদ্ধরা তো মুসলমান নয়, তবে বাংলাদেশী। আবার ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ গ্রহণ করে বাঙালি জাতি বললে ভারতের কিছু মানুষ, যাদের ভাষা বাংলা, তারাও এতে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। যেমন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সুচিত্রা সেন, মান্না দে, সত্যজিত্ রায়, মমতা ব্যানার্জি, জিত, কোয়েল মল্লিক, দেব। ওরাও বাঙালি, তবে বাংলাদেশী নন। বাকি আছে ভূখণ্ডভিত্তিক জাতীয়তাবাদ। এই পরিচয়ে আমরা বাংলাদেশী। ভাষা-ধর্ম নির্বিশেষে যারাই বাংলাদেশের নাগরিক তাদের সবাইকে এই পরিচয়ে অন্তর্ভুক্ত করা যায়। তাই ভূখণ্ডভিত্তিক জাতীয়তা গ্রহণ করে আমাদের বাংলাদেশী হিসেবে পরিচয় দেয়া সবচেয়ে বেশি যুক্তিযুক্ত। মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, মগ, চাকমা, মুরং ইত্যাদি যে কোনো ধর্মের অনুসারী বা যে কোনো ভাষার ব্যবহারকারীই হোক না কেন; সবাই আমরা বাংলাদেশী। তবে কখনও কখনও প্রয়োজনে ভাষাভিত্তিক বা ধর্মভিত্তিক জাতীয়তার পরিচয় উল্লেখ করা যেতে পারে।
আমাদের প্রিয় ভাষার নাম বাংলা, আর আমাদের প্রিয় দেশের নাম বাংলাদেশ। জয় বাংলা অথবা বাংলাদেশ জিন্দাবাদ এই স্লোগানের মাধ্যমে আমরা সবাই আমাদের প্রিয় বাংলাদেশের দীর্ঘায়ু কামনা করে থাকি। জয় বাংলা বললে বাংলা ভাষার দীর্ঘায়ু কামনা করা হয়। এতে বাংলাদেশের দীর্ঘায়ু কামনা করার কথা বোঝা যায় না। কারণ আমাদের দেশের নাম বাংলাদেশ আর আমাদের ভাষার নাম বাংলা। জয় বাংলা বললে ভারতের বাংলা ভাষা ব্যবহারকারীরা এতে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাওয়ার কারণে জয় বাংলা ত্যাগ করে বাংলাদেশ জিন্দাবাদ অথবা জয় বাংলাদেশ বলা উচিত। আমরা বাংলা ভাষাকেও ভালোবাসি। এই ভাষার দীর্ঘায়ু কামনা করে জয় বাংলা বলা যেতে পারে। তবে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের দীর্ঘায়ু কামনা করতে জয় বাংলা একেবারেই যথেষ্ট নয়। এর জন্য বাংলাদেশ জিন্দাবাদ অথবা জয় বাংলাদেশ বলতে হবে।
বছর দুয়েক আগে ভারতের ওয়েস্ট বেঙ্গলের নাম পরিবর্তন করে বাংলা রাখার পক্ষে একটি মত পাওয়া গিয়েছিল। এখন সম্ভবত পশ্চিমবঙ্গ রাখা হয়েছে (নাকি পশ্চিম বাংলা রাখা হয়েছে জানি না)। কখনও যদি সেটার নাম আবার পরিবর্তন করে বাংলা রাখা হয়, তাহলে এদেশের জয় বাংলাওয়ালারা কী করবেন? তখন তো জয় বাংলা বললে ভারতীয় বাংলাই বোঝা যাবে। তখন তারা কি জয় বাংলা স্লোগান পাল্টাবেন? নাকি সেই ভারতীয় বাংলার দীর্ঘায়ু কামনা করতেই তারা তখন জয় বাংলা বলবেন? আমাদের প্রাণপ্রিয় এই বাংলাদেশকে আমরা অত্যন্ত ভালোবাসি। সবাই এই দাবি করেন। সব দলই দেশপ্রেমের কথা বলে। দেশপ্রেম যদি সত্যিই থাকে, তাহলে এদেশের দীর্ঘায়ু কামনা করতে সব দলের স্লোগান একই রকম হওয়া উচিত। এতে জাতির মধ্যে একতা সৃষ্টি হবে। আমাদের দেশের দীর্ঘায়ু কামনা করতে আমাদের এমন স্লোগান দেয়া উচিত যাতে অন্য কোনো দেশের প্রতি বা তাদের কোনো অঙ্গরাজ্যের প্রতি সামান্যতম ইঙ্গিতও সেই স্লোগানে না থাকে। সেটা হতে পারে বাংলাদেশ জিন্দাবাদ অথবা জয় বাংলাদেশ।
No comments:
Post a Comment