স্বাধীনতার স্বপ্ন-প্রকল্প এবং মওলানা ভাসানীর রোড-ম্যাপ

মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানীর স্বাধীনতার স্বপ্ন-প্রকল্প কী ছিল? রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব দখলের লড়াইয়ে দেশের ক্ষমতাবান-বলয়গুলো কি মওলানা ভাসানীর স্বপ্ন-প্রকল্পকে রোড-ম্যাপ হিসেবে ব্যবহার করছেন? স্বাধীনতার ৪২ বছর পর আমাদের মনে আজ এ প্রশ্নগুলো জাগছে। এ প্রশ্নগুলোর উত্তর দেয়া আজ প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। উত্তর দেয়ার আগে আমরা এখানে একটি গৈ-গ্রামের গল্প উল্লেখ করতে চাই। গল্পটির নাম হলো : ডাকাত দল আমার ঘরে আসবে না!
ডাকাত দল আমার ঘরে আসবে না
এক গ্রামে লোকমান শেখ নামে এক কৃষক বাস করে। সন্ধ্যারাতে নিকটস্থ বাজার থেকে বাড়ির দিকে আসার সময় সে দেখতে পেল, একটা জঙ্গলাকীর্ণ জায়গায় একদল ডাকাত ডাকাতি করার জন্য প্রসু্ততি নিচ্ছে। ডাকাত দলের প্রস্তুতি দেখে সে খুব ভয় পেয়ে গেল। তবে মনে মনে ভাবল, এরা তার গ্রামে নয়, প্রতিবেশী অন্য গ্রামে ডাকাতি করবে। তার ঘাবড়ানোর কিছু নেই। সে নির্ভয়চিত্তে নিজ গ্রামের দিকে যাচ্ছিল। উচাটন মন নিয়ে সে পেছন ফিরে তাকাল। বিস্ময়ে দেখল, ডাকাতরা তার গ্রামের দিকেই আসছে। সে মনকে সুবোধ দিল এই বলে যে, ডাকাতরা তার গ্রামের অন্য যে কোনো বাড়িতে ডাকাতি করতে পারে, তবে তার বাড়িতে নয়। লোকমান শেখ মনে মনে ভাবল, আমাদের বাড়িতে যখন ডাকাতরা আসবে না, তখন আমার এত উদ্বিগ্ন হওয়ার দরকার নেই। অন্য বাড়িতে ডাকাতি করলে করুক। তাতে আমার কি বাপু! এই ভেবে সে দ্রুত হেঁটে নিজ বাড়িতে গিয়ে উঠল। সে যখন নিজ বাড়িতে গিয়ে উঠল তখন দেখল ডাকাত দল তার বাড়ির দিকেই আসছে। সে তখন ভাবল, ডাকাতরা অন্য ঘরে ডাকাতি করবে। তার ঘরে আসবে না। যেহেতু ডাকাতরা তার ঘরে আসছে না, তার এত ব্যাকুল হওয়ার দরকার কী? সে তাড়াতাড়ি নিজের ঘরে গিয়ে উঠল। সে দেখল তার স্ত্রী বাচ্চাদের নিয়ে বিছানায় শুয়ে আছে। সে ঘরের বাইরে তাকিয়ে দেখল ডাকাতরা তার ঘরের দিকে আসছে। এখন কী করা! ওরা দেখি আমার ঘরের দিকেই আসছে। লোকমান শেখ ভাবল বাড়িতে ডাকাত ঢুকেছে স্ত্রীকে বললে, সে হাঁক-ডাক শুরু করবে। এতে ডাকাতরা আমার স্ত্রীকে নয়, আমাকে মারধর করবে। আমি মারধর সহ্য করতে পারি না বাবা। স্ত্রীকে কিছু না বলেই সে তাড়াতাড়ি ঘরের এক কোণে থাকা ধানগোলার ভেতর গিয়ে পালাল। স্ত্রী স্বামীর ভীত-সন্ত্রস্তভাব লক্ষ্য করে জিজ্ঞাসা করল, তোমার কী হয়েছে, গোলার ভেতর গিয়ে পালিয়েছ কেন?
এরই মধ্যে ডাকাতরা ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়েছে। তারা কৃষকের বউকে জিজ্ঞাসা করল, তোমার স্বামী কোথায় পালিয়েছে বল? নইলে তোমাকে আমরা মারধর করব। কৃষকের বউ অবস্থা বেগতিক দেখে, ঘরের কোণে ধানের গোলা দেখিয়ে দিল। ডাকাতরা গোলার ভেতর উপুড় হয়ে পড়ে থাকা কৃষককে কান ধরে তুলে আনল। ভীতু কৃষক কাঁপতে কাঁপতে ডাকাতদের পা ধরে বলল, ডাকাত সাহেবরা, আপনারা আমার বাবার মতো। আমাকে মারবেন না। আমি মারধর সইতে পারি না। আমি এক গরিব কৃষক। আমার ঘরে আপনাদের নেয়ার মতো কিছু নেই। আপনারা আমার ঘরে এসে যে কিছুই পাবেন না—এ লজ্জায় আমি খালি গোলায় গিয়ে মুখ লুকিয়ে ছিলাম। এ পোড়ামুখ আপনাদের আমি দেখাই কী করে। ডাকাতরা লোকমান শেখের ভঙ্গিচঙ্গি দেখে বুঝল লোকটা বদ কিসিমের। তারা তাকে বেধড়ক মারধর করার পর হাত-পা-মুখ বেঁধে ফেলে রাখল এবং পুরো গ্রামের বাড়িগুলোতে রাতভর ডাকাতি করে মালামাল নিয়ে চলে গেল।
লোকমান শেখ গ্রামের একজন গণ্যমান্য ব্যক্তি, বাড়ির মুরব্বি এবং পরিবারের কর্তা ছিলেন। ডাকাতদের দেখার পর থেকে প্রতিরোধ করার জন্য তার তিনটি কর্তব্যকর্ম ছিল। এগুলো হলো : গ্রামবাসীদের নিয়ে প্রতিরোধ করা, বাড়ির লোকদের নিয়ে প্রতিরোধ করা ও পরিবারের লোকদের নিয়ে প্রতিরোধ গড়া। তিনি এ তিনটির একটিও করেননি। এমনকি তার নিজের স্ত্রী-সন্তানদের নিরাপত্তার কথাও তিনি ভাবেননি। কীভাবে ডাকাতদের হাত থেকে নিজে বাঁচবেন সেটাই তার মূল লক্ষ্য ছিল। এ লোকটিকে সবচেয়ে ভালো করে যিনি জানেন তিনি তার প্রিয়তমা স্ত্রী। লোকটির স্বার্থপর চরিত্র সম্পর্কে তার স্ত্রী জানেন বলেই তার পালানোর জায়গাটি দেখিয়ে দিতে তিনি সময় ক্ষেপণ করেননি। কারণ এ লোকটির ভীত-সন্ত্রস্ত আচরণের কারণেই যে ডাকাতরা তার পিছু পিছু ধাওয়া করেছিল, এটা বুঝতে তার স্ত্রীর মোটেই কষ্ট হয়নি।
প্রিয় পাঠক, আমি যে কথাগুলো আপনাদের সঙ্গে আলোচনা করতে চেয়েছিলাম তা এ গল্পে বলা হয়ে গেছে। আমরা শুধু একটি কথা আমাদের রাষ্ট্র-পরিচালকদের স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে, বাংলাদেশের মানুষের স্বাধীনতা ও জানমালের নিরাপত্তা বিধান করার দায়িত্ব সরকারের। এ দায়িত্ব পালন না করে আমাদের দেশের কোনো কোনো সরকার এ কেচ্ছার কৃষক লোকমান শেখের মতো ব্যবহার করতে পারে। এ প্রেক্ষাপটে আমরা ভাসানী-মুজিবের স্বাধীনতার স্বপ্ন-প্রকল্প নিয়ে আলোচনা করতে পারি।
মওলানা ভাসানীর স্বাধীনতার স্বপ্ন-প্রকল্প
প্রিয় পাঠক, আপনারা জিজ্ঞাসা করতে পারেন, এ গল্পের সঙ্গে মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানীর স্বাধীনতার স্বপ্ন-প্রকল্পের সম্পর্ক কি? আপনারা জানেন, বাংলাদেশের মানুষ একটু নিরাপত্তা পাওয়ার জন্য যুগ যুগ ধরে স্বপ্ন দেখেছেন। বহিরাগতদের নিপীড়ন থেকে মুক্তির লক্ষ্যে লড়াই করেছেন। বাংলার মানুষ কৃষক ছিলেন। কৃষি জীবনের নিরাপত্তা ও ভূমির অধিকারিত্ব অর্জন ছিল তাদের স্বপ্ন। বাংলার কৃষক-শ্রমিকের সন্তানরা কৃষকের মুক্তির স্বপ্ন দেখেছিল। সে স্বপ্নের ক্যাটালিস্ট হিসেবে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কাজ করেছিলেন। এ জন্য তারা জানবাজি রেখেছিলেন। জেল-জুলুম-ফাঁসির মঞ্চে বার বার গিয়েছেন। তাই তো বাংলাদেশের মানুষ তাদেরকে প্রাণ দিয়ে ভালোবেসেছিল। অর্জিত এ ভালোবাসার ভিত্তিমূলে দাঁড়িয়ে কৃষকের নয়নমণি মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী আমাদের জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলেছিলেন। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্বপ্ন-প্রকল্প রচনা করেছিলেন। রাষ্ট্রের মূল্যবোধ হিসেবে সমতা, মানবতা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার কথা বলেছিলেন। এর ভিত্তিতেই বাংলার কৃষক-শ্রমিক মেহনতি মানুষ একনদী রক্তের বিনিময়ে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ অর্জন করে। দেশের মানুষের একটিমাত্র স্বপ্ন ছিল : শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ জীবন চাই। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের নিপীড়িত কৃষক-শ্রমিকের জীবনে কি নিরাপত্তা এসেছে? আমরা লক্ষ্য করেছি, স্বাধীনতার মূল-স্বপ্ন নিরাপত্তার আকাঙ্ক্ষা সুদূর পরাহত হয়ে পড়েছে। স্বাধীনতার পরপরই দেশবাসী লক্ষ্য করল তার প্রাণকেন্দ্রে ধানমন্ডির ৩২নং রোডের বাড়িতে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হলেন। তিনি বাংলাদেশ কৃষক-শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল) প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে নিহত হলেন। এ বছর ৪ নভেম্বর জেলখানায় নিহত হলেন স্বাধীনতার চার অন্যতম স্থপতি— সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমদ, মনসুর আলী ও এএইচএম কামারুজ্জামান। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে নিহত হলেন স্বাধীনতার মহাবীর জিয়াউর রহমান। এসব ঘটনা কেবল পারিবারিক বিষাদের ঘটনা নয়, বরং জাতীয় বিষাদের ঘটনা। বাংলাদেশের নিপীড়িত মানুষের মনে এসব ঘটনা গভীর রেখাপাত করেছে।
স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা
নানা টানাপড়েনের মাধ্যমে নিহত জাতীয় নেতাদের আতঙ্কগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের দেশের আশাহত মানুষ ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতায় নিয়ে এলেন। নিরাপত্তাহীনতার মানসিক অবস্থা নিয়ে যখন নিহত নেতাদের পরিবারের সদস্যরা রাষ্ট্রক্ষমতায় এলেন, তখন এদের নিরাপত্তাহীনতার আতঙ্ক জাতীয় জীবনে শোক-স্মৃতির রাজনীতিতে পরিণত হলো। নিরাপত্তাহীনতা জীবনের জন্য কতটুকু ভয়াবহ ও বেদনাদায়ক হতে পারে তা নিহত পরিবারের সদস্যরা ভালো জানেন। নিহতদের পরিবারের সদস্যরা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে, ঘটনাকালীন নিষ্ঠুরতা পরিবারের কোনো কোনো সদস্যকে নিষ্ঠুর করে তুলতে পারে—এটা মনোবিজ্ঞানের কথা। আমাদের দেশের রাজনীতিতে আজ যে নিষ্ঠুরতা লক্ষণীয় তা জাতীয় নেতাদের হত্যার আফটার ইফেক্ট। জাতীয় নিরাপত্তা অর্জনের স্বপ্ন বাংলাদেশের মানুষের মন থেকে জাতীয় নেতাদের নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে মুছে দেয়া হয়েছে। এতে বহির্দেশীয় আধিপত্যবাদীরা আমাদের জাতীয় স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার দুশমন হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। তদুপরি নিরাপদ জীবনের স্বপ্ন-প্রকল্প নির্মাতাদের হত্যাকাণ্ডের পর গড়ে ওঠা বিষাদের রাজনীতি বাংলাদেশের মানুষের মনে বিষাদের ছায়া ফেলেছে। এ বিষাদের ছায়া আমাদের স্বাধীনতার চেতনা ও নিরাপত্তার স্বপ্নকে বিনাশ করে দিয়েছে।
এ প্রেক্ষাপটে আমরা বলতে চাই, মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী বাংলাদেশের কৃষক, শ্রমিক মেহনতি মানুষের শান্তিপূর্ণ নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করার জন্য স্বপ্ন দেখেছিলেন। অতীব দুঃখের বিষয় হলো এই যে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শোকাহত পরিবারের ক্ষমতাসীন সদস্যরা সে স্বপ্ন-প্রকল্প আজ বহন করে না। আমরা বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করছি, দেশবাসীর নিরাপত্তা বিধানের চেয়ে এ ক্ষমতাসীনরা নিজেদের নিরাপত্তার কথা বড় করে দেখেছেন। নিজেদের মানসিক দুর্বলতার কারণে এরা শুধু দেশের স্বাধীনতাই আজ বিপন্ন করে তোলেননি, উপরন্তু দেশের সর্বস্তরের মানুষের জীবনকেও নিরাপত্তাহীন করে তুলেছেন। এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা বলতে চাই, যারা কৃষক লোকমান শেখের মতো কেবল নিজে ব্যক্তিগতভাবে বাঁচার জন্য গ্রাম বাঁচান না, বাড়ি বাঁচান না, পরিবার বাঁচান না, তাদের কাছে দেশ-জাতি-জনগণ নিরাপদ নয়।