কাকে সমর্থন করছি?

দর্শক-সমর্থক যে কোনো খেলার প্রাণ। সশরীরে মাঠে গিয়ে কিংবা টেলিভিশনের পর্দায় সমর্থিত দলের আইকন খেলোয়াড়দের নৈপুণ্যে ভক্তদের উচ্ছ্বাস-উন্মাদনা প্রকাশ আদিকাল থেকেই চলমান। এটি খেলার অবিচ্ছেদ্য-অপরিহার্য অংশ, সৌন্দর্যও বটে। সাজসজ্জার বৈচিত্র্যে এবং সমর্থন প্রকাশের রকমারি ভঙ্গিতে মাঠে উৎসবের আমেজ তৈরি হয়, যা নিঃসন্দেহে আয়োজক থেকে খেলোয়াড় সবাইকে অনুপ্রাণিত করে। ১৯৯৭ সালের আইসিসি ট্রফিতে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কাল থেকে ক্রিকেটের সঙ্গে এ দেশের মানুষের যে ঘনিষ্ঠতা, সময়ের সঙ্গে তা আরও প্রগাঢ় হয়েছে। ক্রিকেটকে ঘিরে 'স্বপ্ন' আরও রঙিন হয়েছে। ক্রিকেটারদের কাছে 'প্রত্যাশা' তুঙ্গে পেঁৗছেছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে আবেগ। কখনও কখনও ক্রিকেট শুধু খেলা নয়; প্রেরণার উৎস, জাতীয় ঐক্য আর মেলবন্ধনের দৃঢ় ভিত্তি।

ওয়ানডে আঙিনায় পা রাখার পর ক্রিকেটারদের সমান্তরালে বাংলাদেশের দর্শকরাও উদার এবং ক্রীড়াবান্ধব আচরণের কারণে বিভিন্ন মহলে সমাদৃত-প্রশংসিত হয়েছেন। গর্ব হয় যখন তারকা খেলোয়াড়দের এ দেশি দর্শকদের ক্রীড়াপ্রেম নিয়ে উচ্চকিত হতে দেখি। কারণটা মোটেও অনুমিত নয়। সমর্থক হিসেবে আমরা আবেগী হতে পারি, কিন্তু 'অন্ধ' নয়। প্রতিবেশী ভারত-পাকিস্তানে ক্রিকেটারদের ব্যর্থতায় কুশপুত্তলিকা দাহ হয়, বাড়ি-ঘরে হামলা করা হয়। অথচ বিজয়ের আনন্দে আমরা যেমন উদ্বেলিত হই, তেমনি আশাভঙ্গের হতাশায় ব্যথিত হয়ে বড়জোর দু'একটা কটুবাক্য উচ্চারণ করি। সাকিব-তামিম-মাশরাফি আমাদের 'দেবতা' না হোক, 'নায়ক' তো অবশ্যই। তাদের হাতে দৈত্য বধের স্বপ্ন নিয়মিতই দেখি। তারা আমাদের জাতীয় জীবনে আনন্দ-উচ্ছ্বাস করার মতো উপলক্ষ তৈরি করেছেন অনেকবার। তাই সচেতনভাবে তাদের হারজিত উভয়ই মেনে নেওয়ার মানসিকতা ক্রিকেটপ্রেমী দর্শকমাত্রের থাকা উচিত। আমরা বিশ্বাস করি, বিজয় বরাবরই মহান, তদুপরি বিজয়ের জন্য লড়াইও কম গৌরবের নয়।

ভাষা, স্বাধীনতা কিংবা বিজয়ের মাসে ব্যানারে, পোস্টারে, দেয়ালে, পত্রপত্রিকার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগের সাইটগুলোতেও লাল-সবুজ পতাকার ছড়াছড়ি চোখে পড়ে। এটাই প্রত্যাশিত। দেশপ্রেম প্রকাশে, দেশের নিশান ওড়াতে কার্পণ্য করব কেন? কিন্তু খেলার মাঠে গিয়ে গ্যালারিতে কিংবা টেলিভিশনের সামনে বসে যখন অন্য কোনো দেশের জয়ে বাংলাদেশি দর্শকদের উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়তে দেখি, তাদের জার্সি গায়ে চড়িয়ে পতাকা ওড়াতে দেখি; দেশপ্রেমের সে চিত্র তখন অনেকটাই মলিন হয়ে যায়। টানা দ্বিতীয়বারের মতো এশিয়া কাপ ক্রিকেট প্রতিযোগিতা ঘরের মাঠে অনুষ্ঠিত হওয়ায় এটি বেশ ভালোভাবেই অনুভূত হচ্ছে। অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে ভারত-পাকিস্তানের পক্ষাবলম্বন করে তাদের সাফল্যে অতিমাত্রায় উচ্ছ্বসিত হচ্ছে অনেকেই। ভীষণ মর্মাহত হই যখন দেখি, বাংলাদেশি দর্শকের হাতে-চিবুকে পাকিস্তানি পতাকা, কণ্ঠে পাক ক্রিকেটারদের প্রশস্তি! তবে কি মুশফিকুর রহিমের সেঞ্চুরি আমাদের যতটা আপ্লুত করে, আফ্রিদির বিধ্বংসী ব্যাটিংয়ে কিংবা কোহলির শতকে কেউ তার চেয়ে বেশি রোমাঞ্চিত হয়?

লাল-সবুজ জার্সিতে যারা দেশমাতৃকার প্রতিনিধিত্ব করছেন দায়বদ্ধতা থেকেই, তাদের সমর্থন জানানো কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। নিছক ক্রিকেট দল হিসেবে পাকিস্তান-ভারত বা অন্য কাউকে সমর্থন জানানো দোষের কিছু নয়। তাই বলে কোন প্রেক্ষিতে কার পক্ষ নিচ্ছি, তা বিবেচনা করব না? ভারত-পাকিস্তান ম্যাচে পাকিস্তানের সমর্থন আর দেশের বিপক্ষে লড়াইয়ে তাদের পক্ষ নেওয়ার মধ্যে বিস্তর ফারাক। নিজ ভূমিতে স্বদেশের বিপক্ষে খেলায় ভারত-পাকিস্তানকে সমর্থন করতে দেখা চরম হতাশার। দেশপ্রেমী প্রতিটি মানুষের কাছে বিব্রতকর। লাল-সবুজের নিশান থাকতে অন্য দেশের পতাকা ওড়ানোর দৃশ্য আর দেখতে চাই না। দর্শকদের হাতে এমন ব্যানার যেন না ওঠে, যাতে আমাদেরই লজ্জিত হতে হয়_ 'যেসব বঙ্গে জন্মি সাজে ভারতীয়-পাকিস্তানি/সেসব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।'