ভয়ঙ্কর নয় : শিক্ষককে চাই মানুষ গড়ার কারিগর হিসেবে

শিক্ষার্থীর ওপর শিক্ষকের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন সরকারিভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অথচ সরকারের এ নির্দেশ দেশের সবখানে মানা হচ্ছে না বলে প্রায়ই গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, অনেক ক্ষেত্রেই এ ধরনের অত্যাচার-নির্যাতন চালিয়ে তা ধামাচাপা দেয়া হচ্ছে। অনেক সময় লোকচক্ষুর আড়ালেও অহরহ ঘটছে শিক্ষার্থী নির্যাতনের ঘটনা।
জনসচেতনতার অভাবেও অনেক সময় এ অমানবিক ঘটনা ধামাচাপা থেকে যাচ্ছে। এভাবে নীরবে নামধারী কতিপয় শিক্ষক কর্তৃক শিক্ষার্থীদের নির্যাতন মেনে নেয়ার ঘটনাও ঘটছে। অথচ এসব জঘন্য অপরাধের বিষয়ে শিক্ষাঙ্গনসহ সর্বস্তরে প্রতিরোধ জরুরি। অন্যথায় সুস্থ ধারার শিক্ষা ব্যবস্থাপনা হুমকির মুখেই থেকে যাবে।
জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে জানা যায়, ঝালকাঠিতে প্যারেন্টস পেয়ার কিন্ডার গার্টেনের নার্সারি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক খান মো. আলমগীরের বিরুদ্ধে স্কুলে পড়তে আসা কোমলমতি শিশু শিক্ষার্থীদের অমানবিক দৈহিক প্রহারের অভিযোগ উঠেছে। জানা গেছে, গত ২২ এপ্রিল ক্লাসে হাতের লেখা লিখতে না পারার অপরাধে ওই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক খান মো. আলমগীর হোসেন শিশু শিক্ষার্থীদের বেত্রাঘাত করেন। স্কুল থেকে বাসায় ফিরে তামিম নামে এক শিশু তার মায়ের কাছে পিঠে বেতের আঘাতগুলো দেখায়। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে বৃদ্ধ দাদী তাকে নিয়ে স্কুলে গিয়ে প্রহারের কারণ জানতে চান।
এ সময় উত্তেজিত আরও কয়েকজন অভিভাবক এসে একই প্রশ্ন করলে অভিযুক্ত শিক্ষক আলমগীর বেকায়দায় পড়েন। পরে সুচতুর আলমগীর উপস্থিত অভিভাবকদের কাছে ভুল স্বীকার ও ক্ষমা প্রার্থনা চেয়ে রক্ষা পান। স্কুলের নার্সারি শ্রেণীর ছাত্র তামিমের মা তানিয়ার অভিযোগ, শিশু তামিমকে শুধু স্কুলে যাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলার জন্য স্কুলে ভর্তি করা হয়েছে। এভাবে যদি মারপিট করা হয় তাহলে তো শিশুরা স্কুলে আসতেই চাবে না। তিনি আরও অভিযোগ করেন, এর আগে পশ্চিম চাঁদকাঠি এলাকার প্রবাসী মজিবুর রহমানের মেয়ে দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্রী ইপ্তি (৮)-কে আলমগীর হোসেন কানের উপর চড় মারায় এখনো সে কানের ব্যথায় ভুগছে।
অভিভাবক তাহেরা বেগমের অভিযোগ, তার ছেলে শুভ ওই বিদ্যালয়ে গত বছর দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়ার সময় শিক্ষক আলমগীর ও অন্য এক সহযোগী শিক্ষক কয়েকবার মারধর করায় বাধ্য হয়ে অন্যত্র ভর্তি করিয়েছি।
অপরদিকে অভিযুক্ত শিক্ষক খান মো. আলমগীরের দাবি, বিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রীদের তাদের অভিভাবক ও পিতার দায়িত্ব হিসেবেই দেখেন তিনি।
পত্রিকায় প্রকাশিত অন্য এক খবরে জানা গেছে, বেসরকারি চাকরি বিধিমালা না মেনে নিজ পুত্রকে গালি দেয়ার অপরাধে এক ছাত্রকে নির্মমভাবে পিটিয়ে রক্তাক্ত জখম করে ক্ষমা চেয়ে পার পেয়ে গেলেন জামালপুর জেলার ইসলামপুরের নেকজাহান মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক ওমর আলী (বিএসসি)।
অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে ম্যানেজিং কমিটি বিধি মোতাবেক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও নেয়নি। বরং ওই শিক্ষকের চাকরি ও শাস্তি বাঁচাতে গত ৩ এপ্রিল বিদ্যালয় অফিস কক্ষে এক সালিশ দরবারের আয়োজন করা হয়। সালিশিতে নির্যাতিত ছাত্রর বাবা বিধিমোতাবেক অভিযুক্ত শিক্ষক ওমর আলীর বিরুদ্ধে বার বার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে তাগিদ দিলেও অবশেষে চাপের মুখে বিষয়টি ধামাচাপা দিতে অভিযুক্ত শিক্ষক ওমর আলী বিএসসি অভিভাবকের কাছে তার অশালীন বৈরীভাব কৃতকর্মের জন্য হাত ধরে ক্ষমা চেয়ে নেন।
ঘটনার বিবরণে জানা গেছে, ২ এপ্রিল ইসলামপুরের ঐতিহ্যবাহী নেকজাহান মডেল পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র মেহেদী হাসান ও তার বন্ধুরা ক্লাসে বিরতির সময় খেলার ছলে ওমর আলী বিএসসিকে নিয়ে তার ছেলে সিয়ামের সঙ্গে কথা কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে সিয়াম তার ওই বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক পিতা ওমর আলীকে বিচার দিলে তিনি তাত্ক্ষণিক বেত নিয়ে অষ্টম শ্রেণীর ক্লাসে ঢুকে মেহেদী হাসানের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে বেধড়ক পিটুনি দেয়। এতে মেহেদী হাসান গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে ক্লাসের অপর বন্ধুরাসহ তার পরিবারের লোকজন খবর পেয়ে তাকে উদ্ধার করে ইসলামপুর উপজেলা হাসপাতালে ভর্তি করে।
নির্যাতিত শিশুটিকে এক নজরও দেখতে যাননি নির্যাতনকারী শিক্ষক ওমর বিএসসি ও ওই স্কুলের প্রধান কর্তা। ছেলের প্রতিশোধ নিতে একজন শিক্ষকের এ নির্মমতার আচরণের খবর শুনে এলাকার সচেতন মহলে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
এ ব্যাপারে অভিযুক্ত শিক্ষক ওমর আলী ওই ছাত্রকে বেত্রাঘাতের কথা স্বীকার করে গণমাধ্যম কর্মীদের জানান, চাকরি জীবনের ৩০ বছরেও এমন ঘটনা তার জীবনে ঘটেনি। রাগের মাথায় এমনটি ঘটেছে। এতে তার চাকরি গেলেও কোনো আফসোস নেই। আহত ছাত্রের পিতা শেখ মো. জহিরুল ইসলাম তার ছেলের ওপর অমানুষিক নির্যাতনের সুবিচার দাবি করলেও অবশেষে ৩ এপ্রিল বিদ্যালয়ের অফিস কক্ষে এক শালিসিতে অভিযুক্ত শিক্ষক ওমর আলী শিশু নির্যাতনের বিষয়টি ক্ষমা চেয়ে পার পেয়ে যান। ইসলামপুরে ঐতিহ্যবাহী ওই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের আচরণে এমন বৈরীভাব ঘটায় সচেতন মহলে নানা গুঞ্জন চলছে এবং ক্ষমা নয় অভিযুক্ত ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন সচেতন মহলের অভিভাবকবৃন্দ। অপরদিকে বিষয়টি মিমাংসা হয়েছে এমন দাবি করে নিজের দায়সারা দায়িত্ব সেরেছেন ইসলামপুর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার গোলাম মোস্তফা।
গত ৮ মে একটি তুচ্ছ ঘটনায় গাজীপুরের কালিয়াকৈর পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ইংরেজি শিক্ষক জিন্নত আলী একই স্কুলের লামিয়া আক্তার নামে নবম শ্রেণীর এক ছাত্রীকে শ্রেণী কক্ষের ভেতরেই ডাস্টার দিয়ে এলোপাতাড়িভাবে পিটিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে মারাত্মক আঘাতসহ অমানুষিক নির্যাতন করেন।
এ নিয়ে ওই শিক্ষকের কাছে জানতে গেলে শিক্ষক জিন্নাত আলী ক্ষুব্ধ হয়ে ওই ছাত্রীর মা ও স্কুলের পরিচালনা পরিষদের সদস্য মোসাম্মত্ মিলি আক্তারকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ, বিভিন্ন ভয়ভীতি ও হুমকি প্রদর্শন করেন এবং তার বিরুদ্ধে কোথাও কোনো অভিযোগ করে লাভ হবে না বলেও সাফ জানিয়ে দেন। এ ব্যাপারে ওই শিক্ষার্থীর মা মোসাম্মত্ মিলি আক্তার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।
জানা গেছে, ইতিপূর্বে ছাত্রীদের সঙ্গে অশালীন ও কুরুচিপূর্ণ কথা বলা ও বিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা ভঙ্গসহ বিভিন্ন অভিযোগে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি ওই শিক্ষককে পর পর তিনবার শোকজ করেন।
অভিযুক্ত শিক্ষক জিন্নাত আলী স্থানীয় গণমাধ্যম কর্মীদের জানান, ওই মেয়েকে দুষ্টমী করার কারণে ডাস্টার দিয়ে পিটিয়েছি। শিক্ষক হিসেবে ছাত্রীদের মারধর করতেই পারি। (তথ্যসূত্র : অনলাইন বাংলালিংকডটকম, ৮.০৫.১৩)
রাজধানীর উদয়ন উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভাইস প্রিন্সিপাল ও শ্রমমন্ত্রী রাজিউদ্দিন আহমেদ রাজুর স্ত্রী মাহবুবা খানম কল্পনা শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ এনে গত ২৩ মে অর্ধ শতাধিক ছাত্রীর স্কুল ড্রেসের জামার ফুলহাতার অর্ধেকটা কেটে দিয়েছেন। এ সময় কাঁচিতে অনেকের হাতেও আঘাত লেগেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, নবম, দশম, একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণীর ৫০ জনের বেশি শিক্ষার্থী ফুলহাতা শার্ট পরে এসেছে—এমন অভিযোগ তুলে স্কুলের ভাইস প্রিন্সিপাল মাহবুবা খানম কল্পনা কাঁচি দিয়ে ছেলেদের সামনেই মেয়েদের জামার হাতা কেটে দেন। এ সময় অনেক শিক্ষার্থী ক্লাসেই কান্নায় ভেঙে পড়েন।
এ নিয়ে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। এ ঘটনার পর থেকেই প্রিন্সিপাল ও ভাইস প্রিন্সিপালের শাস্তির দাবিতে তারা স্কুল প্রাঙ্গণে অবস্থান নেন।
অভিভাবকদের অভিযোগ, স্কুল কর্তৃপক্ষ আগে কোনো ধরনের নোটিশ বা নির্দেশনা না দিয়ে এ কাজ করেছে। এ রকম স্বেচ্ছাচারী সিদ্ধান্ত মেনে নেয়া যায় না। শিক্ষার্থীরা ধর্মীয় কারণে হিজাব বা ফুলহাতা পরে আসতেই পারে। বাংলাদেশে এ ধরনের পোশাক নিষিদ্ধ নয়।
মন্ত্রীর স্ত্রী হওয়ার দাপটে স্কুলের ভাইস প্রিন্সিপাল এ কর্মকাণ্ডের পাশাপশি এর আগেও অনেক স্বৈরাচারী কর্মকাণ্ড করেছেন। মুসলিম দেশে মেয়েরা ফুল হাতার পোশাক পরিধান করতেই পারে।
উদয়ন উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রিন্সিপাল ড. উম্মে সালেমা বেগম ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে গণমাধ্যমে জানান, ‘আমার নির্দেশে তাদের জামার হাতা কেটে দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, এর আগে আমি তাদের অনেকবার নিষেধ করেছি ফুলহাতা পরে আসতে। কিন্তু এরপরও তারা একই কর্মকাণ্ড করেছে। তাই স্কুলের ভাইস প্রিন্সিপাল কাঁচি দিয়ে ফুলহাতা কেটে দিয়েছেন। স্কুলের নিয়ম অনুসারে সবাইকে ড্রেস পরে স্কুলে আসতে হবে। এর বাইরে মেনে নেয়া হবে না। তবে কেউ যদি পর্দার কারণে ফুলহাতা শার্ট ও হিজাব পরে, তবে লিখিতভাবে জানাতে হবে।’ (তথ্যসূত্র : বাংলালিংকডটকম, ২২.০৫.১৩)
বিদায়ী ২০১২ সালের বছরজুড়েই গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে, কতিপয় শিক্ষক কর্তৃক শিক্ষার্থীদের শারীরিক নির্যাতনের খবর।
কয়েকটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত খবরে জানা যায়, মাথার চুল বড় হওয়ার অভিযোগ এনে খুলনার সরকারি ল্যাবরেটরি উচ্চ বিদ্যালয়ের শতাধিক শিক্ষার্থীর চুল কেটে দেয়া হয়েছে গত বছর। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক গোলাম আজম কয়েকজন সহকর্মী শিক্ষক ও সেলুন মালিককে সঙ্গে নিয়ে ওই চুল কাটার নেতৃত্ব দেন। ফলে ১১৪ জন শিক্ষার্থী চরম লজ্জা এবং হতাশায় পড়ে। এ ঘটনায় ক্ষোভে ফুঁসে ওঠে শিক্ষার্থীদের অভিভাবকসহ বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সদস্যরাও।
ঘটনাটি ঘটে বিদায়ী ২০১২ সালের ১ সেপ্টেম্বর। প্রধান শিক্ষকের নির্দেশে খুলনা ল্যাবরেটরি হাইস্কুলের কোমলমতি ছাত্রদের হঠাত্ করেই চোরের মতো লাইনে দাঁড় করিয়ে চুল কেটে দেয়া হয়। ঘটনার শিকার শিক্ষার্থীরা অপমান সহ্য করতে না পেরে মাথা ন্যাড়া করে ফেলেছে। আবার কেউ কেউ টুপি দিয়ে লজ্জা ঢাকার চেষ্টা চালায়। স্কুল শিক্ষকদের ওই বর্বরোচিত আচরণে কখনো আমাদের কারোরই বিন্দুমাত্রও কাম্য নয়।
অপরদিকে ওই অমানবিক ঘটনার কথা প্রধান শিক্ষক স্বীকারও করেছেন গণমাধ্যম কর্মীদের কাছে। তবে স্কুলের শৃঙ্খলা বজায় রাখতেই এমনটা করা হয়েছে বলে ওই স্কুলের প্রধান শিক্ষক এ কে এম গোলাম আজমের দাবি।
তবে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের উপ-পরিচালক টি এম জাকির হোসেন ওই ঘটনা জেনে হতবাক হয়েছেন। তিনি গণমাধ্যমে জানান, ‘উত্থাপিত অভিযোগ তদন্ত হবে। উপযু্ক্ত বিচারও হবে।’
সংশ্লিষ্ট ছাত্রছাত্রীরা জানায়, অত্যন্ত খোঁড়া অজুহাতে খুলনার সরকারি ল্যাবরেটরি উচ্চ বিদ্যালয়ের ১১৪ শিক্ষার্থীর চুল খোঁচা খোঁচা করে কেটে ‘অমানবিক আচরণের’ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন ওই স্কুলের প্রধান শিক্ষক নিজেই। আর ওই ঘটনার পর থেকে বিদ্যালয়ে চরম উত্তেজনা বিরাজ করে। এর প্রতিবাদে পরদিন ২ সেপ্টেম্বর ক্ষুব্ধ অভিভাবকরা বিদ্যালয় চত্বরে বিক্ষোভ করেছেন। প্রধান শিক্ষক গোলাম আজমকে ‘অমানবিক আচরণকারী ও দুর্নীতিবাজ’ আখ্যায়িত করে অবিলম্বে তাকে গ্রেফতারপূর্বক দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিও করেন তারা।
অপরদিকে আতঙ্ক, ক্ষোভ, দুঃখ আর লজ্জায় মুখ লুকিয়ে বেড়াচ্ছে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। জানা গেছে, ঈদের সময় অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের চুল কেটে দিয়েছিলেন। যে কারণে তখনও পর্যন্ত নতুন করে চুল কাটার সময় হয়নি। তথাপি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক গোলাম আজম বিভিন্ন ক্লাসের ১১৪ জন শিক্ষার্থীকে তার কক্ষের সামনে ডেকে নিয়ে তাদের লাইন দিয়ে দাঁড় করিয়ে নিজ হাতে খোঁচা খোঁচা করে সবার চুল ছেঁটে দেন দাম্ভিকতার সঙ্গে। এ সময়ে তিনি অকথ্য ভাষায় শিক্ষার্থীদের গালিও দেন। আর সকল শিক্ষার্থীর চুল স্কুলের বারান্দায় বসে কাটলেও স্থানীয় কমিশনারের ছেলের চুল কাটিয়ে আনেন একটি সেলুন থেকে। শুধু তা-ই নয়, একই স্কুলে পড়ুয়া নিজের ছেলের চুল কাটার ব্যাপারে কোনো আগ্রহ দেখাননি প্রধান শিক্ষক গোলাম আজম ও তার সহকর্মী কয়েকজন শিক্ষক।
জানা গেছে, যখন চুল কেটে দিতে লাইনে দাঁড় করিয়ে দেয়া হয় তখন চুল না কেটে দেয়ার জন্য শিক্ষার্থীরা অনুরোধ করে। তবে তাদের কোনো কথায় কর্ণপাত করেননি প্রধান শিক্ষক। বরং অনেককে চড়-থাপ্পড় দিয়েছি, ভয় দেখিয়েছে। আর চুল কেটে দেয়ার পর যখন তারা বাসায় ফিরেছে তখন এলাকার মানুষ তাদের ‘চোর’ আখ্যা দিয়ে খেপিয়েছে। খেলার সাথীরা পিছু নিয়েছে। তাই অনেকেই শেষ পর্যন্ত লজ্জা ঢাকতে মাথা ন্যাড়া করে ফেলেছে।
নগরীর মহেশ্বর পাশা এলাকার নাহিদ পারভীন গণমাধ্যমে জানান, তার ছেলের চুল ধরে টেনে-হিঁচড়ে কেটে দেয়া হয়েছে। অথচ তার চুল কাটার সময় তখনও হয়নি। তিনি অভিযোগ করেন, প্রধান শিক্ষক গোলাম আজম প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষাভাবে ২০টি কোচিংয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত। যে সকল শিক্ষার্থী তার মনোনীত কোচিংয়ে পড়ে না তিনি শুধু বেছে বেছে তাদেরই চুল কেটে দিয়েছেন। এছাড়াও ওই প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে অসংখ্য দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। তবে প্রভাবশালী রাজনীতিকদের সঙ্গে তার সখ্য থাকায় কোনো তদন্তও হয় না।
ফুলবাড়ী গেট এলাকার বাসিন্দা এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক মনিরের অভিযোগ, প্রধান শিক্ষক গোলাম আজমের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অমানবিক আচরণ ছাড়াও স্কুলের মাইক্রোবাস বিক্রি করা, স্কুলের গাছ কেটে ঘরের ফার্নিচার করা, নিজের স্ত্রীকে কয়েকশ’ শিক্ষার্থীর টিফিন করে দেয়ার কন্ট্রাক্ট দেয়া, নানা অজুহাতে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেয়া, প্রতিটি ক্লাসে নির্ধারিত আসনের অতিরিক্ত শিক্ষার্থী অর্থের বিনিময়ে ভর্তি করা, কোচিং ব্যবসা পরিচালনা করাসহ অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে শিক্ষার্থীদের চুল কেটে দেয়ার কথা অকপটে স্বীকার করেছেন প্রধান শিক্ষক গোলাম আজম। ওই ঘটনায় তিনি দুঃখ প্রকাশ করে অভিভাবকদের কাছে ক্ষমাও চেয়েছেন। তবে তার বিরুদ্ধে আনিত অসংখ্য দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করলেও কোনো সন্তোষজনক জবাব তিনি দিতে পারেননি গণমাধ্যম কর্মীদের কাছে। তবে গণমাধ্যম কর্মীদের কাছে তার দেয়া তথ্যানুযায়ী বছরে ১০ লাখ টাকা সঞ্চয় করে মাত্র ২০ বছরে কীভাবে কোটি টাকার বাড়ি করেছেন—এমন প্রশ্নের উত্তরও তিনি এড়িয়ে গেছেন সুকৌশলে।
এ ব্যাপারে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা খুলনার উপ-পরিচালক জানিয়েছেন, ‘আমি সাংবাদিকদের কাছে ভিডিও ফুটেজ দেখে প্রথম ঘটনাটি জানতে পারি। তারপর সরাসরি ওই স্কুলে যাই এবং প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে আনিত অমানবিক আচরণের সত্যতার প্রমাণ পাওয়া গেছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে এবং অবশ্যই তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
অপরদিকে, শিক্ষকের বেত্রাঘাতে ২০ জন ছাত্রছাত্রী আহত হওয়ার ঘটনায় বিক্ষুব্ধ ছাত্রছাত্রীরা গত ২ সেপ্টেম্বর দুপুরে ক্লাস বর্জন করে অভিযুক্ত শিক্ষকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। এ ব্যাপারে গুরুতর আহত শিক্ষার্থী থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করলে অভিযুক্ত শিক্ষক ক্যাম্পাস ছেড়ে পালিয়ে যান। ন্যাক্কারজনক এ ঘটনাটি ঘটেছে নেত্রকোনা টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজে। এ ঘটনায় ছাত্র-শিক্ষক ও অভিভাবক মহলে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
স্কুলের নবম শ্রেণীর ড্রেস মেকিং বিভাগের শিক্ষার্থী জুঁই আক্তার জ্যোতির অভিযোগ, ক্লাসে বেত নিয়ে প্রবেশ নিষিদ্ধ হলেও স্কুলের জুনিয়র ইন্সট্রাক্টর (ড্রেস) খোরশেদ আলম গত ২৯ আগস্ট ক্লাসে পড়া না পারার কারণে ২০ জন শিক্ষার্থীকে সর্বনিম্ন ১২ থেকে সর্বোচ্চ ৩২টি করে বেত্রাঘাত করেন। দিলরুবা বেগম নামে এক ছাত্রীকে ৩২টি বেত্রাঘাত করা হয়। হুমায়রা চৌধুরী নামে এক ছাত্রকে ২৭টি বেত্রাঘাত করা হয়। মোশারফ হোসেন ও শুভ আহমেদকে ২০টি করে বেত্রাঘাত করা হয়েছে। গুরুতর আহত দিলরুবা আক্তার বাসায় ফিরে ঘটনাটি তার বাবা-মাকে জানায়। তারা বিষয়টি উক্ত কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষকে অবহিত করে বিচার দাবি করেন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ না নেয়ায় অবশেষে আহত শিক্ষার্থী ঘটনার দু’দিন পর দিলরুবা আক্তার নেত্রকোনা মডেল থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করে। অভিযোগ পাওয়ার পরপরই পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছলে প্রতিষ্ঠানের বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা ক্লাস বর্জন করে অভিযুক্ত শিক্ষকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে।
এ ব্যাপারে ড্রেস মেকিং বিভাগের প্রধান এ এস এম নাইম গণমাধ্যম কর্মীদের জানান, ওই অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে এর আগেও ছাত্রছাত্রীদের ক্লাসে মারধর করার অভিযোগ ছিল। পরে স্কুল কর্তৃপক্ষ এক জরুরি সভায় বসে তার বিরুদ্ধে ‘কেন আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে না’ এই মর্মে তিন কার্য দিবসের মধ্যে লিখিতভাবে জবাব দেয়ার জন্য নোটিশ প্রদান করেন। এ ব্যাপারে তদন্তকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা শাহাদাত্ হোসেন ঘটনার সত্যতাও পান।
ওদিকে, চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে ছাত্রকে অমানবিকভাবে শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। উপজেলার জোরারগঞ্জ আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ে অফিস কক্ষে ডেকে নিয়ে পঙ্কজ বড়ুয়া নামের এক শিক্ষার্থীকে মারাত্মক শারীরিক নির্যাতন করেছে ওই শিক্ষক। গত ১ সেপ্টেম্বর স্কুল চলাকালীন সময়ে এ ঘটনা ঘটে। এ ব্যাপারে আহত শিক্ষার্থীর চাচা পীযূষ কান্তি বড়ুয়া ঘটনার পরদিন উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার ও স্কুল পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি বরাবর লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।
অভিযোগে জানা গেছে, জোরারগঞ্জ আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের ৭ম শ্রেণীর ছাত্র পঙ্কজ বড়ুয়া ঘটনার আগের দিন স্কুলের পাশের রাস্তা দিয়ে ৪/৫ জন সহপাঠীসহ হাঁটছিল। দূর থেকে তারেক নামের অন্য বন্ধুকে দেখতে পেয়ে তারেক সম্বোধন করে ডাক দেয়। এ পথ দিয়ে যাচ্ছিল বিদ্যালয়ের শিক্ষক তারেক নিজামী। তাকে নাম ধরে ডেকেছে ভেবে ক্ষিপ্ত হয়ে পঙ্কজের ওপর চড়াও হন। পঙ্কজ পরদিন বিদ্যালয়ের যাওয়ার পর ওই শিক্ষক অফিস কক্ষে ডেকে নিয়ে মারাত্মকভাবে বেত্রাঘাত করতে থাকে। আঘাত করতে করতে ক্লান্ত হয়ে গেলে সাইফুল ইসলাম নামের অপর শিক্ষকও অমানবিকভাবে বেত দিয়ে পঙ্কজকে পেটাতে থাকে। একপর্যায়ে রক্তাক্ত অবস্থায় পঙ্কজ অজ্ঞান হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। ঘটনার দু’ঘণ্টা পর বাড়িতে খবর পাঠালে চাচা পীযূষ কান্তি বড়ুয়া উপজেলা হাসপাতালে নিয়ে চিকিত্সা করান।
লালমনিরহাটের হাতীবান্ধায় শিক্ষকের বিরুদ্ধে স্কুল ছাত্রীকে পিটিয়ে দাঁত ভেঙে দেয়াসহ নানা অভিযোগ নিয়ে তোলপাড়ের সৃষ্টি হয়। আলোচিত ওই প্রধান শিক্ষক আবদুস সবুরের বিরুদ্ধে নারী নির্যাতন মামলাও দায়ের করা হয়।
গত ২ সেপ্টেম্বর দুপুরে লালমনিরহাট জেলার ট্রাইব্যুনাল জজ আদালতে হাতীবান্ধা উপজেলার সিঙ্গিমারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বিতর্কিত প্রধান শিক্ষক আবদুস সবুরের বিরুদ্ধে সম্ভ্রমহানির মামলা করেছেন দৈনিক সংবাদের সাংবাদিক আলী আখতার গোলাম কিবরিয়ার স্ত্রী ওই স্কুলের সহকারী শিক্ষিকা মাসুদা আখতার। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১০/২ ধারায় দায়ের করা মামলাটি পরিচালনা করেন অ্যাডভোকেট নজরুল ইসলাম সরকার।
মামলার অভিযোগে বলা হয়, গত ১৪ জুলাই প্রধান শিক্ষক সবুর শিক্ষিকা মাসুদা আখতারের সম্ভ্রমহানি ঘটান এবং ওই নারী শিক্ষিকাকে মারতে উদ্যত হন। বিস্ময়ের ব্যাপার যে, প্রকৃত ঘটনা আড়াল করে কোনো প্রকার তদন্ত-শুনানি ছাড়াই উল্টো মাসুদা আখতারকে দোষী সাব্যস্ত করে পরদিন ১৫ জুলাই বিদ্যালয় ম্যানেজিং কমিটির একটি একতরফা রেজুলেশন সম্পাদন করা হয়। প্রধান শিক্ষকের লিখিত অভিযোগ ও রেজুলেশনের আলোকে আবারও কোনো ধরনের তদন্ত ছাড়াই লালমনিরহাটের জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মেহেরুন নেছা গত ১৯ জুলাই শিক্ষিকা মাসুদা আখতারকে সরাসরি সাসপেন্ড করেন। মূল ঘটনা উপস্থাপন করে মাসুদা আখতার ট্রাইব্যুনাল আদালতে প্রতিকার চেয়েছেন।
অভিভাবকদের মতে, শিক্ষকদের বলা হয় মানুষ গড়ার কারিগর। কিন্তু সেই শিক্ষকদের এ ধরনের অমানবিক আচরণ কেউ মেনে নিতে পারছে না। বিক্ষুব্ধ অভিভাবকরা অপমানজনক ওই ঘটনার তদন্ত এবং জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেছেন।
উল্লেখ্য, ২০১০ সালের ১ আগস্ট দেশের সরকারি-বেসরকারি স্কুল, কলেজ, মাদরাসা, কারিগরি শিক্ষা, বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের শারীরিক শাস্তি দেয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে এক পরিপত্র জারি করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের শিক্ষা সচিব সৈয়দ আতাউর রহমান স্বাক্ষরিত জারিকৃত ওই পরিপত্রে শিক্ষার্থীদের শাস্তি দেয়াকে অসদাচরণ হিসেবে গণ্য করা হবে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
২০০৮ সালের এপ্রিল মাসে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জন্য অনুরূপ এক পরিপত্র জারি করেছিল। এ ব্যাপারে হাইকোর্টের অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ রয়েছে। পরিপত্রে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শারীরিক শাস্তি দেয়া বন্ধ করতে এবং কার্যকর ব্যবস্থা নিতে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ও উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। যারা শারীরিক শাস্তি দেবেন তাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ১৮৬০, ১৯৭৪ সালের শিশু আইন এবং ক্ষেত্রমতে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে উদ্যোগ গ্রহণেরও নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
নির্দেশনা অনুযায়ী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানরা নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানে শারীরিক শাস্তি দেয়া বন্ধের বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবেন। বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটি নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানে শারীরিক শাস্তি প্রদানকারী শিক্ষকদের চিহ্নিত করে বিধিমোতাবেক প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নেবেন। এছাড়া শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন দফতর, অধিদফতর ও শিক্ষা বোর্ডগুলোর পরিদর্শকরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিদর্শনের সময় শারীরিক শাস্তি দেয়ার বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করবেন এবং পরিদর্শন প্রতিবেদনে উল্লেখ করবেন।

No comments:

Post a Comment