সদ্য প্রস্তাবিত নারী উন্নয়ন নীতিতে সরকার উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে নারী ও
পুরুষকে সমান করতে চাচ্ছে। তা করা হলে সুরা নিসার ১১ নং আয়াতে নির্দেশিত
বিধানের সরাসরি লঙ্ঘন করা হবে। অথচ এটি একেবারেই অপ্রয়োজনীয়। আয়াতটিতে বলা
হয়েছে—
‘আল্লাহ তোমাদের সন্তানদের ব্যাপারে নির্দেশ দিচ্ছেন : পুরুষের অংশ দু’জন
মেয়ের সমান। যদি (মৃতের ওয়ারিশ) দু’য়ের বেশি মেয়ে হয় তাহলে পরিত্যক্ত
সম্পত্তির তিনভাগের দু’ভাগ তাদের দাও। আর যদি একটি মেয়ে ওয়ারিশ হয় তাহলে
পরিত্যক্ত সম্পত্তির অর্ধেক তার। যদি মৃত ব্যক্তির সন্তান থাকে তাহলে তার
বাপ-মা প্রত্যেকে সম্পত্তির ছয় ভাগের এক ভাগ পাবে। আর যদি তার সন্তান না
থাকে এবং বাপ-মা তার ওয়ারিশ হয় তাহলে মাকে তিন ভাগের একভাগ দিতে হবে। যদি
মৃতের ভাই-বোন থাকে, তাহলে মা ছয় ভাগের এক ভাগ পাবে। এ সমস্ত অংশ বের করতে
হবে মৃত ব্যক্তি যে ওসিয়ত করে গেছে তা পূর্ণ করার এবং সে যে ঋণ রেখে গেছে
তা আদায় করার পর। তোমরা জানো না তোমাদের বাপ-মা ও তোমাদের সন্তানদের মধ্যে
উপকারের দিক দিয়ে কে তোমাদের বেশি নিকটবর্তী। এসব অংশ আল্লাহ নির্ধারণ করে
দিয়েছেন। আর আল্লাহ অবশ্যই সকল সত্য জানেন এবং সকল কল্যাণময় ব্যবস্থা
সম্পর্কে অবগত আছেন।
প্রকৃতপক্ষে ইসলামে পুত্রের চেয়ে কন্যার আর্থিক অধিকার এবং সুবিধা বেশি। নিম্নের বিশ্লেষণই তা প্রমাণ করবে।
আমার নিজের কথাই বলি। আমরা অনেক ভাই-বোন ছিলাম। আমার মরহুম আব্বার পুরো
সম্পত্তির মূল্য আজকের বাজারদরে প্রায় ৯০ লাখ টাকা হবে। আমরা প্রত্যেক ভাই
১৫ লাখ টাকার উত্তরাধিকারী হয়েছিলাম এবং প্রত্যেক বোন ৭.৫ লাখ টাকার
উত্তরাধিকারী হয়েছিল। অর্থাত্ আমার সুবিধা বোনের তুলনায় ৭.৫ লাখ টাকা বেশি
ছিল। অন্যদিকে ইসলামী বিধান মোতাবেক (দ্রষ্টব্য : সুরা বাকারা, সুরা নিসা ও
সুরা তালাক) আমাকে আমার স্ত্রী, পুত্র ও কন্যার ভরণপোষণ ব্যয় বহন করতে
হয়েছে। আজকের মূল্যে তা অন্তত ৩০ হাজার টাকা মাসিক খরচ হবে। আমার স্ত্রী ৩০
বছর বিবাহিত জীবনের পর মারা যান। এ সময়ে আমাকে প্রতি মাসে ৩০ হাজার টাকা
করে ৩০ বছর দরে ব্যয় করতে হয়েছিল, যার পরিমাণ (৩০,০০০*১২*৩০) = ১ কোটি ৮
লাখ টাকা। এরপরও পিতা হিসেবে আমার কন্যার জন্য আমাকে অনেক খরচ করতে হয়েছে।
অন্যদিকে আমার বোনের কোনো অর্থ ব্যয় করতে হয়নি বোনের স্বামী, পুত্র বা
কন্যার ভরণপোষণের জন্য। কেননা, কোরআন ও সুন্নাহ মোতাবেক তারা এর জন্য
দায়িত্বশীল নয়। অর্থাত্ ভরণপোষণের ক্ষেত্রে যেখানে আমাকে ১ কোটি ৮ লাখ টাকা
ব্যয় করতে হয়েছে, সেখানে এ পরিমাণ অর্থ আমার বোনকে ব্যয় করতে হয়নি। এ
ক্ষেত্রে বোনের সুবিধা ১ কোটি ৮ লাখ টাকা। যদি আমার ৭.৫ লাখ টাকা
উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া অধিক সুবিধা বাদ দেয়া হয় তাহলে বোনের নিট সুবিধা
হয় (১,০৮,০০,০০০-৭,৫০,০০০=১,০০,৫০,০০০/-) ১ কোটি ৫০ হাজার টাকা। এ হিসাবে
আমি মোহরানা ধরিনি। অসংখ্য ক্ষেত্রে হিসাব করে দেখেছি, সার্বিক আর্থিক
সুবিধা ইসলামী বিধানে পুত্রের চেয়ে কন্যার বেশি।
পিতামাতার উত্তরাধিকার বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সমান। ভাইবোনরা, যে ক্ষেত্রে তারা
উত্তরাধিকারী হয়ে থাকেন, বেশ কিছু ক্ষেত্রে সমান পান। এসব ক্ষেত্রেও সব
শ্রেণীর পুরুষের আর্থিক দায়িত্ব নারীর চেয়ে একইভাবে বেশি।
হিসাব করে দেখেছি, আমেরিকার জনগণ যদি ইসলামী আইন অনুসরণ করে, তাহলে নারীরাই
অধিক সুবিধা পাবে। সেখানে উত্তরাধিকার খুব সামান্যই পাওয়া যায়। কেননা,
বেশিরভাগ মানুষ ক্রেডিট কার্ডে চলে, তাদের সঞ্চয় নেই বা থাকলেও ৯৯ শতাংশ
ক্ষেত্রে তা খুবই সামান্য। সে দেশে মাসিক খরচ যদি মাত্র দুই হাজার ডলারও
ধরি তাহলে ৩০ বছরের বিবাহিত জীবনে ইসলামী আইন মোতাবেক নারীর সুবিধা হবে
(২০০০ ১২ ৩০) =৭,২০,০০০ ডলার (বাংলাদেশী টাকায় প্রায় ৫ কোটি ৭৬ লাখ টাকা)।
সুতরাং এটা স্পষ্ট যে, পুরুষ ও নারীর আর্থিক সুবিধা প্রদানের ক্ষেত্রে
ইসলাম মূলত নারীদের অধিক সুবিধা দিয়েছে। তাই উত্তরাধিকার আইন বদলের যে কোনো
প্রচেষ্টা অপ্রয়োজনীয়। তদুপরি ৯০ ভাগ মুসলিম অধিবাসীর বাংলাদেশে এ ধরনের
সরাসরি কোরআন-বিরোধী বিধান প্রবর্তন জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। দেশে
উত্তেজনা সৃষ্টি হবে। আমি সরকারকে অনুরোধ করি, যেন তারা এ উদ্যোগ থেকে সরে
আসেন। নারীদের সব ধরনের অধিকার দেয়া হোক, তাদের অধিকার যাতে তারা সত্যিকার
অর্থেই পায় এবং কেবল কথায় যাতে তা সীমাবদ্ধ না থাকে, তার জন্য ব্যবস্থা
নিন। কিন্তু সরাসরি কোরআন ও ধর্মের সঙ্গে সংঘর্ষশীল ব্যবস্থা নেবেন না। এসব
বিধান ভালো করে কার্যকরও হয় না। যেসব আইনের পেছনে নৈতিকতার সমর্থন রয়েছে,
ধর্মের সমর্থন রয়েছে, সেগুলো বেশি কার্যকর হয়। ধর্মবিরোধী আইন কখনোই
সত্যিকার অর্থে কার্যকর হয় না। কেননা আইনের পেছনে দরকার নৈতিক ভিত্তি।